Search
Generic filters
Search
Generic filters

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস ও কালিদাস

কালিদাস বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য প্রতিভা। ভারতবর্ষে রবীন্দ্রনাথের আগে যুগন্ধর প্রতিভা নিঃসংশয়ে কালিদাস। এদেশের কবি-লেখক জয়দেব-বাণভট্ট-দণ্ডী, বা আধুনিককালে রবীন্দ্রনাথ-বিবেকানন্দ (এই বৈদান্তিক ধর্মপ্রাণ মানুষটির ‘মেঘদূত’ কণ্ঠস্থ ছিল)-বুদ্ধদেব বসু, সকলেই তাঁর প্রতিভার স্বরূপ অন্বেষণ করেছেন। বিদেশেও তিনি সমান শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত। বিখ্যাত জার্মান কবি গ্যেটে তাঁকে কবিতায় প্রশস্তি জানান, মাক্স মুলার জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেন ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম্’ নাটক, আর জার্মানির অন্যতম ধ্রুপদী লেখক শিলার ‘মেঘদূত’-প্রভাবিত নাটক লেখেন, ‘মারিয়া স্টুয়ার্ট’।

চারটি কাব্য ও তিনটিমাত্র নাটক তাঁকে বিশ্ববন্দিত কবি বানিয়েছে। অনেক সমালোচক মনে করেন, তিনি আর কিছু না লিখে কেবল ‘মেঘদূত’ লিখলেই অমর হয়ে থাকতেন। এই কৃশকায় কাব্যটির বিখ্যাত টীকাকার মল্লিনাথ বলেছেন, মাঘ-রচিত ‘শিশুপালবধ’ কাব্য, আর কালিদাসের ‘মেঘদূত’– এই দুটির টীকা লিখতেই তাঁর জীবন শেষ! কাব্যটি খুব বড় নয়। একশো দশ (মতান্তরে আরও কিছু বেশি) শ্লোক আছে এতে। সুকঠিন ছন্দে লেখা কাব্যটি,– মন্দাক্রান্তা। প্রাথমিকভাবে এই প্রবল ঝুঁকি নেবার মধ্যেই তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিচয় মেলে।

বিখ্যাত বহু লেখক তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে কোনও কোনও তারিখকে অমর করে গেছেন। শেকসপিয়ারের ‘Julius Caesar’ নাটকে ভবিষ্যদ্বক্তার সংলাপ ‘Be ware the ides of March’ (অর্থাৎ মার্চের ১৫-ই। প্রাচীন রোমে মার্চ, মে, জুলাই ও অক্টোবরের ১৫ তারিখকে, এবং অন্যান্য মাসের তেরো তারিখকে বলা হত ‘Ides’)। আবার বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’ শুরুই করলেন এভাবে, ‘৯৯৭ বঙ্গাব্দের নিদাঘশেষে একদা এক অশ্বারোহী পুরুষ বিষ্ণুপুর হইতে মান্দারণের পথে একাকী গমণ করিতেছিলেন’। তারিখ নয়, সাল দিয়ে বঙ্কিম এইভাবে বাংলা উপন্যাসের শুভসূচনা করলেন। অনুরূপভাবে জেমস জয়েস তাঁর ১৯২২-এ প্রকাশিত ‘Ulisses’ উপন্যাসের মাধ্যমে ১৯০৪-এর ১৬-ই জুনকে শাশ্বত করে দিলেন এতটাই যে, ওই তারিখটিকে জেমস-ভক্তরা আজ-ও বিশেষভাবে উদযাপন করেন। সুবৃহৎ ওই উপন্যাসটির ঘটনাবলি ওই একটি তারিখকে অবলম্বন করে রচিত। তারিখটি জয়েসের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ-ও, কেননা ঠিক ওই দিনটিতেই তিনি তাঁর প্রেমিকা ও ভাবী স্ত্রী নোরা বার্নাকলের (Nora Barnacle)-এর সঙ্গে ‘ডেট’ করেছিলেন। তারিখটি অন্য একটি কারণেও ঐতিহাসিক,– সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা প্রথম নারী, ১৯৬৩-র ওই তারিখে যিনি মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহে চড়ে ৪৮ বার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেছিলেন।
তেমনই কালিদাস অমর করে গেছেন পয়লা আাষাঢ়কে।

কীভাবে? ‘মেঘদূত’-এর কাহিনিতে দেখি, কুবের অভিশাপ দিচ্ছে যক্ষকে, একবছরের জন্য পৃথিবীতে বাস করতে হবে, স্ত্রীর সঙ্গবর্জিত হয়ে। যক্ষের অপরাধ ছিল, কুবেরের উদ্যান পরিচর্যার সময় সে তার স্ত্রীর কথা ভাবছিল। কুবের ধনের দেবতা। যক্ষ উপদেবতা। যাই হোক, যক্ষ কান্তাবিরহিত হয়ে রামগিরিতে দশমাস কায়ক্লেশে কাটাল। রামগিরিও নির্দেশ করে দেয় কুবের, কেননা সেখানে গেলে যক্ষের স্ত্রীবিয়োগের বেদনা গভীরতর হবে। বনবাসকালে রাম-সীতা ওখানে ছিলেন, আর তাই বনবাসকেও সহনীয় করে নিয়েছিলেন তাঁরা, পরস্পরের প্রতি ভালবাসায়। সেখানকার সরোবর, কালিদাস উল্লেখ করতে ভোলেননি, ছিল সীতার স্নানে পুণ্য। অর্থাৎ রামগিরিতে গেলে শোকের মাত্রা বাড়বে যক্ষের। আমাদের মনে না হয়ে পারে না, লঘু পাপে গুরু দণ্ড! দশমাস কাটলেও আষাঢ় মাসের প্রথম দিনটিতে মেঘের আবির্ভাব যক্ষের বিরহকে অসহনীয় করে তুলল। যে মানুষ স্ত্রীর গলা জড়িয়ে থাকতে অভ্যস্ত, সে এই বর্ষায় একাকী কাটাবে? পয়লা আষাঢ়ের সেই মেঘকে তাই তিনি অলকায় তার প্রিয়া তথা স্ত্রীর কাছে দূত করে পাঠাতে চাইল, তাকে জানাতে, যে সে জীবিত আছে। একান্ত স্ত্রী-অনুরক্ত যক্ষের আশঙ্কা হচ্ছিল, স্ত্রী তার বিরহে বেঁচে আছে তো?

এই যে মেঘকে দূত করে পাঠানো, এর মাধ্যমে কবি একদিকে ভারতের এক ব্যাপ্ত অংশের নিখুঁত ভূগোলের বিন্যাস পাঠকের চোখের সামনে মেলে ধরেছেন, অন্যদিকে কাব্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বুনে দিয়েছেন নান্দনিকতার লতাজাল। যার জন্য যুগ যুগ ধরে এ-কাব্যের আবেদন ফুরোয় না। এই কাব্যটিকে বলা হয় ‘দূতকাব্য’। কালিদাসের দেখাদেখি অন্তত পঞ্চাশজন কবি এমন দূতকাব্য লিখেছেন। কিন্তু কালিদাসের কবিপ্রতিভার ধার দিয়েও যায়নি তা। সারা ভারতবর্ষে এ-কাব্য এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, পঞ্চাশটির ওপর কেবল টীকা-ই লেখা হয়েছে এর। আর অনুবাদ? দেশি-বিদেশি কত ভাষাতেই যে হয়েছে! কেবল বাংলাভাষায় একশো জনের ওপর অনুবাদক আছেন!

পয়লা আাষাঢ় তাই একটা কিংবদন্তি হয়ে আছে। এতটাই যে, এখন ভারতে পয়লা আষাঢ়কে কালিদাসের জন্মদিনরূপে পালন করা হয়। কালিদাসের জন্ম কবে ও কোথায় তা এখনও অজানা। কিন্তু তাঁর প্রায় সব রচনায় শিবের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা আর বিশেষ করে মেঘদূত কাব্যে উজ্জয়িনীর মহাকাল মন্দিরের বিশেষ উল্লেখ (মেঘের যাত্রাপথে উজ্জয়িনী পড়ে না, আর তাই রেবানদীর পারে মহাকাল মন্দির-ও। তবু ঘুরপথে মেঘকে একবার সেখানে যেতে বলছে যক্ষ!), এই দুটি ঘটনা কালিদাসকে উজ্জয়িনীর লোক এবং তাঁর জন্মদিন পয়লা আষাঢ়, জনমনে এই বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। পণ্ডিতেরা তর্ক তুলেছেন, কালিদাস ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবস’ লেখেননি৷ কেননা একেবারে পয়লা আষাঢ়েই যে মেঘ নেমে বৃষ্টি আসবে, তা হয় না। তাঁদের মতে, ওটা আষাঢ়ের শেষদিন, ‘আষাঢ়স্য প্রশম দিবস’ হবে। কিন্তু প্রথম দিবস-ই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। এবং তা এতটাই যে, কালিদাসকে নিয়ে ভারত সরকার যে ডাকটিকিট বের করেছে, সেখানে ‘আষাঢ়স্য প্রথমদিবসে’ শ্লোকটি উৎকীর্ণ।

শার্লক হোমস আর ওয়াটসনকে কোনান ডয়েল লন্ডনের ২২১/ বি, বেকার স্ট্রিটের কল্পিত ঠিকানায় রেখেছিলেন। সেই ঠিকানা ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে মিউজিয়াম। কল্পনা এইভাবে যুগে যুগে বাস্তবকে জন্ম দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 3 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »