Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্: বাংলা ভাষা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ

বাংলা ভাষার জন্য লড়াই করে ভাষাশহিদ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার ও সফিউর। বরকত ও জব্বার ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। রফিক ছিলেন বাদামতলী কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের ছেলে। এঁরা তিনজন নিহত হন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে মারা যান রিকশাচালক সালাম এবং হাইকোর্টের কর্মচারী সফিউর রহমান। এছাড়া আরও অনেক মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। গোটা বিশ্বেই গভীর শ্রদ্ধা ও যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে এই দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। মাতৃভাষার জন্য রক্ত ঝরানো অমর একুশ আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছে এবং সেইসঙ্গে সুদূরপ্রসারী অনুপ্রেরণার সঞ্চার করেছে। যার ফলস্বরূপ একুশের রক্তাক্ত স্মৃতি নিয়ে অসংখ্য কবিতা ও গানের সৃষ্টি হয়েছে!

বাংলা ভাষার কবিরা চিরদিনের নিজের মাতৃভাষা বাংলা নিয়ে গর্ব করে কবিতা লিখেছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে সুমিষ্ট ভাষাগুলির মধ্যে বাংলা ভাষা অন্যতম। তাই কবি রামনিধি গুপ্ত ‘নানান দেশে নানান ভাষা’ কবিতায় লিখেছিলেন—
“নানান্ দেশে নানান্ ভাসা (ভাষা)
বিনে স্বদেশীয় ভাসে পূরে কি আশা?
কত নদী সরোবর,
কি বা ফল চাতকীর।
ধরাজল বিনে কভু ঘুচে কি ত্রিষা (তৃষা)?”

আর মহাকবি কায়কোবাদ ‘বঙ্গভূমি ও বঙ্গভাষা’ কবিতায় লিখেছেন—
“বাংলা আমার মাতৃভাষা
বাংলা জন্মভূমি।
গঙ্গা পদ্মা যাচ্ছে ব’য়ে,
যাহার চরণ চুমি।
ব্রহ্মপুত্র গেয়ে বেড়ায়,
যাহার পূণ্য-গাথা!
সেই-সে আমার জন্মভূমি,
সেই সে আমার মাতা!

আমার মায়ের সবুজ আঁচল
মাঠে খেলায় দুল!
আমার মায়ের ফুল-বাগানে,
ফুটছে কতই ফুল!
শত শত কবি যাহার
গেয়ে গেছে গাথা!
সেই-সে আমার জন্মভূমি
সেই-সে আমার মাতা!

আমার মায়ের গোলা ছিল,
ধন ধান্যে ভরা!
ছিল না তার অভাব কিছু,
সুখে ছিলাম মোরা!
বাংলা মায়ের স্নিগ্ধ কোলে,
ঘুমিয়ে রব আমি!
বাংলা আমার মাতৃভাষা
বাংলা জন্মভূমি!”

আবার কবি অতুলপ্রসাদ সেন ‘বাংলা ভাষা’ নিয়ে গর্ব করে বলেছেন, এই ভাষার মধ্যেই শান্তি ও ভালবাসা লুকিয়ে রয়েছে—
“মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা!
তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালবাসা!
কি যাদু বাংলা গানে!— গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে,
এমন কোথা আর আছে গো!
গেয়ে গান নাচে বাউল, গান গেয়ে ধান কাটে চাষা।।
ঐ ভাষাতেই নিতাই গোরা, আনল দেশে ভক্তি-ধারা,
মরি হায়, হায় রে!
আছে কই এমন ভাষা, এমন দুঃখ-শ্রান্তি-নাশা!
বিদ্যাপতি, চণ্ডী, গোবিন, হেম, মধু, বঙ্কিম, নবীন—
আরও কত মধুপ গো!
ঐ ফুলেরি মধুর রসে, বাঁধলো সুখে মধুর বাসা।।
বাজিয়ে রবি তোমার বীণে, আনলো মালা জগৎ জিনে-
গরব কোথায় রাখি গো!
তোমার চরণ-তীর্থে আজি, জগৎ করে যাওয়া-আসা
ওই ভাষাতেই প্রথম বোলে, ডাকনু মায়ে ‘মা’, ‘মা’ বলে;
ওই ভাষাতেই বলবো ‘হরি’, সাঙ্গ হলে কাঁদা-হাসা।।”

ভাষাতাত্ত্বিক এবং জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাংলা ভাষার মযার্দা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বুদ্ধিদীপ্ত প্রত্যয়ে পথিকৃৎ বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা পালন করেছেন। ভাষা আন্দোলনের মনস্তাত্ত্বিক পর্বে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা ও লেখনির শক্তির বিরাট প্রভাব ছিল। তাঁর লেখায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার দাবির পক্ষে জ্ঞানগর্ভ যুক্তিসমূহ ভাষা আন্দোলনের কর্মীদের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। মাতৃভাষা নিয়ে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংকটকালীন সময়ে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে যখন বাংলা-উর্দুর দ্বন্দ্ব নিয়ে উত্তুঙ্গ ঝড় ওঠে তখন তাঁকে বাঙালি জাতিসত্তায় বিশ্বাসী হতে কোনও মানসিক সংকটে ভুগতে দেখা যায়নি। তিনি মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমিকে পরমশ্রদ্ধেয় ভাবতেন।

ঢাকার কার্জন হলে একটি সাহিত্য সম্মেলনের (২৩-২৪ এপ্রিল ১৯৫৪) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (ডানদিকে)। বাঁদিকে ড. কাজী মোতাহার হোসেন।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৭টি ভাষা জানতেন। ভাষা আন্দোলনের মনস্তাত্ত্বিক পর্যায়ে তিনি কলম-সৈনিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ‘দি উইকলি’, ‘কমরেড’, ‘দৈনিক আজাদ’ প্রভৃতি পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে যুক্তিনিষ্ঠ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। প্রাদেশিক রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি প্রথম উচ্চারণ করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। সুতরাং তিনিই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ একথা বললে অত্যুক্তি হয় না। যে বাংলা ভাষার কারণেই বাঙালি জাতির বাঙালিত্ব একটি সংজ্ঞাযোগ্য রূপ লাভ করেছে, সেই বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করতে অনেক বাধা-বিপত্তি ও লড়াই-সংগ্রামের সম্মুখীন হতে হয়েছে। বাঙালির প্রত্যয় ও পরিচয় ভাষাভিত্তিক ও আত্মরক্ষামূলক। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন সেই আত্মপরিচয় রক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বাংলাদেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব কতখানি ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই সত্যটি অনুধাবন করার ক্ষেত্রে যাঁদের কৃতিত্ব সর্বাগ্রে তাঁদের মধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ অন্যতম।

প্রকৃতপক্ষে একটি আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের উপযুক্ত বিকাশের জন্য মাতৃভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও শিক্ষার বাহন হিসেবে মাতৃভাষার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যম্ভাবী। বাংলা ভাষার বিকাশ পর্বের প্রতিবন্ধতাগুলো সমাজ-কাল-পাত্রভেদে গভীর অন্তর্দৃষ্টির সাথে পর্যবেক্ষণ করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। উনিশ শতক পর্যন্ত বাঙালি মুসলমানের একটি শিক্ষিত ও উচ্চ শ্রেণি ফারসির মোহে মোহগ্রস্ত ছিলেন। বাংলা ভাষাকে তাঁরা হিন্দুয়ানী ও কুফরী ভাষা মনে করতেন। সাধারণ্যে আলাপচারিতায় বাংলার ব্যবহার করলেও পারিবারিক ভাষা ছিল ফারসি-উর্দু। ধর্মশাস্ত্র বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে অনেক মুসলমান কবি-সাহিত্যিককে জবাবদিহি করতে হয়েছে। অভিজাত মুসলমানদের পাশাপাশি অভিজাত ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজেও বাংলার চর্চাকে ঘৃণার চোখে দেখা হত। বাংলা ভাষাকে ‘যাবনিক শব্দ ও ম্লেচ্ছস্বর’ বলে তাঁরা ঘৃণা করতেন। কৃত্তিবাস ও কাশীদাসকে ‘সর্ব্বনেশে’ অপবাদও সহ্য করতে হয়েছে, কেবল বাংলা চর্চা চালু রাখার জন্য। সুতরাং মুসলমানদের আশরাফ শ্রেণি ও তথাকথিত হিন্দুদের ব্রাহ্মণ শ্রেণি বাংলা ভাষার মুক্তি প্রয়াসকে বাধাগ্রস্ত করেছেন, ইতিহাসে এটাই নির্মম সত্য।

সপুত্র ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।

১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরের পূর্বে লেখনী ও মৌখিক বিতর্ক ছাড়া বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে সাংগঠনিক কোনও উদ্যোগ গৃহীত হয়নি। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বিকাল ৪টায় তৎকালীন সরকারি ইন্টারমিডিয়েট কলেজের (বর্তমান ঢাকা কলেজ) ছাত্রাবাস ‘নুপূর ভিলায়’ অনুষ্ঠিত ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও উর্দু’ শীর্ষক ঘরোয়া সেমিনারে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সভাপতিত্ব করেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সভাসমিতিতে ও মিলাদ-মাহফিলে সুযোগ পেলেই বাংলা ভাষার পক্ষে যুক্তিগ্রাহ্য বক্তব্য উপস্থাপন করতে থাকেন। ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে তিনিই প্রথম উর্দুর পরিবর্তে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিক দাবি জানান। বাংলা হরফকে আরবি বা উর্দুর ন্যায় রোমান হরফে লেখার ষড়যন্ত্রও সুদীর্ঘকালের। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ অত্যন্ত সচেতনভাবে এ উদ্যোগকে প্রতিহত করেন। একে একটি সর্বনাশা উদ্যোগ উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন— ‘এতে পূর্ব পাকিস্তানের জ্ঞানের চর্চার গতিকে রুদ্ধ করে দেবে এবং হয়তো এতে পাকিস্তানের ভিত্তিমূল ধ্বংস হয়ে পড়বে।’

গণতন্ত্রের শর্ত মোতাবেক তাঁর মতে বাংলাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়ার দাবি রাখে। তাঁর কাছে ভাষার ক্ষেত্রে গোঁড়ামি বা ছুৎমার্গের কোনও স্থান ছিল না। যাঁরা জবরদস্তি করে পাকিস্তানের ওপর উর্দুকে চাপিয়ে দিতে চাইলেন তাঁদের তিনি পাকিস্তানের দুশমন বলেই ক্ষান্ত হননি, ব্যক্তিগতভাবে তিনি বিদ্রোহের হুঙ্কার দিয়েছিলেন। বাংলা ভাষাকে বহু গুণী ও জ্ঞানী ব্যক্তি বিভিন্নভাবে সেবা করেছেন। কিন্তু তাঁর মত এই ভাষার সম্মানরক্ষার জন্য মরণপণ সংগ্রামের কথা আর কেউ ভেবেছেন বলে মনে হয় না। কোনওরূপ রাজনৈতিক অভিলাষ পোষণ না করে এবং রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না হয়েও জাতির সেবায় এমন নেতৃত্বের দৃষ্টান্তেও তিনি অদ্বিতীয়। সে কারণেই হয়তো তাঁকে ভাষার জন্য মিছিলের অগ্রভাগে থেকে তরুণ নেতৃত্বের বোঝা কাঁধে নিতে কুণ্ঠিত হতে দেখা যায়নি।

Advertisement
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৭টি ভাষা জানতেন।

১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রখ্যাত ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন’-এর উদ্বোধনী ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোনও আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা। প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ দিয়েছেন যে, তা মালা তিলক টিকিতে কিংবা টুপি লুঙ্গি দাড়িতে ঢাকবার জো-টি নেই।’ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার ১৪৪ ধারা ভঙ্গের দৃঢ় প্রত্যয়ের স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। সাঁজোয়া পুলিশ কর্ডন করে দাঁড়িয়ে আছে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র চোখেমুখে উদ্বেগের ছায়া। পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপে ছত্রভঙ্গ ছাত্র-জনতা।

মিছিলে অংশ নিতে আসা ছোট ছোট শিশু-কিশোররা অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ মেডিকেল কলেজের পার্শ্ববর্তী দেয়াল ভেঙে তাদের নিরাপদে নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। পুলিশ টের পাওয়ার আগেই ঘটনাটি ঘটে গেল। বেলা তিনটার দিকে মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহিদদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে রাজপথ। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, প্রফেসর আয়ার-সহ হাসপাতালে হতাহতদের দেখতে আসেন। এই বর্বরোচিত নৃশংসতার প্রতিবাদস্বরূপ তিনি তাঁর কালো আচকান কেটে প্রথম কালো ব্যাজ ধারণ করলেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা জেলা শিক্ষক সম্মেলনে একুশের হত্যাযজ্ঞ ও হতাহতের প্রসঙ্গ টেনে বলেন— ‘ছাত্ররা এসব ব্যাপারে জড়িত আমরা সে সম্পর্কে নীরব থাকতে পারি না। আমরা আশা করি, একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির দ্বারা এই ঘটনা সম্পর্কে তদন্তের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

প্রাদেশিক রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি প্রথম উচ্চারণ করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঙ্গে বাংলা ভাষার উন্নয়নের বিষয়টি সংযুক্ত ছিল। বাংলা ভাষার উন্নয়নের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রথম স্বপ্নপুরুষ ছিলেন। তিনি সর্বজনীন শিক্ষার প্রয়োনীয়তায় মাতৃভাষাকে উপযুক্ত বাহন মনে করতেন। বিদেশি ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চাকে তিনি সৃষ্টিছাড়া প্রথা ভাবতেন। তাই বাংলা কলেজ প্রতিষ্ঠায় তাঁর উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথাও ভাবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতন্ত্র বাংলা বিভাগ তাঁরই হাতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বাংলা বানানের জটিলতা ও অনিয়ম নিরসনে তাঁর সুচিন্তিত মতামতটিও যুক্তিযুক্ত ছিল। বাংলা ভাষায় ও বর্ণমালায় এমন বহু বিষয় বর্তমান যা শুধু অবৈজ্ঞানিকই নয়— অনাবশ্যক ও দুর্বোধ্যও বটে। তিনি বাংলা সন তারিখের অস্থিরতা ও পরিবর্তনমান চরিত্রের জন্য সংশোধন ও যুগোপযোগী করার সুপরিশও করেন।

বাংলা ভাষার নানা দিক থেকে সেবার দৃষ্টান্ত তাঁর ক্ষেত্রে বিরল। বাংলা ভাষার জন্য তাঁর নানামুখী অবদান তাঁকে বাংলা ভাষাভাষী জনগণের কাছে এক মহৎ চরিত্র দান করেছে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ভাষাগত বিবর্তন ও বৈয়াকরণিক লক্ষণাদি বিশ্লেষণ করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, বাংলা ভাষার জন্ম মাগধী প্রাকৃত ও মাগধ অপভ্রংশ থেকে নয়, বরং প্রাকৃত স্তরে গৌড়ী প্রাকৃত নামে যে ভাষা প্রচলিত ছিল, সে গৌড়ী প্রাকৃত থেকে গৌড় অপভ্রংশ ভাষার জন্ম এবং তা থেকে কালক্রমে বঙ্গকামরূপী ভাষার উদ্ভব ঘটে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র এ মত প্রায় সকলেই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন। বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে তিনি বলেছেন— ‘বাংলা এবং পাক-ভারতীয় অন্যান্য আধুনিক ভাষা মূলত আদিম প্রাকৃত থেকে এসেছে, সংস্কৃত থেকে নয়। বাংলা ও উর্দু ভাষায় এমন শব্দের প্রাচুর্য রয়েছে যাদের মূল সংস্কৃত নয়!’

একটি আধুনিক জাতি রাষ্ট্রের উপযুক্ত বিকাশের জন্যই তিনি বাংলা ভাষার এমন সেবক হিসেবে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। মাতৃভাষার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধকে বিরোধীরা হিন্দুঘেঁষা মনোভাব বলে কটূক্তি করেছেন। বহু ভাষাবিদ, পণ্ডিত ও প্রাচ্যে অন্যতম সেরা ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ভারতীয় উপমহাদেশের একজন স্মরণীয় বাঙালি ব্যক্তিত্ব। তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অবিভক্ত চব্বিশ পরগনা জেলার পেয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর সত্যকথনের সাহস ও তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চক্ষুকে রক্তপিপাসু করেছে। কিন্তু এই অশীতিপর বৃদ্ধ সংগ্রামীকে থামানো সম্ভব হয়নি। তিনি মাথা উঁচু করে বুদ্ধিজীবী-কবি-সাহিত্যিকদের ও সংগ্রামী ভাষাসৈনিক-যোদ্ধাদের পথিকৃৎ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এ কথা বলাই বাহুল্য ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে তাঁর অবদানের ঋণ অপরিশোধ্য। তাঁর গবেষণার ফলে প্রমাণিত হয়েছে যে, বাংলাভাষা ও সাহিত্যের নির্মাতা হিন্দুও নয় মুসলমানও নয়— বৌদ্ধতান্ত্রিক সম্প্রদায়। অবশ্য রূপে-রসে একে সজীব করেছেন মুসলিম আমির-উমরাহরা। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ই প্রমাণ করেছেন সংস্কৃত থেকে নয়, বাংলাভাষার উদ্ভব হয়েছে ‘গৌড়ী প্রাকৃত’ থেকে। যেমন বাংলায় ‘তুমি ঘোড়া দেখ’ গৌড়ীতে হবে ‘তুম্হে ঘোড়াঅংদেক খহ’। শহীদুল্লাহ্ দেখিয়েছেন সংস্কৃতিতে ‘ঘোড়া’ শব্দ নেই। আছে কেবল ‘অশ্ব’। গৌড়ী প্রকৃত (পালিভাষায়) ‘ঘোটক শব্দ পাওয়া যায়’ ঘোড়া সেখান থেকেই বাংলাভাষায় এসেছে। নেপালের নেওয়াররা মহাযান বৌদ্ধ। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বৌদ্ধদের কাছ থেকে ১৯১৬ সালে কতকগুলো পুঁথি সংগ্রহ করেন। ওইসব পুঁথিতে কতকগুলো বৌদ্ধ দোহা বা সঙ্গীত রয়েছে। এই সঙ্গীতগুলো এখন প্রাচীন বাংলার নিদর্শন। শহীদুল্লাহ্ ওই বৌদ্ধ গানের ওপর ডক্টর অব থিসিস করেন।

বাংলাভাষার প্রতি ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর যে আকর্ষণ তা বোঝা যায় পাকিস্তানি আমলে যখন বাংলা অক্ষরের বদলে আরবি-ফারসি অক্ষরে বাংলা লেখার কথা হয়। তখন তিনি তার বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, বাংলা অক্ষর তার নিজস্ব অক্ষর। এ উপমহাদেশের অধিকাংশ বর্ণমালারই উদ্ভব হয়েছে ব্রাহ্মী লিপি থেকে। আর ব্রাহ্মী লিপির উদ্ভব হয়েছে কোনও এক বিশেষ সেমিটিক ভাষার বর্ণমালা থেকে। তাই জন্মগতভাবে একে ইসলামী ঐতিহ্যের পরিপন্থী বলা যায় না। সবাই কমবেশি জানেন, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ বলেছেন, মাতা, মাতৃভাষা আর মাতৃভূমি প্রত্যেক মানুষের পরম শ্রদ্ধার বস্তু। ৫২-র ভাষা আন্দোলনে শহিদদের শ্রদ্ধা জানাতে এবং রাষ্ট্রভাষা একমাত্র বাংলা করার প্রসঙ্গে ৫৩ সালে এক প্রবন্ধে এ কথা বলেছিলেন।

তিনি বাংলাভাষার গঠন, বৈশিষ্ট্য ও বিকাশের জন্য আজীবন সাধনা করে গেছেন। তিনি লিখেছেন, ভাষা ও সাহিত্য, বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, বাংলা সাহিত্যের কথা (২ খণ্ড), বাংলাভাষার সহজ ব্যাকরণ, আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা, দীওয়ানে হাফিজ, রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম, বিদ্যাপতি শতক ও ইসলামী বিশ্বকোষ। তিনি কোরআন শরিফের তাফসিরও করেছেন। শুদ্ধ ভাষায় কথা বলা নবী সা.-র সুন্নত। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর প্রায় সারা জীবন কেটেছে ভাষার উন্নতি এবং পাঠদান করে।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়/ চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seven + 3 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও দুই বিখ্যাত বাঙালি

কী অসাধারণ শিক্ষাই না আমরা পেতে পারি, উৎসাহিত হয়ে পারি খেলোয়াড়দের থেকে! একটি উদাহরণ: প্রথম বিশ্বকাপে সোনাজয়ী উরুগুয়ে দলে ছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। তেরো বছর বয়সে মেশিনে তাঁর ডানহাত কাটা পড়েছিল। অদম্য উৎসাহে তিনি ফুটবল খেলেছেন, জাতীয় দলে স্থান করে নিয়েছেন, আর ফাইনালে জয়সূচক গোলটিও তাঁর-ই করা! তাঁর স্বদেশবাসী তাঁকে ডাকতেন— ‘এল ডিভিনো মানকো’, অর্থাৎ একহাত-বিশিষ্ট ঈশ্বর।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »
অপরাজিতা মৈত্র

গোদাবরীর গোমুখে

গঙ্গার মর্ত্যে আগমন নিয়ে যেমন ভগীরথের গল্প, তেমনই গোদাবরীর উৎসস্থলে না এলে জানা যেত না, দক্ষিণের গঙ্গা নিয়েও আছে হাজার গল্প। যে গল্প জানাবে আজও এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময়েই কাছাকাছি আর কোনও পানীয়জল না পেয়ে কষ্ট করে হলেও এই উৎসস্থলে এসেই শীতল এই পানীয়জল নিয়ে যান নিজেদের কাজের জন্য। গঙ্গা বা অন্য নদী সে শুধু ধার্মিক আবেগের কারণে পবিত্র না, হাজার প্রাণীর ‘তৃষ্ণা’ মেটাবার জন্য সে হয়ে ওঠে ‘দেবী’ বা ‘পবিত্র’। সে পথে মিশে যায় হাজার গল্প-কষ্ট কিংবা দিনযাপনের চরম বাস্তবতা।

Read More »
রুহ

রুহের কবিতাগুচ্ছ

একই আলোকমালায় কাটিয়েছি/ বহুকাল দু’জনে…/ বলিনি কখনও।/ তারা খসা দেখেছি একসাথে, যদিও/ গোপন থেকেছে চাওয়া-পাওয়া।/ মাঝে বহুদিন, বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো/ একা… নীরবে বয়েছি যাতনা।/ আজ মিথ্যের নেই অবকাশ/ তোমাকে কি পড়েনি মনে/ কোনও মুহূর্ত বা ক্ষণে/ ভাবিনি কি একান্ত বন্ধু আমার—/ এতদিন পরে, পুনর্মিলনে বলেছ/ পাখি হতে চেয়েছিলে এ জীবনে

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

যুদ্ধ: বৈশ্বিক কসাইখানা, পুঁজির সংকট ও শ্রমের মুক্তি

অবিক্রীত পণ্যের পাহাড় যখন পুঁজির পুনরুৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন পুঁজিপতিরা তীব্র আতঙ্কে ভোগে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য তারা প্রতিযোগী পুঁজিপতির বাজার ও পণ্য ধ্বংস করতে চায়। আর এই ধ্বংসের বৈধ হাতিয়ার হিসেবে তারা রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। অর্থাৎ, উদ্বৃত্ত পণ্য এবং অতিরিক্ত শ্রমকে ধ্বংস করে পুঁজির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাই বুর্জোয়া যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য। এই শোষণের প্রক্রিয়াকে আড়াল করতে রাষ্ট্র একদল বুদ্ধিজীবী ও নীতিবিদ লালন করে, যারা কৃত্রিম ‘দেশপ্রেম’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’-এর আফিম খাইয়ে শ্রমিককে বিভ্রান্ত রাখে, যাতে তারা শোষক ও শোষিতের মধ্যকার মৌলিক শ্রেণি-পার্থক্য ভুলে যায়।

Read More »
প্রসেনজিৎ চৌধুরী

বিশ্বকাপ জৌলুসে আর্জেন্টিনা গণহত্যার বধ্যভূমি

বুয়েনস আইরেসের রিভার প্লেটের যে স্টেডিয়ামে তখন খেলা হত, তার মাত্র এক মাইল দূরে ছিল সামরিক সরকারের বন্দিশিবির নেভি স্কুল অব ম্যাকনিকস। সাংবাদিক ডেভিড কক্স ফুটবল বিশ্বকাপের খবর সংগ্রহ করতে গেছিলেন। তিনি ‘ডার্টি ওয়ার’ বইতে লিখেছিলেন, যখন স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার ম্যাচ চলত তখন ওই টর্চার সেল থেকে কান্নার শব্দ শোনা যেত। আর্জেন্টিনার ভুবনমোহিনী ফুটবলে লেগে আছে রক্ত।

Read More »