Search
Generic filters
Search
Generic filters

স্তন্যপানের বিকল্প শুধুমাত্র স্তন্যপানই

‘স্তন’। নিষিদ্ধ ফলের মতই ভীষণ আকর্ষক অথচ নিষিদ্ধ এক শব্দ। পুরুষের কল্পনা এবং কামনার এক দুর্নিবার কেন্দ্রস্থল নারীর স্তন। শুধু পুরুষের কল্পনা কেন নারী শরীরের সৌন্দর্য, কৌমার্য্যের এক উত্তুঙ্গ প্রকাশও নারীর বুকের ওই দুটি মাংসপিণ্ড।

লো-কাট পোশাকের আড়াল থেকে উঁকি দেওয়া বিভাজিকা অথবা শরীরে আঁটসাঁট হয়ে থাকা পোশাক ছাপিয়ে উদ্ধত স্তনযুগল ঝড় তোলে অনেক পুরুষেরই বুকে। কখনও কখনও আমার-আপনার আপনজনেরাই রাস্তায় উন্নত বক্ষযুগলকে দেখে ছুড়ে দেন দুচারটে মধুবাক্যও, যা শুনে লজ্জায়, ঘৃণায় কুঁকড়ে উঠতে হয় মাঝে মাঝেই, কখনও বা রাগে ফেটে পড়তে ইচ্ছে করে।

অথচ এই ‘স্তন’ সাবকিউটেনিয়াস ফ্যাট এবং মাংসের পিণ্ড ছাড়া আর কিছু নয়। নারীশরীরের এই উল্লেখযোগ্য অঙ্গটির সৌন্দর্যায়ন ছাড়াও একটি বিশেষ কাজ আছে, সেটি হল শিশুর জন্মের পর তার খাবার (মাতৃদুগ্ধ) প্রদান করা।
আমাদের সমাজ নারীর উন্মুক্ত বুক একটিবার দেখবার জন্য ভীষণ লালায়িত, জনসমক্ষে অশ্লীল মন্তব্যেও পারদর্শী অথচ এই শহরেই মা শপিংমলে তার ক্ষুধার্ত শিশুকে জনসমক্ষে স্তন্যপান করাতে গেলে তাকে শুনতে হয় কটুবাক্য, উপদেশ দেওয়া হয় ওয়াশরুমে গিয়ে ব্রেস্ট ফিড করাতে।

যাইহোক, এবার আসি স্তন্যপানের প্রসঙ্গে। মায়ের বুকের দুধ, একটি সহজাত এবং সহজলভ্য উপাদান যার বিকল্প সে শুধু নিজেই। এখনও পর্যন্ত কোনও ইনফ্যান্ট মিল্ক সাবস্টিটিউট বুকের দুধের জায়গা নিতে পারেনি। বাচ্চার জন্মের পর তার প্ৰয়োজনীয় পুষ্টি মেটাতে মায়ের বুকের দুধ অদ্বিতীয়। WHO-র নির্দেশিকা অনুযায়ী, বাচ্চার জন্মের পর ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ বাচ্চাকে তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেবার পাশাপাশি তৈরি করে তার রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতা। ৬ মাস বয়সের পরে বুকের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য খাবার শুরু করতে হবে।

বুকের দুধ খাওয়ানোর উল্লেখযোগ্য উপকারিতাগুলোর মধ্যে যেগুলো না বললেই নয়:

১. বুকের দুধ সাশ্রয়ী, কারণ এটা মায়ের শরীরেই তৈরি হয়।
২. বাচ্চার প্রয়োজন অনুযায়ী শরীর দুধ তৈরি করে এবং তাতে সমস্ত প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ থাকে, এমনকি preterm ডেলিভারির ক্ষেত্রেও বুকের দুধ সেই বাচ্চার চাহিদা অনুযায়ীই শরীর তৈরি করে।
৩. মায়ের প্রথম দুধ অর্থাৎ শালদুধ বাচ্চার প্রথম প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে
৪. মায়ের বুকের দুধ সহজপাচ্য, যা শিশু সহজেই হজম করতে পারে।
৫. টিনড মিল্ক-এর মত তৈরি করার, জল গরম করার, বোতল বাটি গরমজলে ফোটানোর দরকার পড়ে না।
৬. ইনফেকশনের সম্ভাবনা অনেক কম থাকে।

শুধু বাচ্চা নয় মায়ের নিজের জন্যও স্তন্যপান খুব উপকারী:
১. গর্ভকালীন সময়ে শরীরে যে অতিরিক্ত ফ্যাট জমা হয় তা ঝরিয়ে শরীরকে আগের অবস্থায় আনতে সাহায্য করে।
২. শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ালে তা প্রথম কয়েকমাস গর্ভধারণ হওয়ার থেকে বাঁচায়।
৩. বাচ্চা বুকের দুধ খেলে মায়ের স্নায়ুতন্ত্র আমাদের ব্রেনকে সংকেত দেয় অক্সিটোসিন এবং প্রোল্যাকটিন ক্ষরণ করার জন্য। এই অক্সিটোসিন হরমোন জরায়ুর সংকোচনে সাহায্য করে এবং পোস্টপার্টাম হেমারেজের সম্ভাবনাকে কমায়। পোস্টপার্টাম হেমারেজ এখনও পর্যন্ত মেটারনাল ডেথ-এর সবচেয়ে বড় কারণ, এমনকি উন্নত পশ্চিমা দেশগুলিতেও।
৪. বাচ্চার সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক সুদৃঢ় করে।
৫. আমাদের দেশে মেয়েদের হওয়া ক্যানসারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যা হল ব্রেস্ট ক্যানসার এবং জরায়ুমুখের ক্যানসার। বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ালে এই দুই ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা কমে।

এই এত উপকার সত্ত্বেও আমাদের দেশের মায়েরা, বিশেষত নব্য-আধুনিক মায়েরা শারীরিক সৌন্দর্যহানির দোহাই দিয়ে অনেকেই বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ান না। তাছাড়াও বড় বড় স্বনামধন্য কর্পোরেট হাসপাতালগুলিতে কোথাও কোথাও জন্মের পরে বাচ্চাকে মায়ের কাছে না দিয়ে বেবি নার্সারি নামক আলাদা ওয়ার্ডে রাখবার ধারা এখনও বহাল তবিয়তে চলছে। সেখানে সারাদিনে দু’বার, তিনবার বা চারবার মায়েরা গিয়ে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াবেন। সব সময় সমস্ত মায়েদের পক্ষে প্রসবকালীন ধকল সামলে সেটুকুও সম্ভব হয়ে ওঠে না। এই সুযোগে চলে infant milk sunstitute-এর যথেচ্ছ ব্যবহার। এর কারণ কী তা আমাদের অজানা। হাসপাতাল পলিসির দোহাই দিয়ে কর্মীরা দায় সারেন। তাহলে সেই হাসপাতাল পলিসি কি আলাদা ওয়ার্ড-এর নামে ব্যবসায়িক লাভের হিসেব! বেবি ফুডের প্রমোশন। বুকের দুধের থেকে মিষ্টি এবং কষ্ট করে টেনে খেতে না হওয়ায় ফর্মুলা ফিডিং খাওয়ার পর সেই বাচ্চা আর বুকের দুধ খেতে চায় না। ফর্মুলা ফিড-এ বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হয়। এছাড়াও ভবিষ্যতে ওবেসিটি, ডায়াবেটিস-এর মত অসুখকে ডেকে আনে।

শিশুকে জন্মের পর ৬ মাস বয়স পর্যন্ত এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিংকে উৎসাহিত করতে WABA, WHO, UNICEF-এর মত অর্গানাইজেশন ১৯৯১ সাল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পালন করছে ‘বিশ্ব স্তন্যপান সপ্তাহ’ বা ‘World Breast Feeding Week’। সেইমত এবছরও ১ আগস্ট থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত পৃথিবীর ১২০টিরও বেশি দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব স্তন্যপান সপ্তাহ। এই বছরের ‘World Breast Feeding Week’-এর থিম ঠিক করা হয়েছে ‘Step up for breast feeding : educate and support’। গোটা পৃথিবীর সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গেও সব হাসপাতালে পুরো সপ্তাহ ধরেই বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, যাতে করে শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যেকটি শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করা যায়।

এক্ষেত্রে দায়িত্ব শুধুমাত্র সদ্য মা হওয়া নারীটির নয়। তার বাড়ির লোকজন সর্বোপরি তার জীবনসঙ্গীকেও দায়িত্ব নিতে হবে, যাতে করে তাদের বাচ্চাটি ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধই খেতে পারে। আর যে সমস্ত কর্পোরেট হাসপাতাল ‘baby friendly hospital initiative’-এর এগ্রিমেন্ট সই করার পরেও বিধি মেনে চলছে না, তাদের চিহ্নিত করে যথাযোগ্য ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন যাতে শিশুর জন্মগত অধিকার রক্ষা করা যায়।

আসুন না, নারীর স্তনযুগলকে নিয়ে ফ্যান্টাসি করবার সঙ্গে সঙ্গে আমরা এই অমূল্য অঙ্গটির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করি। কার বুকের মাপ কত, মনে মনে তা ভেবে শিহরিত হওয়া, একবার ছুঁতে চাওয়ার সুযোগ খোঁজা তো আমাদের রক্তে মিশেই আছে। তার সঙ্গে আমাদের ভবিষ্যতের শিশুটিকে সুস্থ, রোগহীন ভবিষ্যৎ উপহার দিই।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 − twelve =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »