Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

উত্তমকুমার: অন্য ও অনন্য

আবার এসেছে শ্রাবণ! এ মাসটি এলেই বাঙালি মাত্রেই বিষাদে অভিভূত হন। এই শ্রাবণ মৃত্যু দেখেছে রবীন্দ্রনাথের। প্রয়াণ দেখেছে কাজী নজরুল ইসলামের। এবং আরও এক স্বনামধন্য বাঙালির,– উত্তমকুমার। তাঁর জন্মদিনের চেয়েও মৃত্যুদিনটিকে অধিকভাবে স্মরণ করা হয়, এ এক আশ্চর্য ব্যাপার। তাছাড়া বাংলা চলচ্চিত্রজগতে তো কম খ্যাতিমান ব্যক্তির আবির্ভাব হয়নি, সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল, ছবি বিশ্বাস-কানন দেবী-সুচিত্রা-সৌমিত্র, তবু তাঁর মতো, ঠিক তাঁর মতো স্মরণযোগ্য হয়ে রইলেন না কেউ।

শ্রাবণের অনুষঙ্গে নয়, উত্তমকুমারের প্রয়াণদিবসটি চিহ্নিত চব্বিশে জুলাই তারিখটির বিধুরতায়। ১৯৮০-র এই দিনটিতে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এই দিকপাল প্রতিভার জীবনাবসান ঘটে। আজ তাঁর মৃত্যুর পঁয়তাল্লিশ বছর পূর্তিতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন করে উত্তম সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্যের ডালি মেলে দিলাম।

উত্তমকুমার, আমরা জানি, এমন একজন অভিনেতা, যাঁর নাম কোনও ছায়াছবির সঙ্গে যুক্ত হওয়া মাত্র প্রযোজক-পরিবেশক ঝাঁপিয়ে পড়তেন সে ছবির পেছনে অর্থ লগ্নি করতে। অথচ তাঁকে এমন জনপ্রিয়তা অর্জনের আগে পেরিয়ে আসতে হয়েছিল সাত-সাতটি ছবিতে তাঁর ব্যর্থ হওয়ার পথ। একদিকে নিজের অধ্যবসায়, অন্যদিকে পরিচালক-প্রযোজকদের অপার আনুকূল্যই ‘নায়ক’, ‘সপ্তপদী’, ‘ঝিন্দের বন্দী’, ‘চৌরঙ্গী’, ‘যদুবংশ’-সহ দুই শতাধিক ছবির এই মহানায়ককে জন্ম দিয়েছে।

উত্তমকুমার জীবনে একবার, মাত্র একবারই, একটি তথ্যচিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের সময় পরিচালক তপন সিংহ দেশাত্মবোধক একটি দু-রিলের ছায়াছবি নির্মাণ করেছিলেন, যা তখন বিভিন্ন চিত্রগৃহে মূল ছবি দেখানোর আগে পরিবেশিত হত। সে ছবিতে বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের অভিনেতা ও গায়কদের মতো উত্তমকুমার-ও আছেন।

উত্তমকুমার কি এমন কোনও ছবিতে অভিনয় করেছিলেন, যা ‘প্রাপ্তবয়স্ক’-দের ছবি বলে চিহ্নিত হয়েছিল? হ্যাঁ, একটিমাত্র চলচ্চিত্র, ১৯৫২-সালে তৈরি, যে বছরটিতেই তিনি নির্মল দে-পরিচালিত ‘বসু পরিবার’-এর মাধ্যমে সিনেমাজগতে সর্বপ্রথম খ্যাতির মুখ দেখেন। উত্তম-অভিনীত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ছবিটির বিষয়বস্তু এমন, সেসময় এ-ছবি নির্মাণ করার দুঃসাহস,আর সে ছবিতে অভিনয় করার, দুটোই ছিল অভাবিত। যৌনরোগ ছিল ছবিটির বিষয়বস্তু। নায়িকা মঞ্জু দে ছিলেন যৌনরোগীর ভূমিকায়। এ ছবিতে উত্তম অভিনয় করতে রাজি হয়ে সত্যি সত্যি আধুনিক মনের পরিচয় দিয়েছিলেন। এবং আরও বেশি করে অবশ্যই মঞ্জু-ও।

খুব ভাল গান জানতেন উত্তম। গান শিখেছিলেন ধ্রুপদী কণ্ঠশিল্পী নিদানবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। প্রথমজীবনে তিনি যে একটি গানের স্কুলে মাস্টারি করতেন, এ তথ্য খুব একটা জানা নেই আমাদের। স্কুলটির নাম সাউথ চক্রবেড়িয়া মনোরমা গার্লস স্কুল। গৌরী দেবীকে গান শেখাতেন। অবশেষে প্রণয়, বিয়ে। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ বসুশ্রী সিনেমাহলে বাংলার সব শিল্পীদের নিয়ে যে গানের আসর বসত, তাতে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন তিনি। হেমন্ত, মান্না দে, সন্ধ্যার মতো নামী শিল্পীদের সঙ্গীত পরিবেশনের আসরে। তাছাড়া রবীন্দ্রসদনেও কয়েকবার গান গাইতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। খুব ভাল গান জানতেন বলেই ছবিতে গানের সঙ্গে অসামান্য ঠোঁট মেলাতে পারতেন।

এমন গানজানা উত্তম তাঁর কোনও ছবিতে নিজে গান করেছিলেন? আমাদের একটু অবাক লাগে, কোনও পরিচালক-ই তাঁকে তাঁদের ছবিতে নিজের গলায় গান গাইতে দেননি ভেবে। অথচ তিনি ছিলেন ‘কাল তুমি আলেয়া’ ছবির সঙ্গীত পরিচালক। কলকাতা বেতারে প্রতি মাসে যে ‘এমাসের গান’ পরিবেশিত হয়, সেখানে একবার তিনি কবি কবিতা সিংহ-রচিত একটি গানে সুর করেন। গানটি পরিবেশন করেন দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়।

ছবিতে গান তিনি করেছিলেন। একটি-দুটি নয়, সাতটি। নিজ কণ্ঠে। তাঁর অভিনীত ‘নবজন্ম’ ছায়াছবিতে। সঙ্গীত পরিচালক নচিকেতা ঘোষের সুরে।

‘উত্তমকুমার’ তিনি একবারে হননি। ১৯৪৯-এ মুক্তি পাওয়া ‘কামনা’ ছবিতে তাঁর নাম ছিল অরুণকুমার। ১৯৫০-এ বেরল ‘মর্যাদা’। তার নায়ক অরূপকুমার। অবশেষে ১৯৫১-তে উত্তমকুমার, রাজেন চৌধুরী পরিচালিত ‘ওরে যাত্রী’ থেকে।

বাংলাদেশের প্রখ্যাত লেখক শওকত ওসমানের যে সরাসরি ছাত্র ছিলেন উত্তম, তা আমরা কতজন জানি? উত্তম যখন কলকাতার কমার্স কলেজে পড়তেন, সে সময় শওকত সাহেব সেই কলেজের শিক্ষক বিধায় উত্তমের পাঠগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল তাঁর কাছে।

চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমার কিন্তু পেশাদারী নাটকেও অভিনয় করেছিলেন। স্টার থিয়েটারে ১৯৫৩-তে তিনি ‘শ্যামলী’ নাটকে অনিলের চরিত্রে নামেন। এ নাটকে তাঁর বিপরীতে ছিলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। নাটকটি ৪৮৪ রজনী ধরে অভিনীত হয়। পরে এটির চিত্ররূপেও ছিলেন তিনি। নায়িকা হন কাবেরী বসু। মজার কথা, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় দেখেছিলেন নাটকটি। এর পর যখন-ই নানা সরকারি অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে উত্তমকুমারের দেখা হয়েছে, উত্তমকে তিনি ‘অনিল’ নামেই ডাকতেন!

বাংলা ছায়াছবির প্রায় সব নায়ক-নায়িকা পেশাদারী যাত্রাতে অভিনয় করলেও উত্তম তা করেননি। কিন্তু যাত্রাকে অসম্ভব ভালবাসা থেকে তিনি বছরে একবার নিজের উদ্যেগে নিজের পাড়ায় যাত্রাভিনয় করাতেন।

বেশ কয়েকটি ছবিতে তিনি দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। প্রথম করেন ‘তাসের ঘর’ (১৯৫৭)-এ। তাঁর অভিনীত প্রথম রঙিন ছবি ‘পথে হলো দেরী’। প্রযোজক রূপেও পাই তাঁকে, যার সূচনা ‘হারানো সুর’ থেকে। আর পরিচালকের ভূমিকাও ছিল তাঁর। তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবি ‘শুধু একটি বছর’ (১৯৬৬)।

তাঁর সম্পর্কে আরও একটি অজানা তথ্য হল, ১৯৭৩-এ নির্মিত দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের কন্যা অপর্ণা রায়ের (তখনকার মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মা) ওপর নির্মিত তথ্যচিত্রে ভয়েসওভার (ধারাভাষ্য) ছিল তাঁর। ১৯৬৭-তে ভারত সরকার দেশের শ্রেষ্ঠ অভিনেতাকে ‘ভরত’ পুরস্কারে ভূষিত করা শুরু করলে উত্তম ছিলেন তার প্রথম প্রাপক।

মহানায়ক উত্তম প্লেনে চড়তে ভয় পেতেন। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন মহাভীরু!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 − 8 =

Recent Posts

সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটগল্প: ফাউ

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার…

মনু-পরাশর-বৃহস্পতি-কৌটিল্যদের অনুশাসন এসে নারী প্রগতির রাশ টেনে ধরল। নারীর শিক্ষালাভের ইতি ঘটল, অন্তঃপুরে বাস নির্দিষ্ট হল তাঁর জন্য। তাঁকে বাঁধা হল একের পর এক অনুশাসনে। বলা হল, স্বাধীনতা বলে কোনও পদার্থ থাকবে না তাঁর, ‘ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি’! কুমারী অবস্থায় পিতা-মাতার অধীন থাকবে সে, বিয়ের পর স্বামীর, বার্ধক্যে সন্তানের। ধাপে ধাপে তাঁর ওপর চাপানো হতে লাগল কঠিন, কঠিনতর, কঠিনতম শাস্তি।

Read More »
স্বপনকুমার মণ্ডল

গরিব হওয়ার সহজ উপায়

এককালে পর্তুগিজ-মগরা আমাদের নিম্নবঙ্গ থেকে দাস সংগ্রহ করত মালয়-বার্মাতে শ্রমিকের কাজের জন্য, ইংরেজ সাহেবরাও কিনত গোলাম। আজ আবার মানুষ সস্তা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসকের দরকার নেই। খোলাবাজারে নিজেরাই নিজেদের কিনছে দেশের মানুষ। মানুষ বিক্রির মেলা বসে এখন গ্রামগঞ্জের হাটে হাটে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহাশ্বেতা দেবী: স্বনামে চিহ্নিত অনশ্বর প্রতিভা

গ্রামশি-বর্ণিত ও পরবর্তীতে বহুলচর্চিত ‘সাব অলটার্ন’-এর আগেই মহাশ্বেতার লেখায় ব্রাত্যজনসংহিতা মূর্ত; ‘অরণ্যের অধিকার’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৭-এ। আর সাব অলটার্ন-তত্ত্ব প্রথম দানা বাঁধছে ১৯৮২-তে জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, রণজিৎ গুহ, গৌতম ভদ্র, শাহেদ আমিন, পার্থ চট্টোপাধ্যায়দের সঙ্কলন প্রকাশের মাধ্যমে। অবশ্য তার বহু আগেই ইতিহাস রচনায় সাব অলটার্ন চেতনায় স্থিতধী দেখা গেছে রবীন্দ্রনাথকে। স্বামী বিবেকানন্দ মূর্খ, চণ্ডাল ও দরিদ্র ভারতবাসীর মাহাত্ম্য বুঝিয়ে গেছেন, আর বিভূতিভূষণকেও আমরা সামগ্রিক বিচারে প্রান্তিক মানুষের কথাকার রূপেই পাই। কিন্তু মহাশ্বেতা আরও ব্যাপক, গভীর, তন্ময়, নিবিড়, ও নিঃসন্দেহে দলিত জনতার কথাকার।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

সারদাদেবী: এক অনন্যা মাতৃরূপা

ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়ে ও বধূ হয়ে তিনি কিনা মুসলমান ঘরামি আমজাদকে খেতে দিয়ে তার এঁটোকাটা নিজের হাতে পরিষ্কার করেন! বিধর্মী খ্রিস্টান নিবেদিতার সঙ্গে বসে আহার করেন! আর তাঁর চেয়েও বড় কথা, সে যুগের বিচারে বিপ্লবাত্মক ঘটনা, স্বামীর মৃত্যুর পর যে দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন তিনি, বিধবাবিবাহের প্রবর্তক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-ও যা কল্পনায় আনতে গেলে নির্ঘাত মূর্ছা যেতেন, লালপেড়ে শাড়ি আর সোনার বালায় ভূষিতা থাকতেন তিনি! আজকের উচ্চশিক্ষিত সমাজেও ক’জন পারবেন এ-কাজ করতে, বা নিদেন এ কাজকে সমর্থন করতে?

Read More »
মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »