বৌদ্ধধর্মে ধ্যান
ন ন্দি নী ক র চ ন্দ
ধ্যান হল মনকে শান্ত ও একাগ্রতার সাথে মনোনিবেশ করার একটি বিশেষ অনুশীলন। এর মাধ্যমে আবেগীয় স্থিতিশীলতা অর্জন করা যায়। সাধারণত মেরুদণ্ড সোজা রেখে শান্তভাবে বসে এটি অনুশীলন করা হয়। এই সময় শ্বাসপ্রশ্বাস বা কোনও মন্ত্রের ওপর মনোযোগ নিবদ্ধ করা হয়। নিয়মিত ধ্যান করলে বর্তমানের এই কঠিন জীবনে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমে।
বৌদ্ধ ধর্মে ধ্যান হল জাগতিক দুঃখ থেকে মুক্তি পেয়ে নির্বাণ লাভের একটি মার্গ বা পদ্ধতি। একে পালি ভাষায় ‘ভাবনা’ (Bhavana) বা মনের প্রশিক্ষণ বলা হয়। এর মূল লক্ষ্য হল, মনকে নেতিবাচক চিন্তা ও আবেগ থেকে মুক্ত করা। বৌদ্ধধর্মে মূলত দুই ধরনের ধ্যানের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়: ১. শমথ (Samatha): এর অর্থ প্রশান্তি বা স্থৈর্য। এই ধ্যানের মাধ্যমে মনকে এক জায়গায় স্থির ও একাগ্র করা হয়। ২. বিপশ্যনা (Vipassana): এর অর্থ অন্তর্দৃষ্টি। এর মাধ্যমে বাস্তবের স্বরূপ এবং জীবনের সত্য উপলব্ধি করা হয়।
বৌদ্ধধর্মে ধ্যানের উদ্দেশ্য মন থেকে লোভ, ঘৃণা ও মোহ দূর করা। মনকে করুণা, মৈত্রী ও মননশীলতায় উদ্বুদ্ধ করা। জীবনের প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করে বুদ্ধত্ব বা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের জাগরণ ও বোধোদয় লাভ করা। বৌদ্ধ ধর্মে মুক্তির পথ, নির্বাণ অর্জনের জন্য ধ্যানের প্রয়োজন অপরিহার্য। সব ধরনের বৌদ্ধ ধর্ম সঙ্ঘে ধ্যান অনুশীলনের প্রচলন থাকলেও কিছু কিছু তফাত রয়েছে। থেরবাদ বৌদ্ধ ধর্মে শমথ ও বিপাসনার প্রচলন দেখা যায়। চৈনিক ও জাপানি বৌদ্ধ ধর্মে সর্বস্তিবাদ-এর চল বেশি দেখা যায়। আবার, তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মে দেবতা-যোগ এর প্রচলন দেখা যায়, যা শূন্যতা উপলব্ধি বা নির্বাণ লাভের জন্য ব্যবহার করা হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে, একজন অনভিজ্ঞ ধ্যানীর জন্য ধ্যানের প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। অভিজ্ঞ ধ্যানী, যে-কোনও অবস্থায়, যে-কোনও পরিস্থিতিতে, যে-কোনও ভাবে ধ্যান করতে সক্ষম। তবে অনভিজ্ঞ ধ্যানীর বেলায় ধ্যানীর মনোযোগ সহজেই বিচ্যুত হয়, যার জন্য তাকে বেশ কিছু ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হয় যাতে করে ধ্যান করার সময় মনোনিবেশে কোনও অসুবিধা না ঘটে।
ধ্যান শুরু করার পূর্বে সাধককে কিছু ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হয়, যা অনেকে শীল বলেও জেনে থাকেন। অন্তত ৫টি বিষয়ে সাধককে ব্রত থাকতে হয়, যা পঞ্চশীল নামে পরিচিত।
পঞ্চশীল হল: প্রাণিহত্যা না করা, যা দেওয়া হয়নি এমন বস্তু না নেওয়া বা চুরি থেকে বিরত থাকা, অবৈধ কামাচার ও ব্যভিচার তথা যৌনকর্ম থেকে বিরত থাকা, মিথ্যা কথা বা কাউকে আঘাত করে এমন কোনও কথা না বলা, এবং কোনও প্রকার নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন বা গ্রহণ থেকে বিরত থাকা।
বিশেষ কিছু জায়গা শিক্ষার্থী সাধকের ধ্যানের ব্যাঘাত বা অনুকূল পরিবেশরূপে কাজ করে। অনুকূল পরিবেশ হল দিনে লোকজনের তেমন সমাগম নেই এবং রাতে নির্জন। যেখানে পোকামাকড়, মশা-মাছি, সরীসৃপ ইত্যাদির উপদ্রব নেই।
ধ্যানে অভিজ্ঞ, এমন কারও সান্নিধ্যে, এবং লোকালয় থেকে দূরেও নয়-কাছেও নয় এমন স্থান, যেখানে প্রয়োজনীয় দ্রব্য যোগাড় করা সহজ। ৫টি ব্যপারে সতর্কতা নিতে হয়। এই ৫ ধরনের বিষয় পঞ্চনিবারণ বা ধ্যানে বাধা বা প্রতিবন্ধকতা রূপে কাজ করে। সেগুলো হল:
১) কামছন্দ: পঞ্চকামগুণ বা রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস ও স্পর্শ-এর প্রতি যে আসক্তি তাই কামছন্দ। এটি ধ্যানের একাগ্রতাকে বাধা দেয়। ধ্যানে একাগ্রতা আনয়নের মাধ্যমে এর প্রতিহত করা যায়।
২) ব্যাপদ: ক্রোধ, ইর্ষা, হিংসা ও ঘৃণার বশবর্তী হয়ে অন্যের ক্ষতি করা বা করার ইচ্ছাই ব্যাপদ। সৎ কর্মতে অনীহা ব্যাপদের লক্ষণ।
৩) স্থিনমিদ্ধ: চিত্তের অলসতা, সংকোচতা, অস্পষ্টতা, অকর্মণ্যতা, অনুৎসাহ, অবসাদ ইত্যাদিকে স্থিনমিদ্ধ বলে। কুশল চিত্ত গ্রহণ করতে এটি অক্ষম ও অপারগ। মনের জোরকে দুর্বল বা নষ্ট করা এদের কাজ।
৪) ঔদ্ধত্য কৌকৃত্য: অস্থির চিত্তকেই ঔদ্ধত্য বলা হয়। ধ্যনের একাগ্রতা তথা অবলম্বন থেকে এটি বিচ্যুতি ঘটায়। মনে অশান্তি আনে। আর, কৌকৃত্য হল মনের অনুশোচনা, আক্ষেপ, অনুতাপ ও উৎকণ্ঠাকে বোঝানো হয়। এর প্রতিপক্ষ হলে সুখ।
৫) বিচিকিচ্ছা: এর অপর নাম সন্দেহ। ধ্যানীর মনে যখন সন্দেহের জন্ম হয় তখন তাকে বিচিকিচ্ছার সৃষ্টি হয়, এবং এর ফলে ধ্যান বা কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এর পরিণাম অনিশ্চয়তা। বিচার এর প্রতিপক্ষ।
মনকে শান্ত করার জন্য শমথ ধ্যানে ৪০ ধ্যেয় (যাকে অবলম্বন করে ধ্যান করা হয়) নির্বাচন করা হয়েছে। নিজের চরিত্র অনুযায়ী সাধক নিজে বা তার গুরু বা প্রশিক্ষকের দ্বারা পন্থা বাছাই করেন।
ধ্যানের নিমিত্ত আবার ৩ রকমের হতে পারে।
পরিকর্ম নিমিত্ত
ধ্যানী যখন উল্লিখিত ৪০টি ধ্যেয় থেকে যে বিষয়টি তার ধ্যানের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে, তখন সেটি বা সেই অবলম্বনটিই পরিকর্ম নিমিত্ত, যা ধ্যানের প্রাথমিক অবলম্বন।
উদগ্রহ নিমিত্ত
ধ্যানী যখন ধ্যানের সেই পর্যায়ে পৌঁছে যান, যখন চোখ বন্ধ করলেও তিনি চোখ খোলা অবস্থায় পরিকর্ম নিমিত্ত যেমন দেখেন, ঠিক তেমনই দেখতে পান, তখন এই দর্শন শক্তিকে (মন দিয়ে যা দেখেন) উদগ্রহ নিমিত্ত বলা হয়ে থাকে।
প্রতিভাগ নিমিত্ত
উদগ্রহ নিমিত্ত চোখ বন্ধ অবস্থায় দেখতে সম্ভব হলেও তার মাঝে উজ্জ্বল-স্বচ্ছ ভাব থাকে না। কিন্তু ধ্যানী, ধ্যানের গভীর স্তরে প্রবেশের মাধ্যমে, অবিচ্ছিন্নভাবে মানসিক স্থিতি বিরামহীন ভাবে ধরে রাখতে পারলে, সেই নিমিত্তটি আরও স্পষ্ট হতে থাকে এবং একাগ্রতার সাথে ধ্যানের মাধ্যমে তা ক্রম উজ্জ্বল হতে থাকে এবং আলোর মতো জ্যোতির্ময় হয়ে ওঠে, তখন তাকে প্রতিভাগ নিমিত্ত বলা হয়।
ধ্যানের জ্ঞান পর্যায়
ধ্যান তপস্যার মাধ্যমে শমথ ধ্যানী লৌকিক জ্ঞানের ৩টি সমাধি লাভে সক্ষম হয়, যেগুলো হলে পরিকর্ম সমাধি, উপাচার সমাধি ও অপর্ণা সমাধি।
পরিকর্ম সমাধি
ধ্যানী যে নিমিত্ত নিয়ে ধ্যান শুরু করে, তা যতক্ষণ না পর্যন্ত মনে গেঁথে যাচ্ছে, ততক্ষণ মনেমনে, অর্থাৎ ঠোঁট বা জিভ না নেড়ে মনস্থ করার চেষ্টা চালিয়া যেতে হয়। এই প্রচেষ্টার ধাপটিই পরিকর্ম সমাধি।
উপাচার সমাধি
এই ধাপে ধ্যানী চোখের সামনে না থাকলেও নিমিত্ত দেখতে পান।উদগ্রহ নিমিত্তে তার আকার ও রঙ থাকে যা এখানে লোপ পায় এবং বজায় থাকে উপলব্ধিজাত একপ্রকার ধ্যান প্রতিকৃতি।
নিয়মিত প্রতিভাগ নিমিত্তে মনোনিবেশ অব্যাহত রাখলে উপাচার সমাধি লাভ হয়। এর লাভ হলে, পঞ্ছনীবরণ প্রতিবন্ধকতা লোপ পায়।
অপর্ণা সমাধি
এই স্তরে ধ্যানীর মনে সেই নিমিত্তটি প্রবলভাবে দৃঢ় হয় এবং স্থায়ীভাবে স্থিরতা লাভ করে। তখন ধ্যানীর কাছে লৌকিক নয় এমন কাজ করার ক্ষমতা অর্জিত হয়। সাধনার এই ধ্যান স্তরের নামই অপর্ণা সমাধি। এটিই মূলত ধ্যানের দৃঢ়তার শেষ ধাপ।
বৌদ্ধ ধ্যান অনুশীলন ধ্যানকারীদের সচেতনতা, প্রশান্তি এবং অন্তর্দৃষ্টির মতো মৌলিক মূল্যবোধগুলি বিকশিত করতে সাহায্য করে। বৌদ্ধ দর্শন অনুসারে, যখন আমরা আমাদের মন ও আবেগগুলিকে আরও ভালভাবে বুঝতে পারি, তখন আমরা আমাদের কর্ম ও প্রতিক্রিয়াগুলিকে এমনভাবে পরিচালনা করতে পারি যা আমাদের নিজেদের এবং আমাদের চারপাশের সকলের মঙ্গল ও সুখ বয়ে আনে। এবং আমরা অন্যদের মঙ্গল ও সুখের গুরুত্ব যত বেশি উপলব্ধি করি, ততই আমরা সহানুভূতি ও ভালবাসা অনুভব করি । মননশীলতা এবং সচেতনতাই এর মূল চাবিকাঠি।
বুদ্ধদেব মুক্তি লাভের যাত্রার একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে মননশীল ধ্যানের শিক্ষা দিয়েছেন। একটি বিখ্যাত উপদেশে তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, সচেতনতা বিকাশের জন্য চারটি বিষয়ে মননশীল হওয়া প্রয়োজন:
শরীর, অর্থাৎ: এই মুহূর্তে ইন্দ্রিয় দ্বারা কী উপলব্ধি করা হচ্ছে?
অনুভূতি, যেমন: ওই ধারণাগুলো সম্পর্কে আমাদের কেমন লাগছে? আমরা কি সেগুলো গ্রহণ করি নাকি প্রত্যাখ্যান করি?
মন, অর্থাৎ: এর ওপর ভিত্তি করে আমাদের মধ্যে কী ধরনের আবেগীয় প্রতিক্রিয়া ও চিন্তাভাবনা তৈরি হচ্ছে?
ঘটনাপ্রবাহ, যেমন: বিভিন্ন বস্তু সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধির প্রকৃতি কী?
বৌদ্ধ মননশীল ধ্যানকে যা স্বতন্ত্র করে তোলে তা হল— প্রেরণা এবং অন্তর্দৃষ্টি বা বিপাসনা ধ্যানের বিকাশের গুরুত্ব। বৌদ্ধ প্রেরণা দুঃখ ও বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি এবং স্বাধীনতা অর্জনের ওপর কেন্দ্র করে। বৌদ্ধরা সাধারণত তাঁদের অনুশীলন শুরু করার আগে এক মুহূর্ত সময় নিয়ে তাঁদের প্রেরণা স্মরণ করেন এবং তাঁদের যাত্রার যৌক্তিকতার ওপর আস্থা প্রকাশ করেন। তাদের অধিবেশন শেষ হওয়ার পর, তাঁরা তাঁদের প্রেরণা এবং আস্থার পুনরাবৃত্তি করেন। তাঁদের উদ্বোধনী এবং সমাপনী প্রার্থনায়, অনেক বৌদ্ধ এই ইচ্ছাপ্রকাশ করেন যে, ধ্যান তাঁদের অন্যদের আরও ভালভাবে সাহায্য করার জন্য উপায় বাতলে দেবে। বৌদ্ধদের জন্য, করুণা এবং বিচক্ষণতার গুণাবলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সাধারণত এই প্রার্থনাগুলিতে অন্তর্ভুক্ত থাকে, যেমন চতুর্মাধেবল: প্রেমময়তা, সহানুভূতিপূর্ণ আনন্দ, সমচিত্ততা, অন্যের কষ্ট লাঘব করার সদিচ্ছা।
সকল প্রাণীই জীবনের কোনও না কোনও সময়ে অস্বস্তি, যন্ত্রণা ও কষ্টের সম্মুখীন হয়— এই কথা উপলব্ধি করে আমাদের মনে তাদের সুখের পথের সমস্ত বাধা দূর করার ইচ্ছা জাগে। আমরা সকলেই আমাদের কাছের মানুষদের এবং যাদের দুর্দশা আমাদের গভীরভাবে স্পর্শ করে, তাদের কষ্ট ও যন্ত্রণা লাঘব করতে চাই। এই ইচ্ছা অপরিমেয় বা অসীম হয়ে ওঠে যখন আমরা আন্তরিকভাবে তা সকলের জন্য প্রয়োগ করতে পারি, এবং এর জন্য অনুশীলনের প্রয়োজন হয়।
এক্ষেত্রেও, আমাদের নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ, চাহিদা এবং প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে উপলব্ধি অর্জনের ভিত্তি হিসেবে ধ্যান অমূল্য। ধ্যানের মাধ্যমে আমরা অস্বস্তির সাথে কম প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে মানিয়ে নিতে শিখি। ধ্যান আমাদের এমন শক্তিশালী উপায় বাতলে দেয়, যা ব্যবহার করে আমরা নিজেদের ও অন্যদের দুর্দশাকে স্বীকার ও গ্রহণ করতে পারি এবং তাকে এক অসীম, সহানুভূতিশীল হৃদয়ে রূপান্তরিত করতে পারি।
ধ্যান করার সময় আমরা শিখি যে, আমাদের সাধনাকালে এবং দৈনন্দিন জীবনে উদ্ভূত চিন্তা ও অনুভূতিগুলোকে বিচার করা বা সেগুলোর বিশদ ব্যাখ্যা করার কোনও প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ে আমরা কী করব, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা আমাদেরই আছে। যখন আমরা এই উপলব্ধি ব্যবহার করে বন্ধু, শত্রু এবং যাদের আমরা সাধারণত উপেক্ষা করি, তাদের-সহ সকলের সুখ ও সৌভাগ্যে আনন্দিত হই, তখন আমরা দেখতে পাই যে, আমাদের অভিজ্ঞতার আনন্দের কোনও সীমা নেই: এ এক অপরিমেয় আনন্দ।
বর্তমানে প্রচলিত অসংখ্য ধ্যানপদ্ধতির মধ্যে বৌদ্ধ ধ্যান তার গভীর আধ্যাত্মিক কাঠামো এবং বোধি বা নির্বাণ লাভের চূড়ান্ত লক্ষ্যের কারণে স্বতন্ত্র। যদিও অনেক ধ্যান কৌশল শিথিলতা, মানসিক চাপ হ্রাস, বা মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতার মতো ব্যক্তিগত গুণাবলি বৃদ্ধির ওপর আলোকপাত করে, বৌদ্ধদের ধ্যানচর্চা মন ও বাস্তবতার প্রকৃতির গভীরে প্রবেশ করে। দুঃখ এবং পুনর্জন্মের চক্র থেকে মুক্তিলাভের পথ হিসেবে প্রজ্ঞা, নৈতিক আচরণ এবং মানসিক শৃঙ্খলার অনুশীলনের ওপর জোর দেওয়াই এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
এর প্রধান স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে বিপাসনা (অন্তর্দৃষ্টি ধ্যান) এবং শমথ (একাগ্রতা ধ্যান)-এর অনুশীলন, যা সকল ঘটনার অনিত্য প্রকৃতি অনুধাবন করতে এবং সমতা ও অন্তর্দৃষ্টির অবস্থা অর্জনের জন্য অপরিহার্য। অধিকন্তু, বৌদ্ধ ধ্যানে প্রায়শই মেত্তা (প্রেমময়তা) এবং করুণা (সহানুভূতি)-র অনুশীলন অন্তর্ভুক্ত থাকে, যার লক্ষ্য কেবল ব্যক্তিগত শান্তি নয়, বরং সকল প্রাণীর কল্যাণ।
তবে ধ্যান আমরা যে যে পন্থাতেই অনুশীলন করি না কেন— তা দৈনন্দিন স্থিরতা ও একাগ্রতার জন্য আধুনিক পদ্ধতিই হোক, কিংবা বৃহত্তর শান্তির জন্য বৌদ্ধ পদ্ধতিই হোক— ধ্যানের প্রধান নিমিত্ত মাইন্ডফুলনেস বা মননশীলতার মূল কথা হলো, প্রতিটি মুহূর্তকে আরও পরিপূর্ণভাবে যাপন করা। আর সবচেয়ে ভাল ব্যাপার হল, আমরা যে যেখানেই থাকি বা যে-মতাদর্শে বিশ্বাস করি না কেন, ধ্যান আমাদের জীবনের ভাল, মন্দ এবং এর মধ্যবর্তী সবকিছু কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে।
মুক্ত মন ও হৃদয় নিয়ে এই যাত্রা শুরু করলে তা ধ্যানচর্চায় বিস্ময়কর ফল এনে দিতে পারে, যা আত্মজ্ঞান এবং সমগ্র জীবনের আন্তঃসম্পর্ককে আরও গভীরভাবে উপলব্ধ করাতে পারে। ইতিবাচক আবেগ ও বৃদ্ধি করে সার্বিকভাবে মানসিক সুস্থতা বাড়াতে সাহায্য করে। বলাবাহুল্য, বর্তমান বিশ্বে যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ধ্যান; মনের প্রশান্তি ও প্রজ্ঞার অনন্য অন্বেষণ।
চিত্রণ: রাজ রায়







