Search
Generic filters
Search
Generic filters

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

আগমনী

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

শেষবিকেলে নিউ টাউন শহরটা বেশ সুন্দর দেখায়। একটা কমলা আভা ছড়িয়ে পড়েছে আকাশে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়টা বেশ ভাল। পুজো আসছে— এই অনুভূতি মনে সর্বক্ষণ জেগে থাকে।

অ্যাপার্টমেন্টের সামনে সার্ভিস রোডের এক প্রান্তে বিজয়ার গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। পাশ থেকে মাঝে মাঝে হুস-হুস করে ছুটে যাচ্ছে সাইকেল। বিমানবন্দর লাগোয়া শহরের এই অংশটি বিজয়া আর অমিতের সব থেকে বেশি পছন্দ হয়েছিল। মহানগরের কোলাহল থেকে অনেকটা দূরে তারা সুখের ঘর বেঁধেছিল।

বিজয়া ভাবছিল, বন্ধনমুক্ত হতে বেশি সময় লাগে না। আজকাল পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে বিচ্ছেদ যেন খুব তুচ্ছ বিষয়। খুব মনে পড়ছে ওই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সে অমিতকে বলেছিল— ‘চাঁদ চাই না। তুমি তো আমাকে আকাশের কাছাকাছি এনেছ।’ আকাশের দিকে তাকিয়ে অমিত বলেছিল, ‘তুমি… পাখি হয়ে উড়ে যাবে, তাই তো?’ কথাটা শুনে খুব হেসেছিল বিজয়া। অমিতের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘আমি তো পাখি হবই। তুমি প্রেম দিয়ে আটকে রেখো… এই খাঁচায়।’

ভাবতে ভাবতেই ব্যাগ থেকে ফোনটা হাতে নেয় বিজয়া। অন্তত পাঁচ মাস অমিতের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই। এখন কেমন আছে অমিত? বিজয়ার কথা সে কি এখনও ভাবে? এতদিন পর ফোন করলে সে কী ভাববে?

শেষে ফোনটা করেই ফেলল বিজয়া। ডায়াল করেই চোখ বন্ধ করে ফেলল সে। অমিতের ফোন বেজেই চলেছে। একবার নয়, দু’বার, তিনবার। কী মনে হল, ফের লিফটের সামনে হাজির হল বিজয়া। পাঁচতলায় নিজের ফ্ল্যাটের সামনে সে হাজির হল আবার। অমিতের নম্বরে ফের ডায়াল করল বিজয়া। এবার স্পষ্ট শুনতে পেল— ফোনের রিং টোন— বিপ বিপ বিপ…। ভেসে আসছে তালাবন্ধ দরজার ওপার থেকে! বিজয়া অনুভব করল, তার কপালে, গলায় ঘাম জমেছে। নিউ টাউনে ঝুপ করে আঁধার নেমে এল।

আগে যা ঘটেছে…

কলেজ মোড়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল বিজয়া। দুপুরের দিকে সেক্টর ফাইভের থেকে নিউ টাউনমুখী বাসগুলো কোথায় পালিয়ে যায় কে জানে। হঠাৎ পিছন থেকে ডাকল ঋতুপর্ণা। বিজয়া কয়েক মুহূর্ত বিস্ময় গোপন করতে পারেনি। ঋতুর বাবা, তরুণকাকু তার অংকের মাস্টারমশাই ছিলেন। ঋতু তখন অনেক ছোট। বিজয়া একদিন শুনেছিল তরুণকাকু আর নেই! বাবাকে প্রশ্ন করে কোনও সদুত্তর সেদিন পাওয়া যায়নি। বিজয়ার খুব মনে আছে, বাবা বলেছিলেন, ‘তরুণকাকুকে ভুলে যেয়ো না। ভুলে থেকো…।’

সেদিন ঋতু কিছুতেই ছাড়ল না। টানতে টানতে বিজয়াকে সেই ভরদুপুরেই কফিশপে নিয়ে গেল। তবে সেদিন কফিশপে বিজয়া জীবনের সেরা ‘সারপ্রাইজ’-টা পেয়েছিল। ঋতুর অমিতকে সরাসরি চেনার কথা নয়। কিন্তু অমিতের ছবি কেন তার মোবাইলে তা বুঝে উঠতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লেগেছিল তার। আধ ঘণ্টা খানেক পরে উঠে দাঁড়াল বিজয়া। ঋতু ততক্ষণে অমিতের ছবি দেখিয়ে বিজয়কে একাধিক বার বলেছে, এই ছেলেটি তার বিশেষ মানুষ। প্রেম-সম্পর্কের সবে শুভসূচনা হয়েছে।

সেদিন সন্ধ্যায় অমিত-বিজয়ার জীবন দুটি আলাদা রাস্তা বেছে নিয়েছিল। পেশায় আইনজীবী বিজয়ার পক্ষে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে ডিভোর্সে অমিতকে রাজি করানো কঠিন ছিল না। কারণ, বিজয়ার যুক্তির সামনে অমিতের সওয়াল-জবাব টেকেনি। অমিত বারবার বুঝিয়েও বিজয়কে বিশ্বাস করাতে পারেনি যে, ঋতু তার অধীনে একজন শিক্ষানবিশ কর্মচারী ছাড়া আর কিছু নয়। ঋতু তাকে প্রেমের চোখে দেখেছে। সে নয়।

এরপর নিউ টাউনের ফ্ল্যাট থেকে দু’জনেই দু’দিকের পথ নেয়। বিজয়া মানিকতলায় মা’র কাছে ফিরে যায়। অমিতের খোঁজ নিতে মন চায়নি তার।

জীবন হয়তো একই রাস্তায় চলতে থাকত, যদি না ফের ঋতুর সঙ্গে বিজয়ার সেই সেক্টর ফাইভের রাস্তাতেই দেখা হত।

অমিত চাকরি হারিয়েছে— একথা সেদিন ঋতুর থেকেই জানতে পারে বিজয়া। অমিতের ব্যাপারে সে ভুল ভাবত, বিজয়ার সামনে তাও মেনে নেয় ঋতু। বিজয়ার মনে আছে সেদিন ঋতু তাকে বলেছিল, ‘অমিতকে নিয়ে আমি একটু বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। আমার বোঝা উচিত ছিল যে, অমিতের চোখে আমি নিজের জন্য সেই ভালবাসা দেখিনি। ও একজন বিবাহিত মানুষ। ওর চোখে নিজের জন্য ভালবাসা খুঁজতে গিয়ে আমি অন্যায় করেছিলাম। আমি নিজের কাছেও অপরাধী, অমিতের কাছেও অপরাধী।’

আগমনী

‘কিছু বলোনি কেন?’ অমিতের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল বিজয়া। এই হালিসহরের গঙ্গার পাড়ে প্রায় এক দশক আগে দু’জনের দেখা হয়েছিল। সদা বহমান গঙ্গা কি তা মনে রেখেছে?
আজ অমিতকে দেখে বিজয়ার মনে হল গঙ্গা যেন কয়েক মুহূর্ত থেমে গেছে। একবার পুরনো স্মৃতি খুঁজে নিতে চাইছে।
যদিও বিজয়ার সামনে যে যুবক দাঁড়িয়ে আছে, তাকে অমিত বলে চেনা সত্যি কঠিন। এ যুবক যেন খণ্ডে খণ্ডে ভেঙে গিয়েছে।
বিজয়া ভাবতে লাগল, সত্যি! কোনও এক যুবকের জীবনে তার এত বড় ভূমিকা? মক্কেলদের জন্য কেস লড়তে গিয়েও জীবনের সহজ সত্যটা কেন অনুভব করতে পারেনি বিজয়া?
‘বলে কী লাভ হত?’ প্রশ্ন করল অমিত।
‘কেন? স্ত্রী হিসাবে আমার এইটুকু জানার অধিকার নেই?’ অমিতের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিতে পারছিল না বিজয়া।
‘তোমার চোখে সেদিন অবিশ্বাসের ছবি দেখেছিলাম।’ একটু থেমে জবাব দিল অমিত।
‘সে ছবি মুছে দেওয়ার চেষ্টা করোনি কেন? তুমি চেষ্টা করলেই মুছে দিতে পারতে…।’
‘চেষ্টা করিনি…। কারণ জানতাম, তুমি একদিন আগমনী হয়ে ফিরে আসবে।’ বিজয়ার চোখে চোখ রেখে বলল অমিত।
‘বেশ তা হলে আমারও একটা শর্ত আছে।’
প্রশ্ন করতে পারল না অমিত। প্রশ্নগুলো কখন অভিমানে মিশে গঙ্গায় ভেসে গিয়েছে, টের পায়নি সে। শুধু বিজয়ার চোখে দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
‘আজ থেকে আমি বিজয়া নই। আমি তোমার আগমনী।’ অমিতের কাঁধে মাথা রাখল বিজয়া।

কাল মহালয়া। দেবী পক্ষের শুরু।

চিত্রণ: মুনির হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − five =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »