Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ছোটগল্প: পরিযায়ী

মোবাইল ফোনটা একবার বেয়াড়াভাবে ট্যাঁ-ট্যাঁ করে উঠল।

কখন যে চোখদুটো লেগে গেছিল, টের পাননি শ্যামলীদেবী। মোবাইলের আওয়াজে তন্দ্রাটা ভেঙে গেল। পাশে রাখা মোবাইলটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। ধুস, মোবাইল কোম্পানির কীসব অফারের একটা মেসেজ।

‘এই এক জ্বালা, সারাদিনে পঞ্চাশটা মেসেজ আসে!’ খানিকটা স্বগতোক্তির ঢঙে বলে মোবাইলটা রেখে আবার পাশ ফিরে শুলেন শ্যামলীদেবী। প্রথম যখন মোবাইলটা তাঁর জিম্মায় এল, তখন খুব বিরক্তি লাগত! সারাদিনের সংসারের হাড়ভাঙা খাটুনির পর এইসব হাবিজাবি মেসেজ বসে বসে ডিলিট করো রে বাবা। এখন আর অতটা বিরক্তি লাগে না। বোধহয় ধাতে সয়ে গেছে। বরং যখন ওই ‘আপনি মোটা অঙ্কের ডলার জিতেছেন, আপনার ব্যাঙ্ক ডিটেলসটা পাঠান’ গোছের ভুয়ো মেসেজ আসে, তখন খানিক মজাই পান।

নাহ, এখনও ছেলের কোনও মেসেজ আসেনি। মোবাইলের ঘড়িতে সময়টা দেখলেন, সবে সওয়া তিনটে। ছেলের এখনও এয়ারপোর্ট পৌঁছতে দেরি আছে। বেশ কিছুকাল ধরেই ছেলে পড়াশুনার সূত্রে ব্যাঙ্গালোরবাসী। বছরে একবার ছুটি মেলে। তখন ওই মাসখানেকের ছুটিতে বাড়ি আসা। বরও কাজের সূত্রে ভিনরাজ্যবাসী, বছরে দু’বার ছুটি মেলে যদিও। তবে এবারের মতো সবসময়ই যে দুজনের বাড়ি আসার সময় মিলে যায়, তেমনটা নয়। বরের কর্মস্থলে ফেরার সময় হয়েছে বেশ কিছুদিন আগেই। আজ ছেলে রওনা দিল। মফস্বলের দু’কামরার ভাড়াবাড়িতে আবার শ্যামলীদেবী একা। প্রথম প্রথম একটু ভয় ভয় লাগত, মাঝরাতে খুটখাট আওয়াজে বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠত। এখন থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ‘শরীরের নাম মহাশয়, যা সওয়াবেন তাই সয়!’ বিড়বিড়িয়ে বলে নিজের মনেই একবার হেসে ফেললেন শ্যামলীদেবী।

চিৎ হয়ে শুতেই মাথার ওপর ফ্যানটার দিকে নজর গেল। ইসস, বেশ খানিকটা ঝুল জমেছে। ভেবেছিলেন পুজোর আগে টুলে উঠে নিজেই পরিষ্কার করবেন, কিন্তু কাজের চাপে আর শেষমেশ করে ওঠা হয়নি। গরমকালটায় টানা চলার পর এই ঝুলটুল জমে কি ফ্যানটাকে একটু ক্লান্ত দেখাচ্ছে?

‘যত দিন যাচ্ছে, মা তোমার বাতিকটাও যেন বাড়ছে!’ ছেলের কথাগুলো কানে ভেসে এল! সত্যিই বোধহয় একা থাকতে থাকতে আজকাল এইসব আজগুবি ভাবনাগুলো অজান্তেই এসে ভিড় করে। কোভিডের সময় এই ফ্যান নিয়ে এক উদ্ভট ব্যামো চেপেছিল। তখন বাইরে বেরনো বারণ, ট্রাম-বাস-ট্রেন সব বন্ধ, বাপের জম্মে এমন পরিস্থিতি দেখেননি। প্রাথমিক বিহ্বলতাটা কাটতে একদিন ছেলেকে খানিকটা অনুযোগের সুরেই বলেছিলেন, ‘সারাদিন ঘরে বসে থেকে কী করি বল তো? আর কিছুদিন এইভাবে চললে বাত ধরে যাবে!’

ছেলের চটজলদি নিদান, ‘এ আর এমন কী! এক কেজি চালে ক’টা চাল থাকে গুনে দেখো! নাহলে মাথার ওপর বনবন করে ঘোরা ফ্যানের ব্লেডগুলো মিনিটে ক’বার পাক খায় সেটা গোনো!’

ঝোঁকের মাথায় শুরু করেছিলেন! ফ্যানটা দুইতে ঘুরলে ব্লেডগুলো মিনিটে পঁচাত্তর বার পাক খায়, একে ঘুরলে উনপঞ্চাশ! পরে নিজের বালখিল্যটায় নিজেই বেশ একচোট হেসেছিলেন শ্যামলীদেবী। বাড়তি বিড়ম্বনা এড়াতে বেমালুম কথাটা চেপে গেছিলেন, আর বলেননি কাউকে।

মোবাইলটা আবার ট্যাঁ-ট্যাঁ করে উঠল। নাহ, এবার ছেলেরই মেসেজ: ‘আমি ডানকুনি প্রায় পৌঁছে গেছি।’

যাক, খানিকটা নিশ্চিত হওয়া গেল। আগে এই মফস্বল থেকে দমদমে ফ্লাইট ধরতে ছেলে সেই বাস-ট্রেনের হ্যাপা পেরিয়ে যেত, ইদানীং বাড়ি থেকে টানা গাড়িতেই যায়। একটু বেশি পয়সা যায় বটে, তবে ওই বাস-ট্রেনের হ্যাপা থাকে না। বলা যায় না, গোদের ওপর বিষফোঁড়া কখন যে কী ইস্যুতে বাস-ট্রেন বন্ধ করে বসে! তখন বোঝো ঠ্যালা।

‘আচ্ছা, রাস্তায় কোথাও দাঁড়িয়ে একটু চা খেয়ে নিস।’ মেসেজের একটা ছোট্ট জবাব দিয়ে মোবাইলটা রেখে আবার পাশ ফিরে শুলেন শ্যামলীদেবী।

নিজেরও একবার চা খেলে হয়, শরীরের ক্লান্তিটা একটু কাটে। দিনটা ছোট হয়ে আসছে, পড়ন্ত বিকেলের মরে যাওয়া রোদটা পশ্চিমের জানালা গলিয়ে আলগোছে বিছানায় এসে পড়েছে। বাইরের মিউনিসিপ্যালিটির কলটা থেকে ছড়ছড় করে জল পড়ছে! সাড়ে তিনটে বেজে গেল!

‘উফফ, আবার কোন উজবুক কলটা খুলে রেখে পালিয়েছে!’ নিজের মনেই খানিকটা গজগজ করলেন শ্যামলীদেবী। অন্য সময় হলে উঠে বেরিয়ে কলটা বন্ধ করে আসতেন। চারদিকে পানীয়জলের আকালের যা খবর ছাপে, তাতে বুক শুকিয়ে যাবার যোগাড়। আরও কতদিন এই পৃথিবীতে বাঁচতে হবে, তখন সকালের স্নানের জল মিলবে কি না— সেসব ভাবলেই কেমন যেন সব গুলিয়ে যায়। কিন্তু আজ শরীরটা ছেড়ে দিয়েছে, অহেতুক নড়ানড়ি করতে ইচ্ছে করছে না। ‘ধুর, যা জল পড়ে পড়ুক, আর উঠতে পারছি না’— ভেবে হাই তুলে আর একবার মোবাইলটায় চোখ বোলালেন শ্যামলীদেবী। নাহ, আর কোনও নতুন মেসেজ আসেনি।

ক্যানক্যানে গলায় ‘দুধ নেবেন, দুউধ’ বলে সিধু গয়লা পাড়ায় দুধ দিতে এসেছে। ব্যাটার ভারি দেমাক। কথায় কথায় লোকজনকে শুনিয়ে বলে— ‘আমি দুধে জল মেশাই, কিন্তু জলে দুধ মিশিয়ে লোক ঠকাই না!’

মোড়ের মাথায় প্রতিবেশীরা জটলা করে বৈকালিক পরনিন্দা-পরচর্চার আসর বসিয়েছে, সমবেত গলার আবছা আওয়াজ ভেসে আসছে!

‘রোজ রোজ বাবা এরা পারেও বটে! সারাদিনে কী খায় কে জানে যে, এইসব করার এত্ত এনার্জি পায়!’— নিজের মনে ভেবেই খানিকটা করুণা উদ্রেককারী হাসি হাসলেন শ্যামলীদেবী। কার মেয়ে কার ছেলের সাথে ঘুরছে, কোন বাড়ির কাজের লোক একসপ্তাহের মাথায় ছেড়ে গেছে, দুর্গাপুজোয় কে কম চাঁদা দিয়ে বেশি প্রসাদ ঘরে নিয়ে গেছে— এদের ছেঁদো গপ্পের যোগানের কমতি নেই!

ছেলে ভাল বলে— ‘মা, আসলে পাড়াটা গলির মধ্যে তো, তাই যেমন সূর্যের আলো সোজা না পড়ে খানিকটা তেরছাভাবে পড়ে, তেমনি এদের ক্ষেত্রে শিক্ষার আলোটাও তেরছাভাবে পড়েছে।’ ষাট ছুঁইছুঁই বয়সে এসে এই কেচ্ছায় অংশগ্রহণ করতে চান না শ্যামলীদেবী। তার চেয়ে ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়া বা এফএম রেডিওতে গান শোনা ঢের ভাল।

আজকাল কারওর চিন্তাধারার সাথেই ঠিক মেলাতে পারেন না শ্যামলীদেবী। বয়সের ভার? কে জানে! এই তো ও’পাড়ার কাকলির বছরচল্লিশের বরটা দুম করে ক্যানসারে মারা গেল। এই এক হাড়আপদে রোগ! যখন ধরা পড়ল তখন অলরেডি স্টেজ ফোর, দু’দিনের মধ্যেই সব শেষ। সেই নিয়ে পাড়ায় আলোচনা হচ্ছে, ‘এইবয়সে ছেলেটা চলে গেল, এবার সংসারটা চলবে কী করে’— এইসব বলছেন শ্যামলীদেবী, ওমা! হঠাৎই পাড়ার বাবলু বেশ মুরুব্বিচালে বলে— ‘যাই বলুন কাকিমা! আর যদি ১২ ঘণ্টা লাস্টিং করত, তাহলেই একটা ইতিহাস হয়ে যেত! জন্ম-মৃত্যুদিন সেম। ভাবতে পারছেন! পুরো বিধান রায়ের মতো ব্যাপার!’

এর প্রত্যুত্তরে কী বলবেন বুঝে না পেয়ে গুটিগুটি বাড়ি ঢুকে পড়েছিলেন! জন্ম-মৃত্যু একই দিনে হয়ে ওই অকূলপাথারে পড়া সংসারটার কী যে সুরাহা হত, সে আজও মাথায় ঢোকেনি শ্যামলীদেবীর!

নাহ, এবার চা না খেলেই নয়! গড়িমসি করে বিছানা ছেড়ে নেমে গ্যাসে চায়ের জল বসালেন শ্যামলীদেবী। চারটে বাজলেই আবার খাবার জল ধরতে হবে। ভুলে গেলেই জল ফুড়ুৎ, পরের জলটায় ক্লোরিন না কীসব মেশানো থাকে, খেতে কেমন বিস্বাদ।

শরীরটা যে বেশ ভাঙছে, মাঝে মাঝে ভালই টের পাচ্ছেন শ্যামলীদেবী। আগে সারাদিন হেঁশেল সামলেও দশবার অনায়াসে ছাদে ওঠানামা করে জামাকাপড় রোদে দিয়েছেন। এখন বারদুয়েক ওঠানামা করলেই কেমন বুকে হাঁফ ধরে, মাঝপথে থেমে একটু জিরেন নিতে হয়। উপোষ করলে সন্ধের দিকে শরীরটা কেমন টলটল করে। একা মানুষ, কিছু হলে কে দেখবে— এই সাতপাঁচ ভেবে আর নির্জলা উপোষ করেন না। ছেলে মাঝেমাঝেই বলে— ‘অনেক তো হল! আর এইসব উপোষ করে কী হবে!’ ওই যাকে বলে জাড্যধর্ম! ঝোঁকের বশে করে যান আর কী। নাহ, আজ চায়ের সাথে দুটো বিস্কুট খেতেই হবে, নাহলে শরীরটা আর চলছে না! রাতের জন্য পরোটা করাই আছে, পরে খেলেই হবে। এই আর এক বাতিক শ্যামলীদেবীর। ছেলে কোথাও ফ্লাইটে গেলে ভাত-রুটি কিছু খান না!

ছেলে পইপই করে বলে— ‘এসব করে কী লাভ! তুমি না খেলে কি পাইলট আরও বেশি সাবধানে প্লেন চালাবে? যতসব বাতিক তোমার!’

Advertisement

‘ওসব তুই বুঝবি না’— পাশ কাটানো গোছের উত্তর দেন শ্যামলীদেবী।

‘না বোঝার কী আছে! এ কি রকেট সায়েন্স নাকি? বোঝাতে পারলে ঠিকই বুঝব!’ ছেলেও ছাড়বার পাত্রও না।

আর বেশি কথা বাড়ান না শ্যামলীদেবী, শুধু মৃদু হাসেন একটু। কী করে বোঝান যে, মায়ের অপত্যস্নেহের কাছে এইসব লজিক সবসময় খাটে না!

মোবাইল ফোনটা ট্যাঁ-ট্যাঁ করে উঠল। কোনও মেসেজ এল বোধহয়।

চা নিয়ে ঘরে এসে দেখেন ছেলের মেসেজ— ‘আমি এয়ারপোর্ট পৌঁছে গেছি। আবার বোর্ডিং শুরু হলে জানাব।’

যাক, খানিকটা নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।

জীবনে কোনওদিন এয়ারপোর্টে যাননি শ্যামলীদেবী, প্লেনে চড়া তো দূরঅস্ত! যুগের থেকে পিছিয়েপড়া মানুষ। সাথে একটু ভিতুও। সাঁইসাঁই করে প্লেন উড়ছে ভাবলেই কেমন বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করে। জীবনে কখনও সাহস করে মারপিটের সিনেমা দেখতে পারেননি, সিনেমাতে হঠাৎ মারপিটের সিন এসে গেলে ঝপ করে চোখ বুজে ফেলেন!

যা ওই ছেলের থেকে শুনে শুনেই জেনেছেন— ব্যাগেজ ড্রপ, সিকিরিওটি চেক-ইন হ্যানোত্যানো। বড্ড হ্যাঙ্গাম বাব্বাহ।

‘একটা স্মার্টফোন তো নাও এবার! প্লেনে না চড়ো, প্লেন ওড়ার ভিডিও তো দেখতে পাবে!’ ছেলে মাঝেমাঝে জোরাজুরি করে।

‘আমার মতো আনস্মার্ট লোকের জন্য এই পাতি ফোনই ঠিক আছে!’ খানিকটা এড়িয়ে যাওয়ার মতোই উত্তর দেন শ্যামলীদেবী। ওই ইয়া বড় গাব্দা ফোন হাতে নিয়ে কথা বলতে হবে ভাবলেই কেমন কেমন করে। খালি মনে হয়, এইবুঝি হাত ফস্কে পড়ে ভেঙে দু’খান হয়ে যাবে। বা কোন সুইচ টিপতে কোন সুইচ টিপে ফেলব, ব্যস সব টাকা কেটে নেবে।

অন্যদিন এইসময়টায় একটু এফএম রেডিওতে গান শোনেন শ্যামলীদেবী, বা একটু খবরের কাগজটা নেড়েচেড়ে দেখেন। কিন্তু আজ আর সেই এনার্জি নেই। খাবার জলটা ভর্তি করে আবার বিছানায় এসে শুলেন। বিকেলের আলোটা বেশ মরে এসেছে, কার্তিক মাস পড়ে গেছে, বিকেলের দিকে একটু শিরশিরে হাওয়াও দিচ্ছে। একটা হাল্কা চাদর গায়ে ঢাকা দিয়ে গুটিসুটি মেরে শুলেন শ্যামলীদেবী।

কখন যে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলেন শ্যামলীদেবী, টের পাননি। মোবাইলটা বাজতে তন্দ্রাটা ভাঙল।

হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা নিয়ে দেখেন ছেলের মেসেজ— ‘মা, বোর্ডিং শুরু হচ্ছে, আমি ব্যাঙ্গালোর নেমে আবার জানাব।’

‘আচ্ছা, সাবধানে যাস!’ ছোট্ট একটা জবাব দিয়ে মোবাইলটা পাশে সরিয়ে রাখলেন শ্যামলীদেবী।

ইসস, ছ’টা বেজে গেছে! সারা ঘরটা অন্ধকার, বাইরে স্ট্রিটলাইট জ্বলে গেছে। উঠে জানালাগুলো বন্ধ করলেন, না হলে মশা ঢুকে পড়বে! বেশ কয়েকদিন ধরে বাড়িটায় কথাবার্তায় গমগম করছিল, আজ থেকে আবার কেমন যেন মনখারাপ-করা নিস্তব্ধতা। অ্যাশট্রে-তে পড়ে থাকা সিগারেটের টুকরো, ছড়িয়ে থাকা টুকিটাকি ছেলের জিনিসগুলো কি শূন্যতাকে আরও খানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছে? কে জানে…

আবার বছরখানেকের প্রতীক্ষা, মাঝে শতযোজন ভৌগোলিক দূরত্ব, দিনান্তে একবার ফোনে কথা। আজকাল স্মার্টফোনে ভিডিও কল করা যায়, ছেলে বলে। সে যাই হোক, সামনাসামনি কথা বলার স্বাদ কি আর মেটে! মিষ্টির দোকানের শো-কেসে সাজানো মণ্ডামিঠাই যতই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকো, খাবার স্বাদ কি মেটে?

মাঝেসাঝে ঘরটা যে ফাঁকা লাগে না তা নয়। বাজারে আম-লিচু উঠলে, বর্ষায় পাড়ায় ‘টাটকা গঙ্গার ইলিশ, মাত্র ৯০০ টাকা কেজি’ বলে ফেরিওলা হাঁকলে, এক-আধবার মনে হয় ‘ইসস, ছেলেটা ঘরে থাকলে ভাল হত!’ পরক্ষণেই আবার ভাবেন— ‘নাহ বাবা, দূরে আছে, এই পরিযায়ী জীবনই ভালই আছে, অন্তত কাজটা ঠিক করে করার সুযোগ মিলছে!’ সকাল থেকে খবরের কাগজ খুললেই রাজ্যের দৈন্যদশা চোখে পড়ে। চারদিকে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি, চুরি-জোচ্চুরি, যোগ্য চাকরিপ্রার্থীরা দিনের পর দিন হত্যে দিয়ে পড়ে আছে সুবিচারের আশায়, প্রশাসনের কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই! নিজের ঘরেও একটা ছেলে আছে, ওইরকম চাকরির আশায় হত্যে দিয়ে পড়ে আছে ভাবতে গেলেই কেমন হাড় হিম হয়ে আসে শ্যামলীদেবীর। এ বাবা, তার থেকে ভাল, মাস গেলে কাজের পয়সাটা তো ঘরে আসে বর-ছেলের! ছেলে ভাল বলে— ‘মা, এ জগতে অ্যাবসলিউট ভাল বলে কিছু হয় না!’

তাই সই! আর আজকাল তো কত ছেলেমেয়েই কর্মসূত্রে ভিনরাজ্যের বাসিন্দা। তাদের বাড়ির লোকজনও যেমন চালিয়ে নিচ্ছেন, তিনিও ঠিকই পারবেন সবটা একা সামলে নিতে।

নাহ, এবার বেশ খিদেটা পেয়েছে, এবার কিছু না খেলেই নয়! ঘরের আলোগুলো জ্বেলে রান্নাঘরে এলেন শ্যামলীদেবী। টেবিলে রাখা আজকের খবরের কাগজ। হেডলাইনটার দিকে চোখ গেল। কোনও এক মন্ত্রীর দিনবদলের মধুর প্রতিশ্রুতি।

একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে আবার খাবারের আয়োজন করলেন শ্যামলীদেবী। কাল থেকে আবার একাকী দিন গুজরান। চরৈবেতি, চরৈবেতি…

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

2 Responses

  1. বাঃ, সুন্দর লেখা। গল্পে একাকিত্ব বেশ আস্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকলেও, তারই সঙ্গে প্রচ্ছন্ন আছে মনের আসল জোর জায়গাটি। সেই জোরটি প্রবাসী একমাত্র পুত্রের নিয়মিত দূরভাষী যোগাযোগ; সেইসব মিলিয়ে এই গল্পে এসময়ে বাঙলার দশটি ঘরের নয়টি ঘরের মায়ের বিষন্নতা মিশে আছে। চমৎকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × three =

Recent Posts

গৌতম চক্রবর্তী

দুই হুজুরের গপ্পো

১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই, আলবার্ট আইনস্টাইন বার্লিনের উপকণ্ঠে নিজের বাড়িতে স্বাগত জানান ভারতীয় কবি, দার্শনিক ও সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। তিনি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেল বিজয়ী। তাঁদের এই সাক্ষাৎকারটি ইতিহাসের অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত ও মননশীল আলাপচারিতায় পরিণত হয়, যেখানে তাঁরা বিজ্ঞান ও ধর্মের চিরন্তন দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেন। “সায়েন্স অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান ট্রাডিশন: হোয়েন আইনস্টাইন মেট টেগোর” গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের বিবরণ পাওয়া যায়। এই বইতে বিশ শতকের শুরুতে ভারতের বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণ এবং ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক চিন্তার মেলবন্ধন তুলে ধরা হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আশা ভোসলে ও তাঁর বাংলা গান

সুদীর্ঘ আট দশক ধরে তিনি তাঁর সঙ্গীতের সুধায় ভরিয়ে দিয়েছেন কেবল ভারত বা এই উপমহাদেশকেই নয়, বিশ্বকে। পরিণত বয়সেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর, যেমন কয়েক বছর আগে হয়েছিল তাঁর স্বনামখ্যাত অগ্রজা লতা মঙ্গেশকরের। আশা ভোসলে তাঁর সমগ্র জীবনে বারো হাজার গান গেয়ে গিনেস বুকে স্থান পেয়েছেন। একদিকে ধ্রুপদী সঙ্গীত, অন্যদিকে লঘু, পপ, এমনকী চটুল গানেও তাঁর সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সমসাময়িক কিংবদন্তি শিল্পীদের মধ্যে এজন্য অনায়াসে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

স্প্যানিশ ছোটগল্প: পুতুল রানি

সত্যিকারের আমিলামিয়া আবার আমার স্মৃতিতে ফিরে এসেছে, আর আমি আবার— সম্পূর্ণ সুখী না হলেও সুস্থ বোধ করছি: পার্ক, জীবন্ত সেই শিশুটি, আমার কৈশোরের পঠনকাল— সব মিলিয়ে এক অসুস্থ উপাসনার প্রেতচ্ছায়ার ওপর জয়লাভ করেছে। জীবনের ছবিটাই বেশি শক্তিশালী। আমি নিজেকে বলি, আমি চিরকাল আমার সত্যিকারের আমিলামিয়ার সঙ্গেই বাঁচব, যে মৃত্যুর বিকৃত অনুকরণের ওপর জয়ী হয়েছে। একদিন সাহস করে আবার সেই খাতাটার দিকে তাকাই— গ্রাফ কাগজের খাতা, যেখানে আমি সেই ভুয়ো মূল্যায়নের তথ্য লিখে রেখেছিলাম। আর তার পাতার ভেতর থেকে আবার পড়ে যায় আমিলামিয়ার কার্ডটি— তার ভয়ানক শিশুসুলভ আঁকাবাঁকা লেখা আর পার্ক থেকে তার বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার মানচিত্র। আমি সেটা তুলে নিয়ে হাসি।

Read More »
যদুনাথ মুখোপাধ্যায়

বিজ্ঞানমনস্কতা কারে কয়?

শ্রদ্ধেয় বসুর বইতে হোমিওপ্যাথি সম্পর্কিত অধ্যায়টি তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্কদের, বিশেষ করে মুদ্রা-মূর্ছনায় মজে থাকা, বা রাজনীতিজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতির দাবেদার-ঘনিষ্ঠ চিকিৎসকদের বিরক্তিকর বা অপ্রীতিকরই মনে হবার কথা। কেননা, উল্লিখিত দুটি বিষয় নিয়ে তাদের মনের গহীন কোণে প্রোথিত বিজ্ঞানবাদিতার শেকড় ওপড়ানোর সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হয়। প্রশ্ন হল, তাঁর উপরিউক্ত বইটির কারণে তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্ক বন্ধুদের চোখে ব্রাত্য বলে চিহ্নিত হবেন না তো? হলে আমি অন্তত আশ্চর্যচকিত হব না। দাগিয়ে দেবার পুরনো অভ্যাস বা পেটেন্ট এই মহলের বাসিন্দাদের প্রধান অস্ত্র, তা ভুক্তভোগীরা হাড়ে হাড়ে জানেন।

Read More »
প্রসেনজিৎ চৌধুরী

অগ্নিবীর: বন্দুকের মুখে ঈশ্বর

১৯৫০ দশকে নেপালের রাজতন্ত্র ও রাজার মন্ত্রিগোষ্ঠী রানাশাহী শাসনের বিরুদ্ধে সফল সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছিল। সেই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন অনেক ভারতীয়। তাঁদের মধ্যে অনেকে বাঙালি। নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই প্রথম সংঘর্ষ সে-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত। ভারত ও চীনের মধ্যে একফালি দেশ নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম সশস্ত্র ও নিরস্ত্র দুই পথ ধরে চলেছিল। ডান-বাম-অতিবাম— ত্রিমুখী রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের চূড়ান্ত সফলতা আসে ২০০৮ সালে রাজার শাসনের অবসানে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারী: এক দৈবী আখর

আমরা ৮-ই মার্চের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে আবহমান নারীবিশ্বকে সামান্য একটু ছুঁয়ে যেতে চাইলাম মাত্র। হাজার হাজার বছর ধরেই তাঁদের ওপর কড়া অনুশাসন, জবরদস্ত পরওয়ানা আর পুরুষতন্ত্রের দাপট। সে-সবের ফল ভুগতে হয়েছে আন্তিগোনে থেকে সীতা, দ্রৌপদী; জোয়ান অফ আর্ক থেকে আনারকলি, হাইপেশিয়া; রানি লক্ষ্মীবাঈ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া; রোজা পার্কস থেকে মালালা ইউসুফজাই— তাঁদের মতো হাজারো নামহীন নারীকে।

Read More »