Search
Generic filters
Search
Generic filters

মোরব্বা ও তার বীরভূমী বৃত্তান্ত

ঝলকে দেখে মনে হবে যেন মিছরি। মিছরির দানার মতই স্বচ্ছ আর মিঠে। কিন্তু মুখে দিতেই নরম তুলতুলে। আর স্বাদে-গন্ধে অনন্য। এ হল আসল মোরব্বা। বীরভূম জেলার সদর শহর সিউড়ি বিখ্যাত সেই মোরব্বার খাতিরে। বাংলার বহু খ্যাতনামা মানুষ এই সিউড়ির মোরব্বার স্বাদ-গন্ধে মজেছেন। ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে দেশীয়ভাবে প্রস্তুত এই মোরব্বার রকমফেরও তৈরি হয়েছে। স্বচ্ছ, নরম এই মিষ্টিটি মূলত চালকুমড়োর টুকরো থেকে বানানো হয়। তবে অন্যান্য সবজি ও মরসুমি ফল ব্যবহার করেও চমৎকার মোরব্বা হয়ে থাকে। মোরব্বার বীরভূমী বৃত্তান্তটিও চমকপ্রদ।

ফল সংরক্ষণের পথেই মোরব্বার জন্ম। সবজি বা ফল এবং চিনি ও মশলার মিশেলেই মোরব্বা। ভারতে বিলাসী মোগল সম্রাট শাহজাহানের রসুইখানায় মোরব্বার উৎপত্তি বলে কথিত আছে। আগ্রা ছিল সম্রাট শাহজাহানের রাজধানী। সম্ভবত সেই কারণেই আগ্রা সহ উত্তর ভারতে  মোরব্বা জনপ্রিয় হয়। মোরব্বাকে উত্তর ভারতে বলে ‘পেঠা’। উত্তর ভারতে জনপ্রিয় মিষ্টিটি দেখতে সাধারণত আয়তাকার হয়। এখানে কেশর পেঠা, অঙ্গুরি পেঠা প্রভৃতি উৎকৃষ্ট মোরব্বাও পাওয়া যায়। আনাজ বা মরসুমি ফলের মূল উপাদানটি অক্ষুন্ন রেখে স্বাদ ও গন্ধে ভিন্নতা আনতে অনেক সময় এতে নারকেল বা কেওড়ার নির্যাসও ব্যবহৃত হয়। আগ্রা শহরে প্রবল লোকপ্রিয়তার কারণে এটিকে সচরাচর ‘আগ্রার পেঠা’ বলা হয়।

দক্ষিণ ককেশীয় অঞ্চলের দেশসমূহ এবং পশ্চিম, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মোরব্বা অনেককাল ধরে প্রচলিত। জানা যায়, আলেকজান্ডারের সৈন্যদলে থাকা বৈদ্যদের হাত ধরে মোরব্বার মত সংরক্ষণযোগ্য খাদ্যবস্তুটি ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বে। এটি ভারত ও পাকিস্তানে বেশ জনপ্রিয়। অনেকে বলেন, পর্তুগিজদের কাছ থেকে ভারতীয়রা মোরব্বা বানানো শিখেছেন। কিন্তু ভারতে অনেককাল ধরেই ওষুধ ও পথ‍্য হিসেবে বিশেষ ধরনের মোরব্বা প্রচলিত এবং কার্যকরী। যেমন, বেলের মোরব্বা কোষ্ঠকাঠিন্য রোগে, আমলকীর মোরব্বা মুখের রুচি ফেরাতে, হরীতকীর মোরব্বা হজমিকারক হিসেবে ব‍্যবহৃত হয়ে আসছে।

বাংলার প্রচলিত হাজার মিষ্টান্নের মধ্যে বেশ কিছু মিষ্টি স্থাননাম সহ জনমনে ঠাঁই পেয়েছে। যেমন, কলকাতার রসগোল্লা ও রসমালাই, বর্ধমানের সীতাভোগ আর মিহিদানা, কৃষ্ণনগরের সরভাজা আর সরপুরিয়া, জয়নগরের মোয়া, শক্তিগড়ের ল্যাংচা, নবদ্বীপের লাল দই, মালদার রসকদম্ব ও কানসাট, বেলিয়াতোড়ের মেচা সন্দেশ, লালবাগের ছানাবড়া, জনাই ও বেলডাঙার মনোহরা, কামারপুকুরের সাদা বোঁদে, দুই মেদিনীপুর ও হুগলির মুগের জিলিপি, ক্ষীরপাইয়ের বাবরশা, কাটোয়া, কালনা ও রানাঘাটের পান্তুয়া, বেলাকোবার চমচম, শান্তিপুরের নিকুতি, চন্দননগরের জলভরা, মুড়াগাছার ছানার জিলিপি, কোচবিহারের মণ্ডা, মাদারিহাটের কমলাভোগ ইত্যাদি। সিউড়ি নামের সঙ্গে তেমনভাবেই জড়িয়ে গিয়েছে মোরব্বার নাম।

বীরভূমের মোরব্বার জন্ম রাজনগরে। জেলা বীরভূমের একদা রাজধানী বর্তমানে ঝাড়খণ্ড লাগোয়া প্রান্তিক অঞ্চল এই রাজনগর। খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীতে রাজনগরে শাসনক্ষমতার পালাবদল ঘটে। বীরত্বের জন্য জনসাধারণের কাছে খ‍্যাতকৃত‍্য রাজনগরের ‘বীররাজা’ বসন্ত চৌধুরী নিজের পাঠান সেনাপতি ভ্রাতৃদ্বয় আসাদ খান ও জোনেদ খানের অতর্কিত আক্রমণের মুখে পড়েন। দুই ভাইয়ের সম্মিলিত হামলার বিরুদ্ধে লড়ে যান তুখোড় মল্লযোদ্ধা বসন্ত চৌধুরী। কিন্তু লড়তে লড়তে বীররাজা আসাদ খানকে নিয়ে পাশের কুয়োয় পড়ে গেলে দু’জনেরই মৃত্যু হয়। জোনেদ খানের হাত ধরে বীরভূমে শুরু হয় পাঠান রাজত্ব।

বীরভূম তখন ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ। আজকের ঝাড়খণ্ড তখন ছিল বীরভূমের অংশ। বর্তমান ঝাড়খণ্ডের বৈদ্যনাথ-দেওঘর পর্যন্ত ছিল বীরভূমের মধ্যে। আর বীরভূমের রাজধানী তখন রাজনগর। চারদিকে বেল, হরীতকী, আমলকী সহ বিভিন্ন গাছ তখন বনে। এছাড়া রাজনগরের পাঠান রাজারাও বহু ফলের গাছ লাগান। জানা যায়, জনৈক পাঠান রাজা উত্তর ভারতে ঘুরতে গিয়ে চালকুমড়োর মোরব্বা চেখে বেজায় খুশি হন। তাঁর উদ্যোগেই রাজনগরে মোরব্বা বানানোর তোড়জোড় শুরু হয়। এজন্য  মোদক সম্প্রদায়ের সুদক্ষ মিষ্টির কারিগরদেরও নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীকালে রাজনগরের কিছু কারিগর কর্মসূত্রে সিউড়িতে চলে গেলে সেখানেও শুরু হয় মোরব্বা বানানোর কাজ।

দেখা যাচ্ছে, রাজনগর থেকে মোরব্বা গেল সিউড়ি এবং সিউড়ি থেকেই মোরব্বা হল বীরভূম তথা বাংলায় বিখ্যাত। সিউড়ি বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ‘মোরব্বা’ নামের দোকানটি দীর্ঘদিন ধরে মিষ্টিরসিকদের মোরব্বা যুগিয়ে আসছে। এখানে পাশাপাশি আরও কয়েকটি দোকান রয়েছে, সেখানেও অন্যান্য মিষ্টির পাশাপাশি থরে থরে সাজানো থাকে বেল, আমলকী, হরীতকী, শতমূলীর মোরব্বা। জানা গিয়েছে, এখানকার অনেক দোকানের কারিগর আসেন বেনারস থেকে। তবে হরীতকীর মোরব্বা আলকাতরার মত কালো বলে তার চাহিদা কম। খেজুরের মোরব্বা তো আমরা অহরহ খেয়ে থাকি। হাটেবাজারে আমরা যে দলাপাকানো খেজুর দেখি, তা আদতে পিণ্ডরূপী খেজুরের মোরব্বা। তবে যিনি একবার সিউড়ির মোরব্বার স্বাদ পেয়েছেন, তিনি এই ঝুঠো মোরব্বায় সম্ভবত ভুলবেন না কখনও।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

11 − 2 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »