বিস্মৃত হালুদার, অমর ‘হালুদারিয়া’
ত পো ম ন ঘো ষ
গঙ্গার বুকে যখন ভোরের প্রথম আলো এসে পড়ে, তখন জলের ওপরের রুপোলি ঝিলিক আর তীরের পলিমাটির সুবাস মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। নদী আর মানুষের জীবন যেখানে একসূত্রে গাঁথা, সেখানে মাছ কেবল খাদ্য বা জীবিকা নয়, তা বঙ্গজীবনের হাজার বছরের স্মৃতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু গাঙ্গেয় অববাহিকার শতশত জলজ প্রাণীকে বিজ্ঞান আর শিল্পের মেলবন্ধনে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে স্থান দেওয়ার পেছনে লুকিয়ে আছে দুই শতকের এক বিস্মৃতপ্রায় ও বেদনাবিধুর ইতিহাস।
চলতি বছরের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরে গঙ্গায় ইলিশের উঁকিঝুঁকি নিয়ে যখন তোলপাড় ফেলে দিয়েছেন নমামি গঙ্গে এবং সিফরি-র আধিকারিকরা, তখন মৎস্যবিজ্ঞানীদের একটা বড় অংশ প্রায় দুশো বছর আগে বুকানন হ্যামিল্টনের গবেষণা উদ্ধৃত করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, সমুদ্রমোহনা থেকে বহু দূরে ইলিশের দর্শন পাওয়া আদৌ কোনও নতুন ঘটনা নয়। তার বৈজ্ঞানিক এবং ঐতিহাসিক— দুই রকমেরই পূর্বসূত্র রয়েছে। সেই প্রসঙ্গেই উঠে এসেছে ওই গবেষণাগ্রন্থের বিস্মৃত বাঙালি চিত্রশিল্পী ‘হালুদার’-এর প্রসঙ্গ… এই শ্রাবণ তাই বুকানন হ্যামিল্টন ও হালুদারের ‘পরাভূত মৈত্রীর পুনর্বাসন’-এর গল্পকে ধরে রাখতে চায়— নরেশ গুহের কবিতার ভাষায়, ‘এক বর্ষার বৃষ্টিতে যদি মুছে যায় নাম/ এত পথ হেঁটে, এত জল ঘেঁটে, কী তবে পেলাম?’
আঠারো শতকের শেষভাগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিস্তারের সাথে সাথে ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদকে জানার এক অদ্ভুত উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল। ১৭৯৪ সালে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাশাস্ত্রের স্নাতক, প্রখ্যাত স্কটিশ উদ্ভিদবিদ ও ভূগোলবিদ ড. ফ্রান্সিস বুকানন-হ্যামিল্টন ভারতে আসেন। বাবার মতো চিকিৎসকের সাধারণ জীবন পছন্দ না করায় তিনি অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন হিসেবে ভারতে পাড়ি জমান। বার্মা সফর শেষে তাঁকে পাঠানো হয় তৎকালীন দূরবর্তী পূর্ব সীমান্ত, বর্তমান বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুরে। মেঘনা আর সুবর্ণরেখার জলরাশি তাঁকে আকুল করেছিল, কিন্তু শিবপুরের বটানিক্যাল গার্ডেনের প্রধান উইলিয়াম রক্সবার্গের সাফল্যের পাশে নিজের গবেষণা হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় তিনি অস্থির ছিলেন। সেই অনিশ্চিত দিনগুলোতেই রক্সবার্গের হাত ধরে বুকানন-হ্যামিল্টনের সঙ্গে পরিচয় হয় এক প্রতিভাবান বাঙালি তরুণের— যাঁর নাম হলধর গাঙ্গুলি। এই পদবি নিয়েও সন্দেহের অবকাশ যথেষ্ট। কেউ এমনটাও বলেন, গাঙ্গুলি নয়— মালদা অঞ্চলের ধীবরদের অতিপ্রচলিত পদবি ‘হালদার’ থেকেই ‘হালুদার’। রক্সবার্গ এবং বুকানন-হ্যামিলটন পরবর্তীতে সবসময় এই তরুণকে উল্লেখ করবেন ‘হালুদার’ (Haludar)নামে; ভাষাতাত্ত্বিক নিরিখে যা হলধর-এর অপভ্রংশ। তা যে তাঁর পদবি নয়, নাম হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবলতর, তা বোঝা যায় মার্টিন রিক্স সম্পাদিত ‘ইন্ডিয়ান বোটানিক্যাল আর্ট: অ্যান ইলাস্ট্রেটেড হিস্ট্রি’র মতো প্রামাণ্য বইতে। সেখানে রক্সবার্গ, রবার্ট রাইট বা ক্লদ মার্টিনের মতো বটানিস্টের অধীনস্থ কর্মচারী হিসাবে ‘হালুদার’ (Haludar), ‘গোবিন্দ'(Govindoo) বা ‘রঙ্গিয়া’ (Rungiah)-র উল্লেখ স্বনামেই পাওয়া যাচ্ছে। ১৭৯৭ সালের ৩০ নভেম্বর রক্সবার্গকে লেখা এক চিঠিতে বুকানন হ্যামিলটন লিখেছিলেন, ‘আমি আমার পুরনো চিত্রশিল্পীকে মাসে এক মোহর বেতনে মাছের ছবি আঁকার কাজে যুক্ত করেছি। আমি চেষ্টা করছি যেন সে নিখুঁতভাবে মাছের বাইরের রেখাটুকু আঁকতে পারে; সেটা হয়ে গেলেই আমি রং করানোর কাজ শুরু করব।’
যতটুকু জানা যায়, আজকের মালদা জেলা ছিল এই ‘হালুদার’-এর জন্মভূমি। কিশোর বয়সেই হয়তো গম্ভীরার মুখা আর মূর্তি গড়ার কৌশল দেখে শিল্পের প্রাথমিক হাতেখড়ি— তারপর পা রাখা পোট্রেট-এর জগতে। আইহো-সিঙ্গাবাদ জমিদারবাড়িতে পোট্রেট আঁকতে গিয়ে তাঁর তুলির ‘ডিটেইলিং’ আর ‘কিউরোসকিউরো’ বা আলোছায়ার কাজ চোখ টেনে নিল ইংরেজ রাজপুরুষটির। বুকানন-হ্যামিলটন বুঝলেন, এই তরুণটিকে দিয়ে তাঁর কাজ হবে, তবে ঘষেমেজে নিতে হবে। মহাফেজখানার প্রামাণ্য নথি সংকলন ‘দ্য মালদা ডায়েরি অ্যান্ড কনসালটেশনস (১৬৮০-১৬৮২)’ থেকে জানা যাচ্ছে, খোরাকি বাবদ সেই সময়ে, এমনকী পরবর্তী সময়েও এই জাতীয় ব্যক্তিগত অধঃস্তন কর্মচারীদের খোরাকি হিসাবে এক আনা বরাদ্দ করার রীতি প্রচলিত ছিল। স্কটিশ আধিকারিকটি বাঙালি শিল্পীর অঙ্কনশৈলীর বিরাট কোনও পরিবর্তন ঘটালেন না; ক্যামেরা-পূর্ব যুগে তিনি শুধু পোট্রেটের আলোছায়াকে বৈজ্ঞানিক স্পষ্টতার দিকে নিয়ে গেলেন। ট্র্যাডিশনাল ভেষজ রঙের পাশাপাশি রাসায়নিক রং ব্যবহৃত হল ছবিতে। সবথেকে বেশি জোর পেল অনুপুঙ্খতার বিষয়গুলি। জল থেকে তোলা মাছ আড়তে বা বাজারে আসার পথে হারিয়ে ফেলতে পারে তার প্রকৃতিপ্রদত্ত রং— তাই জেলেদের পাশে দাঁড়িয়ে দ্রুতহাতে তাদের তুলে আনা হতে লাগল স্কেচবুকে। অনেকক্ষেত্রে একাধিক কপিও বানানো হতে লাগল।
সেই শুরু। নদীপাড়ের এক অখ্যাত বাঙালি যুবক দিনে দিনে হয়ে উঠলেন এই মহাযজ্ঞের প্রধান চালিকাশক্তি। ১৮০৭ সালে লর্ড মিন্টো অবিভক্ত বাংলার মালদা ও দিনাজপুর জেলার জরিপের দায়িত্ব দিলে বুকানন-হ্যামিল্টন তাঁর প্রধান কার্যালয় স্থাপন করেন ইংরেজবাজার ও পুরাতন মালদায়। টাঙন, মহানন্দা, কালিন্দী আর গঙ্গার কোল-ঘেঁষে ঘুরে বেড়াতেন তাঁরা। স্থানীয় হাট, মাছের আড়ত আর সরাসরি নদীর তীরে জেলেদের থেকে তাজা মাছ সংগ্রহ করা হত। এই তথ্যভাণ্ডারই পরবর্তীতে গাঙ্গেয় ভারতের মৎস্য বৈচিত্র নিয়ে বুকানন-হ্যামিল্টনের কালজয়ী গবেষণামূলক গ্রন্থের মূল বৈজ্ঞানিক উপাদান সরবরাহ করেছিল। মৎস্যবিজ্ঞানী ড. রালফ ব্রিটজের কথায়, বুকানন-হ্যামিল্টনের প্রধান লক্ষ্যই ছিল সদ্য ধরা মাছের প্রাকৃতিক রং বদলে যাওয়ার আগেই তা নথিভুক্ত করা। আর এই কঠিন কাজটি নদীর পাড়ে বসেই ক্ষিপ্র হাতে সম্পাদন করতেন হালুদার। বুকানন নিজে দাঁড়িয়ে তরুণ হালুদারকে অণুবীক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, ব্যবচ্ছেদবিদ্যা ও ইউরোপীয় বৈজ্ঞানিক চিত্রায়নের কঠোর নিয়ম শেখান। ভেষজ রং, জলরং আর তুলির সূক্ষ্ম টানে আঁকতে থাকেন মাছের দৈর্ঘ্য, উচ্চতা, পাখনার কাঁটা, আঁশের বিন্যাস আর চোয়ালের সুঁচালো দাঁত। পরবর্তীকালে ব্যারাকপুরে লর্ড ওয়েলেসলির ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানার পাখি ও পশুপাখির ছবি আঁকা থেকে শুরু করে শিবপুরের ‘রয়েল বোটানিক গার্ডেন’-এর প্রধান ড্রাফটসম্যান হিসেবে হালুদারের দক্ষতা সর্বজনস্বীকৃত হয়। সেখান থেকেই সরকারি নিয়মে অবসর গ্রহণ করেন তিনি। মালদার কৃতী ভূমিপুত্র আচার্য বিনয় সরকার বা বিধুশেখর শাস্ত্রীর পথ ধরেই জন্মভূমিতে ফেরা হয়নি তাঁর।
কিন্তু এই যৌথ প্রতিভার সৃষ্টির ওপর নেমে এসেছিল ঔপনিবেশিক শাসনের নিষ্ঠুর কুঠারঘাত। ১৮১৫ সালে ভারত ছাড়ার সময় গভর্নর জেনারেল লর্ড ময়রা ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে বুকানন-হ্যামিল্টনের কাছ থেকে হালুদারের আঁকা ১৪৪টি রঙিন চিত্র বাজেয়াপ্ত করেন। ফলে ১৮২২ সালে এডিনবরা থেকে প্রকাশিত বুকানন-হ্যামিল্টনের কালজয়ী গ্রন্থ ‘অ্যান অ্যাকাউন্ট অফ দ্য ফিশেস ফাউন্ড ইন দ্য রিভার গ্যাঞ্জেস অ্যান্ড ইটস ব্রাঞ্চেস’-এ স্থান পায় মাত্র ৯৭টি এক রঙের পেন্সিল স্কেচ ও কালির ছবি। দেশীয় শিল্পীদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ছাপানোর নিয়ম না থাকলেও, বুকানন তাঁর ব্যক্তিগত ডায়রিতে সেই ‘বাঙালি যুবক হালুদার’-এর অবিস্মরণীয় দক্ষতার প্রশংসা করে যান।
কালক্রমে ইতিহাস এই বাঙালি শিল্পীকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। ব্রিটিশ লাইব্রেরি, ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম, হার্ডউইক কালেকশন, জুওলজিক্যাল সোসাইটি অফ লন্ডন এবং লিনিয়ান সোসাইটির অন্ধকারে ধুলো জমছিল তাঁর আঁকা কাজগুলোতে। ২০০ বছর পর ইতিহাস তার ভুল শুধরে নিতে শুরু করে। ঐতিহাসিক উইলিয়াম ডালরিম্পল তাঁর ‘ফরগটন মাস্টার্স’ প্রদর্শনীতে হালুদারের মতো বিস্মৃত ভারতীয় শিল্পীদের বিশ্বমঞ্চে ফিরিয়ে আনেন। পাশাপাশি, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মূল ২২৫টি ছবির প্রাথমিক সংগ্রহ ও অনুলিপি থেকে ২২৩টি হারিয়ে যাওয়া রঙিন চিত্রকর্ম একত্রিত করে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ড. র্যালফ ব্রিটজের সম্পাদনায় ২০১৯ সালে ঐতিহ্যবাহী ‘রে সোসাইটি’ প্রকাশ করে ‘ফ্রান্সিস হ্যামিল্টন’স গ্যাঞ্জেটিক ফিশেস ইন কালার’ (আইএসবিএন: ৯৭৮-০-৯০৩৮৭৪-৫২-৬, মূল্য: ১৫০ পাউন্ড) শীর্ষক আকরগ্রন্থটি। এই গ্রন্থে ভারতীয় মৎস্যবিজ্ঞানের জনক হিসেবে বুকানন-হ্যামিল্টনের পাশাপাশি চিত্রকর হিসেবে হালুদারের অবদানকেও সমমর্যাদায় মূল্যায়ন করা হয়। এরপর ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী লিনিয়ান সোসাইটিতে একটি বিশেষ প্রদর্শনী এবং ড. ব্রিটজের ‘ফ্রান্সিস হ্যামিল্টন’স গ্যাঞ্জেটিক ফিশেস: অ্যান ইকথিওলজিক্যাল মাস্টারপিস এহেড অফ ইটস টাইম’ শীর্ষক বক্তৃতার মাধ্যমে বিজ্ঞানবিশ্ব আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেয় হ্যামিল্টন ও হালুদারের এই যৌথ অমর সৃষ্টিকে।
তবে মৎস্যবিজ্ঞানের জগতে সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক স্বীকৃতি এসেছিল ২০১০ সালে। শ্রীলঙ্কার বিজ্ঞানী রোহান পেথিয়াগোডা গঙ্গা অববাহিকার একধরনের ক্ষুদ্র ক্রান্তীয় মাছের গণের নামকরণ করেন ‘হালুদারিয়া’ (Haludaria)। পেথিয়াগোডা তাঁর গবেষণাপত্রে লেখেন, ‘হালুদারিয়া নামটি ‘হালুদার, এক বাঙালি যুবক’-এর স্মরণে রাখা হল, যিনি ১৭৯৭ সাল নাগাদ গাঙ্গেয় মাছের ওপর প্রকাশিত ফ্রান্সিস বুকানন-হ্যামিল্টনের ১৮২২ সালের গ্রন্থের সেই অপরূপ সুন্দর ছবিগুলো এঁকেছিলেন।’
মালদার পলিবাহিত নদীগুলোর স্রোতে আজও জলজ জীবন একই ঋতুচক্রে আবর্তিত হয়। পদ্মা আর গঙ্গার কোলভাঙা বাতাসে যখন নদীপাড়ের ভিটেমাটি আর স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন নদীর গভীরে সাঁতরে চলা ওই ছোট্ট ‘হালুদারিয়া’-র আঁশের ঝিকিমিকিতে যেন বেঁচে থাকেন এক উপেক্ষিত শিল্পী। ঔপনিবেশিক বিস্মৃতির গহ্বর থেকে উঠে এসে বঙ্গোপসাগর আর গঙ্গার ঢেউয়ের মতোই আজ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে অমর হয়ে রইল বাঙালি যুবক হলধর-এর নাম ও তাঁর তুলির স্পর্শ। নাকি, সকলের অলক্ষ্যে ‘মোনালিসার হাসি’ হেসেছিলেন মহাকাল? বিষ্ণুপুরাণের প্রথম অবতারকে সযত্নে আশ্রয় দিলেন অষ্টম/নবম অবতার হলধর বলরাম… প্রলয়পয়োধি জলে ‘কেশব ধৃত মীন শরীর’ তার অনাদ্যন্ত পরিক্রমা শেষ করল ‘কেশব ধৃত হলধর রূপ’-এর আশ্রয়ে! কালের যাত্রার ধ্বনির অন্তরালে ইতিহাস প্রতিশোধ-অভিলাষীও বটে— তাই তার ফিরে আসার পথটুকু আর ফুরাতে চায় না…
চিত্র: গুগল






