Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ছোটগল্প: মোরগলাল

দারিপা মণ্ডলের মোরগটা মহা ধড়িবাজ, সেয়ানা, আত্মম্ভরি হাবভাব। গোটা কুড়ি মুরগি নিয়ে তার হারেম। কে কার সাথে পালিয়ে যাচ্ছে, নজর রাখছে। ঝুঁটি ফুলিয়ে তেড়ে যাচ্ছে। গাছের ছায়ায় বসে চোখ মটকে বুড়ো ভামের মত পাহারা দেয়। এলাকা টহল মারতে বেরোয় পেছনে ছয়, আট মুরগি যায় এসকর্টের মত।

সেদিন বিকেলে টিপলিগিরি ঘাটে সে মাতলার জল দেখছিল। বর্ষায় ফুলে ওঠা ঘোলা জল। সারাদিন টেম্পো জাল টেনে মাঝিমাল্লা পাড়ে ফিরছে। থকথকে কাদা ঘাটে। মাটির বিরাট গামলায় চিংড়ির মিন। বাজারে লম্পের আলোর তলায় সারি দিয়ে বসবে। কারা এল, কারা লঞ্চ ধরল, কে নৌকো সারাচ্ছে, কে চা খেয়ে বিড়ি ধরাল ধীরেনের দোকানে, গণেশ আর ঝানু বগলা মুদির দোকানের পেছন দিক দিয়ে ঢুকল গাঁজা কিনতে। সবই দেখছিল মোরগলাল। বর্ষার ঘোলা আকাশ থেকে আলো নিভে বিকেলের শুরুতেই সন্ধে নামিয়ে এনেছে। চালবাজ মোরগলাল পাড়ে হাঁটিহাঁটি করতে করতে দেখল, দূরে একটা ভটভটি আসছে। সন্ধের বাতাসে তখন মরচে রং ধরে গেছে। ভেজা সোঁদা বাতাস ভারী হয়ে আছে। বৃষ্টি নামবে। মোরগলাল ঘাঁড় ফুলিয়ে দুপা দেখতে এল। এ তো গোসাবার লঞ্চ। হড়হড়ে কাদায় দুটি বাঁশ একত্র করে বাঁধা। তার ওপর দিয়ে চারটে জুতো পরা পা নড়বড় করতে করতে আসছে। মোরগলাল আন্দাজ করছিল কোনটা ব্যালেন্সের খেলায় ফেল মারবে। প্রথম ছেলেটা দুহাত দুদিকে ছড়িয়েছে। আহা! লম্বু বক খালের ধারে ডানা মেলেছে। পেছনে একটা হাড়গিলে ছেলে তিন ঠ্যাঙা কিম্ভুত একটা জিনিস নিয়ে আসছে। বন্দুক নাকি ওটা? ই-ইঃ জলায় পাখি মারবে, বনবাবুরা ধরবে। হাড়গিলেটা পড়তে পড়তে সামলাল। একদম শেষেরটা হড়কে বাঁশ ধরে ঝুলতে লাগল। সেটা একটা মেয়ে। কিছু বাচ্চা দাঁড়িয়েছিল, হেসে গড়িয়ে গেল। ফুক্কুড়ি দেখো, পায়ে আবার ধাম্বু মত বুট জুতো মেয়েমানুষের। তার সঙ্গীরা পাড়ে উঠে পড়েছে। সেখান থেকে আও বাচ্চা! আও বাচ্চা স্টাইলে উৎসাহ দিচ্ছে। করিম বুড়ো হরেনের চায়ের দোকানে বসেছিল। মাজাটা অর্ধেক তুলে নামবে কিনা ভাবতে ভাবতে বাঁশ মড়মড়িয়ে ভাঙল। মেয়েটা হড়কে পেছনে জলের দিকে চলে গেল। হাচরপাচর করে উঠেও পড়ল। ছেলেগুলো কেউ হাসল না। হনহন করে লাহিড়ীপুরের দিকে রওনা হল। মেয়েটার প্যান্টে চাবড়া কাদা। গর্ভবতী হাঁসের মত দুলে দুলে সেও এগোল। পেছনে বাচ্চাদের হাসাহাসির মাঝখানে করিম উদাস তাকিয়ে বিড়ি ধরাল।

একটানা ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে। বিকেলে যারা ঘাটে নেমেছিল তারা আল দিয়ে হেঁটে চলেছে। বৃষ্টি পড়ছে ঝিরঝির। নদীতে জল অফুরন্ত। পাড়ে ধোঁয়ার মত অদৃশ্য ঘরবাড়ি, হোগলা পাতায় ছাওয়া। নদীর দুধারে বন। ধোন্তল, কেওড়া, গরান গাছের ভূতুড়ে সারি খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জঙ্গলের সীমান্তে। উঁচু বাঁধের রাস্তা নিচে প্রশস্ত প্রান্তর। দম বন্ধ করা বর্ষার বাতাসে গুমোট রহস্যের মায়া ছড়িয়ে আছে।

কীরে? মাঠপাড়া কোথায়? এ তো শুধুই মাঠ। রোগা ছেলেটা বলল। একজন কী উত্তর দিতে গেল। হঠাৎ একটা কানফাটা আওয়াজে সবাই বিমূঢ় হয়ে পড়ল। একশো হাউন্ড ডাকলে এমন হয়। লম্বু গম্ভীরভাবে উত্তর দিল বাঘিনীর মেটিং কল।

দলটা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। গোঁ গোঁ করে জ্বলে উঠল তিনটে মোবাইল। কী একটা হুড়মুড়িয়ে উড়ে এসে মাথার ওপর দিয়ে ওপাশে পড়ল। বাঘের ভীতিতে পূর্ণ মস্তিষ্কে সবাই ভাবল বাঘ। তারা নিঃশব্দে আসে। বাদাবনের বাতাসও এত নিঃশব্দ নয়। জুতোর ভেতর বুড়ো আঙুল নড়লেও তারা টের পায়। সংরক্ষিত বনের বাঘ আর বাদাবনের মামা এক নয়। সে ছোটখাটো। শুলোর সঙ্গে মিশিয়ে তার পিঠে লম্বা কালো লাইন। ঝটপটিয়ে গায়ের ওপর দিয়ে যেটা গেল, মোবাইলের আলোয় দেখা গেল সেটা একটা মোরগ। সে প্রাণীটা আগে আগে কঁক কঁক করে চলল। যেন ভগবান পথ দেখাতে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছে। সবাই একটু কষ্টে হাসতে গেল। সকাল থেকে হেঁটে, ক্লান্তিতে কারও গলায় স্বর ফুটল না।

দূর থেকে দিগন্তের গা ঘেঁষে একটা আলো এগিয়ে আসছে। আকাশ থেকে জোতিষ্ক নেমে এল বুঝি। কাছে এগিয়ে এল কাচ কালো লণ্ঠন।

আবনারা কারা? কোথায় যাবেন ইখানে বাঁধে কী করতিছেন?

আমরা মাঠপাড়া যাব।

তা সে জায়গা ইদিকে কোথায়? তিনি তোম্বা মুখ করে জানালেন, এ তো লাহিড়ীপুর। উলটো দিকি এয়েচেন।

চারজন কালাহারি মরুভূমিতে মরূদ্যানের মত লোকটাকে ছেঁকে ধরল।

লোকটার নাম লক্ষ্ণণ মণ্ডল।

বনবিবি পুজোর রিচ্যুয়ালস তুলতে এসেছে এরা। কাল বনবিবির পুজো। দিনক্ষণ জানা ছিল। বেরিয়ে পড়েছে। লাট অঞ্চলের গাঁয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্য ছিল না। অ্যামেচারিস্ট, রোমান্টিক। গোসাবার থেকে দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে হাঁটছিল। শেষে একটা প্রাইভেট ভটভটি লঞ্চে এদিকে এসে পড়েছে। মাঝির কাছেই শুনেছে মাঠপাড়ায় বড় করে বনবিবির পালা হয়। রাত জেগে মেলা লোক পালা দেখে।

এখানে রাতের মত থাকার জায়গা হবে? টাকা পয়সা যা লাগে…।

লক্ষ্ণণ বলল, আপনারা কি টুরিস নাকি? এখেনে তো হোটেল নাই।

না আমরা ছবি তুলতে এসেছি। রোগা ছেলেটা বলল।

ফিলিম কোম্পানি? মোটে তিনজনা?

হ্যাঁ, মানে আমরা ডকুমেন্টারি, মানে এদিক-ওদিক…

বুঝেছি সেবারা এক হেই উঁচু সাহেব আসছিল অস্টিলিয়া থেকে, ঘুরে ঘুরে একাই সে কত কী ফোটো তুলল। তা আমার বাড়িতে চলুন। আমার বোনকে দেখতে পাত্র আসবে সজনেখালি থেকে। তাই আলো হাতে উজিয়ে এলুম। ভাবলাম বুঝি ছেলের বাড়ির লোক। একা বোকা হয়ে পথ চিনতে পারছে না।

সজনেখালির ভাই ভাই অপেরার ম্যানেজার সমীর গায়েন এসেছে মেয়ে দেখতে। সমীরের বউ কচি একটা মেয়ে রেখে মারা গেছে। আত্মীয়দের চাপাচাপিতে এই বিয়ে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে এসেছে মেয়েটার মুখ চেয়ে। যাত্রাপাগল। উঠোনে ভিড়। তিনজন ডকুমেন্টারি মেকার মোটা চটের ওপর বসে। লক্ষ্ণণের সঙ্গে কথা হয়েছে কাল বনবিবির পুজো দেখতে নিয়ে যাবে। উঁচু দাওয়া পেরিয়ে ভেতরে ছোট ঘর। সেইখানেই পাত্রী দেখা হবে। একটা পায়া ভাঙা টেবিলের পাশে দুটি চেয়ার ভাইবোনের মত দাঁড়িয়ে আছে। একটিতে সমীর আনমনা বসে আছে। বর্ষার গুমোটে ঘামছে। টেবিলে টিনের প্লেটে দুটি আতা সন্দেশ ও দানাদার। দরজার বাইরে বছর বারোর একটি ছেলে লুব্ধ দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে বিনুনি ঝোলানো একটি রোগা মেয়ে হাতে ঢলঢলে চুড়ি পরে এসে ঢুকল। পেছন থেকে শাঁখা পরা হাত তাকে সম্মুখে ঠেলে দিল। মেয়েটি চেয়ারে না বসে দাঁড়িয়ে রইল। দরজার বাইরে সমবেত কণ্ঠ বলে উঠল, বসি পড়, বসি পড়। এক বৃদ্ধ ভিড় ঠেলে এসে ধারাবিবরণী দিতে লাগল।

এবারা মাধ্যমিক পাশ দিল। আরও পড়বে ইচ্ছে আছে। তা যেকোনও রান্না কাজ… বৃদ্ধ আরও কী বলতে যাচ্ছিল। ফরফর করে ঘরে ঢুকল মোরগলাল। পাখার ঝাপটায় লণ্ঠন উল্টে পড়ে নিভল। আলো নেভার একটু আগে সমীর দেখে নিয়েছে মেয়েটার চোখদুটো বেশ ভাসা। দুখের মায়ের চরিত্রে ভালই মানায়।

***

বেলা প্রায় তিনটে বেজেছে। মাঠপাড়ার গণেশ মণ্ডলের উঠোনে অস্থায়ী হোগলা পাতার ছাউনির নিচে টগবগ ফুটছে খিচুড়ি। বাদার ধারে তামাম লোকের উপচে পড়া ভিড়। কলাপাতায় কাটা শশা, কলা বাতাবীর ওপর মাছি উড়ছে। নিতান্ত অপরিসর মাটির ভিতে উঁচু দাওয়ায় দুখানি পাতা ছাউনির ঘর। দিনমানে অন্ধকার। দূরে খরস্রোতা মাতলার পশ্চিমের সীমানা। দীর্ঘ ঝাঁকালো কেওড়া গাছগুলো অপরিচ্ছন্ন জটলায় দাঁড়িয়ে। মেঘমুক্ত আকাশ ভেঙে চড়চড়ে রোদ পড়েছে। দূরে বনের মাথায় কালো মেঘ। সূর্য পশ্চিমে হেলে গেলেই এই উঠোন আলোছায়ার মায়ায় গড়িয়ে যাবে। রঙিন কাগজ কাটা শিকলি ঝুলছে বাঁশের গায়ে। মাঠে সার্টিনের কুচি দেওয়া প্যান্ডেলে বনবিবি, শা জঙ্গলি দাঁড়িয়ে আছে। খিচুড়ি নামার আশায় বুড়োরা দল পাকিয়ে বিড়ি ফুঁকছে। বাচ্চাদের একচোট খাওয়া হয়ে গেছে। দ্বিতীয় বার খিচুড়ি চেপেছে। রাত জেগে রিহার্সাল দিয়ে বনবিবি পালার অ্যাক্টররা ঝিমিয়ে নিচ্ছে। পালা শুরু হতে রাত বারোটা। কয়েকটা জোয়ান লোক হারমনিয়াম ডুগি তবলা বেহালায় প্যাঁ পোঁ করছে। বাচ্চাকাচ্চা সেখানেই মজে আছে। তিন উঠতি ফিল্মমেকার অ্যাঙ্গেল তুলতে ব্যস্ত। চোখের সামনে ছড়ানো চরাচর। দৃশ্যের ভেতর দৃশ্য। পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা লুটে নিচ্ছে ক্যামেরা।

পর পর বছর দুই ঝড় তাণ্ডবে আবাদের বেহাল দশা। নোনাজলে তৈরি জমি খেয়ে গেছে। অঘ্রানের হিমেও ধানের শীষ পুষ্ট হয়নি। আবাদি মানুষ তাই বেপরোয়া। বাদায় ঢুকতে হয় রোজ রাতে। কাঁকড়া, মাছ যা পড়ে সেইটুকুই। সন্ধের এক প্রহর কেটেছে। দারিপা মণ্ডলের ছেলে পাতু মণ্ডল সিনেমা কোম্পানির সঙ্গে জুটে আছে সকাল থেকে। এদিক-ওদিক পথ চিনিয়ে সেই নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিন এই সব ভিটে উঠোন টিমটিম করে। সন্ধে হতে না হতেই আবাদ ঝিমিয়ে পড়ে। জেগে ওঠে বাদাবন। খরস্রোতের জলধারা থেকে কী এক অচেনা আলো আবাদের অন্ধকারকে রহস্যময় করে তোলে। পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়ি ইলেক্ট্রিক ডুম জ্বলে। আজ অবশ্য অন্য ব্যাপার। বড় বড় হ্যাজাক জ্বলছে। বাউলে রসিক মিঞা একপাশে ঝিম হয়ে বসে। বাদায় তার অন্য রূপ। বাঘের মুখে চিৎকার গালিগালাজ, মন্ত্র ছুড়ে মারা, মাথায় গামছার পেখমধরা ফেট্টি। খবরদার! খবরদার! ফেনা ওঠা মৃত্যু থেকে লাশ ছিনিয়ে আনার তাণ্ডব। ডেঙো জমিতে সে গেরস্থ। বাদায় সে পাশবিক শক্তিধর। হাঁটু পর্যন্ত কাদা, গায়ে খড়ি, মুখে থু থু উড়ছে। সবুজ বনের ছাউনির নিচে প্রকৃতির আদিম খেলার খেলোয়াড়। দিগ্বিদিক শূন্য বাঁচা মরার খেলা। গণেশের ভগ্নিপতির আধখাওয়া লাশ রসিক বাউলে ঘাড়ে করে এনে ফেলেছিল নৌকায়। সেদিন তার হার হয়েছিল। গণেশের যেদিন কালীর চরে এক থাবায় চোয়ালের মাংস নেমে গেছিল সেদিন রসিককে বাঘের চেয়ে বিশাল জানোয়ার মনে হয়েছিল। বনের ছাদ ফুঁড়ে আকাশে উঠে গেছিল তার সীমাহীন মাথা। ভাঙাচোরা জোড়া দেওয়া গাল, বাঁ কানের জায়গায় মাংসের পুঁটুলি গণেশ। সে আজ পালায় অ্যাকটিং করবে।

ইন্দ্র আর রনি মাঠের ধার থেকে লংয়ে কিছু শট নিচ্ছে। বনি রসিকের ইন্টারভিউ নেবে তার প্রস্তুতি চলছে। বিড়ির ধোঁয়ার সঙ্গে তামাক পোড়া কটু গন্ধ ভাসছে। গাঁজা চলছে সকাল থেকে। কল্কে ধরে গাঁজা টানতে মেয়েদের এখানে কেউ দেখেনি। বনির চারপাশে লজ্জা লজ্জা মুখে কিছু যুবক দাঁড়িয়ে। গণেশ, পাতু, লক্ষ্ণণ, ভোলা একটানে কল্কে শেষ করে ফেলছে। খালের ধারে নৌকায় বসে রসিকের একটা শট নেওয়া হবে। পাতু আলো ধরে দাঁড়িয়েছে। রাতে বাদায় টাইগার অ্যাটাকের সিন আছে। রসিক গলা ঝেড়ে নারকোল মালার হুঁকোয় কড় কড় শব্দ তুলে সেটি নামিয়ে রেখে, শুরু করেছে… ‘বাঘেরে আমি ঘৃণা করি…, হঠাৎ আকাশ থেকে উড়ন্ত চামচিকের মত কী যেন পাখা ঝাপটে আলোর ওপর ঝাঁপ দিল। পাতুর হাত থেকে লাইট পড়ে চুরমার!

বনি বলল, কী? ওঃ! ভ্যাম্পায়ার নাকি! আমি কখনও ভাল করে চামচিকে দেখিনি!

ইন্দ্র গম্ভীর হয়ে বলল, পাজি মোরগটা! সামথিং রং!

গণেশ দৌড়ে এসে ঘাস থেকে কাচ কুড়োতে লাগল, যেন এখুনি জোড়া দিয়ে দেওয়া যাবে। ফিল্ম কোম্পানির ব্যাগ থেকে থ্রেপটিন বিস্কিট চুরি করে খেয়ে লক্ষ্ণণের ছেলে বাবু আঠারো বার হেগে কাল রাতে কাহিল হয়ে পড়েছিল। বাবু ল্যাগব্যাগ করে ছুটেও তাকে ধরতে পারে না।
রসিক বিরক্ত মুখে বলল, অ্যাই পাতু! সন্দে কালে মোরগ ঘরে দিসনি! ছেড়ে রেখেছিস, বাবুদের কত লোসকান হয়ে গেল!

পাতু অসহায়ভাবে বলল, তা থাকলে তো! বেরিয়ে গিয়ে জলের ধারে চষে বেড়াবে!

লক্ষ্ণণ বলল, এর মাথায় কী আছে বল দিনি! আলো দেখলেই ঝাঁপাঝাপি করে। অ্যাই পাতু যা, গে চট করে চুবড়ি চাপা দিয়ে আয়।

চুবড়ি উবরে পালাবে কাকা!

তালে পায়ে দড়ি বাঁধ।

ইন্দ্র খুব বিনীতভাবে রসিকের দিকে তাকাল। সে বাউলে। সমস্ত আবাদের রক্ষাকর্তা। লোকে তাকে সর্দার মানে। ইন্দ্রর একটা খুব শীলিত আওয়াজ একটু ভেতরের দিক থেকে আসে এবং দন্ত-স-গুলো তালব্য-শ উচ্চারণ হয়। কিন্তু নিজেদের অঞ্চলের ভাষার বাক্যকথা শহুরে লোকের মুখে শুনলে এরা সন্দেহ করে। মন খোলে না। ইন্দ্র অভিজ্ঞতায় দেখেছে। তাই ইন্দ্র এক্সট্রা তালব্য-শ দিয়ে বলল, রাত ১২টায় আপনাদের শো শুরু হচ্ছে তার আগে কি টাইগার অ্যাটাকের শ্যুট করা যাবে। আপনাদের মেকআপ, প্রস্তুতির ব্যাপারটা ভাবা দরকার। কাল সকালে যদিও আমরা চলে যাচ্ছি। খুব ভোরে যদি…

গণেশ শিল্পী মানুষ। অভিনয়ের একটা খিদে আছে। টাইগার অ্যাটাকে ভিকটিমের রোলটা সেই প্লে করবে। বাকিরা সাপোর্ট ক্যারেক্টার। দ্বিজবর পোদ, লক্ষ্মণ মণ্ডল, গণেশ, ভোলা ঢালি চারজন যাবে। জঙ্গলের একটু ভেতরে খালে শ্যুট হবে।

গণেশ বলল, ঝপাঝপ গুণ টানব। ভাটিতে গিয়ে জোতে চলে আসব। এসেই লুঙ্গিটা ছাড়ি নিয়ে দাড়ি বসিয়ে নেমে পড়ব। সে চিন্তা নেই। ও আমি বুঝি। ইন্দ্রবাবু আপনার সাধের জিনিসটা! চাঁদের আলোতে বড় মেঞা হানা দিস্যে দাঁত ছেরকুটে এইটাই ভাল হবে।

বাঘের স্টক শট ব্যবহার করা হবে। আসল বাঘ তো মিলবে না। আর ভোলা ঢাকি বাঘের সাজ পরবে। আলো-আঁধারিতে চিট করে শটটা নেওয়া হবে। কালীর চড়ায় নিয়ে যেতাম ইন্দ্রবাবু। কিন্তু দূর অনেক। চার ভাটি পাঁচ জো।

বনি ইন্দ্রকে সাইডে ডেকে বলল, তুই তো রাতেই করতে চেয়েছিলি, তাহলে এসব বলছিস কেন? দুশো টাকা করে নিচ্ছে তো চারজন!
অ্যাকটারকে পয়সা দিলে হয় না শুধু। কেয়ার দিতে হয়। ওর বাঘে খাওয়া মুখটা ব্যবহার করতে হলে এক্সপ্রেশান চাই। বাঘের প্রতি ওর যেরকম বিদ্বেষ। একটা লোক জগতে শুধুমাত্র বাঘকে ঘৃণা করে, অদ্ভুত। আমাদের ধারণায় আসবে না। ভাইয়ের মাথা বাঘের মুখে, পা ধরে টানাটানি, এই বাস্তবটা আমাদের থেকে বহু দূরে। সত্যি যদি কোনওদিন রিয়েল অ্যাটাক তুলতে পারতাম। আমরা পর্দায় অ্যাটাক তুলি। ওরা জীবনে তুলে রাখে শুকনো ঘায়ের ছাপ।

বনি জয়েন্ট ধরিয়ে বলল, লোকটা জাত অভিনেতা।

ইন্দ্র একটু হেসে চুপ করে গেল।

মাঠপাড়ার একটা পুকুর থেকেই নৌকা ছাড়ল। বড় গাঙের সঙ্গে যোগ আছে পুকুরের। টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। দ্বিজবর নৌকার পাছ গলুইয়ে বসেছে, সামনে লক্ষ্মণ। ভোলা বাঘের মুখোশ পরে পাটাতনে বসে। এ গাঁয়ের উঠতি জামাই সমীর গায়েন মেকআপ করে দিয়েছে। সে আজকের পালার ডিরেক্টরও বটে। বৃষ্টির জন্য ভোলা মাথায় ছালা চাপিয়েছে। তার ওপর গামছার ফেট্টি। কিম্ভুত দেখাচ্ছে।

গণেশ প্রাণবন্ত লোক। সে-ই একা কথা বলছে। বাকিরা চুপ। এত বিশাল নিস্তব্ধতা! চারটে প্রাণীর নড়াচড়া, বিড়ি ধরানো, কাশির শব্দ, গুণ টানার আওয়াজ, গভীর স্রোতে কাগজের টুকরোর মত হারিয়ে যাচ্ছে।

গণেশ বলল, সামনে ছোট খাল। ঢুকিয়ে দি? ভাটিতে আটকে গেলে জোয়ার আসা ওবদি বসে থাকতে হবে। ফিরতি দেরি হবেক্ষণ।

খালে নৌকা ঢুকল। নির্বাক নিস্পন্দ কেওড়ার সারি। সাসপেন্স আর ক্রিয়েট করতে হয় না। চারিদিকেই অব্যক্ত অসহ্য ঘোর সাসপেন্স। কী যেন সর সর শব্দ! অ্যামবিয়েন্সের জন্য গাছের পেছনে ব্যাকলাইট ফিট করা হয়েছে। একটা বাঘের লেজ সহ সিলিউট তোলা হয়েছে। বাস্তবে তা ভোলার ল্যাজ। নৌকার লম্ফটাকে ফোকাস করে শট নেওয়া হল। নৌকার কানায় এক বিরাট মুখ উঁকি দিয়েছে। ঝপ করে লম্ফটা নিভে গেল। বাতাস নেই। কঁক কঁক করে কেমন শব্দ। পাখা ঝাপটে নৌকার গলুইতে বসল মোরগলাল।

দ্বিজবর চেঁচিয়ে গালি দিল। হতচকিত বাঘ ভোলা দাঁড়িয়ে উঠল কাদায়।

এঃ শালো এরে এখেনে কে আনল। গণেশ বলল।

লক্ষ্মণ লম্ফয় কাঠি মেরে বলল, আনতি হয়নি, যেচে এসেছে। এবারা এটাকে জবাই করা লাগবে।

রনি fuck বলে গজদাঁত বের করে হাসতে লাগল।

ইন্দ্র বলল, বুঝলেন গণেশবাবু, মোরগ কিন্তু জঙ্গলের গাছেই থাকত। মানুষই তাকে ধানের টোপ দিয়ে মাটিতে নামিয়েছে। বিশেষ বিখ্যাত সুস্বাদু পাখি।

মোরগের ওপর সবাই ভারি রেগে যায়। সে যেন বাঘের মত মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী। উপরি অনেকগুলো টাকা পাওয়ার ফুটন্ত রক্তোচ্ছ্বাস তাদের শরীরকে বাড়তি চাঙারস যুগিয়েছে, তাতে সে জল ঢালছে বেকার। এ পৃথিবীর আদিম অন্ধকার রক্ষা করতে গিয়ে সে শীঘ্রই জবাই হয়ে যাবে।

***

একমাস পর। ডকুমেন্টারি ফিল্ম ‘দ্য ওয়ার্কার’-এর স্ক্রিনিং হচ্ছে। এডিট টেবিলে বার বার তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে মোরগলালের। প্রায় প্রতি সিনেই ভিড়ের মধ্যে থেকে উঁকি দিচ্ছে। সবে দশ মিনিট পেরিয়েছে। ঝপ করে হলের লাইট নিভে পর্দা অন্ধকার। ওরা তিনজন হেসে উঠল। মোরগটা কি কলকাতায়?

যান্ত্রিক গোলযোগ। পাঁচ মিনিটেই পর্দা চালু হল। পর্দায় দুর্দান্ত ক্ল্যারিওনেট বাজছে। ঝমঝম করে দাঁড় ফেলে মাঝির দল চলেছে বনবিবির বনে। মানুষের মেহনত অনেক ফেস্টিভ্যাল ঘুরবে এখন।

মাঠপাড়া টিপলিগিরি বাজার নিঝুম। উন্নয়নের জিভ চেটে খেয়ে নিয়েছে অন্ধকার। কিন্তু জীবন আরও অনিশ্চিত হয়েছে। মোরগলাল তার ডানায় অন্ধকার ঘনিয়ে, বাঁধ ডিঙিয়ে, লম্বা পা ফেলে জঙ্গলে নামল।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়
Advertisement
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »