এই মুহূর্তে, এখনই, অসীম বিস্তৃত মহাজগতে অসংখ্য ঘটনা ঘটছে একসঙ্গে। মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে এক বিশাল নক্ষত্র তার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বিস্ফোরিত হচ্ছে সুপারনোভায়। সেই বিস্ফোরণে ছড়িয়ে পড়ছে লোহা, সোনা, অক্সিজেন। তার থেকে হয়তো একদিন নতুন গ্রহ, নতুন সাগর, নতুন প্রাণ জন্মাবে। আবার এই মুহূর্তে কোথাও জন্ম নিচ্ছে একটা নতুন তারা। সে সময়েই মানবজগতে, অন্ধকার ঘরে কেউ কারও গলা টিপে ধরছে। আমাদের কোনও ধাতুর গন্ধে ভরা কারখানায় তৈরি হচ্ছে প্রাণঘাতী বোমা। কারও হাত থেকে ঠিক এখনই ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে তার শেষ সম্বল। আর তখন, আড়াইশো মানবশিশু নিচ্ছে তাদের প্রথম শ্বাস। কোথাও শিশুর কান্না থেমে যাচ্ছে হাড়সর্বস্ব বুকের হাহাকারে। আর্কটিকে কেউ আলিঙ্গন করছে মৌসুমের প্রথম তুষারপাত আর সাহারায় কেউ চোখ ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে বালুঝড়ে। এই লেখাটা শেষ করার আগেই আমার শরীরে লাখো কোষ মরে যাবে, নতুন কোষ জন্মাবে। কারও উঠোনে একটা শিশু প্রথমবার সাইকেল চালিয়ে ডগমগ করতে করতে এগিয়ে যাবে। অসীম মহাবিশ্বের কোথাও গ্রহে গ্রহে সংঘর্ষ হবে। দূরের এক অচেনা গ্রহে ‘সেলারিন’ নামক কোনও পর্বতমালা কোনও অজানা আকাশের সূর্য-রাঙা ভোরের প্রথম আলোয় রং বদলাবে। এই লেখাটা শেষ করার আগেই মানবজগতে কেউ প্রথমবার বলবে ‘ভালবাসি’, কেউ শেষবার শুনবে। কোনও রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে একজোড়া মানুষ বিদায় নেবে দীর্ঘ বিচ্ছেদের আগে।
এই সব কিছুর ভিড়ে সবচেয়ে স্পন্দিত হবে যে সত্য, তা হল মানুষের ভালবাসার ক্ষমতা।
মানুষের এই ভালবাসা, যখন গভীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্রোতে প্রবাহিত হয়, তখন তার রূপ হয় প্রেম। প্রেমের স্রোত উত্তাল ও উষ্ণ। আমার পরিপার্শ্ব জগতে আমি দেখেছি প্রেমের ক্ষেত্রে একটা ক্যাচ আছে (ক্যাচ মনে করলে ক্যাচ)। অ্যানালজিক্যালি, প্রেম হল চুলায় ধীরে ধীরে ফোটানো দুধের মতো, যত ফোটানো যায় স্বাদ তত গভীর হয়, কিন্তু সামান্য অন্যমনস্ক হলেই দুধ উথলে পুড়ে যায়। আমার-চেনা-দেখা-জানা মহলের অভিজ্ঞতায় প্রেমের প্রবাহের শেষ গন্তব্য সাধারণত তিন ধরনের, (ক) অধিকাংশ প্রেম ‘অ্যানালজিক্যালি’ পুড়ে যায়, (খ) কিছু প্রেম ধীরে ধীরে ভালবাসার প্রশস্ত সমুদ্রে মিশে জীবনের অনেকটা জুড়ে চিহ্ন রেখে যায়, (গ) খুব কম ক্ষেত্রে: প্রেম, আপাতদৃষ্টিতে দুধের মতো ঘন হয়ে, দুর্যোগ, সংকট মোকাবিলা করে দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, গাঢ়ত্ব আরও বাড়ে। যদিও এ বিরল, তবু এটুকু আমাকে স্বীকার করতেই হবে, নইলে আজকের বা ভবিষ্যতের প্রেমিক-প্রেমিকারা হাল ছেড়ে দেবেন।
প্রেমের নদীর ঘনিষ্ঠ তীর ছেড়ে এবার পা বাড়াই ভালবাসার অনন্ত সমুদ্রে। আমি প্রায়ই ভাবি, আমরা হয়তো বিশ্বাস করি আমরা ভালবাসাকে বুঝি, কিন্তু আসলে কতটা বুঝি বা জানি? মানুষ কতটা ভালবাসতে পারে?
আমাদের ভালবাসার ধারণা অনেক সময়ই তৈরি হয় অন্যকে দেখে, বই পড়ে, সাহিত্য ও চিত্রকলা থেকে, সমাজের নিয়ম-আচার, আনুষ্ঠানিকতা, সামাজিক প্রতিফলনের মাধ্যমে। কিন্তু তাতে কি ভালবাসার রূপ পুরোটা ধরা যায়?
জীবনে চলতে গিয়ে সম্পর্কের অভিজ্ঞতায়, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ আর জীবনের চলমান স্রোতে নানা মানুষের গল্প থেকে আমি ভালবাসার রূপ খুঁজতে চেয়েছি। আমি কোনও সমাজবিজ্ঞানী বা মনোবিজ্ঞানী না। আমার শিক্ষাগত প্রশিক্ষণ ও কর্মজীবন কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিজ্ঞানে। তবুও জীবনের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে মানুষ প্রকৃতির এক অমূল্য সম্পদ। সেই মানুষদের সঙ্গে মেলামেশা, তাদের গল্প শোনা এবং সময়ের প্রবাহে সম্পর্কের পরিবর্তন দেখে দেখে আমি ভালবাসাকে বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছি আজও। সেইসব বোঝা থেকে, আমি ভালবাসার কিছু রূপ আলাদা করে সাজিয়েছি একটা চার্টে। তবে এই চার্ট কোনও বিজ্ঞানভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস না। এটা বহু বছর ধরে বহু মানুষের জীবনের কাছ থেকে শেখা একটা নিজস্ব মানচিত্র, যেটা আমি এই লেখায় তুলে ধরলাম। যদিও আমি মনে করি, মানুষের অনুভব অনুভূতি কার্যকারণকে আমাদের জানা জগতের শব্দভাণ্ডার বা শ্রেণিবিন্যাস দিয়ে আদতেই পুরোটা ধারণ করা যায় না।

চার্টে উল্লিখিত ভালবাসার রূপসমূহ:
১। রোমান্টিক ভালবাসা:
(ক) স্থায়িত্ব-সহিষ্ণু স্নেহ
(খ) স্থায়িত্ব-অসহিষ্ণু স্নেহ (ডিসক্লেইমার দেখুন)
২। নন-রোমান্টিক ভালবাসা:
(ক) গৃহ-স্নেহ/ স্ব-পক্ষ স্নেহ
(খ) গোষ্ঠী স্নেহ
(গ) পারফরমেটিভ স্নেহ
(ঘ) অন্তর্ভুক্তি স্নেহ
(ঙ) অলৌকিক-অন্তর্মুখী স্নেহ
আমরা শিশুকাল থেকেই ভালবাসার কিছু নির্দিষ্ট রূপ দেখে বড় হই; বইয়ের গল্প, সিনেমা, গান, নাটক, বিজ্ঞাপন, সামাজিক আচার আমাদের চোখে একধরনের ‘চেনা ভালবাসা’-র ছবি এঁকে দেয়। সেই ছবিতে প্রায়ই থাকে নাটকীয়তা, আবেগের চরম উচ্ছ্বাস, কিছু বেদনার রূপ, এবং কিছু পূর্বনির্ধারিত সামাজিক রূপকল্প, যা আমার কাছে অনেকটা প্রচলিত বা ক্লিশে এক জগতের অংশ বলে মনে হয়। তবুও আমি স্বীকার করি, অন্তত এই ‘চেনা ভালবাসা’-র ছবি এঁকে এঁকে হলেও, মানুষ বারবার ভালবাসতেই চেষ্টা করে যায়, ভালবাসাকেই ধারণ করতে চায়।
যাইহোক, এটুকুই বলব, ভালবাসার যে রূপ মূলধারায় তেমন করে বাণিজ্যিকীকরণ হয় না, তেমন একটা রূপ আমার শ্রেণিবিন্যাসের ‘অন্তর্ভুক্তি স্নেহ’। যে মানুষেরা সেই স্নেহের ধ্বজা ধরে আলোর পথ দেখাতে পেরেছেন বা পারছেন, আমরা তাদের কমবেশি ‘মহামানব’ বলে থাকি। অথচ এটাই মানুষের ভেতরের প্রাকৃতিক ক্ষমতা, মানুষের এই ক্ষমতা টিকে থাকে সভ্যতার বহুস্তরের রংচঙে পরতের অনেক গভীরে। মানুষ সেকথা টেরই পায় না। এই ক্ষমতা উপলব্ধি করানোর জন্য অগণিত অভিজ্ঞতা, গল্প, শিক্ষা, ঘাত-প্রতিঘাত ও অনুপ্রেরণার প্রয়োজন হয়। হয়তো সভ্যতার প্রতিযোগিতা, বিভাজন আর নিজস্ব প্রয়োজনের বলয়ের তলানিতে চাপা পড়ে গেছে সেই ক্ষমতা। তবুও আমি বিশ্বাস করি, ভালবাসার এই প্রাচীন ও মৌলিক রূপ আমাদের ভেতরে নিঃশব্দে জেগে থাকে; তাকে চিনে নেওয়াই আসলে মানুষের দীর্ঘ, অন্তহীন যাত্রাপথের এক অনিবার্য অধ্যায়। তবে সবাই যে তা চিনতে পারবেই এমনও নয়, হয় অনেকে অজান্তেই তার সেই রূপ অবজ্ঞা করে পাশ কেটে যায়, বা এ মহাজগৎ তার সব পর্দা সবার সামনে তোলে না…
***
Disclaimer:
আমার শ্রেণিবিন্যাস বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি নয়। এটি বছরের পর বছর চেনা-জানা মানুষ এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে গড়ে ওঠা। কিছু কিছু সম্পর্ক ও ভালবাসার পর্যবেক্ষণ খুব কাছ থেকে করার সুযোগ পেয়েছি। নির্দিষ্ট বছর সংখ্যা বলা কঠিন, তবে বলা যায় এটি প্রায় দুই দশক বা তারও বেশি সময়ের পর্যবেক্ষণ ও ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণের ফল।
একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার, আমার শ্রেণিবিন্যাসে ভালবাসার একটি রূপ রয়েছে, যার নাম ‘স্থায়িত্ব-অসহিষ্ণু স্নেহ’। এই নামকরণ কোনও অবমাননার উদ্দেশ্যে নয়। এখানে যে প্রবণতার কথা বলা হচ্ছে, তা এমন এক প্রবণতা যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে একই সম্পর্ক বা আবেগীয় বন্ধনে স্থির থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। এই প্রবণতাটি সমাজে সাধারণত প্রশংসিত নয়, বরং প্রায়ই নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। কিন্তু এর শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত আছে প্রাগৈতিহাসিক মানব ইতিহাসে। আধুনিক মানুষের প্রায় তিন লক্ষ বছরের ইতিহাসের অধিকাংশ সময় আমরা ছিলাম শিকারি-সংগ্রাহক, যাযাবর ও ছোট গোষ্ঠীর অংশ। তখন সম্পর্ক, বাসস্থান, এমনকি গোষ্ঠীর সদস্যপদও ছিল অস্থির। পরিবেশ, খাদ্যের প্রাপ্যতা, সংঘাত ও বেঁচে থাকার তাগিদ আমাদের জীবনকে ক্রমাগত পরিবর্তনশীল রাখত। দীর্ঘ অতীতে দীর্ঘদিন এক স্থানে বা এক সম্পর্কে স্থির থাকার মানসিক কাঠামো তেমন গড়ে ওঠেনি। সঙ্গী নির্বাচনও এর ব্যতিক্রম ছিল না।
মানবপ্রজাতির বিকাশের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘমেয়াদি একক সম্পর্ক তখন জৈবিক, সামাজিক বা মানসিকভাবে অপরিহার্য ছিল না, বরং সন্তান লালন-পালন ও বংশবৃদ্ধির জন্য একাধিক সঙ্গীর সম্ভাবনা রাখা অনেক ক্ষেত্রে প্রজনন সাফল্যের একটি কৌশল ছিল, আর আবেগীয় বন্ধনের স্থায়িত্ব প্রায়শই নির্ভর করত তাৎক্ষণিক পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, সম্পদের প্রাচুর্য বা সংকট, এবং ব্যক্তির বেঁচে থাকার প্রয়োজনের ওপর।
তাই আজকের রোমান্টিক সম্পর্কে ‘স্থায়িত্ব-অসহিষ্ণু স্নেহ’রূপটি নৈতিক কাঠামোতে যতই অগ্রহণযোগ্য হোক না কেন, এর শিকড় আমাদের জিনগত স্মৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত, এ এক দীর্ঘ অভিযোজন প্রক্রিয়ার ফল, যা আমাদের প্রজাতিকে বহু সহস্রাব্দ ধরে টিকিয়ে রেখেছে। তবে এটি বলার উদ্দেশ্য কোনওভাবেই এ আচরণকে সমর্থন বা ন্যায্যতা দেওয়া নয়, বরঞ্চ বোঝার চেষ্টা করা যে, মানুষের কিছু প্রবণতা ও আচরণ দীর্ঘ প্রজাতিগত ইতিহাসের ফল, যা আজকের সামাজিক নিয়ম ও নৈতিকতার সঙ্গে খাপ খায় না।
আজকের সামাজিক নিয়ম আসলে দীর্ঘ মানব ইতিহাসের তুলনায় খুব সাম্প্রতিক, মানুষের অস্তিত্বের তিন শতাংশেরও কম সময় ধরে বিদ্যমান। এই বৈপরীত্য বোঝা জরুরি, নইলে আমরা ব্যক্তি-বিশেষের আচরণকে হয়তো একমাত্র ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, বা ইচ্ছাশক্তির ঘাটতি বলে ব্যাখ্যা করে ফেলতে পারি; যদিও কিছু ক্ষেত্রে তা সত্যিই ব্যক্তিগত কারণ বা ইচ্ছাশক্তির অভাব থেকেও হতে পারে।
আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার, এখানে প্রতিটি রূপ আলাদা আলাদা করে তুলে ধরা হলেও বাস্তবে একজন মানুষের মধ্যে একাধিক রূপের মিশ্রণ একসাথে থাকতে পারে, কারণ মানুষের মানবিক আবেগ ও সামাজিক সম্পর্ক জটিল বহুবিধ উপাদানের দ্বারা প্রভাবিত হয়। আমার শ্রেণিবিন্যাস কোনও শুদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন বিভাগে বিভাজিত নয়, বরং এটি বাস্তব জীবনের ভালবাসার জটিলতা ও বহুমাত্রিকতার একটি ক্ষুদ্রচিত্র।
চিত্রণ: মনিকা সাহা





