Search
Generic filters
Search
Generic filters

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

মৃত্যুফাঁদ ও বিলাবল ঠাট

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে
বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।
সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন
অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার
ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা
শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,
অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

এযাবৎ নিষ্পলক কুয়াশার রাতদিন কড়চায়
ছিল বেসামাল গরমিল, এবার আর মিলবে না রেহাই।
ওই শোনো মুহুর্মুহু পড়ছে তেহাই, পাহাড়প্রমাণ অসঙ্গতি।

তাম্রশাসনের চোরাদৃষ্টি পাকদণ্ডী ঘুরতে নারাজ
তাই বুক চিরে, ফালা করে তুলে আনা হল গহ্বর।
তার অতলে সহস্রতন্ত্রীর অন্তঃসলিলা—
অভিমান চুইয়ে পড়ছে অগোচরে।

অথচ যে নিস্তরঙ্গ জনপদ তামাদি হয়ে এতদিন টিকে ছিল
আপন খেয়ালে, আজ তাকে বিবাগী উতরাইয়ে
জলাঞ্জলি দিতে হবে সবটুকু, তেমনটাই আকাশবাণী।

তাই, চারপাশজুড়ে নাগপাশে মুড়ে ফেলা হয়েছে পাথুরেপ্রাণ
চলছে ইমারতে তাল ঠোকাঠুকি, সভ্য-ভব্য-সভ্যতায় শান।
শাল সেগুন পাইনের কবরে বাঁধা হয়েছে রঙিন মলাট
ঈগল আজ বাবুটি সেজে ভেঁজে চলেছে বিলাবল ঠাট।
অথচ চঞ্চুর কোণে লেগে আছে রক্ত জমাট!

চারদিকে মৃত্যুফাঁদ, গোল গোল কথাদের কূপ
সারে সারে যূপকাঠ গজিয়েছে যেখানে, নাগরিক জীবন
সেপথেই গড়িয়ে চলেছে যন্ত্রবৎ নিশ্চুপ।

**

শব্দকল্প

বিসর্জনের জল নিঙড়ে তুলে এনেছি তোমায়—
তুমি ব্রহ্মেরও অকাল-অতীত শব্দ।
যে কবিতাঘরখানা ভেঙে তলিয়ে গিয়েছ সেদিন
দেখো তার কালবেলাজুড়ে দাঁড়িয়ে মহাশূন্যের কাটাকুটি
আর কিছু বন্ধ্যা সহস্রাব্দ।

আজও জানি না উদ্ধত কালপুরুষের ফণায়
কতবার ফালা হয়েছে তোমার দেহ?
ক’খানা মলাটে ধরা দিয়েছ তুমি?
অথবা ক’টা গ্রন্থে পরিপূর্ণ তোমার গর্ভ।
অথচ পাতাঝরা চৈত্রের খেয়ালি কবি
আজও হা-পিত্যেস করে মরে, এখনও অতৃপ্ত তার সঙ্গম-সন্দর্ভ।

সেই ক্ষয়ে যাওয়া কাঠামোয়
আবার মেলে ধরেছি আমি খসে যাওয়া নির্মোক।
শোকস্তব্ধ অশান্ত সময়ের মলিন প্রহরে
তার বিভঙ্গ কোনও পরিণতি পাবে কিনা জানি না,
অথবা আবাহন রাগের গমক
শরীরজুড়ে প্রশান্তি ছড়াবে কিনা, তাও জানা নেই।

শুধু জানি শব্দরা জাল বোনে, মহাকালের অনুরণনে
সে ইন্দ্রজাল আবারও গড়বে অক্ষয় শব্দের বুনিয়াদ।

***

পারিজাতের ছোঁয়া

একটা পারিজাতের ছোঁয়া আমারও চাই,
যার শিশির ধোওয়া আশ্বাস আনবে নতুন সকাল,
যে রাঙা শরীরের নরম আবেশ আতুর বুকে
এঁকে দেবে দীর্ঘ প্রশ্বাসের সোহেলা।

একটা পারিজাত হোক আমার, একান্ত আমার।
যার উদার নদীতে লীন হয়ে যাবে পৃথিবীর
ছন্নছাড়া সব কাঁটাতার। আর ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না জুড়োবে
ভরা জঠরের নন্দিত কামোদে।

এমন একটা পারিজাত চাই ভীষণভাবে
আমার, আমাদের সকলের।
যার উজল স্নিগ্ধতায় শীতল হবে
অর্বুদ কুরুক্ষেত্রের শোণিত-দগ্ধ বুক।
স্তব্ধ হবে সবুজের কর্কট যন্ত্রণা।

অসম্ভব শান্তির সে পারিজাত নেমে আসুক
অস্থির পৃথিবীর বুকে, পারিজাত-সুখে
হিন্দোল কলতানে জাগুক জীবনের ছন্দ।
রন্ধ্র-রন্ধ্র বয়ে যাক পূর্ণতা, ক্ষীরসাগরের আনন্দ।

চিত্রণ: মনিকা সাহা

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

11 − 6 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »