Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

‘চাষাভুষো’ শব্দ এবং তাচ্ছিল্যস্বরে তার ব্যবহার

বাংলাদেশের শাহজালান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ডক্টর লায়লা আশরাফুল বলছেন, ‘আমরা চাষাভুষা নই যে আমাদের যা খুশি তাই বলবে।’ প্রসঙ্গত, ওই বিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছিলেন এবং তারা অশালীন মন্তব্য করেছিলেন বলে অভিযোগ। তারই প্রতিবাদে মানববন্ধনের আয়োজন হয় এবং সেখানেই উক্ত মন্তব্যটি করেন ওই অধ্যাপক। তাঁর মন্তব্যের বিরুদ্ধে ছাত্ররা তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং অন্যান্য কলেজের অধ্যাপকরাও নানাভাবে সমালোচনা করেন। সবারই বক্তব্য ওই মন্তব্য করা ঠিক হয়নি।
সমাজমাধ্যমে ঋতুপর্ণ ঘোষের নেওয়া সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাৎকার ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাক্ষাৎকারটি আগের। দু’জনেই এখন নেই। সেখানেও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মুখে ‘চাষাভুষো’ শব্দটি ব্যবহার হতে শুনলাম। এ মন্তব্য নিয়ে কোনও প্রতিবাদ হয়েছে বলে শুনিনি। পশ্চিমবঙ্গে কোনওদিন শব্দটি নিয়ে প্রতিবাদ হতেও দেখিনি। শব্দটি যথেষ্ট ব্যবহার হয়েছে, এখনও হয় এবং সিংহভাগই শহরাঞ্চলের মানুষের মুখে। গ্রামের মানুষ মাত্রই চাষাবাদ করেন– এমন ধারণা অনেকেরই আছে। আদৌ চাষ করেন কি না ঠিক নেই। হয়তো ব্যবসা করেন বা মুদির দোকান আছে বা অন্য কোনও জীবিকা-নির্বাহ করেন কিন্তু গ্রামের মানুষের সাথে মতান্তর বা বিরূপ কিছু হলেই কিছু শহুরে মানুষ বলেন, ‘ওসব চাষাভুষো মানুষ, বুঝবে কী করে!’
আমি গ্রামের মানুষ। এখনও গ্রামেই থাকি। কৃষকের ছেলে। নিজেকেও চাষাবাদ দেখতে হয়। ফলত কানে বাধে। শুনি। খারাপ লাগে, আবার ভাবি, সত্যিই তো ‘চাষাভুষো’ মানুষ কিন্তু তাচ্ছিল্যার্থে ব্যবহারটা নেওয়া যায় না। কৃষকের গুরুত্ব কি ওরা বোঝেন না? ‘চাষাভুষো’ উচ্চারণ করতে যে শক্তি লাগে, সেটার জোগান দেন ওই ‘চাষাভুষো’ মানুষগুলোই। কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষিকাজ দেশের শিকড়। কৃষক অন্নদাতা। অন্ন ব্রহ্ম।
দেশের শিকড়কে যারা তাচ্ছিল্য করেন তারা লেখাপড়া জানলেও অশিক্ষিত, অজ্ঞ, ভিতরের সুপ্ত অহংবোধ আছে বলেই আর এক শ্রেণির মানুষকে এমন নজরে দেখেন।
কিন্তু শহুরে মানুষগুলোই বা গ্রামের মানুষকে এভাবে বলেন কেন? ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ করতে ওই শব্দ ব্যবহার করেন কেন? শব্দটির মধ্যে কী আছে?
‘চাষাভুষো’ শব্দটি নিয়ে google-এর শরণাপন্ন হলাম। সেখানে যা মানে করেছে, বুঝতে অসুবিধা হল না, কেন শহরের মানুষ এমন দৃষ্টিতে কৃষককে দেখেন! সেই আভিধানিক অর্থগুলো দেখে নিই:
বাংলায় অর্থ–

‘চাষাভুষো’ শব্দটি কোনও অঞ্চলে চাষাভুষাও বলে। এর পূর্ববর্তী শব্দ চাষাড়ে এবং পরবর্তী শব্দ চাষী। ‘চাষা’ শব্দের বাংলা অর্থ– কৃষক, কর্ষক, ভূমি কর্ষণকারী ব্যক্তি, মূর্খ, অশিক্ষিত, অমার্জিত লোক, অসভ্য, গ্রাম্য গোঁয়ার, স্থূল রকম চড়া বা উগ্র।

এবার ইংরেজিতে দেখে নিই–

a plughman, a husbandman, a cultivator, a farmer, a rude or vulgar person, a boor, a clodhopper, uncultured, uneducated, obstinate, rustic.
চাষাভুষো– poor rustin people living by agriculture, uncultured or uneducated rustin people.
গেঁয়ো চাষা– a clodhopper, a rustic.

ভাবুন, যাঁরা অভিধান লিখেছেন, তাঁদের দেখার চোখ! যারা অন্ন জোগান, যারা দেশের প্রাণভোমরা, তাঁদেরই যদি এই দৃষ্টিতে দেখা হয়, তবে দেশ আগামী একশো বছরেও এগোবে না।
প্রাসঙ্গিক হিসেবে এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা যাক–
মাঠের সঙ্গে সংযোগ থাকার সুবাদে কি না জানি না হঠাৎই একদিন মাথায় এল মাঠ নিয়ে, কৃষি-জীবন, মাঠ-জীবন নিয়ে গল্প লিখেছেন কারা? সেগুলো নিয়ে একটা সংকলন করলে কেমন হয়? ‘মাঠ মানুষের গল্প’ গ্রন্থের নাম ভাবলাম। শুরু হল গল্পের খোঁজ। আশ্চর্যজনকভাবে, প্রাতঃস্মরণীয় প্রথম শ্রেণির গল্পকারদের সরাসরি কৃষক-জীবন নিয়ে কোনও গল্প নেই! যে রবীন্দ্রনাথ লেখেন ‘আমরা চাষ করি আনন্দে’ কবিতা, তাঁরও একটি গল্প পেলাম না! শরৎচন্দ্রও লেখেননি! আরও বহু লেখকের গল্প খুঁজেছি। পাইনি। নানা জনের কাছে জানতে চেয়েছি, তাঁরা মাথা উঁচু করে ভেবেছেন, বিশেষ কিছু বলতে পারেননি গল্প নিয়ে। চিন্তাভাবনার মানুষ, আমার স্যার চিরঞ্জিৎ ঘোষ মহাশয় প্রচুর পড়াশোনা করেন। তাঁর কাছে আমার বিস্ময় গোপন করিনি। অন্নদাতারাই উপেক্ষিত ছোটগল্পে? তাঁর সাথে আলোচনার মধ্যে দিয়ে যে বিষয়টি উঠে এল– কৃষক পরিবার থেকে কোনও লেখক সেভাবে উঠে আসেননি। বিখ্যাত গল্পকাররা কৃষক-জীবন নিয়ে বিশেষ ভাবিত নন, বরং অনেক বেশি ভাবিত, শাসক যেন বিরক্ত না হয়, এমন লেখা লিখতে!
আবার দেখুন, হাল আমলের সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম লালগড়-এর মতো শাসক-টলানো আন্দোলন নিয়েও উচ্চমানের তেমন গল্প লেখা হয়নি। বর্তমানের প্রথম শ্রেণির লেখকরা কি লিখেছেন গল্প? সেভাবে নয়। শাসকের ভয়ে? নাকি কৃষক মানুষের আন্দোলনকে সেভাবে গুরুত্ব না দেওয়ার ফল?
সাহিত্য সংস্কৃতির প্রথম শ্রেণির মানুষের যদি কৃষকের প্রতি এমন দৃষ্টি থাকে, তবে অন্যরা যে ফুল ছড়ানো হাসি উপহার দেবেন না, ভাবাটা অন্যায় কিছু না।
এখানে আর একটা বিষয় উল্লেখ করব, সেটা জেনেছি সুরঞ্জনদার (সাহিত্যিক সুরঞ্জন প্রামাণিক) কাছে। বিষয়টি হল, মানুষের শরীর খারাপ করে। তার জন্য ডাক্তারখানায় যেতে হয়। ডাক্তার ওষুধ দেন রোগ সারার জন্য। আবার পাশাপাশি কৃষিজাত দ্রব্য শরীর গঠনের ও রোগ নিরাময়ের কাজে লাগে। তা হলে কেন কৃষক-উৎপাদিত শস্য ওষুধের মর্যাদা পাবে না? কৃষক অবহেলিত কেন হবেন?
যদি ধরে নেওয়া হয় অভিধান লেখার সময় কৃষকদের উদ্দেশে ব্যবহৃত শব্দগুলো সঠিক ছিল, তাও প্রশ্ন থেকে যায়, সব কৃষক কি অমন ছিলেন? অভিধানে এখনও অর্থগুলো রেখে দেওয়ার মানে কী? কেন, কোন উদ্দেশ্যে রেখে দেওয়া হয়েছে?
মানুষগুলো শুধু অন্নদানই করেন না, তারা বাংলা ভাষাটাও বাঁচিয়ে রেখেছেন। তারা বাংলা ভাষায় সব কথা বলেন। বাংলা তারিখ বলতে পারেন। বাংলা মাস ধরে ধরে জমিতে বীজরোপণ করেন। বাংলা ভাষার বাহক ওই চাষাভুষো মানুষগুলোই। আব্দুর রাজ্জাক সাহেব বলছেন, ‘বাংলা ভাষাটা বাঁচাইয়া রাখছে চাষাভুষো মুটেমজুর। এরা কথা কয় দেইখাই তো কবি কবিতা লিখতে পারে।’
বিস্তৃত ব্যাখায় না গিয়েও সহজেই বলা যায়, পরিবেশ সুস্থ রাখার মূল কারিগরও এই ‘চাষাভুষা’ মানুষগুলোই আর অন্যদিকে যারা চাষাভুষোকে তাচ্ছিল্য করেন, উগ্র গোঁয়ার ভাবেন, তারাই পৃথিবীকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছেন বেশি। বাংলা ভাষার ব্যবহার তারাই অপেক্ষাকৃত কম করেন, ইংরেজি ও হিন্দিকে প্রাধান্য দেন বেশি। উন্নত জীবনের লক্ষ্যে পরিবেশ নিয়ে ভাবেনও কম।
উষ্ণায়ন-বিরোধী কার্যকলাপের মধ্যে অন্যতম একটি হল– একটা জিনিস যত বেশি ব্যবহার হবে তত কম উৎপাদন করতে হবে। ফলে উপাদান কম লাগবে এবং কারখানা থেকে বর্জ্য নির্গত হবে কম– এই কাজটা চাষাভুষোরাই করেন। ছেঁড়া জামা পর্যন্ত ব্যবহার করে মাঠে কাজ করেন।
একটা গোষ্ঠীর উদ্দেশে কোনও শব্দ ব্যবহারের আগে নানান দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবা উচিত।
শেষ করব কার্তিক নাথ সম্পাদিত ‘চড়ুইপত্র’ পত্রিকার ‘ধান’ সংখ্যায় সুরঞ্জনদার প্রবন্ধের কিছু অংশ দিয়ে।
‘একজন কৃষকের মৃত্যু মানে একজন অন্নদাতার মৃত্যু– একজন অন্নদাতার মৃত্যু মানে আমার প্রাণদাতার মৃত্যু– আমার প্রাণদাতার মৃত্যু মানে আমার পিতা-মাতার মৃত্যুর সমান।… একজন কৃষক অন্নদাতা হিসাবে প্রাণের উপাদান যোগানদার, একজন শিক্ষক (মনের অন্ধকারে যিনি আলো জ্বালেন), একজন চিকিৎসক (যিনি সংকটাপন্ন প্রাণকে বাঁচিয়ে তোলেন)– এর সমান সামাজিক মর্যাদায় উন্নীত হোক, যাতে একজন ডাক্তারের সন্তান কৃষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে, কি– একজন ব্যবসায়ী সন্তানের ইচ্ছা অনুসারে তাকে কৃষিজীবী হিসাবে প্রতিষ্ঠা দিতে পারে।’

চিত্রণ: বাপ্পাদিত্য জানা

6 Responses

  1. আমাদের সমাজের শিক্ষিত মানুষ গুলোর কৃষক কে নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? সারাটা জীবন তাদের ব্যবহার করে চলছে, তথাকথিত শিক্ষিত বাবুরা তো তাদের মানুষ বলেই ভাবে না, আপনার কাজকে স্বাগত জানাই দাদা। আপনার গবেষণা আরো এগিয়ে চলুক, কৃষক নিয়ে আমি ও অনেক ভাবি, আমার কয়েকটি কবিতা তাদের নিয়ে আছে। আমিও চাষার ছেলে, চাষ আমাদের নাড়ীর বাঁধন। ছিঁড়তে পারি না 👍👍❤️❤️🙏🙏🙏

    1. আপনার মন্তব্য ভালো লাগলো। ভালো থাকুন।

  2. দাদা দারুন লিখেছেন। যেকোনো দেশের আয়ের বেশিরভাগ অংশ আসে কৃষি থেকে। কৃষক আছেন বলেই তো আমরা তিনবেলা খেতে পাই। এই বিষয়টি নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। কৃষকদের তাচ্ছিল্যের চোখে দেখা পাপ বলে আমি মনে করি।

    কেউ কৃষকদের নিয়ে না লিখলেও আপনি তো গল্প লিখেছেন “প্রণাম”। আপনাকেই আরো শক্ত হাতে কলম ধরতে হবে। লিখতে হবে কৃষকদের জীবন নিয়ে।

    শুভকামনা রইলো দাদা।

  3. সঠিক কথাগুলো ঠিকঠাক বলা গেছে। লেখককে অনেক অনেক ধন্যবাদ —

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty − nineteen =

Recent Posts

অরিজিৎ চক্রবর্তী

অরিজিৎ চক্রবর্তীর ছোটগল্প

ট্রমা-চিহ্নিত সেলফিগুলি অ রি জি ৎ  চ ক্র ব র্তী অজ্ঞাত পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধারকৃত দু’টি টীকা (লেখকের নাম অনুপস্থিত। পাণ্ডুলিপির শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠা বহু আগেই

Read More »
পিয়াস মজিদ

পিয়াস মজিদের কবিতা

পি য়া স  ম জি দ অনিমিখ তোমার ভেতর যত ময়ূরতা, কেকা; আমি বন থেকে তার দিকে লক্ষ করে আছি। আমার চোখের সবুজ লোকালয়ের বাকি

Read More »
স্বপনকুমার মণ্ডল

স্বপনকুমার মণ্ডলের ছোটগল্প

জিতকা স্ব প ন কু মা র  ম ণ্ড ল ১ হাটবারে বিদ্যাখাড়ির পাড়ে রাস্তা জুড়ে জমাটি ভিড়। মোরগ লড়াই চলছে। কাঁতিদার লড়াইয়ের তাগদ দেখে

Read More »
সুদীপ্ত মাজি

সুদীপ্ত মাজির কবিতা

সু দী প্ত  মা জি মেঘ জংলা হাওয়ার গন্ধে জাগা নেশার মতো উড়িয়ে দিচ্ছ ওড়না তোমার, দিদিমণি এখন কি আর তেমন সবুজ বয়স আছে কুড়িয়ে

Read More »
চম্পা রায়

চম্পা রায়ের ছোটগল্প

ডিঙি চ ম্পা  রা য় ‘ও যদু… জাল নিয়া এগাও।’ মাঝ-নদীতে কারেন্ট জাল পাতছিল কালিচরণ। যদুকে ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাঁক দিল। যদিও কালিচরণ জানে,

Read More »
হৈমন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়

হৈমন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতাগুচ্ছ

হৈ ম ন্তী  ব ন্দ্যো পা ধ্যা য় মোহনার দিকে লুম্পেন হয়েছে রাত, রাহাজানি করে নিয়ে গেছে মন জ্যোৎস্নার গভীরদেশে ঘরবাড়ি তার গাঢ় হলুদের মতো

Read More »