Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

সারদাদেবী: এক অনন্যা মাতৃরূপা

শ্রীরামকৃষ্ণজায়া সারদাদেবীর আজ‌ পুণ্য জন্মতিথি। তাঁর জন্ম ১৮৫৩-র ২২-এ ডিসেম্বর। আর তাঁর প্রয়াণ ২০.০৭. ১৯২০।

সারদাদেবীর একমাত্র পরিচয় কিন্তু উনিশ শতকের অনন্য‌ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও যুগপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণের স্ত্রী এবং সাধনসঙ্গিনী রূপেই নয়, তাঁর নিজের‌ও ছিল‌ অসাধারণ গুণ, যা তাঁকে শাশ্বত মহিমা দান করেছে। উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে জন্মানোর অশেষ প্রতিকূলতা তিনি জয় করেছিলেন। জন্মেছিলেন নিতান্তই এক দরিদ্র পিতা-মাতার ঘরে। মা শ্যামাসুন্দরী দেবী, বাবা রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। বাঁকুড়া জেলার জয়রামবাটীতে জন্ম তাঁর। সেকালে দেশে শিক্ষিত লোকের হার ছিল মাত্র দশ শতাংশ, আর মেয়েদের তো শিক্ষালাভের কোনও‌ বালাই ছিল না।‌ তবে কোনও রকমে অক্ষরজ্ঞান তাঁর ‌হয়েছিল। মাত্র‌ পাঁচ বছর বয়সে সারদার সঙ্গে ‌বিয়ে হয় তাঁর চেয়ে সতেরো বছরের বড় হুগলি জেলার কামারপুকুর নিবাসী শ্রীরামকৃষ্ণের‌ সঙ্গে। সময়টা ১৮৫৮।

পুরোহিতের পরিবারে বিয়ে। অতএব পুজোআচ্চা, গণ্ডায় গণ্ডায় সন্তানধারণ, দিনগত পাপক্ষয়ের মধ্য দিয়েই অতিবাহিত ‌হতে পারত তাঁর জীবন।‌ কিন্তু তিনি ছিলেন‌ ভস্মাচ্ছাদিত বহ্নি। তাই মহিমময়ী এক আদর্শ‌ নারীরূপে আমরা তাঁকে পাই, যেমন পাই রাসসুন্দরী দাসী (১৮০৯-১৮৯০), নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী (১৮৩৪-১৯০৩), বেগম রোকেয়াকে (০৯.১২.১৮৮০-০৯.১২. ১৯৩২)। বাঙালি মুসলমান মহিলা হিসেবে প্রথম মাস্টার্স, প্রথম অক্সোনিয়ান ও কলেজের প্রথম অধ্যক্ষা ফজিলাতুন্নেসা (১৮৯৯-২১.১০.১৯৭৭)-কেও। কিন্তু তা হয়নি। সারদাদেবী বরাবর স্বামীর সঙ্গে থেকে তাঁর সাধনাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। শ্রীরামকৃষ্ণ-ও তাঁকে প্রকৃত অর্থেই নিজ সহধর্মিণী রূপে পেয়েছিলেন। সারদাদেবীর প্রতি তাঁর ছিল একদিকে প্রেম-ভালবাসা, অন্যদিকে অপার শ্রদ্ধা ও ভক্তি। শ্রীরামকৃষ্ণের এই ভক্তির চূড়ান্ত বিন্দু আমরা লক্ষ্য করি ১৮৭২-এর ফলহারিণী অমাবস্যা কালীপুজোর রাতে নিজ স্ত্রীকে ষোড়শীপূজা করার মধ্য দিয়ে। সংস্কারের কতটা ঊর্ধ্বে উঠলে এমন কাজ করা যায়, আর তার চেয়েও বড় কথা, কতখানি উদারমনা হলে এমন অর্ঘ্য গ্রহণ করা যায়, তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়।

সারদাদেবীকে নিয়ে বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়, সূচনা মাত্র। মনে রাখতে‌ হবে, সেকালের এক তিমিরাচ্ছন্ন গ্রামের অজ্ঞাতকুলশীল পরিবারে জন্মেছিলেন তিনি। ব্রাহ্মণের ঘরে, ব্রাহ্মণের বধূ হয়ে, যাদের সামাজিক প্রভাব এতটাই ছিল যে, অন্য ধর্মীয়দের তো কথাই নেই, এমনকি হিন্দু নিম্নবর্ণদের প্রতিও‌ ছিল তাদের অবজ্ঞা ও ঘৃণা, দূরত্ব বজায় রাখার সযত্ন প্রয়াস। আর এই ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়ে ও বধূ হয়ে তিনি কিনা মুসলমান ঘরামি আমজাদকে খেতে দিয়ে তার এঁটোকাটা নিজের হাতে পরিষ্কার করেন! বিধর্মী খ্রিস্টান নিবেদিতার সঙ্গে বসে আহার করেন! আর তাঁর চেয়েও বড় কথা, সে যুগের ‌বিচারে বিপ্লবাত্মক ঘটনা, স্বামীর মৃত্যুর পর যে দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন তিনি, বিধবাবিবাহের প্রবর্তক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-ও যা কল্পনায় আনতে গেলে নির্ঘাত মূর্ছা যেতেন, লালপেড়ে শাড়ি আর সোনার বালায় ভূষিতা থাকতেন তিনি! আজকের উচ্চশিক্ষিত সমাজেও ক’জন পারবেন এ-কাজ করতে, বা নিদেন এ কাজকে সমর্থন করতে?

একটি বেদনার কথা উঠে আসে এখানে। আমাদের বঙ্গীয় নবজাগরণের ইতিহাসে নারীদের ভূমিকা বেদনাদায়কভাবে অনুপস্থিত। তাই দেখি, প্রবল প্রতিকূলতা ভেদ করেও নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হয়ে উঠেছিলেন প্রগতির, নারীশিক্ষার অগ্রদূত, রামমোহনের সমসাময়িককালে দাঁড়িয়ে হটু বিদ্যালঙ্কার চতুষ্পাঠী খুলে ছাত্র পড়াচ্ছেন, বেগম রোকেয়া নারীশিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন, সুদূর বিলেত থেকে এসে নিবেদিতা জীবন ঢেলে দিলেন এদেশের‌ জন্য, বাঙালির প্রথম আত্মজীবনীটি এল এক তথাকথিত আনপড় মহিলা রাসসুন্দরীর হাত ধরে, বা অন্দরের অবরোধ থেকে বেরিয়ে এসে বঙ্কিমের বিএ পাশ করার মাত্র এক দশকের মধ্যেই তাঁকে কাদম্বিনী গাঙ্গুলি যে কেবল‌ ছুঁয়েই থেমে থাকলেন না, ছাড়িয়েও গেলেন ডাক্তার হয়ে, তা সেভাবে ইতিহাসের পাতায় নেই। নেই ফজিলাতুন্নেসার কথা, যিনি বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম এমএ, প্রথম অধ্যক্ষা, প্রথম অক্সোনিয়ান। তাই ইতিহাস পুনর্লিখনের দাবি করে।

Advertisement

সারদার‌ মূল্যায়ন-ও তাই অপেক্ষিত হয়ে আছে। যিনি বলতে পারেন, তিনি কেবল সতের মা নন, অসতের-ও মা, কোরান-পুরাণ, বেদ আবেস্তা তো অন্তর্গত হয়েই আছে তাঁর।‌ নিবেদিতা সম্পর্কে তাঁর অগ্নিভ উচ্চারণ, ‘নরেন সাগরপার থেকে শ্বেতপদ্ম নিয়ে এসেছে’ উক্তিটিতে তিনি কবি হয়ে ওঠেন, ও সেইসাথে মুক্তমনা। আবার তিনি পাতানো মা নন কারও, অথবা গুরুমা-ও নন, একেবারেই প্রকৃত মা— তাঁর এই অঙ্গীকৃত বয়ানে তাঁর বিশ্বমাতৃত্বের স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে পড়ে। নিজে সামান্য নামস‌ইটুকু সম্বল করে দীক্ষা দিয়ে গেছেন কতই না উচ্চশিক্ষিতকে! বিস্ময়কর ব্যাপার নয় কি?

জন্মতিথির প্রণাম তাঁকে।

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 3 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর চারটি কবিতা

কেন বন্ধ ঝরোকাটি, এভাবে কেন যে বন্ধ হয়ে গেল, আমি কি পাতক/ করেছি কোনও, আমি তো শুধুই মুছি স্নেহাতুর রুক্ষ হাতে হাঁসেদের ত্বক/ ধনুকেতে কেউ বুঝি তির জোড়ে প্রার্থনায়, ব্যর্থ যেন না হয় কিছুতে লক্ষ্যভেদ/ আমিও নিশ্চিত জানি এখানেও ব্যর্থ হব, অন্ধকারে মেলে ধরি চোখ/ আবছায়া আঁধারিতে কখন যে স্বর্ণবৃত্তে বিঁধে গেছে অব্যর্থ শায়ক।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত তাঁর সামান্য খড়কুটোর মতো জীবনকে মহার্ঘ প্রতিভার মিনারের ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তিনি যেন প্রতিভার এক বনসাই, সাহিত্যের কত না সম্ভার নিয়ে সুকান্তর কারুবাসনা! তিনি যদি সারস্বত সাধনার একটি সুচারু তোড়া স্বল্প-পরিসর জীবনে উপহার দিয়ে যান, আমরা লক্ষ্য করব, সেখানে রয়েছে গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, গান, ছড়া, কবিতার বৈভব। আছে তাঁর সম্পাদিত কবিতার বই, ‘আকাল’। তিনি অনুবাদক। এমনকী উপন্যাস রচনাতেও হাত দিয়েছিলেন তিনি। চার বন্ধু মিলে বারোয়ারী। অন্য বন্ধুদের অসহযোগিতায় তা সম্পূর্ণ হতে পারেনি। আবৃত্তিকার ও অভিনেতা, নাট্য-পরিচালক রূপেও দেখেছি তাঁকে। দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার ছোটদের পাতা ‘কিশোরসভা’-র সম্পাদনাসূত্রে সাংবাদিক-ও আবার, যে সভার পঁচিশ হাজারের ওপর সভ্য ছিল।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »
সালমিন রহমান

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Read More »