Search
Generic filters
Search
Generic filters

দেবী সরস্বতী

হিন্দুরা বহুদেববাদী। তারা শক্তির আরাধনা করে কালীপুজোর মধ‍্য দিয়ে, লক্ষ্মীর আরাধনা করে ধনলাভের জন‍্য। আর বিদ‍্যালাভের জন‍্য পুজো করে দেবী সরস্বতীর। এছাড়া হিন্দুদের প্রধান দেবদেবীর মধ‍্যে আছেন দুর্গা, শিব, গণেশ, কৃষ্ণ, রামচন্দ্র প্রমুখ।

মাঘমাসের কৃষ্ণা পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতীপুজো অনুষ্ঠিত হয়। প্রত‍্যেক দেবতাকে পুজো করতে আলাদা আলাদা ফুল লাগে। সরস্বতীপুজোয় পলাশফুল প্রশস্ত। তাছাড়া শীতকালীন ফুল গাঁদাও দেবীকে নিবেদন করা হয়। উল্লেখ‍্য, অন‍্যান‍্য পুজোয় নানান বাজনা ও আরতি আর বাজি ফোটানোর আয়োজন থাকলেও সরস্বতীপুজোয় এসমস্ত কিছুই একেবারে পরিত‍্যাজ‍্য।

যেকোনও হিন্দুর আরাধ‍্যা এই বিদ‍্যার দেবী। তবে ছাত্রছাত্রীদের কাছে সমধিক আরাধ‍্য। পুজোর দিনটিতে ভক্তরা সর্ষের তেল-মিশ্রিত কাঁচা হলুদ মেখে স্নান করে। তারপর পুজোয় অঞ্জলি দেয়। মেয়েরা এইদিন সাধারণত হলুদরঙা শাড়ি পরে। অঞ্জলি না দিয়ে কিছু খায় না। প্রায় সবার বাড়িতেই এ-পুজো অনুষ্ঠিত হয়। তাছাড়া পাড়ার ক্লাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতেও। মাটির মূর্তিতে পুজো পান দেবী।

দেবী দ্বিভুজা। হাতে বীণা এবং পুস্তক। বাংলার বাইরে চতুর্ভুজা সরস্বতীমূর্তিও আছে। বৈদিক যুগ থেকে এ দেবীর উল্লেখ পাওয়া গিয়েছে। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে তাকে বাগদেবী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কেবল হিন্দুদের কাছেই নয়, বৌদ্ধ এবং জৈনদের কাছেও সরস্বতী আরাধ‍্যা। বৌদ্ধদের কাছে এই দেবী প্রজ্ঞাপারমিতা নামে খ‍্যাত। ভারত ছাড়িয়ে চীন জাপান তিব্বত মায়ানমার থাইল‍্যান্ড ও কম্বোডিয়াতেও নানান রূপে ও নামে এই দেবীর পুজো হয়। ইন্দোনেশিয়ায় সরস্বতীর অসাধারণ মন্দির আছে। উরুদ নামক স্থানে এটি অবস্থিত। আরও উল্লেখ করার মতো ব‍্যাপার আছে। ইন্দোনেশিয়া নির্মাণ করেছে সবচেয়ে লম্বা ষোল ফিটের সরস্বতীমূর্তি। দণ্ডায়মান এই শ্বেতশুভ্র সরস্বতীমূর্তিটি স্থাপিত হয়েছে আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসির এমব‍্যাসি রো-তে তাদের দূতাবাসের সামনে।

বিদ‍্যার দেবী।

সরস্বতী বিদ‍্যার দেবী বলে পুজোর দিন বহু ছেলেমেয়ের হাতেখড়ি হয় দিনটিতে। পুরোহিতের হাত ধরে নতুন অক্ষর রচনা করে শিক্ষার্থী। ভারতের তেলেঙ্গানায় জ্ঞানসরস্বতী মন্দিরে এইদিন হাতেখড়ির বিশাল পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ‍্য, এখানকার দেবীমূর্তি হরিদ্রাভ। আর দেবীর বাহন রাজহাঁসের স্থলে ময়ূর। এখানকার সরস্বতীমন্দিরে শ্রীপঞ্চমীর দিন ছাড়াও আষাঢ়ের গুরুপঞ্চমী ও শ্রাবণ পঞ্চমীর দিনেও হাতেখড়ি তথা অক্ষরভ‍্যাসম্ হয়ে থাকে। এখানকার সরস্বতীমন্দির ভারতবিখ‍্যাত।

তেমনই আছে আরও এক বিখ‍্যাত সরস্বতীমন্দির। এখন তা বিধ্বস্ত হলেও ঐতিহাসিক বিলহন ও আলবেরুনির লেখায় মন্দিরটির কথা বিশদ আলোচিত। আবুল ফজলের লেখাতেও আছে বর্তমানে পাক কাশ্মীরের অন্তর্গত হরমুখ পর্বতের নীচে নীলম উপত‍্যকার এই সরস্বতীমন্দিরটির কথা। কাছেই ছিল শারদা বিশ্ববিদ্যালয়। কথিত আছে, আদি শঙ্করাচার্য এখানেই শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন।

তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সরস্বতীপুজো। পৃথিবীতে দ্বিতীয়রহিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সামনের মাঠে সমস্ত বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের উদ‍্যোগে প্রায় আশিটি মণ্ডপে আশিটি বা তার বেশি মূর্তি ও পূজা। অকল্পনীয়। পুজোতে অংশ নেন ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সব ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকবৃন্দ। বিতরিত হয় প্রসাদ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় রাতে।

গ্রীকদেবী আথেনাও ছিলেন বিদ‍্যার দেবী। সভ‍্যতা, আইন, ন‍্যায়বিচারের দেবীরূপেও কল্পিতা হতেন তিনি। এথেনস নগরীটি এই দেবীর নামেই নামাঙ্কিত। আর রোমে এই বিদ‍্যাদাত্রী দেবীর নাম মিনার্ভা। আথেনা কিন্তু যুদ্ধের দেবতাও। আবার দেবী সরস্বতীর মতো আথেনা অবিবাহিতা, অতএব সন্তানরহিতা। কোনও কোনও পুরাণ অবশ‍্য সরস্বতীকে বিবাহিতা বলে থাকে।

সরস্বতীকে নিয়ে কম কিংবদন্তি গড়ে ওঠেনি। তার মধ‍্যে একটি হচ্ছে, মূর্খ কালিদাস দেবী সরস্বতীর বরেই কবিত্বশক্তি লাভ করেন এবং বিশ্ববিখ‍্যাত কবিরূপে জগতে খ‍্যাত হন। আবার, সরস্বতীপুজোর দিন নাকি বইপড়া নিষেধ। সেদিন কেবল দেবীকে আরাধনার দিন। সরস্বতীপুজোর আগে কুল খাওয়ার ওপরেও নিষেধাজ্ঞা আছে। সম্ভবত ছোট ছেলেমেয়েরা এই টক ফলটি অতিরিক্ত আহার করে কাশিতে ভোগে, এজন‍্যই এই নিদান।

আজকের নেটশাসিত যুগে এই পুজোর সঙ্গে মিশেছে ভ‍্যালেন্টাইন পরব। বসন্ত ঋতুকে বলা হয় মধুমাস। এই ঋতু যৌবনের। বসন্তের সবচেয়ে বড় উদযাপন হল দোল বা বসন্তোৎসব। রাধাকৃষ্ণের অনুষঙ্গে তরুণতরুণীদের পরস্পরকে আবীরে রাঙানোর প্রহর। তার-ই রকমফের এই ভ‍্যালেন্টাইন ডে। সবার রঙে রং লাগানোর মহালগন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে এর প্রশ্রয় দিয়ে গেছেন।

সবশেষে বলি, জ্ঞানের দেবী আমাদের পথ দেখাক অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণের।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 4 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »