ভারত তথা এই উপমহাদেশে দীর্ঘকাল ধরে শ্রীকৃষ্ণ তথা বৈষ্ণব ভাবধারাকেন্দ্রিক চিন্তাচেতনা বিস্তার লাভ করেছিল। শ্রীকৃষ্ণকে আমরা পাই মহাভারত, ভাগবত পুরাণ ও বিষ্ণু পুরাণে বহুলাংশে। ভারতবর্ষে ভক্তিবাদিতা গড়ে উঠেছিল যে-সব পৌরাণিক চরিত্রকে ঘিরে, তাঁদের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণ অন্যতম। শৈব, শাক্ত, গাণপত্য (গণপতি/ গণেশের) উপাসকদের মতই বৈষ্ণবমতে বিশ্বাসী লোকের অভাব ছিল না উপমহাদেশে। যুগে যুগে ও কালে কালে এই বৈষ্ণব উপাসনা, পণ্ডিতেরা যার নাম দিয়েছেন ‘Krishna Cult’; তা বিকাশলাভ করে। তবে একথা ঠিক, শৈব এবং শাক্তদের যেমন সংখ্যাহীন মন্দির গড়ে উঠেছে হাজার হাজার বছর ধরে উপমহাদেশময়, সেরকম করে কৃষ্ণমন্দির গড়ে ওঠেনি। তার নানাবিধ কারণ রয়েছে, যা আমাদের আলোচ্য বিষয়ের বাইরে।
আমাদের অভিনিবেশ কেবল শ্রীকৃষ্ণকেন্দ্রিক সাহিত্য, যা হাজার বছর ধরে রচিত হয়ে বাংলায় এহেন প্রবাদেরও জন্ম দিয়েছে, ‘কানু বিনে গীত নাই।’ একথা বাংলার ক্ষেত্রে যেমন সত্য, তেমনই সত্য সমগ্র ভারত তথা উপমহাদেশ সম্পর্কে। দক্ষিণ ভারতে আলওয়ার সম্প্রদায় সুদীর্ঘকাল ধরে বৈষ্ণব। আবার উত্তর ভারতেও মহাভারত এবং ভাগবতের ব্যাপক প্রচারের ফলে বৈষ্ণববাদের প্রসারলাভ ঘটেছে। মধ্যযুগে এসে সন্ত কবি তুলসীদাসের হাতে যেমন রাম, তেমনই মীরাবাঈয়ের গানে কৃষ্ণমহিমা প্রচারিত। ঠিক একই সময়ে বাংলাদেশে শ্রীচৈতন্য আর আসামে শঙ্করদেবের বৈষ্ণবধর্ম প্রচার সমগ্র পূর্ব ভারতকেই প্রভাবিত করেছিল। কবীর ছিলেন আবার রাম-রহিমের সমন্বয়কারী। মধ্যযুগে মরমী কবি-সাধকেরা, জোলা, রজব, দাদ্দ, সুরদাস, রুইদাস, গুরুনানক, জ্ঞানদেব, রামদাস প্রমুখের মধ্যেও এই সমন্বয়ধর্মিতার লক্ষণ প্রত্যক্ষ করা যায়। সুফিবাদ, পিরবাদ বৈষ্ণবধর্মে প্রভাব বিস্তার করে একে অন্য এক মাত্রা দেয় বলে ঐতিহাসিকদের মত। বাংলার চিরায়ত আউলবাউল বলাহারী মাইজভাণ্ডারী সাহেবধনীর প্রভাবও কমবেশি বৈষ্ণব ভাবধারাকে গতিজাড্য দেয়।
শ্রীকৃষ্ণ চরিত্রের বিবর্তন ও কৌতূহল অনুধাবনযোগ্য। রাখালবালক থেকে তাঁর শৈশব যৌবন, নরলীলা, বৃন্দাবন থেকে দ্বারকায় চলে যাওয়া আর কখনও সেখানে ফিরে আসতে না পারা, তারপর মহাভারতের শ্রীকৃষ্ণ, পাণ্ডবদের সখা এবং পরামর্শদাতা থেকে ক্রমশ শ্রীকৃষ্ণের অবতারে উত্তরণ, তার ক্রম ও ধারাবাহিকতা রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে বাংলা ভাষায় যে সুবিপুল, বিস্ময়কর ও শাশ্বতকালস্থায়ী সাহিত্য রচিত হয়েছে, আমাদের মূল আলোচ্য বিষয় সেটি। শ্রীকৃষ্ণের মত শ্রীরামকৃষ্ণ এবং গৌতমবুদ্ধও অবতার হিসেবে বন্দিত। কিন্তু এঁদের নিয়ে সাহিত্যরচনার এতটা ব্যাপ্তি নেই। আমরা বাংলা ভাষার কথা বলছি। আমরা এর গুরুত্ব বোঝার চেষ্টা করব।
পাশাপাশি আরও একটি অনুসন্ধিৎসা থাকবে আমাদের। দেখা গেছে শ্রীকৃষ্ণ-আশ্রিত কাব্য দ্বাদশ শতাব্দী থেকে শুরু করে বৈষ্ণব পদাবলি-বাহিত হয়ে পরবর্তীকালে যে মধুসূদন-রবীন্দ্রনাথ-কাজী নজরুল ইসলাম পর্যন্ত প্রসারিত, সর্বত্রই সেখানকার মূল বিষয় শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার প্রেম। অর্থাৎ দেবতা বা অবতারের প্রেমগাথা। আবার এরই পাশাপাশি সমসাময়িককালেই প্রেমের ঐতিহাসিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও লৌকিক একটি ধারাও সমান্তরালভাবে বয়ে চলেছিল বাংলা সাহিত্যে— লাইলা-মজনু, শিরি-ফরহাদ ইত্যাদি বিদেশি কাহিনির আত্মীকরণের মাধ্যমে, অন্যদিকে দেশীয় লোকায়ত ধারাকে আশ্রয় করে, যার মুখ্য প্রতিনিধি ময়মনসিংহ গীতিকা।
এইসব কাহিনির মধ্যে একটি সাধারণ মিল লক্ষ্য করি আমরা, যে কী বৈষ্ণবসাহিত্য, কী লাইলা-মজনু বা শিরি-ফরহাদ বা ময়মনসিংহ গীতিকা আর রাধাকৃষ্ণের কাহিনি, সবই ট্র্যাজিক। মহুয়া পালার মহুয়া ও নদের চাঁদের মধ্যে যে অবিনাশী ভালবাসা, তার পরিণতিতে যে বিধুরতা, রাধাকৃষ্ণের প্রেমও একই করুণ রসে আর্দ্র। কবিদের রসসৃষ্টিতেও ফারাক দেখি না। রাধার প্রেমানুভূতি বোঝাতে কবি লিখছেন (জ্ঞানদাস), ‘প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর।’ এখানে ভালবাসার যে সর্বাতিশায়িতা, লাইলার পিঠে বেত্রাঘাত মজনুর পিঠে দাগ হয়ে দেখা দেওয়ার মধ্যেও তাই। বৈষ্ণব কবির রাধা ‘নিশ্চয় হইলাম দাসী’ বলে ঘোষণা করেন নিজেকে। অন্যদিকে, পরম কৃষ্ণভক্ত মীরাবাঈয়ের আকুতি, ‘ম্যয়নে চাকর রাখ জী।’ এই উভয় উচ্চারণ কি সমরেখ নয়?
রাধা-শিরি-মহুয়া-লাইলা ভালবাসায় তুল্যমূল্য, বিরহে সবাই অশেষ দুর্গতি ভোগ করেন, প্রতীক্ষায় কাটান কেউ প্রেমিকের জন্য, আবার কেউ মৃত্যুবরণ করেন। লাইলার কবর খুঁজে বের করবার জন্য মজনু কবরের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে হন্যে হয়ে অবশেষে মৃত, মাটির গভীরে সমাধিস্থ লাইলার শরীরের গন্ধ পেয়ে তাকে লাইলার কবর বলে চিহ্নিত করেন। ভালবাসার এহেন গভীর ও নাজুক অনুভবের বর্ণাভা পৃথিবীর যাবতীয় প্রেমকাব্যের মধ্যে একে অনন্য করে রেখেছে।
লাইলার মৃত্যুশোক মজনুকেও আত্মঘাতী করে। অন্যদিকে, রাধার ট্র্যাজেডি আরও ঘনবদ্ধ করে আঁকেন বৈষ্ণব কবিরা। রাধাকৃষ্ণের প্রলম্বিত অভিসার-শরীরী মিলন ইত্যাদির পর শ্রীকৃষ্ণের ডাক আসে মথুরায়, অত্যাচারী কংসকে বধ করতে হবে। দ্বারকা থেকে অক্রূর এসেছে রথ নিয়ে। অক্রূর, বৈষ্ণব কবির ভাষায় যার মত ক্রূর আর দ্বিতীয় হয় না, রাধাকৃষ্ণের এতদিনকার মিলনপ্রহরকে চিরকালের জন্য সমাপ্তি ঘোষণার জন্যই যেন তার রথ নিয়ে আগমন, ‘ক্রূর নাহি যা সম।’
কৃষ্ণ আর ফিরে এলেন না। কংসবধের পর মথুরার রাজা হয়ে বসলেন। এদিকে রাধা দিনের পর দিন প্রতীক্ষা করতে করতে একসময় মতিভ্রষ্ট হয়ে উপলব্ধি করতে লাগলেন, যেন কৃষ্ণ ফিরে এসেছেন। এই মতিভ্রম, hallucination আরও ট্র্যাজিক। রাধা মায়াময় কৃষ্ণকে দেখে বলছেন, ‘এত দিন পরে বঁধুয়া আইলে/ দেখা না হইত পরান গেলে।’ কৃষ্ণ ফিরে এসেছেন, মর্মে মর্মে এই অলীক বোধ জন্ম নিয়েছে তাঁর মনে। কৃষ্ণের সঙ্গে প্রথমদর্শনে যে মন ‘একদিঠ করি ময়ূর ময়ূরী কণ্ঠ করে নিরীক্ষণে।’ অর্থাৎ কৃষ্ণকে সেই মুহূর্তে চাক্ষুষ করতে না পেরে ময়ূর-ময়ূরীকে কাছাকাছি এনে রাধা কী দেখেছেন, না, কণ্ঠ। ময়ূরের কণ্ঠ নীল, কৃষ্ণের কণ্ঠও। দুই কণ্ঠ কেন? রাধার মানসিকতায় তখন এই বোধ, কৃষ্ণ ও তিনি সংলগ্ন হয়ে থাকলে কোন অনবদ্য নান্দনিকতা সৃষ্টি হবে তা দেখা। এই দেখতে চাওয়ার মধ্যে বেদনা থাকলেও তা ট্র্যাজেডি নয়, কেন না দুজনের অভিসারের উপক্রমণিকা রচিত হচ্ছে এখানে।
অন্যদিকে, ভ্রম করে কৃষ্ণকে দেখা ট্র্যাজেডির চূড়ান্ত সোপান, কেন না আমরা জানি, এক, কৃষ্ণ ফিরে আসবেন না আর, ছিন্ন খঞ্জনার মত দেবসভায় গিয়ে নাচের মাধ্যমে কৃষ্ণকে ফিরিয়ে আনার কোনও সম্ভাব্যতাই নেই রাধার। আর দুই, অদৃশ্য অগস্ত্যযাত্রায় গত কৃষ্ণকে রাধা প্রত্যাগত দেখতে পাচ্ছেন। দেখে বলছেন, ‘বল বল বঁধু কুশল বল/ তোমার কুশলে কুশল মানি।’ আরও বলছেন, যা তাঁর মতিভ্রমকে আরও গভীরতর মাত্রা দেয়, ‘মথুরানগরে ছিলে তো ভাল?’ বলা বাহুল্য, ‘থাকা’ ক্রিয়াটির বর্তমান কালে থাকা কৃষ্ণকে রাধা অতীত কালে পরিণত করছেন। সাধিকা মীরার কাছে তাঁর আরাধ্য শ্যাম শাশ্বত বর্তমান, তাই মীরার সর্বাঙ্গে অনুভূত কৃষ্ণময়তা এরকম, ‘পানি মে মীন পিয়াসী/ শুনত লাগত হাসি।’ এই এক বোধ, আর রাধার কী তুমুল বৈপরীত্য! এবং একই সঙ্গে কবি পুরুষের চেয়ে নারীর, এমনকি কঠিন শিলার চেয়ে নারীর সহনশীলতারও ধ্রুবত্ব প্রতিষ্ঠিত করলেন, ‘এতেক সহিলা রমণী বলে/ ফাটিয়া যাইত পাষাণ হলে।’ সন্ত কবি কবীর যে বলেছেন, ‘বিরহ হায় এক সুলতান’, সেই সুলতানিয়াতের বাসিন্দা রাধা। তাই বৈষ্ণব সাহিত্য ঘিরে প্রচলিত প্রবাদকে বর্ধিত করে স্বচ্ছন্দে বলা যেতে পারে, ‘কানু বিনে গীত নাই, রাধা সম প্রীত’।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে বিচিত্র ধারায় যে ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য রচিত হয়েছে, তাতে ট্র্যাজেডির প্রাধান্যই লক্ষ্য করি। এবং সেসব রচনার পাঠযোগ্যতা আজও রয়ে গেছে।