বিদ্রোহ থেকে জন্ম নেয়া প্রথম দেশ
ইতালির নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস স্পেনের রানির অর্থায়নে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দের ১৯ নভেম্বর কিউবার পুয়ের্তো রিকোতে এসে পৌঁছান। এভাবে বিশাল এক ভূখণ্ড আবিষ্কার করে ইউরোপীয়রা। প্রথমে তারা ভেবেছিল, এটি ভারতের পশ্চিম অঞ্চল। তাই নাম রেখেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। পরে তারা বুঝতে পারে এটা পৃথক আরেক ভূখণ্ড।
সপ্তদশ শতকে ফ্রান্স ও ওলন্দাজদের পরাজিত করে ব্রিটিশরা বর্তমান কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ভূমি দখল করে নেয়। ১৭৩২ খ্রিস্টাব্দে তাদের দখলকৃত ভূমিকে শাসনের সুবিধার্থে ১৩টি উপনিবেশে বিভক্ত করে। আটলান্টিকের পশ্চিম উপকূল জুড়ে সাপের লেজের মতো পাশাপাশি ছিল উপনিবেশগুলো। এসব উপনিবেশে নির্বাচিত সরকার ছিল। এরা নিজেদের মতো দেশ চালাত। কিন্তু সপ্তবর্ষী যুদ্ধের কারণে ঋণের দায়ে জর্জরিত ব্রিটেন ঋণের ভার হালকা করতে উপনিবেশগুলোতে নতুন করে কর আরোপ করে। আমেরিকা মানে যুক্তরাষ্ট্র বলতে যে বিরাট দেশ আমরা মানচিত্রে দেখি, তখনও কিন্তু এটি গড়ে উঠেনি।

ব্রিটেনের গ্রেনভিল মন্ত্রিসভা আমেরিকার উপনিবেশগুলোতে স্টাম্প বা টিকেট-দলিল ও চিনির ওপর কর আরোপ করে। ফলে সরকারি যে কোনও কাজের খরচ বেড়ে যায়। কারণ যে কোনও চুক্তি করতে হয় স্টাম্পের ওপর।
আমেরিকানরা এ কর আরোপের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। যে পার্লামেন্টে তাদের কোনও প্রতিনিধি নেই, সে পার্লামেন্ট কী করে তাদের ওপর কর আরোপ করে? ব্রিটেন যুক্তি দেখাল, এই উপনিবেশের কর্মচারী ও সৈন্যদের বেতন দেওয়ার জন্য কর সংগ্রহ করা জরুরি। আমেরিকানরা যুক্তি দেখাল, ব্রিটেন তার সাম্রাজ্য রক্ষা করার জন্য এই কর্মচারীদের বেতন দিতে বাধ্য। ব্রিটেনের পার্লামেন্টের আইন দিয়ে আমেরিকা শাসনের কোনও প্রয়োজন নেই। আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপনের সময় রাজা যে সনদ দিয়েছিলেন, সেটার আলোকে দিব্বি চলতে পারে উপনিবেশগুলো।
ইতিমধ্যে গ্রেনভিল মন্ত্রিসভার পতন হয়। নতুন রকিংহ্যাম মন্ত্রিসভা ‘ঘোষণামূলক আইন’ পাস করে স্টাম্প ট্যাক্স বাতিল করে দেয়। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে অর্থমন্ত্রী টাউনসেন্ড আমেরিকার বাইরে থেকে আমদানি করা চা, চিনি, কাগজ প্রভৃতির কর ধার্য করেন। এদিকে আমেরিকানরা ফ্রান্স থেকে ঝোলা গুড় এনে মদ ও চিনি বানাত। এই কর আরোপের কারণে ফরাসি ঝোলা গুড়ের আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। এতে আমেরিকানরা ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে।
১৭৬৭-এ টাউনশেন্ড অ্যাক্ট পাসের সঙ্গে সঙ্গে আবার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা হয় বোস্টন শহরে। বিক্ষোভ দমন করতে ১৭৭০-এ বোস্টন গণহত্যা চালানো হয়। ব্রিটিশ সরকার টাউনশেন্ডের বেশিরভাগ শুল্ক প্রত্যাহার করে। কিন্তু উপনিবেশগুলোর ওপর সংসদের এখনও কর আরোপের অধিকার আছে বোঝানোর জন্য চায়ের ওপর তিন পেনি হারে কর বসানো হয়। চা-আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ১৭৭৩-এ বোস্টন বন্দরে কয়েকজন দুঃসাহসী আমেরিকান ডার্টমাউথ জাহাজ থেকে আমদানি করা চায়ের পেটি জলে ফেলে দেন। এ ঘটনা ইতিহাসে বোস্টন চা পার্টি নামে বিখ্যাত। এ ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকার বোস্টন বন্দর বন্ধ করে দেয়। আমেরিকানদের দমনের জন্য ব্রিটিশরা ৪টি দমনমূলক আইন পাস করে।
এতে বোস্টনে আবার নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। বিক্ষোভ সামাল দিতে ব্রিটিশরা বোস্টন পোতাশ্রয় বন্ধ করে দেয়। ম্যাসাচুসেটস বে উপনিবেশে সরকারের বিশেষ ক্ষমতা বাতিল করা হয়। অন্যান্য উপনিবেশগুলো ম্যাসাচুসেটসের পাশে দাঁড়ায়। ১৭৭৪-এর শেষের দিকে ১৩টি উপনিবেশের মধ্যে ১২টি এক হয়ে একটি মহাদেশি কংগ্রেস গঠন করে। কংগ্রেসে সমবেত হয়ে রাজা তৃতীয় জর্জের কাছে তাদের অভিযোগের প্রতিকার চায়। কিন্তু ব্রিটেন তাতে কর্ণপাত করেনি। উল্টো লেক্সিংটনে ব্রিটিশ সেনারা গুলি চালালে উপনিবেশগুলি ফিলাডেলফিয়ায় দ্বিতীয় কংগ্রেসে বসে সেবছরই।
১৭৭৫-এর ১৯ এপ্রিল লেক্সিংটন এবং কনকর্ডে বিদ্রোহীদের সঙ্গে ব্রিটিশ সৈন্যদের মুখোমুখি যুদ্ধ শুরু হয়। কমান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল জর্জ ওয়াশিংটনের নবগঠিত মহাদেশীয় সেনাবাহিনী বা কন্টিনেন্টাল আর্মি ব্রিটিশ বাহিনীকে বোস্টনে অবরুদ্ধ করে ফেলে। ১৭৭৬-এর ৪ জুলাই তৃতীয় মহাদেশীয় কংগ্রেসে উপনিবেশগুলোকে মুক্ত ও স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়। দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা প্রণীত হয়। এভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দেশ স্বাধীন করার নজির পৃথিবীতে খুব একটা নেই। আরেকটা নজির হয়েছিল প্রায় দুশো বছর পর। সেটা হল বাংলাদেশ।

ব্রিটিশরা ১৭৭৬-এর গ্রীষ্মে নিউ ইয়র্ক শহর এবং এর কৌশলগত পোতাশ্রয় দখল করে। মহাদেশীয় সেনাবাহিনী ১৭৭৭-এর অক্টোবরে সারাতোগা যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে পর্যদস্তু করে। ব্রিটেনের পুরনো শত্রু ফ্রান্স তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। পরে স্পেনও ফ্রান্সের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে আমেরিকার যুদ্ধ ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।
১৭৮৩-এর ৩ সেপ্টেম্বর প্যারিসে স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটে। প্রথম রাষ্ট্রপতি হন জেনারেল জর্জ ওয়াশিংটন। তাঁকে মার্কিনিরা জাতির পিতার সম্মান দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রামে ফরাসি জনগণের উপহার হিসেবে ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’ ভাস্কর্যটি ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে উপহার দেয়া হয়েছিল। অন্য দেশের বিপ্লবীদের সহযোগিতা করতে গিয়ে ফ্রান্স নিজে বিপদে পড়ে। রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়ে।
ব্রিটিশরা চায়নি তাদের উপনিবেশে ইউরোপ থেকে আসা সেটালাররা স্থানীয় আমেরিকানদের বিরক্ত করুক। তাই তারা পশ্চিম দিকে একটি সীমান্ত রেখা টেনে দিয়েছিল। সেটি অতিক্রম করা ছিল বারণ। কিন্তু আমেরিকা স্বাধীন হওয়ার পর এ বিধিনিষেধের কোনও কার্যকারিতা ছিল না। দলে দলে সেটালাররা পশ্চিমের দিকে রওনা দেয়। ফলে নতুন নতুন ভূখণ্ড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সীমানায় ঢুকে পড়ল। চলতে থাকল একের পর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।
ফরাসি বিপ্লবের কথা পরে কখনও বলব। এই বিপ্লবের পর ক্ষমতায় আসেন জেনারেল নেপোলিয়ন। তিনি দেখলেন এমনিতে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক অবস্থা যা তা, তার ওপর এত দূরের উপনিবেশ পোষার বিপুল ব্যয় বহন অর্থহীন। ততদিনে আমেরিকার ব্রিটিশ সেটেলার নেপোলিয়নের কাছে ধর্না দিয়েছে লুজিয়ানা প্রদেশের কিছু ভূমি তাদের ভাড়া দিতে। নেপোলিয়ন ভাড়ার বদলে পুরো লুজিয়ানা প্রদেশ কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। সেটেলাররা কখনও ভাবেনি নিউ অরলিন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ফরাসিরা কাউকে দিতে রাজি হবে। কিন্তু ফ্রান্স নিজে থেকে এই বন্দর কিনে নেয়ার প্রস্তাব দিল। মাত্র ১৫ মিলিয়ন ডলার দিয়ে লুজিয়ানা ফ্রান্স থেকে কিনে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। ১৮০৩-এ ক্রয় চুক্তি সম্পাদিত হয়। আজকের যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যাঞ্চলের পুরোটা জুড়ো ছিল তখনকার লুজিয়ানা। এরপর স্পেনের কাছ থেকে ৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ফ্লোরিডা কিনে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।
সদ্য স্বাধীন দেশ মেক্সিকোর উত্তরাংশের নাম ছিল টাজাস, যা পরবর্তীতে ট্যাক্সাস হয়। এ জায়গাগুলো মূলত আমেরিকান আদিবাসীদের দখলে ছিল। এখানে মেক্সিকোরও তেমন নিয়ন্ত্রণ ছিল। মেক্সিকো সরকার পরিকল্পনা করল এই ভূমিতে যদি নবগঠিত দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সেটেলারদের থাকতে দেওয়া হয় তা হলে তারা ভাল ভূমিকর পাবে। কিন্তু হল তার বিপরীত। কিছুদিন পর এই সেটেলাররা মেক্সিকোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সে যুদ্ধ ব্যাটল অব আলামো নামে পরিচিত হয়। যুদ্ধে মেক্সিকো পরাজিত হয়। সেটেলাররা ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে টেক্সাসকে স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা করে। টেক্সাস ২৮তম রাজ্য হিসেবে যুক্ত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।
১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার কাছ থেকে আলস্কা কিনে নেয় ৭.২ মিলিয়ন ডলার দিয়ে। এভাবে যুদ্ধ, কূটনীতি ও অর্থের বিনিময়ে লেজের মতো একটা দেশ আজ এমন বিপুল আয়তন লাভ করেছে। হয়ে উঠেছে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ।
চিত্র: জন ট্রুমবুলসের আঁকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণাপত্র পাঠের চিত্র। সৌজন্যে: গুগল







