Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

রামকৃষ্ণের ধর্মভাবনা

শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মভাবনা উনিশ শতকের ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যেখানে বিভিন্ন ধর্মের সাধনা তিনি নিজে অনুশীলন করে তাদের অন্তর্নিহিত ঐক্য উপলব্ধি করেছিলেন। ইসলাম ও খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা ও মতামত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলি কেবল তাত্ত্বিক নয়— প্রত্যক্ষ সাধনার ফল। তাঁর বিখ্যাত উক্তি— ‘যত মত তত পথ’ এই অভিজ্ঞতারই সারমর্ম। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে বিভিন্ন ধর্মের ভাষা ও রীতি ভিন্ন হলেও লক্ষ্য এক— ঈশ্বরলাভ।
শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মভাবনা শুধুমাত্র ধর্মীয় সহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয় না, বরং ধর্মসমন্বয়ের এক গভীর দর্শন তুলে ধরে। বলা যায়, শ্রীরামকৃষ্ণের ইসলাম ও খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কিত ভাবনা ছিল প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। তিনি দেখিয়েছেন যে, ধর্মের বহুত্বের মধ্যেও এক গভীর ঐক্য বিদ্যমান, এবং সেই ঐক্যের উপলব্ধিই মানবজীবনের পরম লক্ষ্য।

শ্রীরামকৃষ্ণ ও ইসলাম

১৮৬৬-৬৭ নাগাদ তিনি ওয়াজেদ আলি খান নামে এক সুফি সাধক দক্ষিণেশ্বরে এলে তাঁর মাধ্যমে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁর আদি নাম ছিল গোবিন্দ রায়। পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে নাম হয়েছিল ওয়াজেদ। যাই হোক, শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর কাছে দীক্ষা নিয়ে মসজিদে গিয়ে নামাজ পর্যন্ত আদায় করেছিলেন। যে মানুষটি তাঁর আশ্রয়দাতা রানি রাসমণির ছোঁয়া অন্ন‌ পর্যন্ত খেতেন না, কেননা রানি ছিলেন কৈবর্তের মেয়ে, সেই লোক পরবর্তীকালে এসব সংস্কার বিসর্জন দিলেন। এবং ইচ্ছে করলেন গোমাংস খাওয়ার, যদিও রানি রাসমণির‌ জামাতা মথুরমোহন তাঁকে নিবৃত্ত করেন। তবে ইসলাম-সাধনার পর্বে তিনি কালীপুজো বন্ধ রাখেন, আর নিদ্রা যেতেন মন্দিরের‌ বাইরে। এখানে উল্লেখ্য, মন্দিরের বাইরেই ছিল এক গাজি পিরের মাজার। রানি রাসমণিকে তিনি স্বপ্নে দেখাও দিয়েছিলেন। তাইতে রাসমণি সেস্থানে নিয়মিত বাতি দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন।
স্বামী প্রভানন্দ রচিত ‘শ্রীরামকৃষ্ণজীবনে ইসলাম’ এবং স্বামী নির্বেদানন্দের‌ লেখাতেও শ্রীরামকৃষ্ণের ইসলাম-সাধনার বিস্তারিত বর্ণনা আছে।‌ শ্রীম রচিত ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত’-তেও। স্বয়ং ঠাকুরের কথায়, ‘গোবিন্দ রায়ের কাছে আল্লা মন্ত্র নিলাম। কুঠিতে প্যাজ দিয়ে ভাত রান্না হল। খানিক খেলুম।’ আবার অন্যত্র, ‘বটতলায় ধ্যান করছি, দেখালে একজন দেড়ে মুসলমান সানকি করে ভাত নিয়ে সামনে এল। সানকি থেকে ম্লেচ্ছদের খাইয়ে আমাকে দুটি দিয়ে গেল। মা দেখালেন, এক বৈ দুই নাই।’ তাঁর আর এক অনন্য অনুভব,— ‘যাঁকে কৃষ্ণ বলা হয়, তিনিই আদ্যাশক্তি, যিশু ও আল্লাহ্ নামে পরিচিত এক রাম, তাঁর হাজার নাম!’

Advertisement

শ্রীরামকৃষ্ণ ও যিশু, এবং খ্রিস্টধর্ম

শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বরে যে‌-ঘরে থাকতেন, সে ঘরটিতে যিশুখ্রিস্টের একটি ছবি ছিল, এবং তা এখন-ও আছে। কী করে একজন সামান্য‌ লেখাপড়া জানা মানুষ কালী ও যিশুকে এইভাবে মেলাতে পারলেন, আমাদের কাছে এ এক আশ্চর্য। ধূপধুনো দিতেন তিনি রীতিমতো সেই ছবিতে। ‌ঘরের মধ্যে দেয়ালে অন্যান্য ঠাকুরের ছবি, তার মধ্যে পিটার‌ জলমগ্ন, সঙ্গে পরিত্রাতা যিশু, এরকম ছবি। জার্মান ভারততত্ত্ববিদ ম্যাক্স মুলার সাহেব পরাধীন দেশের‌ এই নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর ব্যক্তির স্বরূপ ও মাহাত্ম্য যেমন ধরা পড়েছিল আধুনিক কালের‌ অসামান্য পণ্ডিত, প্রাচীন কালের ভারতীয় বিপুল ও বিচ্ছিন্ন রচনা বেদ সঙ্কলন করা, পঞ্চাশটি খণ্ডে উপমহাদেশের অমূল্য জ্ঞানভাণ্ডার ‘The Sacred Books of the East’ নামে প্রকাশ করা— তেমনই এত কর্মযজ্ঞের মধ্যেও তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের‌ জীবনী লেখার তাগিদ অনুভব করেছিলেন। করেছিলেন আরও একজন, যিনি আবার নোবেল পুরস্কারে ভূষিত,— ফরাসী মনীষী রোম্যাঁ রোলাঁ। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ সম্পর্কে বলেছেন, ‘যিশু যেমন সমাজের ব্রাত্যজনকে কৃপা করেছেন, সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, রামকৃষ্ণ-ও এক-ই ভাবে রসিক মেথর থেকে শুরু করে চিনু শাঁখারি পর্যন্ত অসংখ্য অন্ত্যজ মানুষকে নিজের বুকে টেনে নিয়েছেন। পণ্ডিত ব্যক্তিরা শ্রীরামকৃষ্ণকে যতখানি পেয়েছেন, সমাজের নিচুতলার‌ মানুষ পেয়েছে তার থেকে অনেক বেশি।’ তিনি রামকৃষ্ণদেবকে এমনকি ‘খ্রিস্টের কনিষ্ঠ ভ্রাতা’ পর্যন্ত বলেছেন। বলেছেন, ‘বিবেকানন্দ এই বঙ্গীয় যিশুর সেন্ট পল’।
পরাধীন ভারতে ব্রিটিশের অর্থনৈতিক শোষণ একদিকে, অন্যদিকে মিশনারিদের তৎপরতা ও দৌত্যে তখন খ্রিস্টান হ‌ওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল।‌ কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, গুডিভ চক্রবর্তী, মধুসূদন দত্ত থেকে সাধারণ বহু মানুষ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার যুগে ডা. বৌল, মেডিক্যাল কলেজের‌ অধ্যক্ষ, রামকৃষ্ণের অসুস্থতার সময় তাঁকে দেখতে এসে ভিজিট নেননি। কেন? বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল তাঁর ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণলীলামৃত’ গ্রন্থে জানিয়েছেন তার কারণ, ‘ইহার পুণ্য দর্শনে আমি এতোই মুগ্ধ যে পারিশ্রমিক ল‌ইয়া হস্ত ও মনকে কলুষিত করিতে পারি না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty − 10 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »
সালমিন রহমান

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও দুই বিখ্যাত বাঙালি

কী অসাধারণ শিক্ষাই না আমরা পেতে পারি, উৎসাহিত হয়ে পারি খেলোয়াড়দের থেকে! একটি উদাহরণ: প্রথম বিশ্বকাপে সোনাজয়ী উরুগুয়ে দলে ছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। তেরো বছর বয়সে মেশিনে তাঁর ডানহাত কাটা পড়েছিল। অদম্য উৎসাহে তিনি ফুটবল খেলেছেন, জাতীয় দলে স্থান করে নিয়েছেন, আর ফাইনালে জয়সূচক গোলটিও তাঁর-ই করা! তাঁর স্বদেশবাসী তাঁকে ডাকতেন— ‘এল ডিভিনো মানকো’, অর্থাৎ একহাত-বিশিষ্ট ঈশ্বর।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »
অপরাজিতা মৈত্র

গোদাবরীর গোমুখে

গঙ্গার মর্ত্যে আগমন নিয়ে যেমন ভগীরথের গল্প, তেমনই গোদাবরীর উৎসস্থলে না এলে জানা যেত না, দক্ষিণের গঙ্গা নিয়েও আছে হাজার গল্প। যে গল্প জানাবে আজও এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময়েই কাছাকাছি আর কোনও পানীয়জল না পেয়ে কষ্ট করে হলেও এই উৎসস্থলে এসেই শীতল এই পানীয়জল নিয়ে যান নিজেদের কাজের জন্য। গঙ্গা বা অন্য নদী সে শুধু ধার্মিক আবেগের কারণে পবিত্র না, হাজার প্রাণীর ‘তৃষ্ণা’ মেটাবার জন্য সে হয়ে ওঠে ‘দেবী’ বা ‘পবিত্র’। সে পথে মিশে যায় হাজার গল্প-কষ্ট কিংবা দিনযাপনের চরম বাস্তবতা।

Read More »