Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

অন্য চাঁদ, অন্য প্রেম

লেখাটি চাঁদ নিয়ে। তবে যে চাঁদের গল্প এখানে বলব, তা অন্য চাঁদ। আমাদের পৃথিবীর চাঁদ নয়। আমাদের সৌরজগতে রয়েছে দুশোটির বেশি চাঁদ। অধিকাংশ গ্রহেরই চাঁদ রয়েছে, কেবল বুধ (মার্কারি) এবং শুক্র (ভেনাস) ছাড়া। প্লুটো এবং অন্য বামনগ্রহ সহ অ্যাস্ট্রয়েডগুলিরও তুলনামূলক ছোট সাইজের চাঁদ আছে। বৃহদাকার গ্রহ শনি-র (স্যাটার্ন) রয়েছে এক ডজনেরও বেশি সংখ্যক চাঁদ। আমরা বৃহস্পতির একটি চাঁদের কথা বলব। বৃহস্পতি গ্রহ, ইংরেজিতে যাকে আমরা ‘জুপিটার’ বলি, আকার আয়তনের দিক দিয়ে আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ।

চাঁদ যে ‘ন্যাচারাল-স্যাটালাইটস’ বা উপগ্রহ, যা গ্রহদের চারপাশে ঘোরে, তা আমরা সবাই জানি। আমাদের পৃথিবীর চাঁদ যেমন মাত্র একটা। জুপিটারের ধারাপাতে আমাদের পৃথিবী গ্রহের মত ‘এক-এ চন্দ্র’ বললে ভুল হবে। জুপিটারের কিন্তু একটা চাঁদ নয়। জুপিটারের চারপাশে ক’টা চাঁদ ঘোরে, জানেন? মোট ৬৪টা চাঁদ আবিষ্কার হয়েছে এখনও পর্যন্ত। জুপিটারের প্রথম চারটি চাঁদ আবিষ্কার করেছিলেন গ্যালিলিও গ্যালিলি। ১৬১০ সালে। গ্যালিলিওর জুপিটারের চাঁদ আবিষ্কারের আগে অবধি মানুষ জানত একটাই চাঁদ রয়েছে, যা পৃথিবীর। আর একটা কথা বলা দরকার, তা হল আমাদের চাঁদের কোনও নাম না থাকলেও, সৌরজগতে অন্য গ্রহের চাঁদগুলির আলাদা আলাদা নাম দেওয়া হয়েছে। যেমন গ্যালিলিও আবিষ্কৃত চারটি চাঁদের নাম হল Io, Europa, Ganymede and Callisto।

১৯৭৯ সালে জুপিটারের চাঁদ ‘আইয়ো’-র পৃষ্ঠতলের ছবির সঙ্গে পরিচিত হয়েছে মানুষ।

গ্যালিলিও আবিষ্কৃত জুপিটারের চারটি চাঁদের মধ্যে Io (আইয়ো) আলাদা রকমের। ১৯৭৯ সালে ‘ভয়েজার-১’ থেকে জুপিটারের চাঁদ ‘আইয়ো’-র পৃষ্ঠতলের ছবির সঙ্গে পরিচিত হয়েছে মানুষ। এছাড়া ‘আইয়ো’ নিয়ে অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্যও পাওয়া গিয়েছে। জানা গিয়েছে, এই চাঁদ অন্যগুলির থেকে আলাদা রকমের। সেসব কথা থাক। আজ ‘আইয়ো’-কে নিয়ে একটি জমাটি গল্প বলতে চাই। পৌরাণিক গল্পটি বস্তুত দারুণ এক প্রেমকাহিনি। তারপর আবার পরকীয়া!

সরাসরি গল্পে চলে আসি এবার।

হিন্দু পুরাণে যেমন আকাশের দেবরাজ হল ইন্দ্র। বজ্র ও বিদ্যুতের দেবতাও তিনি। লাতিন মাইথোলজিতে সেরকম আকাশের দেবরাজ হল ‘জুপিটার’। গ্রিক মাইথোলজিতে একেই বলা হয় ‘জিউস’। গ্রিক মাইথোলজির একটি চরিত্র ‘আইয়ো’। ঈশ্বরদের রাজাধিরাজ জুপিটারের স্ত্রীর নাম ছিল জুনো। সে ছিল প্রচণ্ড হিংসুটে প্রকৃতির মহিলা। হিংসা হবে নাই-বা কেন? স্বামী জুপিটারের প্রেমিকার সংখ্যা যে অনেক। আসলে জুপিটার কিছুতেই এড়াতে পারত না সুন্দরী মহিলাদের আকর্ষণ। বার বার জড়িয়ে পড়ত প্রেমের ফাঁদে। স্বাভাবিকভাবেই স্ত্রী জুনো সব সময় অবিশ্বাস করে স্বামী জুপিটারকে।

প্রেমিকার সঙ্গে থাকার সময় যাতে সহজে কেউ চিনে ফেলতে না পারে, বিশেষ করে স্ত্রী, তাই নানান কৌশল অবলম্বন করত জুপিটার। কী রকম কৌশল? প্রেমিকার সঙ্গে থাকার সময় ছদ্মবেশ ধারণ করে নিত জুপিটার। কখনও রাজহাঁস, কখনও ঈগল কখনও বা মেঘের রূপে। ‘মৌচাক’ সিনেমার সেই রঞ্জিত মল্লিক আর মিঠু মুখার্জির বাঘের মুখোশ পরা পার্কে প্রেম করার কথা মনে পড়ে যাবে হয়তো পাঠকের।

জুপিটারের প্রেমিকাদের মধ্যে অন্যতম ছিল ‘আইয়ো’। সেই আইয়ো-র প্রেমে পড়ে তখন হাবুডুবু খাচ্ছে জুপিটার। স্ত্রীকে এড়িয়ে প্রেম করার জন্যে এইসময় সে বেছে নিয়েছে একটি দারুণ কৌশল। স্ত্রী যাতে চিনতে না পারে, সেজন্যে জুপিটার কালো মেঘের আদলে নিজের রূপ পরিবর্তন করে নিত। এইভাবে নিজেকে মেঘের আড়ালে রেখে, স্ত্রী জুনোকে লুকিয়ে আইয়োর সঙ্গে মিলিত হত জুপিটার।

একদিন হয়েছে কী, আইয়ো আর জুপিটার ঘনিষ্ঠ হয়ে আছে। এদিকে জুনো পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ দেখতে পেল আইয়োকে। আর আইয়োর পাশেই দেখা যাচ্ছে ঘন কালো মেঘ। স্বামীকে তো ভালই চেনে। সন্দেহ প্রকট হল জুনোর। নির্ঘাত তাঁর গুণবান স্বামী মেঘের রূপ ধরে আইয়োর সঙ্গে প্রেম করছে। জুনো সটান পৌঁছে গেল ওই জায়গায়।

নিজেকে মেঘের আড়ালে রেখে, স্ত্রী জুনোকে লুকিয়ে আইয়োর সঙ্গে মিলিত হত জুপিটার।

যে মুহূর্তে জুনো ওই জায়গাতে পৌঁছল, চতুর জুপিটার তা বুঝতে পেরে, পলকের মধ্যে সে আইয়োকে একটি সাদা গোরুতে রূপান্তরিত করে দিল। যাতে করে স্ত্রী কিছু বুঝতে না পারে। ‘চরিত্রবান’ স্বামীকে তো ভালই চেনে জুনো। পাকা গোয়েন্দার মত জুনো বুঝতে পারল, আইয়োকে ‘গোরু’-তে রূপান্তরিত করে দিয়েছে স্বামী, চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যে। স্বামীর কায়দাটি বুঝতে পেরে, গোরুটিকে দড়ি দিয়ে গাছের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রাখল জুনো।

তারপর ফিরে গিয়ে জুনো তাঁর নিজস্ব ভৃত্য ‘আরগুজ’ দৈত্যকে পাঠাল গোরুটিকে পাহারা দেওয়ার জন্যে। ভৃত্য দানব ‘আরগুজ’-এর ছিল একশোটি চোখ। তবে ঘুমোনোর সময় আরগুজের সব চোখগুলি একসঙ্গে ঘুমাত না। কয়েকটি চোখ খোলা এবং জাগ্রত অবস্থাতে থাকত। জুনো বারবার করে আরগুজকে বলে দিয়েছিল, সে যেন সব সময় সজাগ থাকে যাতে গোরুরূপী বন্দি আইয়োকে চোখে চোখে রাখতে পারে।

জুনো তাঁর নিজস্ব ভৃত্য ‘আরগুজ’ দৈত্যকে পাঠাল গোরুটিকে পাহারা দেওয়ার জন্যে।

এদিকে জুপিটার তার ছেলে মার্কারিকে সেখানে ডেকে পাঠাল, যাতে করে সে গান আর হাবিজাবি গল্প করে আরগুজকে সম্পূর্ণ ঘুমে আচ্ছন্ন করে দিতে পারে। যেন ওর সবক’টি চোখ বন্ধ হয়ে যায়। জুপিটার যেমনটি চেয়েছিল, তাই হল। একের পর এক অজস্র গল্প শোনাতে থাকে মার্কারি। শুনতে শুনতে একসময় আরগুজ গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল। সেই সুযোগে, আরগুজকে হত্যা করল মার্কারি।

যেই না এই খবর জানতে পারল জুনো, প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়ল সে। সঙ্গে সঙ্গে জুনো একটি ডাঁশ মাছি পাঠাল, যাতে মাছিটি গোরুরূপী আইয়োর গায়ে কামড়ে লেগে থাকতে পারে সব সময়। ব্যাস, এতেই দারুণ মুশকিলে পড়ে গেল আইয়ো। অন্যদিকে জুপিটারেরও আর কিচ্ছুটি করার থাকল না। বাধ্য হয়ে জুপিটার, স্ত্রীর কাছে অঙ্গীকার করল যে, সে ভবিষ্যতে আর আইয়োর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখবে না। স্বামীর এই প্রতিজ্ঞার পরে আইয়োকে মুক্তি দিল জুনো। আইয়ো তারপর ইজিপ্টে গিয়ে বসবাস করতে লাগল।

এখানেই গল্পের নটে গাছটি মুড়ল।

চিত্র: গুগল

2 Responses

  1. সৌরজগতের অজানা অজস্র চাঁদের খোঁজ খবর দিয়ে শুরু করে সব শেষে আইয়ো চাঁদের এক তুমুল প্রেম কাহিনী শোনালেন… নতুন এই স্টাইলটা দারুণ লাগল। 🙂❤️

    1. খুব ভালো লাগল আপনি এই লেখার স্টাইলটি নিয়ে বললেন বলে। অনেক ধন্যবাদ জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen − eleven =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাইশে শ্রাবণ

রবীন্দ্রনাথ-ও কিন্তু আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। যে কবি চির আশাবাদী, একটা সময় প্রখর বিষণ্নতা গ্রাস করেছিল তাঁকেও। ইউনানি মতে একবার নিজের চিকিৎসা করান তিনি। তাইতেই এমন মানসিক বিপর্যয়। অবসাদ, কান্না পাওয়া, আত্মহননেচ্ছা, সাময়িকভাবে এসব পেয়ে বসেছিল তাঁকে। পুত্র রথীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানাচ্ছেন তিনি, ‘দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে। মনে হচ্ছে আমার দ্বারা কিছুই হয় নি এবং হবে না। আমার জীবন যেন আগাগোড়া ব্যর্থ।’ কবির এহেন অনুভব, ভাবা যায়? এন্ড্রুজকে লেখা চিঠিতেও এর সমর্থন আছে, ‘l feel that l am on the brink of a breakdown.’

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মোহন রায়হান: এক সুহানা সফর

মোহন রায়হান জীবনযাপনেও দলছুট এক কবি, একলা চলার ব্রত ও অভীপ্সা নিয়ে তিনি পথ চলেন। সেজন্য কম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি তাঁকে, এমনকী কারাবাস ও শারীরিক নির্যাতন, যে জন্য দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য চেন্নাইয়ের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। ‘কবি ছাড়া আমাদের জয় বৃথা’, আপ্তবাক্যটি মোহন রায়হান নামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। মোহন রায়হান কবিতায় সহসা আগন্তুক নন। তাঁর আছে পরম্পরা, ঐতিহ্য, পুরনো দশকসমূহের অনুবর্তিতা আর উত্তরাধিকার। একাত্তর, তার-ও আগের বাহান্নো, বা সাতচল্লিশ পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় যে রেখাপাত ঘটিয়েছে, আলো আর অন্ধকারের কলমকারিতে তার মহাগীত রচিত হয়ে আছে।

Read More »
সালমিন রহমান

বেলুচিস্তান সংকট মোকাবিলা কতটা সহজ

বেলুচিস্তানের সংকটকে কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদ কিংবা কেবল নিরাপত্তা সমস্যার দৃষ্টিতে দেখলে পূর্ণ চিত্রটি বোঝা যায় না। এখানে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন বৈষম্য, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা— সবকিছু একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বাধীন বেলুচিস্তান গঠিত হলে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নতুন রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন বাস্তবতা। অন্যদিকে, পাকিস্তান, চীন, ভারত এবং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও দুই বিখ্যাত বাঙালি

কী অসাধারণ শিক্ষাই না আমরা পেতে পারি, উৎসাহিত হয়ে পারি খেলোয়াড়দের থেকে! একটি উদাহরণ: প্রথম বিশ্বকাপে সোনাজয়ী উরুগুয়ে দলে ছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। তেরো বছর বয়সে মেশিনে তাঁর ডানহাত কাটা পড়েছিল। অদম্য উৎসাহে তিনি ফুটবল খেলেছেন, জাতীয় দলে স্থান করে নিয়েছেন, আর ফাইনালে জয়সূচক গোলটিও তাঁর-ই করা! তাঁর স্বদেশবাসী তাঁকে ডাকতেন— ‘এল ডিভিনো মানকো’, অর্থাৎ একহাত-বিশিষ্ট ঈশ্বর।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আমেরিকার স্বাধীনতা: আড়াইশো বছর

১৬০৭ থেকে ১৭৮৩ পর্যন্ত সময়কাল আমেরিকায় ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক রাজত্ব। আজকের দিনে যে আমেরিকা, তা কিন্তু পুরোটা ব্রিটিশদের দখলে ছিল না। ছিল ভার্জিনিয়া, ম্যাসাচুসেটস, নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া-সহ ১৩টি রাজ্য। আর কানাডার বেশ কিছু অঞ্চল। আমেরিকার অন্যান্য স্থানে ফরাসি, ডাচ, নরওয়েজিয়, সুইডিস উপনিবেশ-ও ছিল। তাছাড়া রাশিয়া আমেরিকার আলাস্কা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত দখল করে। পরে সে আলাস্কা আমেরিকার কাছে বিক্রিও করে দেয়।

Read More »
অপরাজিতা মৈত্র

গোদাবরীর গোমুখে

গঙ্গার মর্ত্যে আগমন নিয়ে যেমন ভগীরথের গল্প, তেমনই গোদাবরীর উৎসস্থলে না এলে জানা যেত না, দক্ষিণের গঙ্গা নিয়েও আছে হাজার গল্প। যে গল্প জানাবে আজও এই অঞ্চলের মানুষ অনেক সময়েই কাছাকাছি আর কোনও পানীয়জল না পেয়ে কষ্ট করে হলেও এই উৎসস্থলে এসেই শীতল এই পানীয়জল নিয়ে যান নিজেদের কাজের জন্য। গঙ্গা বা অন্য নদী সে শুধু ধার্মিক আবেগের কারণে পবিত্র না, হাজার প্রাণীর ‘তৃষ্ণা’ মেটাবার জন্য সে হয়ে ওঠে ‘দেবী’ বা ‘পবিত্র’। সে পথে মিশে যায় হাজার গল্প-কষ্ট কিংবা দিনযাপনের চরম বাস্তবতা।

Read More »