Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

গম্ভীরার কিংবদন্তি সুফি মাস্টার: পড়েছিলেন ব্রিটিশের রোষানলেও

জন্ম মালদার ইংরেজবাজারের ফুলবাড়িতে, শেখ সফিউর রহমানের কিংবদন্তি গম্ভীরা শিল্পী ‘সুফি মাস্টার’ হয়ে ওঠা এখানেই। দেশভাগের পর চলে গেছিলেন ওপার বাংলার চাঁপাইনবাবগঞ্জে, তৈরি করেছিলেন গম্ভীরার নয়া ঘরানা। ২৬ জানুয়ারির দিন বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের সামনে গম্ভীরা পরিবেশন করেন বর্ষীয়ান সুফি মাস্টার। মালদা বা এপার বাংলা আজ মনেও রাখেনি এই গম্ভীরা শিল্পীকে।

১৮৯৪-এ ইংরেজবাজারের ফুলবাড়িতে জন্ম শেখ সফিউর রহমানের। অনেক ভাইবোনের সংসার চালাতে গিয়ে মাত্র ১১ বছর বয়সে মালদা ডাকঘরে পার্সেল প্যাকারের কাজ। পনেরো থেকেই গম্ভীরার মায়ায় জড়িয়ে পড়া। প্রথমে ফুলবাড়ির কিশোরী পণ্ডিতের দলে, তারপর নিজস্ব দল। গম্ভীরা গানের লেখক বা বাঁধনদার হিসাবে শিল্পে ও প্রতিবাদে প্রথম থেকেই অনন্য।

ব্রিটিশ সরকার চালু করল নতুন একটাকার নোট— তাতে কলাগাছের ছবি। তা নিয়েই গান বাঁধলেন সুফি মাস্টার— ‘সাহেব ধরিয়া লাঙন কলার গাছ হে/ নাচাচ্ছো বেশ ভালুক নাচ হে/ এই সোনার ভারতে, দোকানে আড়তে/ চাঁদির বিনিময়ে কাচ হে।’ হৈহৈ পড়ে গেল। পরবর্তীতে এই গান বহুবার ব্যবহৃত হবে লোকসংস্কৃতির গবেষকদের হাতে— সেই ইতিহাস সেদিন থেকেই তৈরি হল।

১৯০৫। এল বঙ্গভঙ্গের হাওয়া। সরকারি ডাকবিভাগের কিশোর কর্মীটি লিখে ফেললেন— ‘তুমি ঘুঁটের আগুন তুষের ধোঁয়া/ লাগিয়ে দিলে বঙ্গে/ আজ হাবুডুবু খায় ভারতবাসী— স্বরাজ তরঙ্গে।’ সেই গানও ঝড় তুলল। আর যায় কোথায়? যদিও গানের ভণিতায় নিজের নাম উল্লেখ করতেন না ওস্তাদ সুফি, তাও বিশেষ সূত্র ধরে ব্রিটিশ পুলিশ হানা দিল তাঁর বাড়িতে। বাজেয়াপ্ত হল গানের খাতা। বয়স অল্প বলে সতর্ক করেই ছেড়ে দিলেন সহৃদয় বাঙালি দারোগা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পুলিশ তাঁকে সহজে ছাড়েনি। সরকার-বিরোধী গান বাঁধার জন্য জেরা, অনুষ্ঠান বন্ধ করার মত পুলিশি হাঙ্গামা তাঁকে নিয়মিতভাবেই পোহাতে হয়েছে।

১৯১০-১২ থেকেই সুফি মাস্টার মালদা ও বৃহত্তর মালদার জনমানসে স্থায়ী আসন পেয়ে যান। ড. প্রদ্যোৎ ঘোষ, ড. পুষ্পজিৎ রায়, ড. ফণী পাল বা শচীকান্ত দাসের মত গম্ভীরা গবেষকরা এ বিষয়ে একমত। মালদার বাইরে থেকে বড় স্বীকৃতি এল এর পরই।

১৯১৮ সাল। পাবনায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের বার্ষিক সম্মেলন। আমন্ত্রিত হয়ে গান বাঁধলেন সুফি মাস্টার, নানা ও নাতির ভূমিকায় তাঁর দলের দুই বিশ্বস্ত শাগরেদ মহ. কুতুবুল আলম ও মহ. রাকিবুদ্দিন। গম্ভীরার আসরের পর সাহিত্য সম্মেলনে সকলের মুগ্ধতার মাঝে সুফির গলায় সোনার মেডেল পরিয়ে দিলেন সভাপতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং! গম্ভীরা নিয়ে কবিগুরুর মুগ্ধতার রেশ ছড়িয়ে রইল সম্মেলনের লিখিত কার্যবিবরণীর মধ্যে।

ওস্তাদ সুফির প্রধান খ্যাতি গীতিকার হিসাবে। ১৯২২-এ মালদার পুড়াটুলির একটি ছাপাখানা থেকে তাঁর সম্পাদনায় বেরল গম্ভীরাগীতির ঐতিহাসিকভাবে প্রথম সংকলনগ্রন্থ ‘গম্ভীরা সংগীত’। মযহারুল ইসলাম তরু তাঁর ‘হাজার বছরের গম্ভীরা’ বইতে আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, এই বইটি উদ্ধার করা গেলে গম্ভীরার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হত। হারিয়েই গেল সেই বই। জাতীয় গ্রন্থাগারে কোনওমতে সংরক্ষিত রয়েছে একটি কপি।

যেকোনও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে চটজলদি গান বাঁধার ক্ষমতা ছিল সুফি মাস্টারের। তাতে সাহিত্যগুণও থাকত যথেষ্ট পরিমাণে। মালদার প্রবীণ গম্ভীরাশিল্পী যোগেন্দ্রনাথ চৌধুরী (মটরা) এবং দেবনাথ রায় (হাবলা) তাঁদের স্মৃতিচারণে বলেছিলেন সুফি মাস্টারের শিঙাড়াপ্রীতির কথা। শিঙাড়া খেতে অসম্ভব ভালবাসতেন তিনি। কোনও এক আসরের শেষে অনুরাগীরা শিঙাড়ার মালা পরিয়ে সংবর্ধনা জানিয়েছিলেন তাদের প্রিয় শিল্পীকে। প্রত্যুত্তরে সেই শিঙাড়া নিয়েই গান বেঁধে শুনিয়েছিলেন সুফি মাস্টার।

১৯২৪-এ দেশবন্ধু ও নেতাজির মালদায় আগমনের সময় তাঁদের সামনেও গম্ভীরা পরিবেশন করেন সুফি মাস্টার। দুজনেই লিখিতভাবে সম্মাননা জানান এই গুণী শিল্পীকে। তরুণ সুভাষচন্দ্রের ভাললাগা এতটাই ছিল যে, মান্দালয় জেল থেকে ৯ নভেম্বর, ১৯২৫-এ লেখা একটি চিঠিতেও তিনি গম্ভীরার অনন্যতার উল্লেখ করেছেন।

হাতে আঁকা সুফি মাস্টারের প্রতিকৃতিটি  শশীকান্ত দাস লিখিত ‘গম্ভীরার অতীত ও বর্তমান’ গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত।

দেশভাগের সময় পরিবার নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের রহনপুর বাজার এলাকায় চলে যান তিনি। মোটামুটি ১৯৪০-এর সময় থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গম্ভীরার নতুন আঙ্গিক তৈরি হতে থাকে মূলত তাঁর হাত ধরেই। এককথায়, প্রাচীন শৈবভাবনাকেন্দ্রিক গম্ভীরায় আসে নাটকীয়তার মোচড় ও গতি। বৃদ্ধ দাদু নানা আর নাতির সংলাপের মধ্যে তীব্রভাবে উঠে আসতে থাকে সময় ও সমসাময়িক সমস্যা। সঙ্গীতের স্থান নেয় সংলাপ।

এর মধ্যেই ভারতের স্বাধীনতা লাভ। এই দু-টুকরো হয়ে স্বাধীনতা নিয়েও গান বেঁধেছেন সুফি মাস্টার। সংবিধান কার্যকর করার দিন বিশেষ আমন্ত্রণে বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের সামনে গান করার আমন্ত্রণ পেলেন সশিষ্য সুফি মাস্টার।

কী হয়েছিল সেই বিশেষ দিনে? বাংলাদেশের খ্যাতনামা নাট্যব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মমতাজউদ্দিন আহমদ ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় লিখছেন, ‘বাংলার চিরন্তন কৃষকের সাজে নানাবেশী কুতুবুল আলম এলেন মঞ্চে। পিছন পিছন যথারীতি এলো তার বিয়েপাগল নাতিবেশী রাকিবুদ্দিন। আজ নানা নাতি বিশেষ আমন্ত্রণে এসেছেন বঙ্গবন্ধুকে সুখ দুঃখের গান শোনাতে। আছেন সুফি মাস্টারও। কৃষক নানার গান শুনে বঙ্গবন্ধু বিমোহিত। বঙ্গবন্ধু এতোই মুগ্ধ হলেন যে তিনি মন্ত্রীসভার প্রত্যেক মন্ত্রীকে গম্ভীরা গান মনোযোগ দিয়ে শুনে কৃষক নানার অভিযোগগুলো প্রতিকার করার আহ্বান জানান।’

পরবর্তীতে ২০১৬-তে বাংলাদেশের জাতীয় গম্ভীরা উৎসবে বর্ষীয়ান নানা মহ. কুতুবুল আলমের সম্মাননা জ্ঞাপন করতে গিয়েও ঢাকার গণভবনের ২৬ জানুয়ারির এই গম্ভীরা আসরের উল্লেখ করা হয়েছে, তবে ১৯৫০ না ১৯৫১— তা নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা হয়নি। তবে কৃষিনির্ভর দুটি রাষ্ট্র, ভারত ও বাংলাদেশ, প্রজাতন্ত্র দিবসের বিশেষ দিনে কৃষকের সমস্যা নিয়েই ভেবেছিল, আর ভাবিয়েছিলেন একজন লোকশিল্পী— এই ইতিহাস আজ কার্যত হারিয়ে যাওয়ার পথে।

তবে ইতিহাসের চাকা ঘুরেও আসে। যে বঙ্গবন্ধুকে গান শুনিয়ে আপ্লুত করেছিলেন সুফি মাস্টার, কুতুবুল আলম বা রাকিবুদ্দিন; সেই মুজিবুর রহমানকেই ‘বড়ো নানা’ সম্বোধন করে বিদ্রূপের তির ছুড়ে দিয়েছিলেন তাঁরা। রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে কোনও রেয়াত করা হয়নি তাঁকে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত থেকে যে কাপড় আমদানি করা হত, তা গুণমানে এতটাই অপকৃষ্ট ছিল যে তা লজ্জানিবারণের অনুপযুক্ত— এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ১৯৭৫-এ নাটোরের উত্তরা গণভবনে গম্ভীরার অনুষ্ঠানে তাঁরা গাইলেন— ‘হে নানা, কেনে করিস তুই ভাবনা/ ঐ দেখ আসছে হাঁরঘে বড়ো নানা/ বল্যা যাব নানা লাতি/ কোন কথা বাকি রাখবো না/ বিদ্যাশ হতে আসছে নানা/ দামি দামি সব কাপড়/ কিনতে যায়্যা ধরা খাইছে/ হাঁরঘে হাফর ফাপর/ তারপরেও পিন্ধলে কাপড়/ দেখা যায় বড়ো নানা।’ এই আসরের পর আর বছর আটেক বেঁচেছিলেন ওস্তাদ শেখ সফিউর রহমান— সুফি মাস্টার।

সরকারি অনুদান পেতে যেনতেনপ্রকারেণ সরকারি প্রকল্পের গুণগান করতে করতে গম্ভীরা আজ সরে এসেছে তার প্রতিবাদের জায়গা থেকে। ক্ষমতাবানের চোখে চোখ রেখে সত্যি কথাটা মুখের ওপর বলার সাহস এই লোকমাধ্যমের শিল্পরূপ তৈরি করেছিল; সুফি মাস্টারদের সঙ্গে সেটাও আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে।

মলাটচিত্র: ফোটোগ্রাফের ডানদিক থেকে দ্বিতীয় ব্যক্তি সুফি মাস্টার। ১৯৮৩-তে মৃত্যুর কয়েকবছর আগে তোলা শেষ ফোটোগ্রাফ।

চিত্র: লেখক কর্তৃক সংগৃহীত

বাঙ্গিটোলার ছানার মণ্ডা এবং সত্তরোর্ধ্ব ষষ্ঠীচরণ

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
5 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
J.Ghosh
J.Ghosh
2 years ago

পড়ে ভালো লাগলো?

Anish Saha
Anish Saha
2 years ago

খুব অনালোচিত একজন গম্ভীরাশিল্পীর কথা উঠে এল।লেখককে অভিনন্দন।

Avik Bhattacharya
Avik Bhattacharya
2 years ago

???

Abhik Paul
Abhik Paul
2 years ago

হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস উঠে এলো

Avik Bhattacharya
Avik Bhattacharya
2 years ago

তথ্যমূলক ও বিশ্লেষণধর্মী লেখা

Recent Posts

আবদুল্লাহ আল আমিন

মাহমুদ দারবিশের কবিতায় ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রাম

যুবা-তরুণ-বৃদ্ধ, বাঙালি, এশিয়ান, আফ্রিকান যারাই তাঁর কবিতা পড়েছেন, তারাই মুগ্ধ হয়েছে। তাঁর কবিতা কেবল ফিলিস্তিনি তথা আরব জাহানে জনপ্রিয় নয়, সারা বিশ্বের ভাবুক-রসিকদের তৃপ্ত করেছে তাঁর কবিতা। তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক পঠিত নন্দিত কবিদের একজন।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর কবিতা: কিছু কিছু পাপ

শৈবাল কে বলেছ তাকে, এ যে বিষম পাথরে/ সবুজ জমা, গুল্মলতা পায়ে জড়ায়, নাগিনী/ হিসিয়ে ফণা বিষের কণা উজাড় করো আদরে/ তরল হিম, নেশার ঝিম কাটে না তাতে, জাগিনি

Read More »
সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »