Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

মানকুমারীর কবিতায় বিষাদ ও নিঃসঙ্গতাবোধ চোখে পড়ে

আমাদের ভয়ে ফুল যদি ভেসে যায়
যদি অনুতাপী পাপী প্রীতি নাহি পায়,
বৃথা গান ধর্মগীতি
বৃথা ভাণ ‘বিশ্বপ্রীতি’
আমাদের এ জীবন বৃথা এ ধরায়!
আয় তোরা বাঁচি-মরি
ঝাঁপ দিয়া জলে পড়ি,
বাঁধিয়া আনিব ফুলে স্নেহ-মমতায়।
[স্রোতের ফুল/ মানকুমারী বসু]

উনিশ শতকের অন্যতম মহিলা কবি মানকুমারী বসু (২৩ জানুয়ারি ১৮৬৩-২৬ ডিসেম্বর ১৯৪৩)। তৎকালীন যশোহর জেলার শ্রীধরপুরে মামাবাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ‘মানসিক’ করায় তাঁর জন্ম, এজন্যই নাম রাখা হয় মানকুমারী। মাতা শান্তমণি দেবী এবং পিতা আনন্দমোহন দত্ত। বাবা-মায়ের কনিষ্ঠ সন্তান তিনি। তাঁর কাকা কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কাব্যে বিশেষ প্রভাবিত হয়েছিলেন মানকুমারী।

পিতা আনন্দমোহনকে আদর্শ মানুষ মনে করতেন মানকুমারী। তাঁর আত্মকথা ‘আমার অতীত জীবন’-এ বাবার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও অনুরাগ নানাভাবে প্রকাশ করেছেন কবি। জ্ঞান হওয়ার পরই তিনি বুঝেছিলেন, ‘আমার বাবা– আমার ঋষিপ্রতিম বাবা– ধর্মাচরণ ও জ্ঞানানুশীলন লইয়াই দিনযাপন করেন। …আমি অতি বাল্যকাল হইতে আমার মাতা-পিতাকে সাংখ্যের পুরুষ-প্রকৃতি অথবা পুরাণের প্রণব-শক্তির মতই দেখিতে পাইয়াছিলাম।’’

প্রথম সাহিত্যরচনার প্রসঙ্গে আত্মকথায় কবি লিখছেন, ‘আমার মনে হয়, একদিন আমার এক ভগিনীকে দিয়া একখানি ছোট খাতা বাঁধাইয়া লইয়াছিলাম। অতি নির্জনে বসিয়া সেই খাতা এবং দোয়াত-কলম লইয়া তাহার নামকরণ করিলাম ‘‘লাইবাইটের উপাখ্যান’’। কিন্তু সেই লাইবাইট পুস্তকে কি লিখিয়াছিলাম, তাহা আমার ভাল মনে নাই। …যাহা হউক, সেই লাইবাইটই আমার প্রথম রচনা।’

বাড়িতেই বাবা, দিদির কাছে মানকুমারী লেখাপড়া শেখেন। বাড়িতে ‘বামাবোধিনী’ পত্রিকা আসত। তা পড়ে কিশোরী মানকুমারীর মনেও লেখার বাসনা জাগে। গোপনে তিনি খাতায় পদ্য লেখা শুরু করেন। একদির বাবার চোখে পড়ে। ভেবেছিলেন, বাবা বকবেন। তার বদলে ‘বাবা বড় আনন্দিত হইয়া আমাকে বুকে টানিয়া লইয়া খুব আদর করিলেন।’ বাবার উৎসাহেই মানকুমারী কবিতা লেখায় মনোযোগ দেন।

এদিকে সেই সময়ের সামাজিক রীতি মেনে মাত্র দশ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়। স্বামীর নাম বিবুধশঙ্কর বসু। মানকুমারীর প্রতি তাঁর স্বামী সদয় ও আন্তরিক ছিলেন। বৃহৎ শ্বশুরবাড়িতে তাই সমস্যা ও কষ্ট পেলেও স্বামীসঙ্গ তাঁর সব দুঃখ ভুলিয়ে দিত। কিন্তু এই সুখ তাঁর ভাগ্যে সয়নি। ১৮৮২ সালে হঠাৎই ‘দয়ালু দেবপ্রতিম পতিরত্ন’ তাঁকে এবং তাঁদের একমাত্র কন্যাকে রেখে চিরতরে চলে যান।

সেইকালে বিধবাদের জীবন ছিল দুঃসহ। মানকুমারী বৈধব্যব্রত পালনে নিষ্ঠার পরিচয় দেন। অন্যদিকে এই প্রিয়বিয়োগের শোকে তাঁর কবিহৃদয় মথিত হয়। অজস্র কবিতা লেখেন। ‘প্রিয়-প্রসঙ্গ’ (১৮৮৪) এমনই এক গ্রন্থ। তবে তাঁর ‘কাব্যকুসুমাঞ্জলী’ (১৮৯৩) পাঠে উনিশ শতকের বিশিষ্ট সাহিত্যিকরা সন্তোষ বোধ করেন। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘কবিতাগুলি সরল, সুমধুর ও সুপাঠ্য।’ নবীনচন্দ্র সেন জানান, ‘আপনার সুললিত কবিতার অক্ষরে-অক্ষরে আপনার সরল রমণী-হৃদয়ের কবিতামৃত প্রবাহিত, অক্ষরে অক্ষরে কল্পনার উচ্ছ্বাস, অক্ষরে অক্ষরে ভাবুকতার তরঙ্গ।’

তাঁর আরও একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘কনকাঞ্জলী’ (১৮৯৬)। সেই ‘কনকাঞ্জলী’ পাঠে মুগ্ধ কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় একটি পত্রে লেখেন, ‘পুস্তকখানি পড়িয়া আমি চমৎকৃত হইয়াছি। যেখানেই খুলি, সেইখানেই মন আকৃষ্ট হয়।… কবিতাপ্রিয় ব্যক্তিমাত্রেই, যিনি ইহা পাঠ করিবেন, তিনিই গ্রন্থকর্ত্রীর ক্ষমতা এবং প্রভাব অনুভব করিতে পারিবেন, এবং তাঁহার প্রতিভার ছটায় মোহিত এবং পুলকিত না হইয়া পারিবেন না।’

কবিতা প্রসঙ্গে মানকুমারীর নিজের বক্তব্যও প্রণিধানযোগ্য। লিখেছেন, ‘এ জগতে ফুলের ফুটিয়াই সুখ, পাখির গান গাহিয়াই সুখ, কিন্তু ইহা ছাড়া আরও একটি কথা আছে, ফুলের শোভা ও সৌরভ যখন অপর-চিত্ত বিনোদন করে, তখনই ফুলের শোভা ও ফুলজীবন সার্থক হয়। বিহঙ্গগীতি যখন অপরের শ্রুতি মুগ্ধ করে, তখনই কলকণ্ঠের গান করা সার্থক হয়, মানবের কবিতাও যখন পরের হৃদয়ে আদরপ্রাপ্ত হয়, তখনই সে কবিতার জীবন সার্থক হয়।’

মানকুমারীর কবিতায় বিষাদ ও নিঃসঙ্গতাবোধ চোখে পড়ে। কখনও বলেন, ‘মানবজীবন ছাই বড় বিপদের’; কখনও বলেন, ‘একা আমি চিরদিন একা’। এ সংসারে তাঁর অরণ্যরোদন– ‘কি যেন হয়েছে আহা/ যা চাই না পাই তাহা’। গীতিকবিতার পাশে তাঁর ‘বীরকুমারবধ’ (১৯০৪) এপিকধর্মী কাব্যটিও উল্লেখযোগ্য। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ভারত সরকার তাঁকে আর্থিক বৃত্তি দেয়। ১৯৩৭-এ চন্দননগরে বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের কবিতা অধিবেশনে তিনিই সভানেত্রী হন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে ভুবনমোহিনী ও জগত্তারিণী স্বর্ণপদক দিয়ে সম্মানিতও করে। আশি বছর বয়সে খুলনায় মেয়ের বাড়িতে কবির জীবনাবসান ঘটে।

অর্ধ শতকের বেশি সময় ধরে কবিতা ছাড়াও মানকুমারী লিখেছেন উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং গল্পও। তাঁর গ্রন্থতালিকাও দীর্ঘ নয়। কোন-বঙ্গমহিলা-প্রণীত ‘প্রিয় প্রসঙ্গ বা হারানো প্রণয়’ (গদ্য-পদ্য), ‘বনবাসিনী’ (উপন্যাস), ‘বাঙালী রমণীদিগের গৃহধর্ম’ (সন্দর্ভ), ‘স্বর্গীয় মহাত্মা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিয়োগে শোকোচ্ছ্বাস’, ‘কাব্যকুসুমাঞ্জলী’, ‘কনকাঞ্জলী’ (কাব্য), ‘বীরকুমারবধ (কাব্য), ‘শুভ-সাধনা’ (গদ্য-পদ্য), ‘বিভূতি’ (কাব্য), ‘সোনার সাথী’ (কাব্য), ‘পুরাতন ছবি’ (আখ্যায়িকা) ইত্যাদি। ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে একটি ছোটগল্পের জন্য জিতে নিয়েছিলেন প্রথম বছরের ‘কুন্তলীন পুরস্কার’-ও।

চিত্র: লেখক কর্তৃক সংগৃহীত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − 12 =

Recent Posts

গৌতম চক্রবর্তী

ব্রিটিশ ছোটগল্প

আমি আগে থেকেই আমেরিকার পাখি বইটি সম্পর্কে জানতাম, কিন্তু কখনও বইটির সঙ্গে তেমনভাবে সময় কাটাইনি। ঠিক যেভাবে কেউ নদীর ধারে বসে সময় কাটায়। বাবার হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে থাকতে থাকতে আমি যেন ধৈর্যের অর্থ শিখে নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করতে শিখেছিলাম। এডি ঠিকই বলেছিল— আমিও মাছ ধরতে যেতে চাইছিলাম। জলের ধারে বসে থাকতে চাইছিলাম। কিন্তু বাবাকে দেখতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো সম্ভব হয়নি। তাই আমি অডুবন-এর সরোবরসম বইয়ে আমার জাল ফেললাম।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »
তপোমন ঘোষ

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে…

হঠাৎ চোখ পড়ে বুথের এক্সিট দরজাটার দিকে… একটা ছোট্ট ছায়া ঘোরাফেরা করছে! চমকে উঠে সে দেখে, সেই বাচ্চাটা না! মায়ের কোলে চড়ে এসেছিল… মজা করে পোলিং অফিসার তার ছোট্ট আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভোটের কালি। হুড়োহুড়িতে মা ছিটকে গেছে কোথাও— নাকি আরও খারাপ কিছু! বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে তার। শুনশান বুথে পোলিং আর সেক্টর অফিসার গলা যথাসম্ভব নিচুতে রেখে ডাকতে থাকেন বাচ্চাটাকে। একটা মৃদু ফোঁপানি… একটা হালকা ‘মা মা’ ডাক— বাচ্চাটা এইসব অচেনা ডাকে ভ্রূক্ষেপও করে না, এলোমেলো পায়ে ঘুরতে থাকে।

Read More »