Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

পূর্ণিমা রাতে সুন্দরী রিশপ

বড়দিনের ছুটিতে প্রকৃতির হাতছানিতে ছুটে গিয়েছিলাম লাভা, লোলেগাঁও, রিশপ। আমরা ছয়জন, দুই পরিবার শিয়ালদা থেকে রাতের দার্জিলিং মেলে সকালে এনজেপি স্টেশন। স্টেশনের বাইরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল নেপালি ড্রাইভার বিধান রাই, বয়স তিরিশের কোঠায়। গাড়িতে মালপত্র বেঁধে চললাম সুন্দরী রিসপের উদ্দেশে। বিধান ভীষণ ভদ্র, মিশুকে। গাড়িতে কত অজানা গল্প। সমতল রাস্তা থেকে আস্তে আস্তে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ। ঘন সবুজ গাছের সারি আর মাঝে মাঝে সুসজ্জিত চা বাগান– চোখ জুড়িয়ে যায়। স্বচ্ছ নীল আকাশ। এক জায়গায় পাহাড়ি ছাগলের মাংস পাওয়া যাচ্ছে। ৫০০ টাকা কেজি। একদম টাটকা। লোভ সামলাতে পারলাম না। রাতের ব্যবস্থা। মাংস নিয়ে আবার গাড়িতে। যত উপরে উঠছি ঠান্ডার আমেজ তত বাড়ছে। পাহাড়, জঙ্গল আর আকাশজুড়ে শুধুই নিঃস্তব্ধতা। ধাপে ধাপে পাইনের গগনচুম্বী অরণ্য আর ঝুল ঝাড়ু, এলাচের চাষ। কোথাও কোথাও পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সরু জলের ধারা, কোথাও বা ছোট্ট ঝর্না। গাড়ি চলেছে ধীরে রহস্যময় অসংখ্য পাহাড়ি বাঁকের মধ্যে দিয়ে, প্রত্যেক বাঁকেই নতুন নতুন দৃশ্য। কোথাও মেঘের ভিতর দিয়ে পথ, পরক্ষণেই আবার রৌদ্রোজ্জ্বল প্রকৃতি।

ঘুমন্ত বুদ্ধ।

লাভা পৌঁছলাম দুপুরে। লাভা পর্বত আর পাইন জঙ্গলে ঘেরা ছোট্ট মনোরম জায়গা। উচ্চতা ৭২০০ ফুট। হাঁটা পথে লাভা মনেস্ট্রি, তিন কিমি দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘা ভিউ পয়েন্ট। দশ কিমি দূরে নেওরাভ্যালি জাতীয় উদ্যান, ছ্যাংগি ফলস। প্রচুর বন্য জীবজন্তু আছে।

লাভাতে গাড়ি থেকে নামতেই ঠান্ডায় শরীরে কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল, তাড়াতাড়ি গরম পোশাক পরে হাঁটা শুরু করলাম। লাঞ্চ সারতে হবে। লাভা ঘনবসতিপূর্ণ জায়গা। অনেক বাড়ি, হোটেল, বেশ বড় মার্কেট। এক বাঙালি হোটেলে ডিম ভাত ডাল আলুভাজা, তাতেই সই। লাঞ্চ সেরে বাজারের মধ্যে দিয়ে হাঁটছি। হঠাৎ বাজারের পাশে একফালি ফাঁকা জায়গায় বেশ কিছু স্থানীয় গোর্খা আবালবৃদ্ধবনিতা বছরের প্রথম দিন উপলক্ষে নাচ গান মোজমস্তি করছে। অদ্ভুত মাদকতা। সাথে দেদার পানীয়। ঠান্ডা বেশ জাঁকিয়ে পড়ছে। একদিকে কাঠের আগুন। আগুনের পাশে এক মধ্যবয়সী মহিলা গ্লাসে বিয়ার পরিবেশন করছে, আর সবাই গোল হয়ে নেপালি গানের তালে তালে শরীর দোলাচ্ছে। আমরাও গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলাম। কাছে যেতেই আমাদের সাদর আমন্ত্রণ, আবদার পা মেলানোর। কখন যে তাদের সাথে মিশে গিয়ে কোমর দোলাচ্ছি বুঝতেই পারিনি। ওদের চোখেমুখে পোশাকে দারিদ্রের ছাপ, কিন্তু আজকের দিনে সব ভুলে আনন্দ মজা আর খানাপিনা। পয়লা জানুয়ারি উপলক্ষে আজ লাভা উৎসবে মেতে উঠেছে। পশ্চিমদিকে পাইন গাছের সারির মধ্যে দিয়ে সূর্য ঢলে পড়ছে। বিদায়মুহূর্তে এক গোর্খা ভাই আমার মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলল, “মুঝে ইঁয়াদ রাখনা”। এবার আমাদের গন্তব্য লাভা মনেস্ট্রি। অসাধারণ সুন্দর। চারপাশে পাইনের ঢল, মাঝে এই মনেস্ট্রি, খুব বড়। মনে হচ্ছে শিল্পীর তুলি দিয়ে আঁকা ক্যানভাস। আপনা থেকেই মনে আসে এক অনাবিল প্রশান্তি।

হোমস্টে লন থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা।

লাভা থেকে রিশপ গাড়ি পথে সাত কিমি। রাস্তার কোনও চিহ্ন নেই। বড় নুড়িপাথরে ভর্তি। দুপাশে ঘন জঙ্গল। বিধান ভাই বলছিলেন– এই জঙ্গলে হিংস্র ভালুকও আছে। ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে গেল। চারিদিক শুনশান, অদ্ভুত এক নিঃস্তব্ধতা। কেমন যেন গা ছমছম করছে। অন্ধকারের বুক চিরে সামনে শুধু গাড়ির হেডলাইট।

ঘণ্টাখানেক পর পৌঁছলাম হোমস্টের সামনে, হিমালয়ান হাট, রিশপ। হোমস্টের মালিক বিমল তামাং সহাস্যে অভ্যর্থনা জানালেন। রবি নামে এক ভোলেভালা বিহারি কেয়ারটেকার। দুটো ঘর, কাঠের। ঘর লাগোয়া বাথরুম টয়লেট। কোমোডও আছে। টিভি নেই। কনকনে ঠান্ডা। জলের অপচয় করবেন না– বাথরুমে লেখা। এখানে জলের খুব কষ্ট। কাঠের আগুনে গরম করা জলে হাত-পা-মুখ পরিষ্কার করে গরম চা আর বিস্কুট। রবির হাতে মাংস দিয়ে বললাম– রাতে কষা মাংস আর রুটি, সাথে পেঁয়াজ। পরিষ্কার আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত দিগন্ত বিস্তৃত সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘা। চোখধাঁধানো অপরূপ দৃশ্য! চাঁদের স্নিগ্ধ আলোর বিচ্ছুরণে কাঞ্চনজঙ্ঘার যেন এক মায়াবী রূপ। হোমস্টের সামনের লনে দোলনায় বসে প্রকৃতির এই অপার্থিব দৃশ্যের সাক্ষী হতে পেরে নিজেদের খুব ধন্য মনে হচ্ছে। এ অনুভূতি বর্ণনাতীত।

Advertisement
বন ফায়ার।

কিছুক্ষণ পর রবি জ্বালানি কাঠ দিয়ে “বন ফায়ারের” ব্যবস্থা করে দিলেন। আকাশে পূর্ণিমার আলোয় প্রজ্জ্বলিত কাঞ্চনজঙ্ঘা, আর আমরা সবাই গোল করে কনকনে ঠান্ডায় আগুন পোহাচ্ছি। শ্যালিকার কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত– ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে…’। এ রোমান্টিক অভিজ্ঞতা ভোলার নয়। চারিদিকে অজানা জংলি পোকার ডাক আর দূর বন থেকে নিশাচর পাখির ডাক। তাপমাত্রার পারদ হু হু করে নামছে। বিমল তামাংয়ের গৃহিণী কাঠের উনুনে রুটি করছেন অদ্ভুত দক্ষতায়। ডিনারে পাহাড়ি ছাগলের কষা মাংস আর গরম গরম রুটি, সাথে পেঁয়াজ। ওহ! মজাই আলাদা!

রাত এগারোটা। ঘরের ভেতর থেকে কাচের জানালা দিয়ে বাইরের নয়নাভিরাম দৃশ্য। দুটো কম্বল, পায়ের মোজা থেকে মাথার টুপি সমেত বিছানায়। মনে হচ্ছে বিছানা যেন বরফ-জল। বাইরে তাপমাত্রা মাইনাস দুই ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। পাশের ঘরে ভায়রাভাইয়ের ডাকে ঘুম ভাঙল। সকাল ছ’টা। দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই চোখের সামনে দিগন্তবিস্তৃত কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপর সূর্যের প্রথম রক্তিম আলো। অনন্য সুন্দর! অপার্থিব দৃশ্য। প্রথমে নিজের চোখকে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। সবাইকে ঘুম থেকে ডেকে তুললাম। এত কাছে কাঞ্চনজঙ্ঘা, পুরো ১৮০° দৃশ্যমান। মনে হচ্ছে রক্তিম গলিত সোনা কে যেন পর্বতের চূড়ামালায় ঢেলে দিয়েছে। হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে, এত কাছে।

সূর্যের প্রথম আলোর স্পর্শ।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে কাঞ্চনজঙ্ঘার মায়াবী রূপেরও পরিবর্তন হতে থাকল। হোটেলের লনে বসে গরম গরম কফির পেয়ালায় চুমুক। চারদিকে আলো ঝলমল করছে। গাছে গাছে পাখির কলতান। এক নৈসর্গিক পরিবেশ। গরমজলে স্নান করে সুস্বাদু মোমো খেয়ে সকাল সকাল গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। যাচ্ছি লোলেগাঁও।

চিত্র: লেখক

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10 − 4 =

Recent Posts

তন্ময় চট্টোপাধ্যায়

মাতৃভাষা: অবিনাশী হৃৎস্পন্দন ও বিশ্বজনীন উত্তরাধিকার

প্রতিটি ভাষার নিজস্ব একটি আলো আছে, সে নিজের দীপ্তিতেই ভাস্বর। পৃথিবীতে আজ প্রায় সাত হাজার ভাষা আছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই শতাব্দীর শেষে তার অর্ধেকেরও বেশি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এ তথ্য সত্যিই বেদনাদায়ক। একটি ভাষার মৃত্যু মানে কেবল কিছু শব্দের মৃত্যু নয়— সে মানে একটি জগৎদর্শনের অবলুপ্তি, একটি জাতির স্মৃতির চিরকালীন বিনাশ। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক বহুমাত্রিক। নিজের মাতৃভাষাকে ভালবাসা, তাকে চর্চায় রাখা, তার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর তার সাথে অন্য সমস্ত ভাষার প্রতি আরও বেশি করে শ্রদ্ধাশীল হওয়া।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

শংকর: বিচিত্র বিষয় ও আখ্যানের কথাকার

শংকরের জনপ্রিয়তার একটি কারণ যদি হয় সাবলীল ও সহজ গতিচ্ছন্দময় ভাষা, অন্য আরেকটি কারণ হল, নিজ সময়কে করপুটে ধারণ করা। তার সঙ্গে মিশেছে আমাদের পরিকীর্ণ জগতের বহুকিছু, আমাদের নাগালের মধ্যেই আছে, অথচ আমরা এ-পর্যন্ত যার হদিশ পাইনি, তাকে পাঠকের দরবারে এনে হাজির করা। ১৯৫৫-তে যে উপন্যাসটি দিয়ে বাংলা-সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব, সেই ‘কত অজানারে’ হাইকোর্টের জীবনযাপন, সেখানকার আসামি-ফরিয়াদি, উকিল-ব্যারিস্টার প্রমুখের চিত্র। লেখকের নিজ অভিজ্ঞতাপ্রসূত রচনা এটি। তিনি প্রথম জীবনে হাইকোর্টের সঙ্গে চাকরিসূত্রে যুক্ত ছিলেন।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর তিনটি কবিতা

তারপরে একদিন আকাশে মেঘের সাজ, মুখরিত ধারাবারিপাত/ রঙিন ছাতার নিচে দু’গালে হীরের গুঁড়ি, মন মেলে ডানা/ আরো নিচে বিভাজিকা, নিপুণ শিল্পীর হাতে গড়া দুই উদ্ধত শিখর/ কিছুটা অস্পষ্ট, তবু আভাসে ছড়ায় মায়া বৃষ্টিস্নাত নাভি/ তখনই হঠাৎ হল ভূমিকম্প, পাঁচিলের বাধা ভাঙে বেসামাল ঝড়/ ফেরা যে হবে না ঘরে মুহূর্তে তা বুঝে যাই, হারিয়েছি চাবি/ অনেক তো দিন গেল, অনেক ঘুরেছি পথে, বিপথে অনেক হল ঘোরা/ তাকে তো দেখেছি, তাই নাই বা পড়ুক চোখে অজন্তা ইলোরা।

Read More »
সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটগল্প: ফাউ

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার…

মনু-পরাশর-বৃহস্পতি-কৌটিল্যদের অনুশাসন এসে নারী প্রগতির রাশ টেনে ধরল। নারীর শিক্ষালাভের ইতি ঘটল, অন্তঃপুরে বাস নির্দিষ্ট হল তাঁর জন্য। তাঁকে বাঁধা হল একের পর এক অনুশাসনে। বলা হল, স্বাধীনতা বলে কোনও পদার্থ থাকবে না তাঁর, ‘ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি’! কুমারী অবস্থায় পিতা-মাতার অধীন থাকবে সে, বিয়ের পর স্বামীর, বার্ধক্যে সন্তানের। ধাপে ধাপে তাঁর ওপর চাপানো হতে লাগল কঠিন, কঠিনতর, কঠিনতম শাস্তি।

Read More »
স্বপনকুমার মণ্ডল

গরিব হওয়ার সহজ উপায়

এককালে পর্তুগিজ-মগরা আমাদের নিম্নবঙ্গ থেকে দাস সংগ্রহ করত মালয়-বার্মাতে শ্রমিকের কাজের জন্য, ইংরেজ সাহেবরাও কিনত গোলাম। আজ আবার মানুষ সস্তা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসকের দরকার নেই। খোলাবাজারে নিজেরাই নিজেদের কিনছে দেশের মানুষ। মানুষ বিক্রির মেলা বসে এখন গ্রামগঞ্জের হাটে হাটে।

Read More »