Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

স্যার রোনাল্ড রস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য

ম্যালেরিয়া সমগ্র বিশ্বের অন্যতম এক জীবননাশক রোগ।
সারা বিশ্বের নানা দেশে প্রতি বছর বেশ‌ কয়েক কোটি মানুষ এতে আক্রান্ত হন, আর মৃত্যুও হয় বহু লোকের। কেবল‌ ২০২৪-এর হিসেবেই দেখা যাচ্ছে, আঠাশ কোটির ওপর মানুষের ম্যালেরিয়া হয়েছিল সে-বছর, আর মৃত্যু হয় ছয় লাখ দশ হাজার মানুষের। তবে একথাও ঠিক, ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াইয়ে বিশ্বের সাতচল্লিশটি দেশ থেকে এ-রোগটিকে নির্বাসিত করা গিয়েছে। দেশগুলির মধ্যে মিশর, শ্রীলঙ্কা, চীন, আজারবাইজান, তাজিকিস্তান, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, মরিশাস, মরক্কো, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি রয়েছে। ২০০৭ সাল থেকে প্রতি বছর ২৫-এ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশে বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস-রূপে পালন করা হয়।
ম্যালেরিয়া আজকের রোগ নয়। ২৭০০ আর ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে যথাক্রমে চীন ও মেসোপটেমিয়ায়, ষষ্ঠ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ভারতে এর অস্তিত্বের কথা জানা গেছে। মিশরে আবিষ্কৃত মমির প্লীহাতেও ম্যালেরিয়ার জীবাণু মিলেছে।‌ বিখ্যাত গ্রীক ‌চিকিৎসক হিপোক্রেটস রোগটির নাম দেন ‘Autumn fever’। বিশ্বের বহু রথী-মহারথী এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন,— গ্রীক বীর আলেকজান্ডার, চেঙ্গিস খান, মহাকবি দান্তে, চিত্রকর রাফায়েল, অভিযাত্রী ভাস্কোডাগামা ও লিভিংস্টোন।
এহেন কাল-ব্যাধির প্রতিকারে সচেষ্ট ছিলেন বিশ্বের বহু বিজ্ঞানী ও চিকিৎসাবিদ। তবে এটি যে মূলত মশাবাহিত, বা মশার কামড় থেকেই হয়, এটা জানতে মানুষের‌ অপেক্ষা করতে হয়েছিল বিশ শতক পর্যন্ত। ব্রিটিশ চিকিৎসক-গবেষক-গণিতবিদ স্যার রোনাল্ড রস-এর মাধ্যমেই এই তথ্যটি সুপ্রমাণিত হয়। এবং এই তথ্যটি আবিষ্কারের‌ জন্য‌ ১৯০২ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
রোনাল্ড রসের (১৩.০৫.১৮৫৭—১৬.০৯.১৯৩২) জন্ম ভারতের আলমোড়ায়। জীবনের বিভিন্ন পর্বে ভারতের নানা স্থানে থেকেছেন তিনি।
১০ বছর বয়সে বিলেত যান। সেখানেই লেখাপড়া, ডাক্তার হ‌ওয়া। লিভারপুল স্কুল অফ ট্রপিকালে দশ বছর ছিলেন। বিলেত থেকে ‘Indian Medical Service’ পাশ করে লিভারপুলে চাকরি-শেষে, ফের‌ ভারতে চাকরি নিয়ে আসেন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেনারেল হসপিটাল, যা P. G. Hospital বা এসএসকেএম নামে সমধিক পরিচিত, সেখানে চিকিৎসক-রূপে নিযুক্ত থাকার সময়েই ম্যালেরিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেন। তিনি প্রমাণ করেন, আ্যানোফিলিস মশার পাকস্থলীতেই ম্যালেরিয়ার জীবাণু থাকে। তাঁর নিজের-ও ম্যালেরিয়া হয়েছিল একবার।

স্যার রোনাল্ড রস-এর সহ-গবেষক কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়।

একটা কথা জানা উচিত আমাদের। রোনাল্ড রসকে তাঁর গবেষণার সহায়তাকারী এক বিস্মৃত বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯২৯)। তাঁর অবদান কিন্তু খুব কম নয়। তিনি ছিলেন রস-এর অধীনে সহ-গবেষক। রস নোবেল পেলে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর নেতৃত্বে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কিশোরীনাথের ভূমিকার বিষয়টি বড়লাট লর্ড কার্জনকে জানান। কার্জন এ-বিষয়টি ব্রিটিশ সরকারের গোচরে আনেন। এর ফলে ১৯০৩ সালে যখন দিল্লিতে দরবার বসে, তখন ডিউক অফ কনট-এর মাধ্যমে কিশোরীনাথকে ব্রিটিশরাজ সপ্তম এড‌ওয়ার্ড-এর তরফ থেকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। পরে কলকাতার সেনেট হলে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সভাপতি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ।
ফিরে আসি ফের ডোনাল্ড রস প্রসঙ্গে। রস কেবল যে চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী ছিলেন তা নয়, তিনি ছিলেন একজন কবি-ও। একদিকে ম্যালেরিয়া নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে যে আসামিকে তিনি শনাক্ত করলেন, সেই মশা নিয়েও কবিতা আছে তাঁর, ‘l have found thy cunning seeds,/0 million-murdering death!’ যেমন তাঁর নিজস্ব বিষয় নিয়ে একাধিক ব‌ই আছে তাঁর,— ‘The Prevention of Malaria’ (1010) বা ‘Studies on Malaria’— তেমনই কবিতা, গল্প ও উপন্যাসের ব‌ই-ও আছে। তাঁর কবিতার ব‌ই— ‘Selected Poems’ (1929), ‘In Exile’ (1931)। একাধিক ব‌ই আছে তাঁর, নিজের অন্যতম প্রিয় বিষয় গণিতের ওপরেও।
ম্যালেরিয়া নিয়ে তাঁর গবেষণাটি আত্মপ্রকাশ করে ১৮৯৭-এর ২০-এ আগস্ট। ওই দিনটিকে তাই তাঁর সম্মানে বিশ্ব মশক দিবস হিসেবে গণ্য করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen + ten =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »