Search
Generic filters
Search
Generic filters

মণিশংকর বিশ্বাসের কবিতা

বই

(উৎসর্গ: নবনীতা সেন, সুজনেষু)

নিখিল জ্ঞানের শিশু
নতভাবে ফুটে থাকো রৌদ্র-সায়রে
বিলাপের মতো ঈষৎ আন্দোলিত হও—
ধিমে আসা হ্যাজাকের আলোয়।
তোমাকে জাগাব আমি কোনও এক বারুণী-মত্ত মাঝরাতে—
তাসের মতন বেটে
কখনও-বা চালান করে দেব টেবিলের তলায়
হয়তো পুরনো জাহাজি সে, ঠিকঠাক নারীসঙ্গে বঞ্চিত
ভুলেও জিজ্ঞেস কোরো না তাকে সমুদ্রের কথা
সে আরেক শাপগ্রস্ত, তরল নক্ষত্র এক
তার-চে পিপেতে লুকিয়ে থাকা বিড়ালীর সাথে
ভাগ করে নিয়ো টুনা-স্যান্ডউইচ—

অন্ধকারের জটিল গ্রন্থি

২

যদি একঘেয়ে লাগে, বোলো, মেষপালনের মত
সহজ দায়িত্ব দেব কোনও, গান গেয়ে শিস দিতে দিতে
বানিয়ো পাতার মুকুট
অতিগ্রীষ্মে সতর্ক থেকো
এসময় দলবেঁধে পশুরা পাগল হয়— ক্রুদ্ধ পশু
মাইল মাইল পথ হেঁটে যায় মিষ্টিজলের খোঁজে
জলভরা চামড়ার থলে কাঁধে তুমি যেয়ো
নিচু ডাঙার খোঁজে উন্মাদ পশুর পিছনে
যেখানে জল থাকে সারা বছর, সরলবর্গীয় ছায়াঘেরা

৩

যদি ভাল না লাগে, হাইওয়ের পাশে যে সরাই
সেখানেই দেখা হবে উস্তাদ
রাতে একসাথে খাটিয়ায় বসে
সপ্তর্ষি-মণ্ডল, কালপুরুষে আঙুল বোলাতে বোলাতে
গল্প করা যাবে, জিজ্ঞেস করা যাবে,
ট্যাটু সম্পর্কে তুমি কতটা সিরিয়াস— হাতের নিশানা কেমন?
শেষ কবে শিকারে গিয়েছ?

ঘুমিয়ে পড়ে যদি কেউ স্বপ্ন দেখি
তা-ও ভাগ করে নেব সমান সমান—

বলো রাজি আছ কিনা

৪

পাথরের ছাদ হতে পরপর ঝোলানো ঘণ্টাগুলি—
জাপানি অক্ষর আর সূক্ষ্ম কারুকাজ করা
একটি কাঠের সুদৃশ্য দণ্ড দিয়ে সেগুলোকে ছুঁয়ে যেতে হবে
তাতেই যা হবার হবে— না লেখা কবিতার প্রথম পঙ্‌ক্তি
নন-ফিকশনের প্রোলগ— ব্লার্বের লেখা
অথবা সমস্ত নীল উজাড় করে দেওয়া
একটি ছোবল…

অথচ তোমার সঙ্গগুণে যত পুণ্য, আমি তার সবই
সস্তার সরাইখানায় এক বোতল জুয়ার প্রসঙ্গে খরচ করে ফেলি

দেখি— ফণীমনসার কাঁটায় লেগে আছে একটি শিশিরবিন্দু—

বলাই-বাহুল্য ওই আলোকবিন্দুটিই সেই সন্ন্যাসী যে কিছু পরে
মিশে যাবেন শ্মশানযাত্রীদের শোক ও মদে—
আর যার কোমরে বাঁধা আছে চূড়ার ঘণ্টাঘরের চাবি…

৫

তারপর একদিন সূর্যোদয়ের আগে শুরু করব ট্রেকিং
মধ্যাহ্নের একটু পরেই পৌঁছে যাব সূর্যাস্ত চূড়ায়—
যেখানে মন্দির তোমার,
চিৎকৃত নৈঃশব্দ্য দিয়ে গড়া
ধূসর বেদির উপরে বিশাল এক ঘণ্টা, দেবতার কানের মত
তার ঠিক নিচে বসে কাঁদব আমরা
ফেলে আসা নদী, বজরা খেত, ভেড়ার খামার
পাহাড়তলির চায়ের দোকানটির জন্য—
আমরা কাঁদব প্রেম, অভিজ্ঞান, আমাদের শৈশব,
এমনকি সূর্যমুখী খেতে ফেলে আসা মরদেহটির জন্য

তখন কীইবা থাকবে আর
অনেক নীচে বুদ্‌বুদময় কাচের ওই পেপারওয়েটটির কাছে!

যাকে ছুঁয়ে এতকাল বেঁচে থেকেছি
যার ভিতর বসে বসে এই মৃত্যুর কথা ভেবেছি!

চিত্রণ : মুনির হোসেন

8 Responses

    1. খুব ভালো লাগল পারিজাত, তুমি পড়লে খুব আনন্দ হল!

  1. ভীষণ সুন্দর। আনন্দ পাই পড়ে। আবার বেদনায় মুষড়ে উঠি। লেখাগুলো মথিত করে রাখছে। আবার পড়তে হবে।

    1. আমার আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা ভাই

  2. খুব ভালো লেখা, মণিমুক্তো

    1. আমার আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানবেন

  3. কোনো মন্তব্যই যথেষ্ট নয়। একটানে পড়লাম। হাইওয়ের পাশে একটা সরাই দোল খাচ্ছে চোখের সামনে। ফণীমনসার ডালে লেগে থাকা শিশিরের শব্দ শুনছি। এই লেখাগুচ্ছের প্রতিটি শব্দকে আমার প্রণাম। প্রণত হে…

    1. আর কী চাইতে পারতাম! “ভালোবাসা ছাড়া আর কোনো যোগ্যতাই নাই এ-দীনের” ?????

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 − 2 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »