ম্যালেরিয়া সমগ্র বিশ্বের অন্যতম এক জীবননাশক রোগ।
সারা বিশ্বের নানা দেশে প্রতি বছর বেশ কয়েক কোটি মানুষ এতে আক্রান্ত হন, আর মৃত্যুও হয় বহু লোকের। কেবল ২০২৪-এর হিসেবেই দেখা যাচ্ছে, আঠাশ কোটির ওপর মানুষের ম্যালেরিয়া হয়েছিল সে-বছর, আর মৃত্যু হয় ছয় লাখ দশ হাজার মানুষের। তবে একথাও ঠিক, ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াইয়ে বিশ্বের সাতচল্লিশটি দেশ থেকে এ-রোগটিকে নির্বাসিত করা গিয়েছে। দেশগুলির মধ্যে মিশর, শ্রীলঙ্কা, চীন, আজারবাইজান, তাজিকিস্তান, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, মরিশাস, মরক্কো, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি রয়েছে। ২০০৭ সাল থেকে প্রতি বছর ২৫-এ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশে বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস-রূপে পালন করা হয়।
ম্যালেরিয়া আজকের রোগ নয়। ২৭০০ আর ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে যথাক্রমে চীন ও মেসোপটেমিয়ায়, ষষ্ঠ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ভারতে এর অস্তিত্বের কথা জানা গেছে। মিশরে আবিষ্কৃত মমির প্লীহাতেও ম্যালেরিয়ার জীবাণু মিলেছে। বিখ্যাত গ্রীক চিকিৎসক হিপোক্রেটস রোগটির নাম দেন ‘Autumn fever’। বিশ্বের বহু রথী-মহারথী এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন,— গ্রীক বীর আলেকজান্ডার, চেঙ্গিস খান, মহাকবি দান্তে, চিত্রকর রাফায়েল, অভিযাত্রী ভাস্কোডাগামা ও লিভিংস্টোন।
এহেন কাল-ব্যাধির প্রতিকারে সচেষ্ট ছিলেন বিশ্বের বহু বিজ্ঞানী ও চিকিৎসাবিদ। তবে এটি যে মূলত মশাবাহিত, বা মশার কামড় থেকেই হয়, এটা জানতে মানুষের অপেক্ষা করতে হয়েছিল বিশ শতক পর্যন্ত। ব্রিটিশ চিকিৎসক-গবেষক-গণিতবিদ স্যার রোনাল্ড রস-এর মাধ্যমেই এই তথ্যটি সুপ্রমাণিত হয়। এবং এই তথ্যটি আবিষ্কারের জন্য ১৯০২ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
রোনাল্ড রসের (১৩.০৫.১৮৫৭—১৬.০৯.১৯৩২) জন্ম ভারতের আলমোড়ায়। জীবনের বিভিন্ন পর্বে ভারতের নানা স্থানে থেকেছেন তিনি।
১০ বছর বয়সে বিলেত যান। সেখানেই লেখাপড়া, ডাক্তার হওয়া। লিভারপুল স্কুল অফ ট্রপিকালে দশ বছর ছিলেন। বিলেত থেকে ‘Indian Medical Service’ পাশ করে লিভারপুলে চাকরি-শেষে, ফের ভারতে চাকরি নিয়ে আসেন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেনারেল হসপিটাল, যা P. G. Hospital বা এসএসকেএম নামে সমধিক পরিচিত, সেখানে চিকিৎসক-রূপে নিযুক্ত থাকার সময়েই ম্যালেরিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেন। তিনি প্রমাণ করেন, আ্যানোফিলিস মশার পাকস্থলীতেই ম্যালেরিয়ার জীবাণু থাকে। তাঁর নিজের-ও ম্যালেরিয়া হয়েছিল একবার।
একটা কথা জানা উচিত আমাদের। রোনাল্ড রসকে তাঁর গবেষণার সহায়তাকারী এক বিস্মৃত বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯২৯)। তাঁর অবদান কিন্তু খুব কম নয়। তিনি ছিলেন রস-এর অধীনে সহ-গবেষক। রস নোবেল পেলে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর নেতৃত্বে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কিশোরীনাথের ভূমিকার বিষয়টি বড়লাট লর্ড কার্জনকে জানান। কার্জন এ-বিষয়টি ব্রিটিশ সরকারের গোচরে আনেন। এর ফলে ১৯০৩ সালে যখন দিল্লিতে দরবার বসে, তখন ডিউক অফ কনট-এর মাধ্যমে কিশোরীনাথকে ব্রিটিশরাজ সপ্তম এডওয়ার্ড-এর তরফ থেকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। পরে কলকাতার সেনেট হলে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সভাপতি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ।
ফিরে আসি ফের ডোনাল্ড রস প্রসঙ্গে। রস কেবল যে চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী ছিলেন তা নয়, তিনি ছিলেন একজন কবি-ও। একদিকে ম্যালেরিয়া নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে যে আসামিকে তিনি শনাক্ত করলেন, সেই মশা নিয়েও কবিতা আছে তাঁর, ‘l have found thy cunning seeds,/0 million-murdering death!’ যেমন তাঁর নিজস্ব বিষয় নিয়ে একাধিক বই আছে তাঁর,— ‘The Prevention of Malaria’ (1010) বা ‘Studies on Malaria’— তেমনই কবিতা, গল্প ও উপন্যাসের বই-ও আছে। তাঁর কবিতার বই— ‘Selected Poems’ (1929), ‘In Exile’ (1931)। একাধিক বই আছে তাঁর, নিজের অন্যতম প্রিয় বিষয় গণিতের ওপরেও।
ম্যালেরিয়া নিয়ে তাঁর গবেষণাটি আত্মপ্রকাশ করে ১৮৯৭-এর ২০-এ আগস্ট। ওই দিনটিকে তাই তাঁর সম্মানে বিশ্ব মশক দিবস হিসেবে গণ্য করা হয়।






