সঙ্গীতজগৎ তার এক জ্যোতিষ্ককে হারাল— আশা ভোসলে (৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩৩—১২ এপ্রিল ২০২৬) প্রয়াত হলেন। সুদীর্ঘ আট দশক ধরে তিনি তাঁর সঙ্গীতের সুধায় ভরিয়ে দিয়েছেন কেবল ভারত বা এই উপমহাদেশকেই নয়, বিশ্বকে। পরিণত বয়সেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর, যেমন কয়েক বছর আগে হয়েছিল তাঁর স্বনামখ্যাত অগ্রজা লতা মঙ্গেশকরের (২৮ সেপ্টেম্বর ১৯২৯—৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২)।
আশা ভোসলে তাঁর সমগ্র জীবনে বারো হাজার গান গেয়ে গিনেস বুকে স্থান পেয়েছেন। একদিকে ধ্রুপদী সঙ্গীত, অন্যদিকে লঘু, পপ, এমনকী চটুল গানেও তাঁর সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সমসাময়িক কিংবদন্তি শিল্পীদের মধ্যে এজন্য অনায়াসে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি।
আশাজি ছিলেন মহারাষ্ট্রের ভূমিকন্যা। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর মাতৃভাষা মারাঠি। প্রচুর গান করেছেন তিনি মারাঠি ভাষায়। যেমন তা ব্যাপ্ত ছিল মারাঠি চলচ্চিত্রে, তেমনই মহারাষ্ট্রের সন্তকবি তুকারামের অভঙ্গ পদও পরমনিষ্ঠায় তুলে নিয়েছিলেন তাঁর কণ্ঠে। প্রসঙ্গত, তুকারামের অভঙ্গের কিছু কিছু বাংলা অনুবাদ করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।
আশা— আশ্চর্যের কথা, হিন্দি, বাংলা, ওড়িয়া, তেলুগু, আরবি, ফারসি, ইংরেজি, রুশ, ফরাসি প্রভৃতি কুড়িটি ভাষায় গান করেছেন। তাঁর অগ্রজা লতা মঙ্গেশকরের মতো তাঁরও ছিল বাংলা ভাষার প্রতি আকর্ষণ। তদুপরি তিনি রাহুল দেববর্মনের স্ত্রী হওয়ার সূত্রেও বাংলা ভাষা তথা বাংলা গানের প্রতি আগ্রহী হয়ে থাকবেন।
আশার বাংলা গানের কয়েকটি বিভাগ নির্ণয় সম্ভব। এক— প্রতিবছর শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে যে গানের রেকর্ড বেরোত, সেগুলো। বহু বিখ্যাত গান পাই এ-পর্যায়ে। যেমন, ‘ফুলে গন্ধ নেই, ভাবতেও পারি না’, ‘চেনা চেনা মুখখানি তোমার’, ‘যাব কি যাব না ভেবে ভেবে একা যাওয়া তো হল না’, ‘আকাশে সূর্য’ ইত্যাদি। দুই— বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য গাওয়া তাঁর গান। এ-পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গান হল— ‘আর কত রাত একা থাকব’, ‘মন বলছে কেউ আসবে’, ‘চোখে চোখে কথা বল’, ‘কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে’, ‘সন্ধ্যাবেলা তুমি আমি’ ইত্যাদি।
আশা বাংলা যে সিনেমায় প্লেব্যাকগুলি করেছেন, তাঁর সঙ্গীত পরিচালকেরা ছিলেন বিখ্যাত ও স্বনামধন্য। যেমন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে তিনি করেছিলেন ‘মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো’। তেমনই তাঁর পরিবেশিত ‘কে গো তুমি ডাকিলে আমারে’ গানটির সুরকার নচিকেতা ঘোষ। তাঁর গাওয়া ‘গা ছমছম’ গানটিতে সুর দিয়েছিলেন সুধীন দাশগুপ্ত। আর রাহুল দেববর্মনের সুরে তিনি করেন ‘কথা দিয়ে এলে না’।
একটি কৌতূহলী ও ব্যতিক্রমী তথ্য পরিবেশন করা যাক এবার। বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমার কেবল যে গান জানতেন তা-ই নয়, ‘কাল, তুমি আলেয়া’ এবং ‘সব্যসাচী’— এই দুটি ছবির সঙ্গীত পরিচালকও ছিলেন তিনি। আর তাঁর সঙ্গীত-পরিচালনায় আশা এ-ছবিতে গান করেছিলেন। গানগুলো হল— ‘পাতা বেঁধে চুলগুলো কে’ এবং ‘মনের মানুষ ফিরল ঘরে’। গানগুলোর গীতিকার ছিলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রসঙ্গত, এ-ছবিতে উত্তম তাঁর সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে দিয়েও একটি গান গাইয়েছিলেন।
বাংলাদেশেও আশা অ্যালবামে অংশ নেন। ‘সংগীতা’-র কর্ণধার সেলিম খানের ‘দুটি মনে এক প্রাণ’ বেরোয় ২০০৪-এ। সেখানে আশা ভোসলে এবং বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী বেবি নাজনীনের ডুয়েট আছে। রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন প্রমুখ আশার স্নেহধন্য।
তিন— আশার রবীন্দ্রসঙ্গীত। ১৯৮৯-এ এইচএমভি থেকে আশার একটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম বেরোয়। মূলত এর পরিচালনায় ছিলেন সন্তোষ সেনগুপ্ত। তবে সংঘমিত্রা গুপ্তই তাঁকে গানগুলো আশার কণ্ঠে নিয়ে আসতে সাহায্য করেছিলেন। তাছাড়া এইচএমভি পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ও ভি বালসারাকেও নিযুক্ত করেন, যাতে আশার কণ্ঠে সাবলীল বাংলা উচ্চারিত হয়। আশার অ্যালবামটি অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল। গানগুলোর মধ্যে আছে— ‘বড় আশা করে’, ‘স্বপ্নে আমার মনে হল’, ‘তুমি কোন কাননের ফুল’, ‘এসো শ্যামল সুন্দর’ ইত্যাদি, মোট চোদ্দটি। লতা ও আশা দুজনেই এভাবে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তবে লতার সঙ্গে হেমন্ত একাধিক রবীন্দ্রসঙ্গীত করলেও আশার সঙ্গে করেননি। সম্ভবত মান্না দে-র সঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ডুয়েট আছে আশার।






