আধা কিমির বেলাইন
ত রু ণ চ ক্র ব র্তী
সেদিনের পর থেকে আর লাইনের ধার দিয়ে বাড়ি ফেরার কথা ভাবতেও পারে না কিশোর। এমনকী, দিনের বেলাতেও সে লাইন পারের রাস্তাটাকে অ্যাভয়েড করে। অথচ লাইনের ধার দিয়েই আগে কত যাতায়াত করত! আধা কিমি পথ। কত স্মৃতি।
থাক সেইসব কথা, সেদিনের কথায় আসা যাক। আড্ডা মেরে বাড়ি ফিরতে রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল সেদিন কিশোরের। রিকশা করে ফেরার পয়সা ছিল না। তাই লাইনের ধার দিয়েই বাড়ির পথ ধরে সে।
রাত তখন প্রায় ১২টা ছুঁই ছুঁই। রেলের প্যারালাল রাস্তা ধরে বাড়ি ফেরার পথটাই সহজ। অনেক কম সময় লাগে। তাই রানাঘাট স্টেশনে নেমে রথতলা গেট, দিব্যি চলে আসে কিশোর সান্যাল। পঁচিশ-ছাব্বিশের গরম রক্ত কিন্তু সেদিন কিন্তু একটু পরেই ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। এখন সত্তরে এসেও ভুলতে পারে না সেই রাত!
বর্ষার সেই রাত। টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছিল। সঙ্গে ছাতাও ছিল না। আর মোবাইল ফোন? তখন ল্যান্ড ফোনও ছিল দুর্লভ বস্তু। রথতলা গেট থেকে রেললাইন পার করে মিলপাড়া। মিলপাড়া অবধি সব ঠিকঠাক। গা ছমছমের কোনও বালাই নেই। তখনও সারারাত ধরে চলে পাওয়ার লুম। বাড়িঘরও রাস্তার ধারে। আছে দোকানপাটও। তাই রাত বেশি হলেও কোনও ভয়ডর উঁকি মারার সুযোগ পায়নি। রেললাইনের পাশের পাকারাস্তা ধরেই হাঁটছিল সে। মিলপাড়ার পরই কাটাখাল। কালভার্ট। আর তারপর রেললাইনের দু’ধার পুরো ফাঁকা। ডানদিকে বিশাল ফরেস্ট। আর বাঁদিকেও ধারেকাছে জনবসতি নেই। একদম নির্জন। শিয়ালের হুক্কা হুয়াও ছিল সেদিন বন্ধ।
এই রেললাইন সোজা চলে গিয়েছে গেদে-দর্শনা হয়ে বাংলাদেশ। আর কিছুটা বাঁদিক ঘুরে কালীনারায়ণপুর। তারপর বাঁদিকে শান্তিপুর আর সোজা গেলে কৃষ্ণনগর, লালগোলা। এই লাইন মুখস্থ তার। সেদিন ট্রেনের সাড়াশব্দও ছিল বন্ধ। নিজের মনেই প্রশ্ন জাগে, বর্ষার রাতে আজ ট্রেনেরও কি ভেজা বারণ! গা একটু বেশিই ছমছম করে তার। করবে নাই বা কেন, এই নির্জন আধা কিলোমিটার রেলপথ তো আত্মহত্যার জন্য বিখ্যাত! সেই ছোটবেলা থেকেই সে নিয়মিত শুনে এসেছে, রেলে কাটা পড়ার খবর। তার পরিচিতরাও অনেকে চলন্ত ট্রেনের নীচে ঝাঁপ দিয়ে ইতি টেনেছে জীবনের। অসিত, গার্গী, সনাতন, শিখা— আরও কত কে! তাই লাইন ধারের এই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে একটু গা ছমছম অনেকেরই করে। আগে কখনও তার এমনটা হয়নি। তবে সেদিন করছিল।
শর্টকার্ট। তাই গ্রামের অনেকের মতো সেও সেদিন বেছে নিয়েছিল এই পথ। রিকশার যা ভাড়া! তখন তো আর দশ টাকার টোটো ছিল না! রাতেও তাই তার মতো অনেকেই এই পথ দিয়ে যাতায়াত করতে বাধ্য হতেন। কিশোর আগেও বহুবার রাতে বন্ধুদের সঙ্গে ফিরেছে এই পথ ধরে। একাও ফিরেছে। কখনও কিছু হয়নি।
হঠাৎই তার সেদিন মনে পড়ল বছর কয়েক আগের কথা। তখন সে কলেজে পড়ে। সড়কপাড়ার ক্লাস এইটে পড়া খুড়তুতো ভাইবোন একসঙ্গে যেদিন রেলে গলা দিল, সেদিন রাতেও লাস্ট শোয়ে সিনেমা দেখে এই পথ দিয়ে দিব্যি বাড়ি ফিরেছিল ও, ভুলু আর পঙ্কা। তিন বন্ধু। কোনও ভয় করেনি। বরং সেই ক্লাস এইটের মেয়েটির কিশোরী মুখ বারবার ভেসে উঠছিল তার মনে। দু’জনকেই ভাল লাগত তার। বিশেষ করে মেয়েটিকে। খুব ভাল মানিয়েছিল। কিন্তু আপন খুড়তুতো ভাইবোন। তাই প্রেমে বাধা এবং রেললাইনে একসঙ্গে ঝাঁপ। আধা কিমির এই রেলপথের সেই গল্পও সেদিনই ফের মনে পড়ল তার।
ছোটবেলা থেকে এরকম কত গল্প শুনে এসেছে সে। দেখেও এসেছে। ছোটবেলায় শুনেছে, এই পথে নাকি ঘড়ি-ভূতের দাপট! একবার তার মা ও ছোড়দি গীতাঞ্জলি হলে ম্যাটিনি শোয়ে সিনেমা দেখে হেঁটে বাড়ি ফেরার সময় সেই ঘড়ি-ভূতের পাল্লায় নাকি পড়েছিল। আধা কিমি রাস্তা সেদিন বিকেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটেও তারা শেষ করতে পারেনি। তারপর পাড়ারই কার্তিকঠাকুর তাদের দেখে উদ্ধার করে। অন্যদের মুখেও ছোটবেলায় এরকম অনেক ঘটনা শুনে এখনও মনে রেখেছে কিশোর। বিশ্বাস করেনি। বামপন্থী চেতনার কাছে ভূতটুত খুব একটা সুবিধে করতে পারেনি আগে কখনও। সেদিন অবশ্য নিজেকে বড্ড দুর্বল মনে হচ্ছিল তার।
পাড়ার আর-পাঁচটা বন্ধুদের থেকে কিশোর চিরকালই একটু আলাদা। ভয়ডর কম ছিল তার। মার্কস-লেনিন প্রভাবে সে ঈশ্বরে অবিশ্বাসী। আবার সক্রিয় রাজনীতিতেও তেমন একটা আগ্রহ ছিল না। কলেজবেলা থেকেই সে একটু লেখালেখি, লিটল ম্যাগাজিন, কবি সম্মেলন— এইসব নিয়েই বেশি ব্যস্ত থেকেছে। মনতাইয়ের সঙ্গে তার প্রেমও সেই লেখালেখির হাত ধরেই। তখন তো ফেসবুক ছিল না। লিটল ম্যাগ আর চিঠিই ভরসা!
প্রেমপর্ব সামলে শ্যামনগরের কবি-বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে সেদিন ফিরছিল সে। রাতটা একটু বেশিই বেশি হয়ে যায়। খেয়াল করেনি।
যাইহোক, মিলপাড়া পার হতেই গা আরও ছমছম করতে লাগে কিশোরের। গলা শুকিয়ে কাঠ। কিছু পরে বৃষ্টি থামলেও গুমোট ভাবটা কাটেনি। চারিদিক অন্ধকার। রেলের সিগনালের বাতিগুলো টকটকে লাল হয়ে জ্বলছে। অন্ধকার যেন আরও ফুটে উঠেছে এই লাল আলোয়। কিন্তু কোনও উপায় নেই। আধা কিমি পথ পাড়ি দিতেই হবে। রেলে-কাটা পরিচিতদের মুখগুলো বড্ড বেশি ঝামেলা পাকাচ্ছিল তার মনে। ভোলার চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। আরও বেশি করে জাপটে ধরছিল রেলে-কাটা বীভৎস সব চেহারা। গলা শুকিয়ে কাঠ!
—কীরে, এত রাতে তুই এখানে? কোথা থেকে ফিরছিস?
গলার স্বরটা খুব চেনাচেনা লাগে কিশোরের। চিনতে পারে না হঠাৎ উদয় হওয়া ছেলেটাকে। কিন্তু ডাকটা খুব চেনা চেনা লাগে। খুব কাছের কেউ হবে। তাই পাল্টা প্রশ্ন কিশোরের, ‘কে? অন্ধকারে ঠিক চিনতে পারছি না! স্বরূপ মনে হচ্ছে?’
—হ্যাঁরে, আমি স্বরূপ। ঠিক চিনেছিস তো! ছোটবেলার বন্ধুদের কি ভোলা যায়! তারপরে তোর মতো কবি বলে কথা!
—এই, বাজে কথা বলবি না। আমরা বন্ধু। ছোটবেলার কত স্মৃতি! তুই, গোপাল, তোর বোন সুতপা, ভোলা…! ভালই হল তোকে পেয়ে। কোথায় যাবি?
—নাইট ডিউটি। চল তোকে এগিয়ে দিই।
—না, মানে এগোতে হবে না। তুইও তো ওদিকেই যাবি!
কথা না বাড়িয়ে স্বরূপের ভরসাতেই পা চালিয়ে হাঁটা শুরু করে কিশোর। ভয়টয়ের আর বালাই নেই। আর ভয় পেলেও বুঝতেও দেওয়া চলবে না! ম্যাটার অফ প্রেস্টিজ! কিশোরের নাস্তিক মন তবু ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিতে ভুল করেনি। আধা কিমি শেষ হয় কিশোরের।
—তুই এবার সাবধানে লাইন পার হয়ে বাড়ি চলে যা। আর ভয় নেই। আমি এখানে দাঁড়াচ্ছি।
কথা না বাড়িয়ে কিছুটা হন্তদন্ত হয়েই লাইন পার হল কিশোর। স্বরূপ ওপারেই দাঁড়িয়ে ছিল। লাইন পার হওয়ার পর ওকে গুডনাইট বলে বাড়ির পথে পা বাড়াল কিশোর।
আর কোনও ভয় নেই। দু’পা গেলেই কলোনি। তারপর ললিতচন্দ্র পাওয়ারলুম। সেখান থেকে দু’পা হাঁটলেই কিশোরদের ক্লাব। রেনেসাঁস স্পোর্টিং অ্যাসোসিয়েশন। এত রাতে অবশ্য কারও থাকার কথা নয়। চেনা রাস্তা, এটাই ভরসা।
দূর থেকেই কিশোর দেখতে পেল ক্লাবের আলো জ্বলছে। ‘এত রাতে ক্লাবের লাইট? নির্ঘাত কেলে স্যুইচ অফ করতে ভুলে গিয়েছে!’ নিজের মনেই কেলে মানে, সুভাষকে গালি দেয় কিশোর।
কিন্তু না। তার চোখে পড়েছিল সেদিন অত রাতেও ক্লাবের সামনে জটলা। কীসের? ভুলু, লাল্টু, বুড়ো, পঙ্কা, জিসি— সব্বাই ছিল সেই জটলায়। কী ব্যাপার?
সবার মুখভার।
—শুনেছিস?
—কী?
কেলেকে পাল্টা প্রশ্ন করেছিল কিশোর।
—সন্ধ্যা নাগাদ কল্যাণীর গান্ধীতে মারা গিয়েছে স্বরূপ। বডি আসবে এখুনি।
—অ্যাঁ!
কালীতলার চাঁতালে সেদিন ধপাস করে বসে পড়েছিল কিশোর। তার এইভাবে বসে পড়া দেখে প্রথমে তেমন একটা অবাক হয়নি কেউ। ভেবেছিল গাঁজার অ্যাকশন। স্বরূপের কথা শুনে কিশোরের এমন কেলিয়ে পড়ার তেমন তো আর কোনও কারণ ছিল না। একসঙ্গে পড়লেও গদগদ ভাব ছিল না কোনওকালেই। তাই সকলে নিশ্চিত, গাঁজার নেশায় এমন ব্যোমভোলা কিশোর! কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে একদৃষ্টে, একভাবে তার বসে থাকা দেখে কেলেরই প্রথম খটকা লাগে।
—কীরে, কী হয়েছে তোর? শরীর খারাপ লাগছে? গাঁজা বেশি মেরেছিস! নাকি ট্যাবলেট!
কখন যে সেদিন সে বাস্তবে ফিরেছিল, আজ আর তেমন একটা মনে নেই। তবে দূর থেকে ভেসে আসে ম্যাটাডরের শব্দ এবং সঙ্গে সেই ‘বলো হরি, হরি বোল’, আজও কানে বাজে।
আর কোনও দিন লাইন পার হয়নি কিশোর। এমনকী, যায়নি স্বরূপের শ্রাদ্ধেও।
°°°
চিত্রণ: সৌজন্য চক্রবর্তী






