Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

সিদ্ধার্থ মজুমদারের কবিতাগুচ্ছ

চান্দ্রেয়

যতটা আলোক ভাবো পূর্ণিমা চাঁদ
অতটা দীপ্ত নয় ষোলোকলা
.                        জ্যোৎস্না প্লাবন।

আলো ও আঁধার লেখা কোনো কিছু
কখনও সত্য বলে না। পেতে রাখে
ছলনা ও কিছুকিছু আত্মপ্রমাদ!

সঠিক বুঝতে চাও যদি, তবে
কীভাবে দীপ্তি কমে দিনে দিনে,
কীভাবে আঁধার নামে ক্ষীয়মাণ
গভীর দৃষ্টি দিয়ে চিনে নিও
.                       প্রতিটি পর্যায়।

অন্ধকার ও আলোকের মাঝখানে,
বিভ্রম ছড়ানো থাকে স্তরে স্তরে!

*

মধ্যমা

‘শুরু’ কিংবা ‘শেষ’— কেবলই তা সোজাসুজি, সহজ-সরল। শুধু মাঝখানে,
যে-কোনো দিকেই বাঁক নিতে পারে। মাঝখানে বড় বেশি অস্থির,
জটিল কুটিল।

দিন কিংবা রাতের শুরুতে খুব চেনা মায়াময় অনাবিল রুল টানা,
অনায়াস পেলবতা কথা বলে! শুধু মধ্যরাত্রি ও দ্বিপ্রহর নিঝুম পারদে,
উষ্ণতা ওঠানামা করে, অনিশ্চিত আবেশে।

কিংবা ভেবে নাও পথ : শুরু আর শেষগুলি সেখানেও পরিপাটি, খুব চেনা
রথের দড়ির টানে যথাবিধি যে-রকম গড়গড় চাকা, যাওয়া আর আসা
চেনাজানা… গন্তব্য ঠিকানা…

সকলেরই মাঝপথে তবু, টানটান অনিশ্চিত আঁকাবাঁকা কানাগলি বিপথগামিতা,
জলাশয় কিংবা নদী হলে, মাঝখানে ছুঁয়ে দেখো— বয়ে যায় থই থই খরস্রোতা।

রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলি যে-কোনো দিকেই যেতে পারে। শুধু মধ্যেখানে
অসীম অনধিগত টানটান লিখে রাখে। ওখানেই সৃষ্টি ও রূপান্তরণ
ওখানেই উৎক্রম বিপুল সম্ভাবনা।

জীবনের মধ্যাহ্নে, কানেকানে ফিসফিস বিনিময় চলে, আলোময় জ্যোৎস্নার ভূমধ্য সাগর।
ওইখানে গতিময় দারুণ ফেনিল! যে-কোনো দিকেই যেতে পারো তুমি…

সকলেরই আছে, শুধু গাছের জীবনে মাঝবয়সি কোনো ক্রাইসিস থাকে কি না,
পরের পর্বে কখনও দেখব সেইসব জীবনমধ্যমা।

*

হওয়া না-হওয়ার গল্প

কিছু না-হলেও, যা হয়—
সে-ও তো— কিছু না-কিছু
.                          হওয়াই!

জল-বালি ছুঁয়ে ছুঁয়ে, সময়ের ঢেউগুলি
বয়ে যায়, হওয়া বা, না-হওয়ায়!

Advertisement

কিছু হোক বা না-হোক,
আসলে তা, কোনো এক
.                    মায়াবিৎ, সাদৃশীকরণ…

হয়তো বা আবছায়া ঢেকে রাখা
কিছু না-কিছু হওয়া ও
.                            সূচনার পর্যাবরণ…

*

ছায়া আলো

যে-কোনো ছায়াতেই কমবেশি মিশে থাকে
নিস্তরঙ্গ আবছায়া, অজ্ঞেয় কিছু কিছু আলোর কণিকা

ছায়া কোনও অন্ধকার নয়,
নয় কোনো উদ্ভাসন বা আলোর নিশানা
সকলেরই ছায়া পড়ে : চলমান, জড় বা অজড়
শুধু বহু দূর উঁচু-ওড়া পাখিদের ডানা
কোনো ছায়া কালো-সাদা লেখে না!

*

জলছবি

জলের গায়ে যে ছায়া পড়ে, তা
মাটির মতো নয়— আলাদা ;
ফুটে ওঠে রঙ-ঢঙ, বিশ্বস্ত আদল…
মাটিতে যে ছায়া পড়ে, কালো ও সাদায়
তা, বড় বেশি গোলমেলে—
মায়াময় ধোঁয়াশায় লেখা…

*

কোয়ারেন্টিন

কাছে এসো। এভাবেই দূরে দূরে অবরোধ থাকি
সরে থাকো, দূরে দূরে দূরতার চাদর আড়ালে।
দূরে থাকো, সরে থাকো অজড়িত-ছুঁয়ে
এভাবেই কাছে এসো। খুব কাছে। ভালবাসো,
ছুঁয়ে থাকো অনুরতি
আসঙ্গ-আশ্লেষ।

দূর যত বেশি, কাছে আসি তার বহুগুণ
মূছে যায় অজড়িত ব্যবধান

নিজে-নিজে কথা বলি। দূর থেকে সূর ভেসে আসে।
এ ভাবেই কাছে থাকি। কাছে আসি। খুব কাছাকাছি
যতখানি দূর হলে গায়ে-লাগা ভালবাসাবাসি
দূরে দূরে ছুঁয়ে থাকে দুজনার ঠোঁট… স্পর্শকাতর

এত একা। একা একা। তবুও একাকী হব না…
দূরে থাকো। বহু দূর ব্যবধান। ভাল থাকো
শুধু আরও ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকো
মাথা রাখি কোলে। ছুঁয়ে দাও দূর

খোলা জানালায়, চারধারে ভেসে যায়, ভেসে আসে
.                                                  একতারা সুর।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10 + nineteen =

Recent Posts

কাজী তানভীর হোসেন

চেতনার বিবর্তন ও ঈশ্বরের নৃবিজ্ঞান

মানুষের অজ্ঞানতা ও ভুলের গর্ভেই ঈশ্বরের জন্ম হয়েছিল; আর মানুষের জ্ঞান ও সভ্যতার ঐতিহাসিক অগ্রগতিই একদিন ঈশ্বরের কবরে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেবে। জ্ঞানতাত্ত্বিক আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান তাত্ত্বিকভাবে বিনাশ করবে অলৌকিক সৃষ্টিকর্তার ধারণা, আর সম্পদের সুষম বণ্টন ও সাম্যবাদ (Communism) বিলুপ্ত করবে প্রাচীন টোটেমীয় কুসংস্কারকে। একদিন ধর্মের এই অন্ধ খোলস ভেদ করে স্থান করে নেবে উচ্চতর গণিত, আধুনিক সৃষ্টিতত্ত্ব এবং বিজ্ঞানসম্মত মানবিক কর্তব্যবোধ।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

ব্রিটিশ ছোটগল্প

আমি আগে থেকেই আমেরিকার পাখি বইটি সম্পর্কে জানতাম, কিন্তু কখনও বইটির সঙ্গে তেমনভাবে সময় কাটাইনি। ঠিক যেভাবে কেউ নদীর ধারে বসে সময় কাটায়। বাবার হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে থাকতে থাকতে আমি যেন ধৈর্যের অর্থ শিখে নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করতে শিখেছিলাম। এডি ঠিকই বলেছিল— আমিও মাছ ধরতে যেতে চাইছিলাম। জলের ধারে বসে থাকতে চাইছিলাম। কিন্তু বাবাকে দেখতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো সম্ভব হয়নি। তাই আমি অডুবন-এর সরোবরসম বইয়ে আমার জাল ফেললাম।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »