Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

উচ্চতা

ঝিনুকের বাবা বড়, অনেক বড়। ঝাড়া ছ’ফুট দু’ইঞ্চি লম্বা— ফর্সা, দোহারা চেহারা। ক্লিন শেভড, ব্যাকব্রাশ করা একমাথা ঘন চুল; চোখে বাহারি ফ্রেমের চশমা। এককথায় সত্যিকারের সুপুরুষ— হাঁ করে তাকিয়ে দেখার মত। ঝিনুকের পাড়ার, স্কুলের, টিউশনির সমস্ত জায়গার বন্ধুরাই একবাক্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, ‘ওহ্ ঝিনুক, তোর বাবা কী হ্যান্ডসাম রে! ঠিক যেন ফিল্মস্টার।’

ওদের ক্লাসের বিদীপ্তা বলে, ‘আমার তো আঙ্কেলকে দেখেই মনে হয় অক্ষয় কুমার।’

সুনীপা মুখ ঝামরে ওঠে, ‘কী যে বলিস না— তার ঠিক নেই। অক্ষয় কুমারের চেয়েও হ্যান্ডসাম আঙ্কল। আমার তো মার্লন ব্র্যান্ডোর মত লাগে।’

শুধু শারীরিক উচ্চতাই নয়, ঝিনুকের বাবার সামাজিক পদমর্যাদাও কিছু কম নয়। একটা বড় কোম্পানির এক্সিকিউটিভ অফিসার। প্রতিদিন বাবার জন্য অফিস থেকে গাড়ি আসে। ওদের নিজেদেরও পার্পল কালারের একটা দামি গাড়ি আছে যেটাতে চড়ে ওরা শপিংয়ে যায়; উইকএন্ডে কাছেপিঠে ঘুরে আসে।

উল্টোদিকে ঝিনুকের মা খুব সাধারণ একজন মহিলা— সিম্পল হাউসওয়াইফ। লম্বায় পাঁচ ফুটও নয়, গায়ের রং শ্যামলা। ঝিনুকের দাদু নাকি মায়ের কোমর ছাপানো একরাশ কালো চুলের ঢল আর লক্ষ্মীশ্রী মুখ দেখে ভারি পছন্দ করে ছেলের বউ করে এনেছিলেন। পড়াশোনাতেও মায়ের আহামরি কোনও ডিগ্রি নেই— হিস্ট্রি অনার্স নিয়ে গ্র্যাজুয়েট। একেক সময় ঝিনুকের তো মনে হয় বাবার পাশে মা একেবারেই বেমানান। গত ষোলো বছরের জীবনে বাবাও কি কখনওসখনও একই কথা ভাবেনি? হয়তো ভেবেছে আর ভেবেছে বলেই মাঝে মধ্যে মায়ের দিকে তির্যক মন্তব্য করতে ভুলে যায় না। এই তো ক’দিন আগেই ঝিনুক পড়তে পড়তে মাকে ‘জেনোসাইড’ শব্দটার মানে জিজ্ঞেস করেছিল। মা বলেছিল, ‘জানি না রে। ডিকশনারিতে দেখে নে।’

অ্যান্ড্রয়েড ফোন থাকতে আবার ইয়া মোটা ডিকশনারি ঘাঁটতে যায় নাকি কেউ? নেট অন করে সার্চ করার আগেই বাবা ইংরাজি নিউজপেপার হাতে ঘরে ঢুকে বলেছিল, ‘কী হল ঝিনুক? কী জিজ্ঞেস করছিলি?’

‘জেনোসাইড মানে কী জিজ্ঞেস করছিলাম মাকে।’

‘বলতে পারল তোর মা?’

‘না— বলল ডিকশনারি দেখতে। তুমি জানো?’

ঝিনুকের বাবা সামান্য কাঁধ শ্রাগ করে বলেছিল, ‘না জানার কী আছে? জেনোসাইড মানে হল গণহত্যা। একসঙ্গে অনেক লোককে যখন মেরে ফেলা হয় তখন সেটাকে বলে জেনোসাইড।’

ঝিনুকের মা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলে, বা রে, আমি হিস্ট্রির স্টুডেন্ট— আমি কী করে…’

মাকে থামিয়ে বাবা বলে উঠেছিল, ‘তুমি কী করে জানবে মানে? হিস্ট্রির লোক হিসাবে তোমারই তো বেশি করে জানার কথা। জালিয়ানওয়ালাবাগে জেনোসাইড হয়েছে, হিটলারের গ্যাসচেম্বারে হয়েছে— কী হিস্ট্রি পড়েছ যে এসব জানো না?’

ঝিনুক লক্ষ্য করেছিল মায়ের শ্যামলা মুখটা দ্রুত কালচে হয়ে যাচ্ছে। লজ্জা ঢাকতেই বোধহয় মা তড়িঘড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেছিল।

গতবার ঝিনুকের জন্মদিনের ড্রেস কেনা নিয়েও তো মাকে কম অপদস্থ হতে হয়নি। মাকে সঙ্গে নিয়ে ঝিনুক বিগবাজার থেকে দুটো ড্রেস কিনে এনেছিল। বাবা অফিস থেকে ফিরতেই ঝিনুক আহ্লাদে ডগমগ হয়ে ড্রেস দুটো দেখিয়েছিল। প্যাকেট থেকে খুলে ড্রেস দুটো একবার নেড়েঘেঁটে ঝিনুকের বাবা নাক সিঁটকেছিল, ‘কোত্থেকে এসব ট্র্যাশ জিনিস কিনে এনেছিস?’

ঝিনুকের আহ্লাদী মুখ মুহূর্তে থমথমে। ছায়া নেমেছিল মায়ের মুখেও। বলেছিল, ‘তোমার পছন্দ হয়নি?’

‘কী করে হবে?’ ঝিনুকের বাবার গলা থেকে একরাশ বিরক্তি ঝরে পড়েছিল, ‘এরকম পুওর চয়েস তোমাদের হয় কী করে? ঝিনুক না হয় ছোট; বোঝে না। তুমি তো সঙ্গে ছিলে। বার্থ ডে পার্টিতে রেসপেক্টেড গেস্টরা আসবে। তাদের সামনে এরকম ড্রেস পরে আমার মেয়ে কেক কাটবে? ক্যান্ডেল নেভাবে? আমার প্রেস্টিজটা থাকবে তখন? বেটার কিছু ছিল না স্টকে?’

‘অন্য রকম ছিল’, ঝিনুকের মা আমতা আমতা করে বলে, ‘কিন্তু ওগুলোর এত দাম!’

‘হ্যাং ইয়োর দাম; দামের কথা ভাবতে তোমায় কে বলেছে? টাকা নিয়ে যাওনি তুমি? কার্ডও তো ছিল!’ প্রবল বিরক্তিতে মাথা নাড়তে থাকে বাবা, ‘পেটি মিডল ক্লাস মেন্টালিটিটাকে একটু পাল্টাও পরমা— জাস্ট থিংক ডিফারেন্ট।’

যথারীতি অস্বস্তির ছায়া আরও ঘন হয়ে চেপে বসেছিল মায়ের মুখে। ঝিনুক খেয়াল করেছে মিডল ক্লাস মেন্টালিটি কথাটা বাবা প্রায়ই ব্যবহার করে। মাকে নয়তো মায়ের বাপের বাড়িকে পিঞ্চ করার জন্যই বোধহয়, কারণ কথাটা শুনলেই মায়ের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। মামার বাড়ি খুব একটা দূরে না হলেও যাতায়াত বিশেষ নেই। অথচ যে কয়েকবার মামাবাড়ি গেছে ঝিনুক— খারাপ লাগেনি মোটেই। দিদুন আছে, মামা-মামি ছাড়াও আছে ভীষণ সুইট মামাতো ভাই ঋভু। পুরনো আমলের দেড়তলা বাড়ি। সামনে ছড়ানো উঠোনে ফলন্ত পেঁপে গাছ, পেয়ারা গাছ, কলমের আমগাছ। বাড়ির পেছন দিকে একচিলতে ছবির মত নারকেল গাছ ঘেরা ছোট একটা খেলনা পুকুর। প্যাঁক প্যাঁক আওয়াজ তুলে মামাদের পোষা হাঁসদুটো প্রায় সারাদিন জলে সাঁতার কাটে। ডাহুক না পানকৌড়ি— কী যেন একটা পাখি টুপটাপ জলে ডুব মারে। হিলহিলে শরীরে দু-একটা হেলে কিংবা জলঢোঁড়া সাপ জল কেটে এগোয়। মামাবাড়ি গেলে অনেকটা সময় পুকুরপাড়ে বসেই কেটে যায় ঝিনুকের।

ঝিনুকদের স্কুলটা সি.বি.এস.ই বোর্ডের— ক্লাস নাইনেই প্রচণ্ড চাপ। সায়েন্স আর হিউম্যানিটিজ গ্রুপের আলাদা আলাদা প্রাইভেট টিউটর আছেন। এছাড়া ছুটিছাটার দিনে কিংবা সময় পেলে রাতের দিকে বাবাও যতটা সম্ভব গাইড করে। সকাল আটটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত স্কুল। বাড়ি ফিরতে দুটো, সোয়া দুটো— বিকেলে টিউশন। সন্ধেবেলা স্কুলের হোমটাস্ক সেরে যখন ওঠে তখনই ক্লান্তি এসে গ্রাস করতে চায় ঝিনুককে। মা হয়তো লক্ষ্য করে বলে, ‘তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড় ঝিনুক— রেস্ট নে।’ ঝিনুকের বাবা অমনি ফোঁস করে উঠবে, ‘কী যে বলো তার ঠিক নেই। দু’বছর পর বোর্ড এগজ্যাম দেবে। এখনও কি বাচ্চাদের মত আর্লি ডিনার সেরে শুয়ে পড়বে? রাবিশ!’

ঝিনুকের ঘুম জড়ানো চোখ দুটো দেখে মায়া হয় মায়ের। একবার শেষ চেষ্টা করে, ‘হোমটাস্ক তো সব শেষ হয়ে গেছে। টিউশনির পড়াও কমপ্লিট। না রে ঝিনুক?’

জ্বলন্ত সিগারেটের ছাইটা অ্যাশট্রেতে ঝেড়ে বাবা বলে, ‘শুধু স্কুলের পড়াটুকু কমপ্লিট করলেই হবে? অ্যাডভান্সড স্টাডিও তো করতে হবে। তার জন্য রেফারেন্স বই ফলো করতে হবে। রাত বারোটার আগে যদি স্টাডি রুমের আলো নেভাও তাহলে ফিউচারের আলোটাও নিভে যাবে— মাইন্ড ইট ঝিনুক।’

এরপরে তো আর কোনও কথা চলে না; চলেওনি কোনওদিন।

তারপর তো শুধু ঝিনুকের কেন, গোটা পৃথিবীর ভবিষ্যতের আলোই নিভে গেল। করোনার হুংকারে পুরোপুরি থমকে যাওয়া পৃথিবীটা বহুদিন কুঁকড়ে ছিল, তারপর ভয়ের খোলস ছেড়ে গুটিগুটি হাঁটতে চেষ্টা করলেও পদে পদে হোঁচট খেতে লাগল। কত নতুন নতুন পরিভাষা প্রতিদিনের জীবনচর্চায় মিশে যেতে লাগল। লোকে নিউ নর্ম্যাল শিখল, সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং শিখল, রাজনৈতিক নেতারা মানবশৃঙ্খলের প্রয়োজনীয়তা ভুলে গেল, মুখোশ আর শুধু অপরাধীদের ভূষণ হয়ে রইল না, স্যানিটাইজার হল ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। ঝিনুক শিখল অনলাইন ক্লাসের খুঁটিনাটি, বাবা শিখল ওয়ার্ক ফ্রম হোমের কায়দাকানুন। লকডাউনে খাঁচাবন্দি স্বামী আর মেয়ের মুড ভাল রাখার জন্য ঝিনুকের মাকে ইউটিউব ঘেঁটে হাজারো কিসিমের মনকাড়া খাবার বানানোর টেকনিক শিখতে হল।

স্কুল যেহেতু কবে খুলবে ঠিক নেই তাই ঝিনুকদের পরীক্ষাও এবার অনলাইনেই হবে। ব্যাপারটা নিয়ে একটু টেনশনে আছে ঝিনুক। ওদের নামী স্কুলে রেগুলার স্ট্যান্ড করা মেয়ে ঝিনুক— বিশেষত সায়েন্স গ্রুপে ও ছোট থেকেই তুখোড়। তবে এতদিন তো যে কোনও পরীক্ষাই হোক— স্কুলে গেছে, বেঞ্চে বসেছে, স্যার বা মিসরা খাতা দিয়েছেন, কোশ্চেন দিয়েছেন, ওরা লিখে খাতা সাবমিট করেছে। কিন্তু এবার? মা বলেছে, ‘ভালই তো হয়েছে ঝিনুক। কষ্ট করে আর স্কুলে যেতে হবে না। ঘরেই পড়ার টেবিলে বসে আরাম করে পরীক্ষা দিতে পারবি।’ তা হয়তো পারবে, তবু নতুন সিস্টেমের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ঝামেলাটাও তো আছে। স্কুলের মেল থেকে সিডিউলড টাইমের দশ মিনিট আগে কোশ্চেন দিয়ে দেব। ঝিনুকদের ফোনে সেই কোশ্চেন ডাউনলোড করে দেড়ঘণ্টার মধ্যে আনসার লিখে আনসার স্ক্রিপ্টের ছবি আবার আপলোড করে পাঠাতে হবে। প্রায় মাসতিনেক অনলাইনে ক্লাস করতে করতে যদিও ব্যাপারটা সড়গড় হয়ে গেছে, তবু পরীক্ষা বলে একটা চোরা টেনশন তো থাকবেই। সবচেয়ে প্রবলেম হবে যদি পেপার সাবমিট করার সময় নেটওয়ার্ক ডাউন হয়ে যায়। তবে বাবা ভরসা দিয়েছে, ‘প্রবলেম হবে না। বাড়িতে তো ওয়াইফাই আছে।’

প্রথম দু’দিন নির্ঝঞ্ঝাটে কাটলেও গোলমালটা বাধল সোশ্যাল স্টাডিজের জিওগ্রাফি পোর্শনে। দুটো শর্ট কোশ্চেন আর একটা ম্যাপ পয়েন্টিংয়ে হোঁচট খেল ঝিনুক। গোটা সিলেবাসের মধ্যে জিওগ্রাফিটাই ঝিনুকের ‘অ্যাকিলি’স হিল।’ সেখানেই গেরোটা বাধল।

জলের বোতল হাতে মা ঘরে ঢুকে ঝিনুককে কলম কামড়ে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করে, ‘কী রে? পেন চুষছিস কেন?’

‘পারছি না’, ঝিনুক মুখ থেকে পেনটা বের করে নেয়। মা এগিয়ে এসে ঝিনুকের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, ‘ঠান্ডা মাথায় ভাব। ঠিক পারবি।’

মা বেরিয়ে যাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বাবা ঢোকে, ‘পেপার সাবমিট করতে কতক্ষণ বাকি আছে?’

Advertisement

‘পনেরো মিনিট’, প্রাণপণে আনসারগুলো মনে করার চেষ্টা করে। কিন্তু না— ধারেকাছেই পৌঁছানো যাচ্ছে না। একদম ওয়াইল্ড গেস ছাড়া উপায় নেই।

‘সব আনসার লেখা হয়ে গেছে?’

‘না, না’, ঝিনুক মাথা নাড়ে, ‘দু তিনটে শর্ট কোশ্চেন পারছি না।’

‘সে কী রে! কত নম্বরের?’ বাবার গলা থেকে একরাশ উদ্বেগ ঝরে পড়ে।

‘মোট তিন নম্বর— এই যে কোশ্চেন নাম্বার থ্রির বি আর ডি আর একটা ম্যাপ পয়েন্টিং।’

‘দেখি, দেখি’, ঝিনুকের হাত থেকে ফোনটা প্রায় কেড়ে নিয়ে চোখ বোলায় বাবা, ‘এ তো জিওগ্রাফি— আমারও জানা নেই। হিস্ট্রি হলেও না হয় তোর মাকে জিজ্ঞেস করা যেত।’

‘বেশি টাইমও নেই!’ বিভ্রান্ত দেখায় ঝিনুককে।

‘দাঁড়া দেখছি— ওয়েট, ওয়েট’— ঝিনুকের বাবা বেরিয়ে যায়।

সিওর তিনটে নম্বর গেল। হাত কামড়াতে ইচ্ছে হয় ঝিনুকের। পায়েল, দেবস্মিতা, অরিজিৎ, পৌষালী— ক্লাসের অন্যান্য স্ট্যান্ড করা স্টুডেন্টরা যদি পেরে যায়? ওরা তো অনেকটা এগিয়ে যাবে! পিছিয়ে পড়বে ঝিনুক?

‘ঝিনুক, ঝিনুক’, ব্যস্ত হয়ে বাবা ঘরে ঢোকে; হাতে একটা বই, ‘এই নে— আনসারগুলো পেয়ে গেছি।’

‘কী বই নিয়ে এলে?’ ঝিনুক অবাক হয়।

‘তোর সোশ্যাল স্টাডিজের বই। খুঁজে খুঁজে বের করেছি আনসারগুলো— চটপট লিখে নে।’

কী বলছে বাবা? বই দেখে আনসার লিখবে ঝিনুক?

‘কী হল?’ বাবা তাড়া দেয়, ‘তাড়াতাড়ি লিখে সাবমিট কর। টাইম আপ হয়ে যাবে।’

ঝিনুক আমতা আমতা করে, ‘ব্-বই দেখে লিখব?’

‘হ্যাঁ লিখবি। অনলাইন পরীক্ষায় বই দেখে লেখাটা গ্রান্টেড। শুধু তুই কেন, সবাই লিখবে। কেউ তো দেখতে আসছে না।’

ফ্যালফ্যাল করে কয়েক মুহূর্ত বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে ঝিনুক। তারপর ফ্যাসফেসে গলায় বলে, ‘চুরি করে লিখব?’

বিরক্তির মাথা ঝাঁকায় বাবা, ‘ওঃ ঝিনুক! একে চুরি বলে না। ইট ইজ আ ম্যাটার অব টেকিং অপরচুনিটি— জাস্ট আ সিচুয়েশন্যাল অপরচুনিটি।’

‘একে চুরিই বলে, অন্য কিছু বলে না।’ মায়ের গলা পেয়ে ঝিনুক চমকে তাকায় দরজার দিকে। কখন ঘরে ঢুকেছে মা? এক অচেনা দৃষ্টিতে মা কয়েক পলক তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। তারপর ঝিনুককে বলল, ‘বই দেখে একটা উত্তরও লিখবি না ঝিনুক।’

‘কীসব ছেলেমানুষী সারমন্ দিচ্ছ?’ ধমকে ওঠে বাবা, ‘না লিখলে যে তিনটে নম্বর কাটা যাবে। মার্কসটা কমে যাবে না? স্ট্যান্ড করতে পারবে?’

‘পারবে না; করতে হবে না স্ট্যান্ড।’ অবিচলিত লাগে মায়ের গলা।

‘ইউ আর টকিং ননসেন্স। তোমরা কী ভাবছ? ওর ক্লাসমেটরা সবাই যুধিষ্ঠির? প্রত্যেকে বই দেখে লিখবে।’

‘যে লেখে লিখবে, কিন্তু আমার মেয়ে লিখবে না।’ চোখের দৃষ্টির মত মায়ের গলাটাও একদম অচেনা লাগে ঝিনুকের।

বাবা তখনো গজগজ করে যায়, ‘যত্তসব ফালতু…’

মা চলে যেতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়ায়, ‘কী হল? কথাটা শেষ করো— ফালতু মিডল ক্লাস মেন্টালিটি— এ কথাটাই বলবে তো? কিছু যায় আসে না তাতে। ফালতু মিডল ক্লাস মেন্টালিটি যদি আমার মেয়েকে পরীক্ষায় চুরি করতে বাধা দেয়, তাহলে ওই মেন্টালিটি নিয়েই যেন আমার মেয়ে বড় হয়ে ওঠে।’

কাঁপছে মায়ের গলা। মাথা তুলে তাকাতেই অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে যায় ঝিনুক। চার ফুট এগারো ইঞ্চির মা ক্রমশ লম্বা হচ্ছে; লম্বা হতে হতে ছ’ফুট দু ইঞ্চির বাবাকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে আর ভারি মায়াবী, নরম একটা আলোকবলয় যেন ঘিরে রেখেছে মাকে। স্বপ্ন কিংবা ম্যাজিক নয় তো! জোরে চোখ রগড়ে আর একবার তাকায় ঝিনুক। ওই তো, এখনও রয়েছে সেই আলোর আভা। আর দেরি করল না ঝিনুক। আশ্চর্য সেই আলোকবলয়কে ছোঁয়ার জন্য অনেক উঁচু হয়ে যাওয়া মায়ের দিকে ছুটে গেল।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 5 =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »