শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মভাবনা উনিশ শতকের ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যেখানে বিভিন্ন ধর্মের সাধনা তিনি নিজে অনুশীলন করে তাদের অন্তর্নিহিত ঐক্য উপলব্ধি করেছিলেন। ইসলাম ও খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা ও মতামত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলি কেবল তাত্ত্বিক নয়— প্রত্যক্ষ সাধনার ফল। তাঁর বিখ্যাত উক্তি— ‘যত মত তত পথ’ এই অভিজ্ঞতারই সারমর্ম। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে বিভিন্ন ধর্মের ভাষা ও রীতি ভিন্ন হলেও লক্ষ্য এক— ঈশ্বরলাভ।
শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মভাবনা শুধুমাত্র ধর্মীয় সহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয় না, বরং ধর্মসমন্বয়ের এক গভীর দর্শন তুলে ধরে। বলা যায়, শ্রীরামকৃষ্ণের ইসলাম ও খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কিত ভাবনা ছিল প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। তিনি দেখিয়েছেন যে, ধর্মের বহুত্বের মধ্যেও এক গভীর ঐক্য বিদ্যমান, এবং সেই ঐক্যের উপলব্ধিই মানবজীবনের পরম লক্ষ্য।
শ্রীরামকৃষ্ণ ও ইসলাম
১৮৬৬-৬৭ নাগাদ তিনি ওয়াজেদ আলি খান নামে এক সুফি সাধক দক্ষিণেশ্বরে এলে তাঁর মাধ্যমে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁর আদি নাম ছিল গোবিন্দ রায়। পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে নাম হয়েছিল ওয়াজেদ। যাই হোক, শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর কাছে দীক্ষা নিয়ে মসজিদে গিয়ে নামাজ পর্যন্ত আদায় করেছিলেন। যে মানুষটি তাঁর আশ্রয়দাতা রানি রাসমণির ছোঁয়া অন্ন পর্যন্ত খেতেন না, কেননা রানি ছিলেন কৈবর্তের মেয়ে, সেই লোক পরবর্তীকালে এসব সংস্কার বিসর্জন দিলেন। এবং ইচ্ছে করলেন গোমাংস খাওয়ার, যদিও রানি রাসমণির জামাতা মথুরমোহন তাঁকে নিবৃত্ত করেন। তবে ইসলাম-সাধনার পর্বে তিনি কালীপুজো বন্ধ রাখেন, আর নিদ্রা যেতেন মন্দিরের বাইরে। এখানে উল্লেখ্য, মন্দিরের বাইরেই ছিল এক গাজি পিরের মাজার। রানি রাসমণিকে তিনি স্বপ্নে দেখাও দিয়েছিলেন। তাইতে রাসমণি সেস্থানে নিয়মিত বাতি দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন।
স্বামী প্রভানন্দ রচিত ‘শ্রীরামকৃষ্ণজীবনে ইসলাম’ এবং স্বামী নির্বেদানন্দের লেখাতেও শ্রীরামকৃষ্ণের ইসলাম-সাধনার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। শ্রীম রচিত ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত’-তেও। স্বয়ং ঠাকুরের কথায়, ‘গোবিন্দ রায়ের কাছে আল্লা মন্ত্র নিলাম। কুঠিতে প্যাজ দিয়ে ভাত রান্না হল। খানিক খেলুম।’ আবার অন্যত্র, ‘বটতলায় ধ্যান করছি, দেখালে একজন দেড়ে মুসলমান সানকি করে ভাত নিয়ে সামনে এল। সানকি থেকে ম্লেচ্ছদের খাইয়ে আমাকে দুটি দিয়ে গেল। মা দেখালেন, এক বৈ দুই নাই।’ তাঁর আর এক অনন্য অনুভব,— ‘যাঁকে কৃষ্ণ বলা হয়, তিনিই আদ্যাশক্তি, যিশু ও আল্লাহ্ নামে পরিচিত এক রাম, তাঁর হাজার নাম!’
শ্রীরামকৃষ্ণ ও যিশু, এবং খ্রিস্টধর্ম
শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বরে যে-ঘরে থাকতেন, সে ঘরটিতে যিশুখ্রিস্টের একটি ছবি ছিল, এবং তা এখন-ও আছে। কী করে একজন সামান্য লেখাপড়া জানা মানুষ কালী ও যিশুকে এইভাবে মেলাতে পারলেন, আমাদের কাছে এ এক আশ্চর্য। ধূপধুনো দিতেন তিনি রীতিমতো সেই ছবিতে। ঘরের মধ্যে দেয়ালে অন্যান্য ঠাকুরের ছবি, তার মধ্যে পিটার জলমগ্ন, সঙ্গে পরিত্রাতা যিশু, এরকম ছবি। জার্মান ভারততত্ত্ববিদ ম্যাক্স মুলার সাহেব পরাধীন দেশের এই নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর ব্যক্তির স্বরূপ ও মাহাত্ম্য যেমন ধরা পড়েছিল আধুনিক কালের অসামান্য পণ্ডিত, প্রাচীন কালের ভারতীয় বিপুল ও বিচ্ছিন্ন রচনা বেদ সঙ্কলন করা, পঞ্চাশটি খণ্ডে উপমহাদেশের অমূল্য জ্ঞানভাণ্ডার ‘The Sacred Books of the East’ নামে প্রকাশ করা— তেমনই এত কর্মযজ্ঞের মধ্যেও তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী লেখার তাগিদ অনুভব করেছিলেন। করেছিলেন আরও একজন, যিনি আবার নোবেল পুরস্কারে ভূষিত,— ফরাসী মনীষী রোম্যাঁ রোলাঁ। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ সম্পর্কে বলেছেন, ‘যিশু যেমন সমাজের ব্রাত্যজনকে কৃপা করেছেন, সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, রামকৃষ্ণ-ও এক-ই ভাবে রসিক মেথর থেকে শুরু করে চিনু শাঁখারি পর্যন্ত অসংখ্য অন্ত্যজ মানুষকে নিজের বুকে টেনে নিয়েছেন। পণ্ডিত ব্যক্তিরা শ্রীরামকৃষ্ণকে যতখানি পেয়েছেন, সমাজের নিচুতলার মানুষ পেয়েছে তার থেকে অনেক বেশি।’ তিনি রামকৃষ্ণদেবকে এমনকি ‘খ্রিস্টের কনিষ্ঠ ভ্রাতা’ পর্যন্ত বলেছেন। বলেছেন, ‘বিবেকানন্দ এই বঙ্গীয় যিশুর সেন্ট পল’।
পরাধীন ভারতে ব্রিটিশের অর্থনৈতিক শোষণ একদিকে, অন্যদিকে মিশনারিদের তৎপরতা ও দৌত্যে তখন খ্রিস্টান হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল। কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, গুডিভ চক্রবর্তী, মধুসূদন দত্ত থেকে সাধারণ বহু মানুষ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার যুগে ডা. বৌল, মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ, রামকৃষ্ণের অসুস্থতার সময় তাঁকে দেখতে এসে ভিজিট নেননি। কেন? বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল তাঁর ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলামৃত’ গ্রন্থে জানিয়েছেন তার কারণ, ‘ইহার পুণ্য দর্শনে আমি এতোই মুগ্ধ যে পারিশ্রমিক লইয়া হস্ত ও মনকে কলুষিত করিতে পারি না।’






