Search
Generic filters
Search
Generic filters

একটা ডাকে না-দেওয়া পোস্টকার্ড: অমিয় দেব

হঠাৎ সেদিন কোন এক বইয়ের ফাঁকে একটা পোস্টকার্ড পেলাম। আমারই লেখা। লিখেছিলাম ১২ জানুযারি ২০০৪-এ। আমার বর্তমান ঠিকানা থেকে (EE 108/7 সল্ট লেক/কলকাতা 700 091 [2359 3468])। শান্তিনিকেতনের পূর্বপল্লীতে শ্রীমতী চামেলি বাগ-কে। এই ছিল পোস্টকার্ডের বয়ান :

চামেলিদি,

এক্ষুনি যে-খবর শুনলাম তাতে মন খুব স্তব্ধ হয়ে গেল। অনেকদিন দেখা হয়নি বিনায়কের সঙ্গে, শুনেছিলাম শরীর ভালো নেই, কিন্তু এতটা যে খারাপ তা বুঝতে পারিনি। নিঃসঙ্গতাকে বিনায়ক মানিয়ে নিয়েছিল এ-ই জানতাম। তাছাড়া ওর চরিত্রে চমৎকার স্থিতির লক্ষণ ছিল। কখনও উত্তেজিত হত না, আবেগকে প্রশ্রয় দিত না। একসময় এত নিকট ছিলাম যে ওর স্বভাবের স্পর্শে আনন্দ পেতাম। সেইসব দিন এখন সত্যিই ‘অলীক’। মণি কোথায় আছে জানি না, বলদেবেরও কোনো খবর রাখিনি (যে-কয়েকবার দেখা হয়েছে তা বিনায়কের থিয়েটার রোডের বাড়িতেই), বাচ্চু তো শুনলাম এবার আসেওনি। আমার শোক আপনাকে ছাড়া আর কাকে জানাব?

অমিয়

এই পোস্টকার্ড কেন ডাকে দেওয়া হয়নি বুঝতে পারছি না। ভুলে গিয়েছিলাম? কিন্তু ঊনিশ বছর আগে তো এখনকার মতো ভুলো ছিলাম না! তাহলে কি ইচ্ছে করেই দিইনি? ভেবেছিলাম, এই কথাগুলো আসলে নিজেকেই বলা? বিনায়কের দিদিকে শোক জ্ঞাপন করতে হলে তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। আর তা তক্ষুনি করবার অবকাশ ছিল না বলেই কি এক চিঠির কথা ভেবেছিলাম? পরে যখন কোনো ‘কাজে’ শান্তিনিকেতন গেছি, তখন বন্ধুবিয়োগের বেদনা বয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করে এসেছি। ([পোস্টকার্ডে উল্লিখিত] বিনায়কের সবচেয়ে ছোটো বোন মণির সঙ্গে দেখা হয়েছে তারও পরে। ছোটো ভাই বলদেবের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই হয়নি।)

কিছুদিন আগে কোভিডকালীন ‘আরেক রকম’-এ এক “পূর্বপল্লী ১০৪’’ শীর্ষক নিবন্ধ বেরোয় আমার, যাতে আমার বন্ধু বিনায়ক বসুর কথা অনেকটাই আছে। আছে আমার অন্য বন্ধু, বিনায়কের ভগ্নীপতি, বাচ্চু রায়ের কথাও। বস্তুত, আমাদের তিনজনের শান্তিনিকেতনে তথা পূর্বপল্লীর ১০৪ নম্বর প্লটের বাড়িতে পৌঁছে, সত্তরের দশকের সাপ্তাহান্তিক আড্ডাই ওই নিবন্ধের মুখ্য বিষয়। যখন লিখছি তখন বিনায়ক-বাচ্চু দুজনেই গত। তাঁদের চলে যাওয়ার অনেক আগেকার এক ঐকান্তিক অভিজ্ঞতার স্মৃতিই আমাকে ওই লেখায় প্রবৃত্ত করেছিল।

আর এই ডাকে না-দেওয়া পোস্টকার্ড, যা আমি আবিষ্কার করেছি এই ক’দিন আগে, ২০০৪-এর ১২ জানুয়ারির অব্যবহিত পূর্বের এক অভিজ্ঞতার সাক্ষী। অভিজ্ঞতাটি এক একদা-ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মৃত্যুসংবাদ শোনার। তাৎকালিক। অক্ষর যদি সত্যিই কোনো সত্তার দুয়ার খুলে দিতে পারে, তাহলে এই পোস্টকার্ডের মর্মে আছে এক শোক যা কোনো স্মৃতিচারণে থাকে না। থাকবার কথাও নয়, কারণ স্মৃতি সততই সুখের। (এই নামে একটা বইও আছে প্রতিভা বসুর।) নাকি, তা এক সরলীকরণ যা স্মৃতির সকল মাত্রার খোঁজ রাখে না? মনোবিজ্ঞানীরা বলতে পারবেন। বিষ্ণু দে-র কাছে যখন স্মৃতি ও সত্তা (ভবিষ্যৎকে আপাতত দূরে রাখছি) পরম্পর হয়ে ওঠে, তখন কি কোনো মনোবৈজ্ঞানিক প্রেরণা কাজ করে যায়?

অন্তত একটা কথা বোধহয় আমাকে মনে রাখতেই হয় যে, ওই দুই অক্ষর-বৃত্তেরই কর্তা আমি। তাৎকালিকতা যেমন আমার তেমনি অন্তরিত চারণও আমার। দুয়ের চরিত্র আলাদা হলেও আমার বিহনে তাদের উৎপত্তি হত না। অতএব তারা থাক একে অন্যের সম্পূরক হয়ে। কেউ যদি আমার ‘‘পূর্বপল্লী ১০৪’’ পড়ে থাকেন, তাঁকে এই “একটা ডাকে না-দেওয়া পোস্টকার্ড’’-ও পড়বার অনুরোধ জানাই।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

আরও পড়ুন…

বিশেষ নিবন্ধ: খালের শহর

One Response

  1. চমৎকার লেখা। খুব ভালো লাগল।… কিন্তু, ” পূর্বপল্লী ১০৪” এখানে পড়া গেলে, ভালো হত। ওই পত্রিকার অনুমতি সাপেক্ষে যদি এখানে আবার প্রকাশ করা হলে ভালো হত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 − one =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »