Search
Generic filters
Search
Generic filters

সুজিত বসুর কবিতাগুচ্ছ

ছাপিয়ে নিস্বনে তবু

স্টিরিওতে বেজে যায় ডোনা সামারের গলা আর্ত শীৎকারে
বারান্দার অন্য প্রান্তে বনি এম, জ্বরদগ্ধা কুমারী বিলাপে
আশ্লেষ ঘনত্ব ভাব, পাভলভস্কায়া স্ট্রিটে কেমন বিজয়ে
মত্ত মাতালের গলা, জড়িত স্খলিত কারো পদক্ষেপে কাঁপে
মদালসা করিডর, স্বর্ণকেশী রাজকন্যা শরীরের ভারে
বসেছে ছুরিকা হয়ে, মে দিবসে আমি বুঝি বারাঙ্গনালয়ে
বসে আছি ঝিমধরা, রাস্তার পতাকা থেকে রক্তিম আবির
ঝরে পড়ে দুর্নিবার, ও শুধু আবির বুঝি, ও কিছু রক্তের
রাখেনি তো প্রতিচ্ছবি, উনিশশো সতেরো সালে শীতপ্রাসাদের
দুয়ারেই রেখেছিল অগ্নির স্ফুলিঙ্গ জ্যোতি, এখন পশ্চিমী
নৃত্যের গুঞ্জন ধ্বনি, পশ্চিমবঙ্গের বুকে যন্ত্রের দানব
ওয়ালজের সুরে সুরে নেচে যাবে মায়াময়, নিঃস্ব এ শরীর
ছাপিয়ে নিস্বনে তবু ঝরে কেন রক্ত স্রোত, অকর্ষিত ভূমি
কেন থাকো প্রতিবিম্বে মায়াবী দর্পণে এই, স্টিরিওর নব্
ঘোরালে বাজে না কেন বজ্রনাদে শঙ্খরব কাস্ত্র হাতুড়ি!

*

চানের ঘরে কালকেউটে

চানের ঘরে যেই গিয়েছি লাফিয়ে ওঠে কালকেউটে
বাষ্পে ধূমে প্রায়ান্ধকার ঘরের মধ্যে সাপের ফণায়
ফেনিয়ে ওঠে নীলচে দ্যুতি, সাবান সাবান ফেনায় জলে
লেপটে আছে শরীর জুড়ে, চাঁদ সদাগর লোহার ঘরে
ছিদ্র কেটে শাপশাপান্ত, অ্যাদ্দিন তো দিব্বি ছিলে
পাষাণ হয়ে রন্ধ্রভারে, হঠাৎ কেন আজকে উঠে
মুষল হয়ে অস্থি ভাঙো, স্বস্তিটুকু, ঘনায় ঘনায়
নিকষ অমাবস্যা কালো, নরক বা বেহেশতে
প্রথম পদচ্ছায়া আমার, অচেনা অঞ্চলে
বুক কাঁপানে মূর্তি ছায়া, আমায় ঘিরে লৌহকঠিন স্বরে
সাপের এমন ফুঁসিয়ে ওঠা, আমার কাছে ঘেঁষতে
কি শাপ তোমায় সাহস দিল, ক্ষিপ্ত প্রতিমূর্তি
শরীর জুড়ে বিষিয়ে ওঠে, অন্ধ কারাকক্ষে
রাখব না আর বন্দি করে, তোমায় আমি মুক্তি
দেবই দেব সত্যি দেব শানবাঁধানো মেঝেয় এবার
আর পারি না আর পারি না, বিষের নীলে গ্রন্থি গলা
জ্বলতে জ্বলতে নীলকণ্ঠ, তুমিও জানো অলি
মুষল হাতে এই নিয়েছি, প্রমত্ত এই চাপে
যাক ভেঙে যাক শক্ত তালা, গলার সরু নলি বেয়ে
সাপ চলে যাও, সাপ চলে যাও সুজিতটাকে সঙ্গে নিয়ে
শরীর থেকে যেই বেরোল অলি জানো শরীর অবশ
পক্ষাঘাতে আজ নিপাতে প্রাচীন মহাপাপে
তোমার জন্য জমিয়ে রাখা নৈবেদ্য ভালবাসার
রূপান্তরে অশ্রু ভরা বিনষ্ট অঞ্জলি।

*

রোম নগরী তোমায় চিনি

মনের মধ্যে জড়িয়ে আছে, মনের মধ্যে তিন কুলুপে
রঙিন রোমান চাবি দিয়ে শক্ত করে নিপুণ চাপে
কোন জাদুকর রাখলে এমন বন্দি করে ভোমরাটিকে
রোম থেকে তাই ফ্লোরেন্স যেতে চিকনকালো সূক্ষ্ম পাপে
তলায় শ্যামল নৌকোখানি, নিঝুম রাতে একটু চুপে
ফিসফিসোনো বিষের ধোঁয়া, এমনতর সর্পিলতা
আমার জন্যে রোম নগরী, আমার জন্যে শ্বেত মদিরা
পাত্র ঠোঁটে ঠেকিয়ে রাখো, চুলের কালো মৌচাকে আর
চিরুনি সোনা কাঁকড়া দাঁড়া, কখনো কেউ তোমরা ফিকে
নীলচে রঙের পরদা দেখো, তোমরা নাকি রোমান নারী
অশ্বক্ষুরে শহর দাপাও, এমনধারা আজব কথা
কে বিশ্বাস করবে এমন কে আর আছে তপস্বিনী
ট্রেনের কাচে আধঝলকে তরল ধাতুর তীক্ষ্ণ ব্রীড়া
ফোটাও যত উন্মাদিনী, অস্ত্রখানি তার বুকে যার
তির বেঁধানো জন্ম, মায়ার রোম নগরী তোমায় চিনি।

*

ভেনিসে প্রতীক্ষাঘরে

নিশুতি নিঝঝুম ঝুম, অন্ধকার ঘর ভরে অজস্র কুহেলি
ভেনিসে প্রতীক্ষাঘরে ঝুমঝুম ঘুমঘুম, মায়াবী আঁধারে
দুচোখে বিঁধেছে তির, এ কার প্রতীক্ষা বলো ধূধূ জলধারে
মরীচিকা ঝিকমিক, জ্যোৎস্নাময় কুয়াশায় অপরূপ খেলি
কেবল নিজের সঙ্গে, এ খেলার গোলঘরে রুমালচুরির
বৃত্ত ঘুরে চলাফেরা, ভিয়েনার ট্রেন এসে সরল ঋজুতা
দেখাবে বাঁকানো তার বাজপাখি ঠোঁট দিয়ে, সে তার কিছুটা
মুখাগ্র আড়ালে রাখে, ঝমঝম ঝমঝম বর্ষা মেঘ তীর
সহসা ফুটেছে চোখে কৃষ্ণসার অন্ধকারে, গোধূলি গোধূলি
ভেনিস স্টেশন জুড়ে, ফিকে নীল পুরু পরদা দোলনা ঝুলনে
ঝুলেছে নিঃসাড় চুপ, এ রাসপূর্ণিমা এই বৃন্দাবন ধূলি
মেখেছ বৈষ্ণব গায়ে, তারই ঝড় বৃষ্টিধারা ভেনিস স্টেশনে
শরীরে তোমার ঝরে কুয়াশার বর্শা হয়ে, ভিয়েনার ট্রেন
এ থেকে কতটা মুক্তি দিতে পারে, চারিদিকে সমুদ্র সফেন।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

2 Responses

  1. অসাধারণ অসাধারণ। শব্দচয়ন আর ছন্দের শরীর নিয়ে এমন ভাঙাগড়া এসময় খুব কম চোখে পড়ে। কবি আর কবিতা কোনো কালের গন্ডিতে বাঁধা থাকেনা; মননে নিগড় বাঁধে না কোনো ভূগোলের শক্ত সীমানা। এসব লেখায় সেসব বেশ বোঝা যায়। একমাত্র এক শক্তিশালী কবিই পারেন পঞ্চাশ বছর প্রায় নাড়া দেবার মতো রচনার মধ্যে নিজেকে উজাড় করতে। সুজিত বসু আদ্যান্ত কবিতা, তাঁর কবিতা কখনো ফুরানোর নয়। অভিনন্দন কবিকে। ভালভাষাকে ধন্যবাদ, তাঁরা কবিকে পৌঁছে দিচ্ছেন অনুরাগী ও মনোযোগী পাঠকের কাছে

  2. খুব ভাল লাগল। সুজিত বসুর কবিতা আগে পড়িনি। কবি সম্পর্কে আগ্ৰহ জাগল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × five =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »