Search
Generic filters
Search
Generic filters

মাতৃ-ভাষা-রূপে খনি, পূর্ণ মণিজালে

আ মরি বাংলা ভাষা! পৃথিবীতে প্রায় পঁয়ত্রিশ কোটি মানুষ যে-ভাষায় কথা বলেন, প্রতিদিন যে-ভাষায় লিখিত হয়ে চলেছে পদ‍্যগদ‍্যপ্রবন্ধ, যে জাতির মেধাতালিকা বারোশো বছর ধরে ব‍্যাপ্ত ও ক্রমবর্ধমান, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত‍্যপুরস্কারে অভিনন্দিত হয়েছেন যে-ভাষার কবি, সেই বাংলাভাষাকে নমস্কার। বারোশো বছর ধরে অসংখ‍্য মনীষী ও সাধারণ মানুষের আন্তর পরিচর্যা ও নিবিড় যত্নকৃত সেবায় গড়ে উঠেছে এ-ভাষার রূপ আর ভঙ্গি। আর এ-ভাষা যারা ব‍্যবহার করেন দৈনন্দিন কাজে, সাহিত‍্যে আর বিশ্রম্ভালাপে, সেই বাঙালি জাতি নিজ মুদ্রাগুণে গড়ে তুলেছে তার নিজের সংস্কৃতি, ঐতিহ‍্য আর ইতিহাস, যা উত্তরাধিকারসূত্রে বহু শতক জুড়ে পরম্পরাবাহিত। বাংলাভাষা বাঙালিমাত্রের-ই অলংকার, অহঙ্কার, অক্ষয় কবচকুণ্ডল।

মাতৃভাষাকে রবীন্দ্রনাথ মাতৃদুগ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আর সে-ভাষাকে বাঁচিয়ে তুলতে যদি রুধির, অশ্রু ও ঘামের প্রয়োজন হয়, দরকার হয় মানুষের রক্তাক্ত দক্ষিণা প্রদানের, তাহলে সে-মাতৃভাষা তো পরমান্নের-ও অধিক, তা যে অমৃত! বাংলাভাষা আমাদের কাছে তাই মাতৃদুগ্ধের অধিক। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন ১৯৯৯-তে এসে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মোহনায় এসে মিশল, আমাদের মাতৃভাষার এমন উজ্জ্বল বিভা সমগ্র বিশ্বে আমাদের মুখোজ্জ্বল করেছে; সেইসঙ্গে বঙ্গভাষার-ও। মোহনা এখন সমুদ্রগামী।

বাংলাভাষা নিয়ে সত‍্যিসত‍্যি গর্ব করার মতো কী আছে বাঙালির? না এ কেবল অযথা ঢক্কানিনাদ? আছে, অতি অবশ‍্যই আছে। চর্যাপদ থেকে আজকের সময় পর্যন্ত এ-ভাষায় যত কিছু লেখা হয়েছে, তার দিকে সামান্য তাকালেই টের পাব, বাংলাভাষা কতখানি সমৃদ্ধ। আরাকান থেকে গৌড়, সমতট, অনুত্তরবঙ্গ (একদা দক্ষিণবঙ্গকে এই নামে ডাকা হত), বাঙালির মেধাতালিকার কি শেষ আছে? বর্ধমানের মুকুন্দরাম চক্রবর্তী উত্তরাধিকার দিয়ে যান হাসান আজিজুল হককে, বরিশালের বিজয়গুপ্ত জীবনানন্দ-বেগম সুফিয়া কামাল-হেনরি স্বপনকে, কী আশ্চর্য মোজেজা! আর আজ তো বঙ্গভাষার লেখক বিশ্বজুড়ে। বাংলা যাঁদের মাতৃভাষা নয়, এমন ভারতীয়ের হাতেও সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলাভাষা, যেমন সখারাম গণেশ দেউসকর, আবু সঈদ আইয়ুব, গুলজার। বেশ কয়েকজন বিদেশির হাতেও পরমযত্নে লালিত হয়েছে বাংলাভাষা। তাঁদের কয়েকজনের নাম হানা ক‍্যাথেরিন ম‍্যালেনস, উইলিয়াম কেরি, ডেভিড ম‍্যাককাচ্চিয়ন, মার্টিন কেম্পশেন, দানিলচুক, ফাদার দ‍্যতিয়েন, কাজুও আজুমা, উইলিয়াম রাদিচে, ক্লিন্টন বি সিলি প্রমুখ। ডিরোজিও সম্ভবত বাংলায় কিছু লেখেননি, তবে উনিশ শতকে তাঁর হাত দিয়েই শাণিত কিছু ইস্পাত গড়ে উঠেছিল, ইয়ং বেঙ্গল নামে পরিচিত ছিলেন যাঁরা,— বাঙালির যুক্তিবাদী চিন্তা ও চেতনার অগ্রদূত। পরের শতকে ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের-ও কি নয়?

একটি ভাষা অন‍্য ভাষা থেকে যত বেশি শব্দ আহরণ করে নিজের ভাষায় প্রচলন ঘটাতে পারবে, সেই ভাষাটি ততটাই জোরালো হবে। এইজন্যই ইংরেজি ভাষা প্রবল শক্তিশালী। বাংলাভাষাও অন‍্য বহু ভাষা থেকে শব্দ নিয়েছে। সংস্কৃতভাষা থেকে সবচাইতে বেশি, যাকে বলে তৎসম শব্দ। সে-ভাষা থেকে প্রচুর শব্দ গ্রহণ করলেও মনে রাখতে হবে, বাংলা ভাষার গঠনরীতি কিন্তু তার নিজস্ব, ব‍্যাকরণ নিজস্ব। অন‍্যদিকে ব‍্যাকরণের তুমুল শাসন সংস্কৃত ভাষাকে জনপ্রিয় আর লোকভাষা হতে দেয়নি, যদিও এ-ভাষা অনন্ত ঐশ্বর্যে পূর্ণ এক ধ্রুপদী ভাষা। সংস্কৃত শব্দঋণ অতি অবশ‍্যই বাংলাভাষাকে শ্রুতিমধুর ও বলশালী করেছে। তার সঙ্গে ক্ষতিও করেছে অনেক। বাংলাভাষা যে নিজের শব্দের জোরে দাঁড়াতে পারে, তার বহুতর পরীক্ষা বাকি রয়ে গেছে, সংস্কৃত শব্দকাতরতা এবং আশ্রয় খাঁটি বাংলাভাষার বিকাশের ক্ষেত্রে বেশ খানিকটা বাধা। বহু লেখক আবার এই বাধা কাটিয়ে ওঠায় সচেষ্ট। রবীন্দ্রনাথ যখন ‘চুলা’ বা ‘জউ’ (যতু অর্থে), বা নজরুল ‘খুন’ লেখেন ‘রক্ত’-এর সমার্থক শব্দ হিসেবে, তখন এর প্রমাণ পাই। কালীপ্রসন্ন সিংহ, স্বামী বিবেকানন্দ, প্রমথ চৌধুরী, সৈয়দ মুজতবা আলী, পরবর্তীকালে আল মাহমুদ (‘সোনালী কাবিন’- সহ বহু কবিতাগ্রন্থে), সৈয়দ শামসুল হক (‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটক, ‘পরাণের গহীন ভিতর’ কাব‍্য ও অন‍্যত্র) বাংলার প্রাণভোমরা দেশি শব্দকে তাঁদের লেখায় প্রয়োগ করে বাংলাভাষাকে প্রকৃত বাংলাভাষা করায় অবদান রেখেছেন। এ কাজ অনবরত চালিয়ে যেতে হবে আমাদের। অর্থাৎ একদিকে অন‍্য ভাষা থেকে শব্দ এনে অলংকার করে আমার ভাষাকে পরাব, অন‍্যদিকে বাংলার হাটে মাঠে গঞ্জে মজলিশে যে চলমান ভাষা, তাকেও স্বাঙ্গীকৃত করে আমাদের ভাষায় ব‍্যবহার করে তাকে সমৃদ্ধ করব।

অন‍্যভাষার কাছ থেকে আমাদের নেওয়া শুরু হয়েছে সুদূর ইন্দো-ইরানিয়ান যুগ থেকে। প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা ও ইরানীয় ভাষার মিল ছিল প্রচুর। ‘মিহির’ বা ‘মিত্র’ এরকম দুটি শব্দ, যা আজ-ও বাংলায় দিব্বি ব‍্যবহার করা হয়। প্রাচীন ইরানী থেকে যেমন, দীর্ঘ পাঁচশো বছর পাঠান ও মুঘল শাসনামলে ফার্সি রাজভাষা থাকায় দ্বিতীয় দফায় ফার্সি ও সেইসঙ্গে আরবি ভাষা থেকেও বহু শব্দ বাংলায় এসেছে। প্রাচীন কালে যেমন বাঙালির মধ‍্যে তামিল, অস্ট্রিক, ভোট-চীনীয় রক্তের মিশ্রণ ঘটেছে, তেমনি ঘটেছে শব্দের-ও মিশ্রণ। আর ঔপনিবেশিক আমলে বহুতর ইংরেজি ও সামান‍্য কিছু পর্তুগিজ, ফরাসি শব্দ-ও যুক্ত হয়েছে। এই নিয়ে আজকের বাংলাভাষা।

এখানে একটা মজার ব‍্যাপার আছে। মধুসূদন ‘শবদে শবদে বিয়া’ (বিয়া! সে-ও তো বাংলাভাষার অপূর্ব শব্দ! এই মধুসূদন-ই আবার লেখেন, ‘যাদঃপতি রোধঃ যথা চলোর্ম্মি আঘাতে!’ বাপ রে বাপ!) দেওয়া কবির কাজ, লিখেছিলেন। কিন্তু এক-ই শব্দ দুই ভাষা থেকে এসে দুটি অর্থে ব‍্যবহৃত হয়, এ কি তিনি জানতেন? ‘ভর্তা’ সংস্কৃত শব্দ, অর্থ ‘স্বামী’। আর সেই শব্দটিই আবার অন‍্য ভাষা থেকে বাংলাভাষায় এসে ‘সেদ্ধ’-র প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে! তেমনি ‘রবি’, কিনা সূর্য। আর আরবি ‘রবি’ মানে ‘শীত’ (তু. রবিশস‍্য)! মজা নয়?

একটি ভাষা একটি জাতির গর্ব। আর তা যদি হয় একটি জাতির ভাষা, অর্থাৎ সমগ্র জাতির, একটি দেশের মানুষের মাতৃভাষা তা, সে তো স্বপ্নরাজ‍্য, স্বর্গরাজ‍্য! প্রাচীন ব্রিটনরা যেমন বলত, ‘Ma yezh eo ma bro’, অর্থাৎ ‘My language is my country’, বাংলাদেশ সে-কথা বলতে পারে আজ। আরও। ‘ধ্রবতারাকে পিছনে রেখে ধূমকেতুকে চলেছে লখি’ আজ বাংলাভাষা। রাষ্ট্রসঙ্ঘে ব‍্যবহৃত ভাষাসমূহের অন্তর্গত হওয়ার উদ্দেশে চলেছে সে। ইংরেজি, ফরাসি ও স্প‍্যানিশের পাশাপাশি বাংলাভাষাতেও রাষ্ট্রসঙ্ঘের কাজকর্ম পরিচালনার দিন আগত সামনে।

সে পদবিতে পৌঁছনোর যোগ‍্যতা আছে বাংলাভাষার। একটি ভাষা গড়ে ওঠার পেছনে স্তম্ভ হয়ে কাজ করে তার সার্বিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ‍্য ও সেইসঙ্গে সে-ভাষার লেখককুল, তাঁদের মেধার নান্দনিক স্বাক্ষর। বাঙালি হাজার বছর ধরে অবিরাম এই উভয়ক্ষেত্রে নিজের বৈভব প্রদর্শন করে চলেছে। একটি ভাষার চরম উৎকর্ষ নির্ভর করে সে-ভাষায় কী পরিমাণ গভীর কথা এবং শ্রবণযোগ‍্য পঙ্‌ক্তি,— Quotable quotes রচিত হয়েছে, তার ওপর। সেই চর্যাপদের ঊষালগ্ন থেকেই তো তা হয়ে এসেছে, ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’। অথবা বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, কী শাশ্বত পঙ্‌ক্তি ও গাঢ় অনুভূতি রাধার,— ‘বাঁশীর শবদে মোর আউলাইলো রান্ধন’! তার পর থেকে যদি এ-ভাষার বিপুল লেখকদের মধ‍্য থেকে মাত্র কয়েকজনের ধ্রুবপদ সাজাই, তাহলে দেখব, বাংলাভাষার কী মণিময় সম্ভার!

১. সবার উপরে মানুষ সত‍্য, তাহার উপরে নাই।— চণ্ডীদাস।
২. জনকজননী বন্দম শিরের ভূষণ/ যাহার কৃপায় দেখি এ তিন ভুবন— বিজয়গুপ্ত।
৩. যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় না জানি।— আবদুল হাকিম।
৪. নানান দেশের নানান ভাষা।/ বিনে স্বদেশী ভাষা/ পুরে কি আশা?— রামনিধি গুপ্ত।
৫. বন‍্যরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।— সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

একটি স্থাপত‍্য নির্মিত হয় একদিকে যেমন প্রযুক্তিগত ভাবনাকে মাথায় রেখে, অন‍্যদিকে তেমনি তার মিনার ও জগমোহন, চৈত‍্য ও তোরণ তাই কত কথা বলে, কত নন্দনের বার্তা দেয়। ভাষা-ও অনেক সময় ভাস্কর্য হয়ে দেখা দেয়। ‘এ ভরা বাদর মাহ ভাদর, শূন‍্য মন্দির মোর’ (বিদ‍্যাপতি), ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখী কমনে আসে যায়’ (লালন শাহ্), বা ‘সে কহে বিস্তর মিছা, যে কহে বিস্তর’ ( ভারতচন্দ্র), এসব সদুক্তি বাংলাভাষাকে রঞ্জিত করে রাখবে যাবচ্চন্দ্রদিবাকর। আর রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দের ভাবনার ভাস্কর্যের উদাহরণ দিতে গেলে তো একটি গ্রন্থ-ই লেগে যাবে। আছে কতই না প্রবাদ-প্রবচন! জেমস লং বা ড. সুশীল দে-র সম্পাদনায় জলধিপ্রতিম তা। ‘তারা ফুলের উপর ঘুমিয়ে পড়ে ফুলের মধু খেয়ে’ (দ্বিজেন্দ্রলাল), বা ‘ছোট্ট নেবুর ফুল গো আমার, ছোট্ট নেবুর ফুল,/ স্বর্ণ ঊষার কর্ণভূষার বর্ণতুষার দুল’ (যতীন্দ্রমোহন বাগচী), অথবা ‘কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে’ (জীবনানন্দ)। আর ‘প্রলয়সৃষ্টি তব পুতুলখেলা, আনমনে’ (নজরুল)।

কী যে জাদু বাংলাভাষায়! আর ব‍্যাপ্তি। একহাতে সে উপহার দেয় বৈষ্ণবকবিতা, অন‍্যহাতে ময়মনসিংহগীতিকা। আবিশ্বের বিশ্ববিদ‍্যালয়গুলিতে বাংলাভাষা পড়ানো হচ্ছে,— মেলবোর্ন, লন্ডন, টোকিও, বেইজিং, মন্ট্রিল-সহ একশোটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ব্রিটেন থেকে বেরোয় বারোটি সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা। আছে দৈনিক পাক্ষিক মাসিক পত্রিকাও। বিদেশিদের গবেষণা মাইজভাণ্ডারী দর্শন (হানস হার্ডার, জার্মানি) থেকে অশ্বিনীকুমার দত্ত, চাকমা ভাষা থেকে লালন পর্যন্ত ব‍্যাপ্ত। ব‍্যারি মরিনসন (কানাডা), এলভিয়েতা ওয়ালটার (পোল‍্যান্ড), মারিয়েন ম‍্যাডার্ন (মেলবোর্ন) বাংলাভাষা নিয়ে বিদেশি গবেষকদের সামান‍্য কয়েকটি নাম।

মাতৃভাষার আলোচনা প্রসঙ্গে এটা মনে রাখা জরুরি, যাকে বৈয়াকরণেরা মান‍্য চলিত বাংলা বলেন, তার চেয়েও মানুষের মুখের ভাষা, যা জেলাভেদে, নরনারীভেদে, সামাজিক অবস্থান আর বালক-তরুণ-বৃদ্ধভেদে উচ্চারিত হয়, মাতৃভাষার প্রকৃত দাবিদার কিন্তু সে-ই। বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ তার উদাহরণ হয়ে আছে।

এই ভাষায় গর্জে ওঠেন নূরলদীন, ‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়?’ এই ভাষায় নদেরচাঁদ বলে, ‘তুমি হইয়ো গহিন গাঙ, আমি ডুইব‍্যা মরি’, বা কবিতায় মনীষ ঘটকের নায়িকা বলে ওঠে, ‘তরে বুঝি কই নাই, আমিও বান্দুরী?’ আর মানিক বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের শশীচরিত্র আর্তকণ্ঠে জানায়, ‘শরীর! শরীর! তোমার মন নাই কুসুম?’ আবার বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর সে-দেশে রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে ঋত্বিক ঘটক ওই যে ঢাকায় এসে তাঁর জন্মস্থান জিন্দাবাহার লেন দেখতে চেয়েছিলেন, মোটর গাড়িতে নয়, ঘোড়ার গাড়ি চড়ে, হ‍্যাঁ, সেটাই মাতৃভাষা। ভার্জিনিয়া উলফ কি সাধে বলেছেন, ‘Language is wine upon the lips?’ মনে রাখতে হবে, ভার্জিনিয়া উলফের দিদিমা ছিলেন ফরাসি, আর দাদু বাঙালি!

যেন ভুলে না যাই, বাহান্নোর একুশে ফেব্রুয়ারির মতো উনিনশো একষট্টির উনিশে মে-তেও (রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ!) বাংলাভাষার দাবি আদায়ে ভারতের শিলচরে শহিদ হয়েছিলেন এগারোজন। তাঁদের মধ‍্যে কমলা ভট্টাচার্য নামে এক নারীও ছিলেন। যেন ভুলে না যাই, বাংলাভাষার দাবি আদায়ে মানভূমের বাঙালিদের বহুবছর লড়াই করতে হয়েছিল। যেন ভুলে না যাই, ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে সেখানকার মাতৃভাষা তেলুগুর জন‍্য শহিদ হয়েছিলেন পত্তি শ্রীরামালু।

বাংলাভাষাকে ভালবাসব আমরা বাঙালিরা। আর বেদনাহত হব একথা ভেবে, প্রতিদিন পৃথিবী থেকে লুপ্ত হচ্ছে একটি একটি করে ভাষা। যেন এই বিবেচনায় মাতৃভাষাকে আঁকড়ে থাকি আমরা। আর মাতৃভাষা ছাড়াও অন্তত অন‍্য একটি ভাষা যেন শিখি, কেননা নিজ ভাষা সম্পর্কে ধারণা ও বোধ পাকা হবে তাতে। মহাকবি গ‍্যেটে শিখিয়েছেন খুব জরুরি একটি কথা, ‘Wer framde Sprachen nicht kenat, weiz nichts von seiner eigenen.’ অর্থাৎ, ‘Those who know no foreign language, know nothing of their mother tongue.’
ভাষাশিক্ষাটা যেন হরিনাথ দে-র মতো না হয়ে সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো হয়, পরিবেশিত হয়ে আনন্দ দেয় পাঠককে।

বাংলাভাষার জন‍্য প্রাণ দিয়েছেন খণ্ডিত এই উপমহাদেশের দুই অংশের বাঙালি। ভাষাভাই আমরা। রাজনীতি যতই বিচ্ছেদ ঘটাক, মহান বার্নার্ড শ মাথায় থাকুন আমাদের, যিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ভাষায় লিখেছিলেন, ‘England and America are two countries divided by a common language.’

বড্ড জানতে ইচ্ছে করে, পাকিস্তানে কি পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি?

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 + five =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »