Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ছোটগল্প: মিখাইলিচের সাথে এক রাত

রাস্কলনিকভের খোঁজে

—বৎস (সিনক), কিছুক্ষণ আগে এখান দিয়ে এক ছেলে দৌড়ে গেছে। তুমি কি দেখেছ ওকে?

পড়ন্ত বিকেলে পিতেরবুরগের আলো আঁধারে ঢাকা পুরনো রাস্তায় ছবি তুলছিল অভি। পিতেরবুরগকে এদেশের লোকেরা সংক্ষেপে বলে পিতের। কিছুটা বিরক্তই হয় এই সময়ে একজন এসে কথা শুরু করল বলে। সারাদিন জ্বলে পুড়ে ছারখার হতে হতে সূর্যটা এই বিকেলের জন্য অপেক্ষা করে। তখন আর ওর তর সয় না। যত দ্রুত পারে ফিনস্কি উপসাগরে ডুব দিয়ে শরীরটা একটু জুড়িয়ে নিতে চায়। ছবি তোলার জন্য এখন প্রতিটি মুহূর্ত হীরের টুকরোর মত দামি। আর এখন কিনা কোথাকার কোন বুড়ি এসে তাঁর নাতির খবর জানতে চাইছে। শত হলেও অভি অতিথি। অনেক দূর থেকে এসেছে মাত্র কয়েক দিনের জন্য পিতেরে কিছু ছবি তুলতে বলে। শুনেছে এখানকার লোকজন খুব ভদ্র। তাই নিজেকে একটু সামলে নিয়ে উত্তর দিল,

—না, ঠাম্মা (বাবুশকা)— কাউকে তো এদিকে দৌড়ে যেতে দেখিনি।

—একটু ভালো করে খেয়াল করো। ওকে আমার খুব দরকার।

—ও বুঝি আপনার নাতি?

—নাতি না ছাই! আমার সবকিছু লুট করে নিয়ে গেছে। এই বয়সে আমাকে সর্বস্বান্ত করে গেছে।

—তা আপনি পুলিশে খবর দেন না কেন?

—আবার পুলিশ? ওরা আমাকে পাগল বলে তাড়িয়ে দেয়। যাকগে, দুঃখিত তোমার সময় নষ্ট করলাম বলে। দেখি যদি অন্য কেউ দেখে থাকে।

এই বলেই বুড়িটা হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেল। যেন তার কোনও অস্তিত্বই ছিল না। এতক্ষণ অভির মন পড়ে ছিল দেয়ালের গায়ে আলো-ছায়ার বিচিত্র নকশায়। কিন্তু বুড়ি এভাবে চলে যাবার পরেই ওর মনে কৌতূহল জেগে উঠল। ও স্পষ্ট দেখতে পেল বুড়ির কপালে কুঠারের আঘাত। তখনও সেখান থেকে একটু একটু করে রক্ত ঝরছিল।

তাহলে কি এই বুড়ি রাস্কলনিকভের খোঁজে বেরিয়েছে? —মনে মনে বলে উঠল অভি। হঠাৎ করেই ও যেন কোনও এক টাইম মেশিনে চলে গেল উনবিংশ শতাব্দীর পিতেরে। ওর চারিদিকে দেশ বিদেশের যেসব ট্যুরিস্টরা ঘোরাফেরা করছিল, সবাই যেন কোথায় উধাও হয়ে গেছে। চারিদিকে দরিদ্র মানুষের ভিড়। মাঝে মধ্যে দু-একটা ঘোড়ার গাড়ি চলে যাচ্ছে পাশ দিয়ে। সেখান থেকে উঁকি দিচ্ছে ভদ্র ঘরের পুরুষ আর মহিলাদের মুখ। সাদা রাতের এই আলো-আঁধারের খেলা দেখতে সমস্ত বিশ্ব যেন নেমে এসেছে পিতেরের মাটিতে।

ট্রেন টু সাঙ্কত পিতেরবুরগ

অভির মনে পড়ল গত রাতের ঘটনা। ও মস্কো থেকে পিতের আসছিল ট্রেনে করে। যে বগিতে ও আসছিল সেখানেই দেখা এক ভদ্রলোকের সাথে। অভি অবশ্য তখন শিওর ছিল না তাঁকে ভদ্রলোক বলা যায় কিনা। উদ্ভ্রান্তের মত চেহারা। ধুসর চোখ। আর অদ্ভুত সে চোখের দৃষ্টি। ক্যামেরা ফোকাস করতে না পারলে যেমন সবকিছু ঝাপসা দেখায় ওঁর চোখেও যেন তেমন কিছু একটা ছিল। অভির ছোটবেলায় এদের বলত পাগল। পাগল মানে যারা ভাংচুর করে ঠিক তা নয়, যারা ঠিক অন্যদের মত নয়, সব কাজে কর্মে এক ধরনের পাগলামি ভাব। অভি নিজে খুব ভালভাবেই জানে এটা। ছোটবেলায় অনেকেই ওকেও পাগল বলেই ডাকত বা ভাবত। এদের এখনকার নাম মনে হয় অটিস্ট। সে যাই হোক, তাঁকে দেখে ভয়ের উদ্রেক না হলেও বিশ্বাসের উদ্রেক হচ্ছিল না। ভাগ্যিস ওরা এক কামরায় যাচ্ছে না। উনি দাঁড়িয়ে ছিলেন করিডরের অন্য প্রান্তে। বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখছিলেন দ্রুত গতিতে পিছিয়ে যাওয়া লাইট-পোস্টগুলো আর মাঝে মাঝে অভির দিকে তাকাচ্ছিলেন। অভি ঠিক যখন ভাবছিল এগিয়ে গিয়ে ওঁর সাথে কথা বলবে ঠিক সে সময়ই আর-একজন বেরিয়ে এসে ওঁর পাশে দাঁড়াল। দেখেই বোঝা যায় ওরা পূর্বপরিচিত। তবে আগন্তুক আগের জনের মত শান্ত নয়। লাল দুটো চোখ থেকে যেন আগুন বেরুচ্ছে। চেহারায় তার আক্রমণাত্মক ভাব। সেই দেখে অভি আর দেরি না করে নিজের কামরায় ঢুকে গেল।

আচ্ছা গতকালের ট্রেনের দুই দু’জন মিশকিন আর রাগঝিন নয়তো?

মিশকিন আর রাগঝিন— দস্তয়েভস্কির ইডিয়ট উপন্যাসের দুই প্রধান চরিত্র। অনেকের ধারণা ফিওদর মিখাইলভিচ দস্তয়েভস্কি যিশু খ্রিস্টের আদলে মিশকিনের চরিত্র তৈরি করেছেন। রাগঝিনের সাথে তাঁর পরিচয় ইউরোপ থেকে ফেরার পথে ট্রেনে। দু’জনেই দীর্ঘ দিন ইউরোপে কাটিয়ে রাশিয়া ফিরছিলেন। মিশকিন উত্তরাধিকার হিসেবে প্রাপ্ত সম্পত্তি বুঝে নিতে, রাগঝিন সাঙ্কত পিতেরবুরগের অন্যতম সুন্দরী আনাস্তাসিয়া ফিলিপভনার সাথে দেখা করতে।

হঠাৎ করেই কথাটা মাথায় আসতে ও কেঁপে উঠল। সে কী করে সম্ভব। এই একবিংশ শতাব্দীতে ওরা আসবে কোত্থেকে। তাও আবার মস্কো পিতেরের বিলাসবহুল ট্রেনে। অভি নিজেকে চিমটি কাটল। হ্যাঁ, ব্যথা লাগছে। চোখ কচলাল। মিটমিট করে এদিক-সেদিক তাকিয়ে বুঝল চোখের কোনও সমস্যা নেই। কী হচ্ছে এসব? ও কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? না না, তা হবে কেন। আশেপাশে কিছুক্ষণ ছবি তুলে ও যাবে শীত প্রাসাদের ওদিকে। নাস্তিয়া ওর জন্যে অপেক্ষা করবে। নাস্তিয়া মস্কোর মেয়ে। অভির এক ইয়ার নীচে পড়ত। একই সুপারভাইজার ছিল ওদের দুজনের। তবে ছাত্র জীবনে তেমন ওঠাবসা ছিল না। ও অনেক আগেই ফিজিক্স ছেড়ে বিজনেস লাইনে চলে গেছে। তবে ওদের বসের জন্মদিনে বা ইউনিভার্সিটির অনুষ্ঠানে আসে, দেখা হয়, কথা হয়। বর্তমানে পিতেরে থাকে। তাই আসার আগে অভি ওর সাথে যোগাযোগ করেছে। কথা হয়েছে আজ ওরা একসাথে কোথাও ডিনার করবে তারপর নাস্তিয়া ওকে দেখাবে রাতের পিতের। ব্রিজ উঠিয়ে জাহাজ চলাচলের দৃশ্য। আরও অনেক কিছু। সব যখন শেষ হবে তখন ভোরের দিকে অভিকে পৌঁছে দেবে হোটেলে। ছবি তোলা অভির অন্যতম প্রধান হবি। কনফারেন্স বাদে রাতের পিতারের ছবি তোলা ওর এদিকে আসার প্রধান কারণ। তাই অভি আবার নিজেকে চিমটি কেটে মিশকিন, রাগঝিনদের মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল শীত প্রাসাদের দিকে।

স্তারেতস জশিমা

হাঁটতে হাঁটতে অভি এসে দাঁড়াল গ্রিবয়েদভ কানালের সামনে। বিকেলের আলোয় আলোকিত ঘরবাড়ি ভাসছে ওর জলে। ছোট ছোট ঢেউয়ে ওরা দুলছে আর প্রতিমুহূর্তে নতুন নতুন রূপ ধারণ করছে। অভি প্রচণ্ড ভালবাসে এসব ছবি তুলতে। কী করে যে আধা ঘণ্টা সময় কেটে গেল অভি টেরই পায়নি। কানালে চলছে ছোট ছোট বোট। দেশ-বিদেশের ট্যুরিস্ট ভর্তি সেসব বোট থেকে ভেসে আসছে নানা ভাষার বুলি। এ যেন পাখির হাট। চারিদিক থেকে কিচির মিচির শব্দ বাতাসে ভাসতে ভাসতে অভির কানে ঢুকছে অথচ ও কিছুই বুঝতে পারছে না। বিভিন্ন ভাষার শব্দ মিলেমিশে এক রোম্যান্টিক পরিবেশ তৈরি করেছে। হঠাৎ কানালের জলে এক পরিচিত মুখ ভেসে উঠল। রাস্কলনিকভ? ওর পেছনে দাঁড়িয়ে জলে উঁকি দিচ্ছে বলে মনে হল অভির। ও দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। না, কেউ নেই। যেন কেউ ছিলই না। শুধু কিছু চিন দেশের লোক ওর চারিদিকে। ওরা যাচ্ছে সাবর স্পাস না ক্রোভির দিকে। মস্কোয় যেমন রেড স্কয়ারে সেন্ট ভাসিল ক্যাথেড্রাল, পিতেরে তেমনি সাবর স্পাস না ক্রোভি। গড়নের দিক থেকেও অনেক মিল। এর অফিসিয়াল নাম সাবর ভস্ক্রেসেনিয়ে খ্রিস্তভা না ক্রোভি বা খ্রাম স্পাসা না ক্রোভি। এখানেই ১৮৮১ সালের ১ (১৩) মার্চ জার (ৎসার) দ্বিতীয় আলেক্সান্দর আততায়ীর হাতে প্রাণ ত্যাগ করেন। সেই মর্মান্তিক ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতেই এই গির্জা প্রতিষ্ঠিত হয় আর সেটা হয় সমস্ত রাশিয়ার জনগণের দানের টাকায়। জনতার ভিড়ে অভিও সেদিকেই চলে গেল। পাশেই মিখাইলভস্কি গার্ডেন। এই বন্ধ হয় হয়।

দেরি না করে অভি ওখানে ঢুকে গেল বাগানের কিছু ছবি তুলতে। দূরে কে যেন চিৎকার করছে। লোকজন মাতাল হলে সাধারণত এভাবে চিৎকার-চেঁচামেচি করে। কিন্তু কারও কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই সেদিকে। সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। বাচ্চারা আইসক্রিম খাচ্ছে, যুবক-যুবতীরা হাত ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেখে মনে হয় অভি ছাড়া আর কারওই চোখে পড়ছে না ওই লোকটার মাতলামি। হতে পারে দেখে দেখে অভ্যস্ত লোকজন এসব আর গায়ে মাখে না। অভি যে প্রথম মাতাল দেখছে তা নয়। তবে এরকম জায়গায়, যেখানে শত শত মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে সেখানে ও এ দৃশ্য আশা করেনি। তবে এটাও ঠিক ভিক্ষুক জাতীয় মানুষ উপাসনালয়ের আশেপাশেই ঘোরাফেরা করে। অভি দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে মাতাল লোকটাকে। এই গরমেও শীতের পোশাক পরা। হঠাৎ শুভ্র শ্মশ্রুধারী এক বৃদ্ধ এসে সেই মাতালকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন। এত কিছুর পরেও কেউ সেদিকে তাকিয়েও দেখছে না। তাহলে এসব কি শুধুই গল্প? যেন দ্মিত্রি কারামাজভ আর স্তারেতস জশিমা বইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে মিখাইলভস্কি গার্ডেনে। অভি দ্রুত বের হয়ে গেল বাগান থেকে। সূর্যের শেষ আলোয় ঝলমল করছে স্পাস না ক্রোভি গির্জার কুপালা বা গম্বুজ। ছবি তোলার এই তো সময়। অভি গির্জার চারপাশে ঘুরে বেশ কিছু ছবি নিল। শ্বেত রাত্রি দেখতে পিতেরে নেমেছে ট্যুরিস্টদের ঢল। এত মানুষ যে আপেল পড়ার জায়গা পর্যন্ত নেই। সেই ভিড় ঠেলে অভি যাত্রা করল শীত প্রাসাদের দিকে।

আনাস্তাসিয়া ফিলিপভনা

অভি হাঁটছে গ্রিবয়েদভ কানালের পাশ দিয়ে। কানালের জলে রংবেরঙের ছবি ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ও ক্যামেরা বের করে পাগলের মত ছবি তুলতে থাকে। এই ক্যামেরাই একমাত্র বস্তু যার ভেতর দিয়ে তাকিয়ে অভি বাস্তবে ফিরে আসে। আসলে তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যায় পড়ার এই এক সমস্যা। অংকের ফর্মুলা সব সময় মাথায় গিজগিজ করে। এর মধ্যে আবার যোগ হয়েছে উপন্যাসের চরিত্রগুলো। এমতাবস্থায় একমাত্র ক্যামেরাই ওকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে পারে। কিন্তু কনফারেন্সের শেষ রিপোর্টটা শেষ হতে না হতেই অভি বেরিয়ে পড়েছে ছবি তুলতে। নাস্তিয়ার আসতে এখনও অনেক দেরি। শেষ কফি ব্রেক ছিল সাড়ে চারটায়। কিছু একটা মুখে না তুললেই নয়। এখন চারিদিকে লেতনি ক্যাফে। শীতের দেশ। শীতে সব শুধুই ইনডোর। গ্রীষ্ম এলে অনেক ক্যাফেই বাইরে খোলা জায়গায় বসার ব্যবস্থা করে দেয়, আবার অনেকেই শুধুমাত্র গ্রীষ্মের সময়টাতেই হালকা খাবারের দোকান সাজিয়ে বসে। অভি ভাবল এরকম কোথাও গিয়ে চা আর স্যান্ডউইচ খাবে। হাঁটতে হাঁটতে এমন একটা ক্যাফেতে ঢুকতেই কে যেন অভির পিঠে আলতো করে টোকা দিল।

—চলুন আমাদের সাথে বসবেন।

অভি নিজের চোখকানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ওঁকেই তো গতকাল ট্রেনে দেখেছে। আত্মভোলা মানুষ, ধুসর চোখ। তবে তাতে ভালবাসার অন্ত নেই।

—আপনি?

—গতকাল আমাদের ট্রেনে দেখা হয়েছে। তখনই ভেবেছি আলাপ করব। উপমহাদেশের লোকজন তো এদিকে খুব একটা দেখা যায় না!

—আচ্ছা!

—আসলে গতকালের দেখাও তো অপ্রত্যাশিত। আমি তো ভাবিইনি আবার কখনও আমাদের দেখা হবে। আবার যখন দেখা হলই তার মানে এটা কাকতালীয় ঘটনা নয়, এটা সুদবা, ভাগ্য। তাই ভাবলাম আপনার সাথে একটু আলাপ করি।

—আমি নিজেও গতকাল আপনার সাথে আলাপ করার কথা ভাবছিলাম। ভালই হল। একসাথে সময় কাটানো যাবে।

—চলুন আমাদের টেবিলে।

ক্যাফের এক কোণে এক টেবিলে বসে ছিল গতকালের দেখা সেই লোকটি। ওর চোখ এখনও লাল। মনে হয় অনেকদিন ঘুমায়নি। পাশে বসা এক অপূর্ব সুন্দরী যুবতী। টেবিলের পাশে এসে উনি অভির সাথে বন্ধুদের পরিচয় করিয়ে দিলেন,

—রাগঝিন, পারফেন। আমার বন্ধু। গতকাল ট্রেনে পরিচয়। আর ইনি আনাস্তাসিয়া ফিলিপভনা। পিতেরের অন্যতম সুন্দরী।

—আশ্চর্য! আমি যার সাথে দেখা করতে এসেছি তার নামও নাস্তিয়া মানে আনাস্তাসিয়া।

আনাস্তাসিয়া ফিলিপভনা কিছু না বলে মৃদু হেসে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন। অভি আলতো করে চুমু খেল সেই হাতে। রাগঝিন পাশ থেকে বললেন,

—আর এ আমাদের লেভ নিকোলায়েভিচ মিশকিন। এতদিন ইউরোপে ছিলেন। গতকাল মাত্র রাশিয়া ফিরে এসেছেন।

—খুব খুশি হলাম আপনাদের সাথে পরিচিত হয়ে। তা লেভ নিকোলায়েভিচ, আপনি কি আনাস্তাসিয়া ফিলিপভনার সাথে অনেক দিনের পরিচিত?

—না। আজ সকালেই জেনারেলের বাসায় ওনার ছবি দেখছি। দেখেই ভাল লেগে গেছে। বলতে পারেন ভালবেসে ফেলেছি। অবাক হচ্ছেন তো?

—না না, অবাক হবার কী আছে! আমি নিজেও প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে একটা ছবির প্রেমে পড়েছিলাম।

—তারপর?

—তারপর আর কী? সেই থেকে ভালবেসেই যাচ্ছি।

—উনি আপনার স্ত্রী?

—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম শুনেছেন? বাংলার সেরা লেখক। আপনাদের পুশকিনের মত। উনি কি বলেছেন জানেন? ‘যাকে ভালবাসো তাকে কখনও বিয়ে কোরো না।’

—তবে আপনাকে মানতেই হবে যে ভালবাসতে পারার মধ্যেই আসল মজা, এতেই সব সুখ, যেটা অন্যের ভালবাসা পাওয়ার মধ্যে সব সময় থাকে না।

—যেমন?

—দেখুন, মানুষ যখন অন্যকে ভালবাসতে পারে এর অর্থ তার হৃদয় এখনও মরে যায়নি। মনুষ্যত্বের ফল্গুধারা এখনও তার মধ্যে বইছে। আজ যখন চারিদিকে সব কিছু যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে, মানুষ সব কিছু ভুলে ছুটছে টাকা, যশ আর ক্ষমতার পেছনে, মানুষ পরিণত হচ্ছে রোবোটে, তখন অন্যকে ভালবাসতে পারা কি একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে সুখের সংবাদ নয়?

অভি কী একটা বলতে যাচ্ছিল, তখনই ওয়েটার এসে জানতে চাইল,

—আপনি কি কিছু অর্ডার দেবেন?

অভি আবিষ্কার করল টেবিলে সে একা বসে আছে। কখন যে তিনজন জলজ্যান্ত মানুষ হাওয়া হয়ে গেছে সে খেয়ালই করেনি! অপ্রস্তুত অভি বলল,

—আমি বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছি। ও এলেই আপনাকে জানাব। ধন্যবাদ।

নাস্তিয়া

—অভি তুমি এখানে? আমি তোমাকে তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছি।

বলতে বলতে ক্যাফেতে ঢুকল নাস্তিয়া। নাস্তিয়া সেই আগের মতই আছে। হাসিখুশি। গাঢ় নীল চোখ। কোঁকড়ানো সোনালি চুল। ওরা ছিল দুই বোন। যমজ। ওর বোন পড়ত ফিললজি ফ্যাকাল্টিতে। মাঝেমধ্যে অভি ওর বোনকে নাস্তিয়া মনে করে ডেকে বোকা বনে যেত। ছাত্রজীবনে ওদের তেমন বন্ধুত্ব ছিল না। কথা হত মূলত কাজ নিয়ে মানে থিসিসের কাজ কেমন চলছে এসব ব্যাপারে। ব্যক্তিগত বিষয়ে কথাবার্তা হত না কখনও। এখন অনায়াসে নিজেদের কথা বলে, ছেলেমেয়েদের কথা বলে। যদি ছাত্রজীবনে নাস্তিয়াকে ডিনারে ডাকতে অভি সংকোচ বোধ করত, এখন সেটা করে না। যেকোনও পরিচিত প্রাক্তন ছাত্রের সাথে দেখা হওয়া মানে অতীতের সাথে সাক্ষাৎ। তখনকার শিক্ষকদের, সমবয়সী ছাত্রছাত্রী বন্ধুবান্ধবদের খবরাখবর আদানপ্রদান। তাই যখন সুযোগ আসে সেই সময়ের পরিচিত কারও সাথে দেখা করার, অভি সানন্দে সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে।

নাস্তিয়া অভির ঠোঁটে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল,

—কী ব্যাপার। অন্য কারও জন্য অপেক্ষা করছিলে নাকি?

—না তো! কেন?

—তোমাকে দেখে কেমন যেন পাজল্ড মনে হচ্ছে।

—ও কিছু না।

—কিছু একটা নিশ্চয়ই ঘটেছে। বলো না খুলে।

—তোমার এমন কখনও হয় যেন তুমি টাইম মেশিনে করে অতীতে চলে গেছ?

—বুঝেছি। আসলে পিতেরের পরিবেশ একেবারেই ভিন্ন। মস্কোর মত নয়। এখানকার রাস্তাঘাট, দোকানপাট, মানুষ সব আমাদের অতীতে নিয়ে যায়। তাছাড়া খেয়াল করলে দেখবে কত লোকজন এখানে আঠারো বা উনিশ শতকের পোশাক পরে ঘুরাফেরা করছে। এটাকে বলে ভিদেনিয়ে। স্বপ্ন নয় আবার বাস্তবও নয়। জেগে জেগেই তুমি নিজের দেখা বা পড়া কোনও অতীত ঘটনার মাঝে গিয়ে উপস্থিত হও। বিশেষ করে শ্বেত রাত্রির দিনগুলোতে অনেকের সাথেই এমনটা ঘটে।

—বুঝেছি। তোমার সাথেও এমনটা ঘটে?

—হ্যাঁ।

—তাহলে আমার সাথে যদি এমনটা ঘটছে বুঝতে পার তবে সেটাকে শেষ পর্যন্ত উপভোগ করতে দিয়ো।

ওরা হাঁটতে শুরু করল শ্বেত প্রাসাদের দিকে। ব্রিজ খোলার আগেই ওরা চলে যাবে ইসাকিয়েভস্কি সাবরের ওদিকে। সেখান থেকেই উপভোগ করবে রাতের পিতের।

অভি অবাক হয়ে খেয়াল করল ওদের কমন বন্ধুর সংখ্যা একেবারে কম নয়। অভি যে ফ্যাকাল্টিতে পড়ত, মানে ফিজ-ম্যাথে তিনটে সাবজেক্ট ছিল— পদার্থবিজ্ঞান, গণিত ও রসায়ন। কিছু কিছু ক্লাস— যেমন ইতিহাস, দর্শন— এগুলো হত একসাথে। তাই নিজের ইয়ারের অনেকের সাথেই অভির পরিচয় ছিল। বিশেষ করে যারা হোস্টেলে থাকত ওরা অভির ওখানে নিয়মিত আসত চা খেতে। অভি দেশ থেকে খাঁটি ইন্ডিয়ান বা বাংলাদেশি চা আর কফি পেত নিয়মিত। সেটাই ছিল এসব টি-পার্টির মূল কারণ। দু-এক বছর সিনিয়র বা জুনিয়রদের সাথে তেমন দহরম না থাকলেও পরিচয় ছিল। আসলে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা ক্লাসের বাইরে বেশিরভাগ সময় নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিয়ে কাটাত বলে শতাধিক দেশের ছেলেমেয়েদের, তাদের সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হবার অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অভি সেটা মিস করেছে। তবে নাস্তিয়া যখন একের পর এক বিভিন্ন নাম বলতে শুরু করল, ওদের মুখ মুহূর্তের মধ্যে ভেসে উঠল অভির মানসচক্ষে। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে কফির আড্ডা, একসাথে সিনেমা দেখতে যাওয়া কত কী! কথা বলতে বলতে ওরা দুজনেই ফিরে গেল গত শতাব্দীর আশির দশকে। কথা হল প্রিয় শিক্ষকদের নিয়ে। সময় যেন থমকে দাঁড়াল। আর যখন সম্বিৎ ফিরল ওদের সামনে ঝলমল করে জ্বলতে লাগলো ইসাকিয়েভস্কি সাবরের উজ্জ্বল আলো।

ইসাকিয়েভস্কি সাবর

রাতের আকাশে ঝলমল করছিল ইসাকিয়েভস্কি সাবর। অভি এদিক-সেদিক ঘুরে জায়গা ঠিক করছিল কোত্থেকে ছবি তুলবে। এক সময়ে জায়গা ঠিক করে ও ট্রিপড বসাতে শুরু করল। নাস্তিয়া পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করতে শুরু করল।

এবার নিয়ে অভি চার বার পিতেরে এসেছে আর প্রতিবারই দেখেছে ইসাকিয়েভস্কি সাবরে মেরামতের কাজ চলছে। যার ফলে এখনও পর্যন্ত ও এই সাবরের ভেতরে ঢুকতে পারেনি।

বর্তমান ইসাকিয়েভস্কি সাবর চতুর্থ স্থাপনা। প্রথম সাবর স্থাপিত হয় পিতর পিয়ারভি বা পিটার দ্য গ্রেটের আদেশে ১৭০৬ সালে ১০ হাজার লোকের শ্রমে আডমিরাল্টির শিপইয়ার্ডগুলির জন্য। এখানেই ১৭১২ সালে পিতর আর ইয়েকাতেরিনা আলেক্সেভনার বিবাহ সম্পন্ন হয়। এই সাবরের স্থপতি ছিলেন হল্যান্ডের হেরমান ভন বলাস। এটা ছিল কাঠের তৈরি একতলা সাবর।

প্রথম সাবর দ্রুত নষ্ট হয়ে গেলে ১৭১৭ সালে দ্বিতীয় সাবর তৈরি করা হয়। এটা ছিল পাথরের সাবর। পিতর পিয়ারভি নিজ হাতে সবরের জন্য ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন আর এই নতুন সাবর ইসাকি দালমাতস্কির উৎসর্গ করেন। তখন থেকেই এই সাবর ইসাকিয়েভস্কি সাবর হিসেবে পরিচিত হয়।

১৭৬১ সালে সিনেট ইসাকিয়েভস্কি সাবর পুনর্নির্মাণের জন্য সাভা চেভানকিনকে আহ্বান জানিয়ে আদেশ জারি করেন। তিনি সাবরের জন্য নতুন জায়গা নির্ধারণ করেন নদীর তীর থেকে বেশ দূরে। এখানেই বর্তমানের ইসাকিয়েভস্কি সাবর অবস্থিত। এই নির্মাণ কাজ শুরু হয় সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় ইয়েকাতেরিনার শাসনকালে। তিনি মার্বেল পাথরের সাথে অন্য পাথর ব্যবহার করে নতুন সাবর তৈরি আদেশ দেন। কাজ শুরু হয় ১৭৬৮ সালে। ১৮০২ সালে নির্মাণকার্য শেষ হয়। কিন্তু তার আগেই সাবর নিয়ে হাসাহাসি শুরু হয়ে যায়। ফলে তখনই এই সাবর নতুন করে তৈরির জন্য জনমত গড়ে উঠে।

১৮০৯ সালে নতুন সাবরের স্থাপত্যের জন্য প্রোজেক্ট আহ্বান করা হয়। সে সময়ের রাশিয়া ও ইউরোপের নামকরা স্থপতিরা এতে অংশ নেন, কিন্তু জার আলেক্সান্দর পিয়ারভি সব প্রোজেক্ট বাতিল করে দেন। জারের আহ্বানে অগুস্ট মনফেরান ১৮১৮ সালে নতুন সাবরের প্রোজেক্ট তৈরি করেন। ১৮১৯ সালে নতুন সাবরের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। তবে মাঝখানে প্রোজেক্টে বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়। ১৮২৫ সালে মনফেরান পরিবর্তিত প্রোজেক্ট পেশ করেন এবং তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ১৮৫৮ সালে জার দ্বিতীয় আলেক্সান্দারের উপস্থিতিতে সাবরের স্যাঙ্কটিফিকেশন সম্পন্ন হয়। সোভিয়েত আমলে সাবর মিউজিয়ামে পরিণত করা হয়।

অভি যখন ঘুরে ঘুরে রাতের সাবরের ছবি তুলছিল নাস্তিয়া ওর পাশে দাঁড়িয়ে বলে যাচ্ছিল ইসাকিয়েভস্কি সাবরের ইতিহাস, তার জীবনবৃত্তান্ত। একবার ক্যামেরা থেকে চোখ তুলে অভি দেখবে নাস্তিয়া কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। বয়স বছর কুড়ি হবে। ওর সোনালি চুল সাবরের আলোয় ঝলমল করছে। তবে ওর বিষণ্ণ নীল চোখদুটি বলে দিচ্ছে ওর দুঃখের কথা, ওর হতাশার কথা। অভি যখন ভাবছে মেয়েটার কাছে গিয়ে জানতে চাইবে কী হয়েছে, ঠিক তখনই ভুঁই ফুঁড়ে এক যুবক এসে হাজির হল মেয়েটির সামনে,

—সোনিয়া, লক্ষ্মীটি তুমি আমার কথা শোনো।

—কী শুনব বলো। তুমি যা করেছ তারপরেও আমাকে বলছ তোমার কথা শুনতে, তোমাকে বিশ্বাস করতে?

—কিন্তু আমার কি অন্য কোনও উপায় ছিল? এই বুড়ি আজ হোক, কাল হোক এমনিতেই মারা যেত। সে নিজে কখনই এই সম্পদ ভোগ করার সুযোগ পেত না। আমি তো ওর সব কিছু নিয়ে যাইনি। নিজের পড়াশুনার জন্য, নিজে মানুষের মত মানুষ হবার জন্য যেটুকু দরকার সেটা নিয়েছি। তা না হলে জীবনের শুরুতেই হয়তো আমাকে মরে যেতে হত। সেটা কি কম দুঃখজনক হত!

—তাই বলে একজন জলজ্যান্ত মানুষকে খুন করা? হয়তো তোমার উদ্দেশ্য সত্যি সত্যিই মহান, তাই বলে মানুষের জীবনের বিনিময়ে?

—দেখো, ৎসেল অপ্রাভদিভায়েত স্রেদস্তভা, লক্ষ্যই উপায়ের যৌক্তিকতা, তার ন্যায্যতা নির্ধারণ করে।

—হুম। কিন্তু এটা তো আমাদের জানার কথা নয়। সেটা বলেছিলেন স্ট্যালিন অনেক যুগ পরে।

—কিন্তু আমরা তো আর সেই যুগ পেরিয়ে নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছি।

—তারপরেও, অন্যায় অন্যায়ই।

—আচ্ছা, মানুষ যখন যুদ্ধে নামে তখন কত লোক হত্যা করে। করতে হয়। তাকে কি খুনি বলবে যদি সে পরবর্তীকালে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। সে যদি শান্তিপ্রিয় নাগরিক হয়। ন্যায়ের পথে চলে দেশ ও দশের সেবা করে। আমি তো নিজেকে সে পথেই নিয়ে যেতে চাই, লেখাপড়া করে দেশের একজন সুনাগরিক হতে চাই।

এই বলে ছেলেটি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সোনিয়ার সামনে। সোনিয়া কিছু বলল না। মুখ ঘুরিয়ে সাবরের দিকে তাকিয়ে রইল। অভির আর চুপ করে থাকতে পারল না। সে এর মধ্যেই বুঝে গেছে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাস্কলনিকভ আর সোনিয়া। তার মনে পড়ল সন্ধ্যার ঘটনা। তাই সে বলল,

—না না, তুমি খুনি নও। সেই বুড়ি বেঁচে আছে। আমি তাঁকে আজ সন্ধ্যায়ই দেখেছি।

—কার সাথে কথা বলছ তুমি অভি?

রাস্কলনিকভ, সোনিয়া কেউ কোথাও ছিল না। ওর সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিল নাস্তিয়া। ও দুহাতে অভির মাথাটা ধরে নিজের বুকে টেনে নিল।

—তুমি খুব ক্লান্ত। বাসায় যাবে?

—না। চল নদীর দিকে যাই!

রাতের পিতের। আলো আঁধারে লুকিয়ে থাকা পিতের। এখানে সেখানে হাঁটছে লোকজন। নাস্তিয়া অভির হাতটা নিজের হাতে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল নেভা নদীর দিকে।

পিওতর দ্য গ্রেট

ইসাকিয়েভস্কি সাবর থেকে হাঁটতে হাঁটতে ওর চলল পিওতর দ্য গ্রেটের স্ট্যাচুর কাছে। ঘোড়ার পিঠে বসে আছেন তিনি। ঘোড়ার পায়ের নীচে বিশাল এক সাপ। রাতের আলোয় পিওতরকে একেবারে অন্যরকম লাগছে। অভি চারিদিকে তাকিয়ে দেখছে কীসের ছবি তোলা যায়। আর নাস্তিয়া পাশে হাঁটতে হাঁটতে ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করছিল। গল্পের এক পর্যায়ে নাস্তিয়া জিজ্ঞেস করল,

—তোমার কাতিয়ার কথা মনে আছে?

 

—কোন কাতিয়া?

—কেন, তোমাদের সাথে রসায়নে পড়ত। কালো চুলের সেই মেয়েটা।

নাস্তিয়ার কথায় ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল ছাত্রজীবনের দিনগুলি। অভি ফিরে গেল ভার্সিটির প্রথম বর্ষে। ওর মনে পড়ল একসাথে স্কি করার কথা। সেটা ১৯৮৪ সালের শীত। ওরা গেছে স্কি করতে। হোস্টেলের পেছনে বনের ভেতর দিয়ে গিয়ে লেক পরিক্রম করে ওরা ফিরছে স্টেডিয়ামে। অভি সবেমাত্র স্কি করতে শিখছে। একটু এগুলেই পায়ে পা জড়িয়ে পড়ছে, পড়তে পড়তে কোন রকমে সামলে নিচ্ছে নিজেকে। ওর পাশ দিয়ে একের পর এক বেরিয়ে যাচ্ছে ওর রুশ ইয়ারমেটরা। অভিকে এ অবস্থায় দেখে কাতিয়া এগিয়ে এল সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে। সবাই চলে গেলে কাতিয়া একা রয়ে গেল অভির সাথে।

 

—তুমি কে?

—আমি অভি।

—না না, আমি জানতে চাইছি তুমি কোন সাবজেক্টে পড়বে, হেসে বলল কাতিয়া।

—পদার্থবিদ্যায়।

একটু একটু করে অনেক কথাই বলল অভি ওর ভাঙা রুশ ভাষায়। ওর কালো চুল, কালো চোখ অভির মনে এক গভীর ছাপ রেখে গেল। কালো চুলের সেই ককেসাসের মেয়েটাকে দেখলেই ওর বুকের ভেতর কী একটা তরঙ্গ খেলে যেত। একদিন রুমমেট ঝেনিয়াকে কাতিয়ার প্রতি ওর দুর্বলতার কথা বলায় ও বলল,

—ওদিকে না তাকানোই ভাল। অযথা কষ্ট পাবি।

—কেন?

 

—এরা সোভিয়েত ইউনিয়নের উঁচুতলার লোক।

—তোদের না শ্রেণিহীন সমাজ।

—সেটা মুখে মুখেই।

—কিন্তু কাতিয়ার সাথে এর সম্পর্ক কী?

—ও হল স্পারতাকের অন্যতম কর্মকর্তা নিকোলাই স্তারসতিনের নাতনি।

—কিন্তু ওকে দেখে তো ককেসাসের বলে মনে হয়।

—ওর বাবা ওই অঞ্চলের লোক। যাকগে, তার চেয়েও বড় কথা সেরগেই কারালিওভের নাতির সাথে ওর সম্পর্ক। কিছুদিন পরেই ওদের বিয়ে হবে বলে শুনেছি।

 

অভি আর কোনও কথা বলেনি। কিছুদিন পরে কাতিয়া সত্যি সত্যিই অন্য কোথাও চলে যায়। মনে মনে এক দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে অভি যখন পৃথিবীতে নেমে এল, একটু লাজুক কণ্ঠে নাস্তিয়াকে বলল,

—ঠিক জানি না। আদনাক্লাসনিকিতে একবার ওকে দেখেছিলাম। ছবি দেখে মনে হল অনেক সন্তানের মা। এর বেশি কিছু জানি না।
নাস্তিয়ার দুষ্টুমিতে ভরা চোখ দেখে অভি বুঝল ঝেনিয়া কাতিয়ার প্রতি ওর দুর্বলতার কথা গোপন রাখেনি।

পিওতর দ্য গ্রেটের এই ভাস্কর্যের নাম ব্রোঞ্জের অশ্বারোহী। ঘোড়সওয়ার পিতের যেন নেভা নদীর দিকে তাকিয়ে আছেন। ভাস্কর এতেন ফালকোনে ১৭৬৮ – ১৭৭০ এই দু’বছরে পিওতরের মডেল তৈরি করেন। কাজটি সম্পন্ন করতে তাঁকে সাহায্য মেরি আন কল্লো আর ফিওদর গরদেয়েভ। ১০.৪ মিটার উঁচু এ মূর্তির উন্মোচন হয় ১৭৮২ সালে। এতে খোদাই করে লেখা আছে, ‘প্রথম পিওতরকে দ্বিতীয় ইয়েকাতেরিনা।’ এটা এক সময় ছিল পিতেরবুরগের সিম্বল মত। বিভিন্ন সময়ে রুশ কয়েনে ব্রোঞ্জের অশ্বারোহী শোভা পেয়েছে। এর মধ্যে ১৯৯০ সালে রুশ সাম্রাজ্যের ৫০০ বছর পূর্তি

 

উপলক্ষ্যে ১০০ রুবলের সোনার মুদ্রা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ১৯৮৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ১৯৯৪ ও ২০০৩ রাশিয়ার মুদ্রায় এই ভাস্কর্য স্থান পায়। এর বাইরেও জার রাশিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও নতুন রাশিয়ার বিভিন্ন ডাক টিকেটে স্থান করে নিয়েছে ব্রোঞ্জের অশ্বারোহী। এর আগে যে তিনবার অভি লেনিনগ্রাদ বা পিতেরে এসেছে, সব বারই এখানে ঘুরে গেছে। এই রাতে উজ্জ্বল আলোতে ঝলসে যাওয়া পিওতরের সামনে দাঁড়িয়ে অভি সেসব দিনের কথা ভাবছিল আর ওর চোখের সামনে ভাসছিল ছাত্র জীবনের বন্ধুদের মুখ। মাঝে মাঝে নাস্তিয়ার কথা ভেসে আসছিল অভির কানে। তবে নাস্তিয়া ঠিক কী যে বলছিল ও বুঝতে পারছিল না। বাইরে থেকে অবশ্য যে কেউ ভাবতে পারে অভি এক নিবিষ্ট মনে ছবি তুলছে। হ্যাঁ, ও প্রায়ই ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখছিল, মাঝেমধ্যে দু-একটা ছবিও তুলছিল, তবে প্রায়ই কেন যেন অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল। কেন? হঠাৎ নাস্তিয়া কাতিয়ার কথা বলায়, নাকি লেনিনগ্রাদের অতীত স্মৃতি মনে করে? অথবা অন্য কিছু ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল? ক্যামেরার একটা অসুবিধা হল ওর ভেতর দিয়ে অনেক কিছু স্পষ্ট দেখা যায়। আর যদি টেলি বা জুম লেন্স লাগানো থাকে, তবে তো কথাই নেই। এখন এখানে লোকের ভিড়। সবাই এদিকে এসে ভিড় করছে ব্রিজ খোলা দেখবে বলে। এটা গ্রীষ্মের পিতেরের এক অনন্য আকর্ষণ। শ্বেত রাতে ঘুরে বেড়ানো, আর নেভা নদীর বুক বেয়ে ফিনস্কি জালিব থেকে লাদঝস্কয়ে ওজেরা পর্যন্ত ছোট বড় বিভিন্ন মাপের জাহাজের চলাচল করার দৃশ্য। অনেকেই এ সময় বিভিন্ন মাপের বোট ভাড়া করে নদী থেকে এসব দৃশ্য দেখে। আবার নদীর দু’ ধারেও ভিড় জমায় অগণিত মানুষ। নদীর ধারে শত শত মুখ আর মনের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের ভিড়ে হঠাৎ অভির চোখে পড়ে একজন মানুষের ক্লান্ত মুখ। মনে হয় না তিনি এখানে আনন্দ ভ্রমণে এসেছেন। তাঁর দু’চোখে উদ্ভ্রান্তের মত দৃষ্টি। মানুষ হঠাৎ সব কিছু হারালে যেমন হয়, ঠিক তেমনটা। কিন্তু এই মুখ অভির পরিচিত নয়, ও এ মুখ দেখেনি, কোনও গল্পে এমন মুখের বর্ণনা পড়েনি। কে? কে হতে পারে এই লোক? এ যেন শাপমোচন নাটকে বসন্ত উৎসবে অপূর্ব সুন্দর মানুষদের মধ্যে কদাকার একজনের হঠাৎ আগমন। তাঁর উপস্থিতি যেন শ্বেত রাতের এই আনন্দ উৎসবের ছন্দপতন ঘটাচ্ছে। অভি অনেক চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছে না, কেন যেন তার মানসচক্ষে বারবার ভেসে উঠছে এই মুখ।

 

—কী হয়েছে?

—কই, কিছু হয়নি তো।

—হয়েছে। আমি তো বুঝতে পারছি। কিছু দেখেছ?

—হ্যাঁ, খুব পরিচিত একটা মুখ তবে মনে করতে পারছি না কোথায় দেখেছি।

—পেরভের কথা মনে আছে?

—উনিশ শতকের রুশ শিল্পী?

—হ্যাঁ। তাঁর কোন ছবি? দস্তয়েভস্কি?

 

—হ্যাঁ, অনেকেই এখানে ওনাকে দেখতে পান। বিশেষ করে শ্বেত রাতে।

—কিন্তু এখানে কেন?

—পাশেই একটা ক্যাসিনো আছে।

—বলতে চাও উনি এখানে খেলতে আসেন? হতে পারে। উনি তো নামকরা খেলোয়াড়। জীবন নিয়েই কি কম খেলেছেন?

অভির চোখের সামনে ভেসে উঠল বাবুশকা, আলেক্সেই ইভানভিচ আর পলিনার মুখ। কখনও সে মুখগুলো জেতার আনন্দে জ্বলজ্বল করছে, কখনও চুপসে যাচ্ছে হারার ব্যথায়। ‘জেরো, জেরো’— চিৎকার করে উঠছেন বাবুশকা। জীবন তার সত্যিই আজ শুধুই খেলা। এক রাতের এই বিরল অভিজ্ঞতায় অভিরও মনে হচ্ছে জীবনটা কিছু নয় শুধু খেলা আর খেলা। নাস্তিয়ার ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেরে অভি তাকাবে সামনের দিকে। একজন লোক ধীরে ধীরে আধা আলো আধা অন্ধকারে মিলিয়ে যাবে পিতারের সরু গলিতে।

নেভা নদীর ধারে

—আর কিছুক্ষণ পরেই ব্রিজগুলো খুলতে শুরু করবে। চলো নদীর দিকে যাই।

বলেই নাস্তিয়া নদীর দিকে হাঁটতে শুরু করল। ইতিমধ্যে নদীর ধারে ভিড় জমে গেছে। সবাই অপেক্ষা করছে ব্রিজ খোলার। অভির মনে পড়বে মস্কোর কথা, ছাত্রজীবনের কথা যখন বিভিন্ন উৎসবে স্যালুট বা ফারার ওয়ার্ক হত। ওরা বন্ধুরা মিলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত মিকলুখো মাকলায়া স্ট্রিটে ক্রেস্তের ওখানে। অনেক কষ্টে একটা জায়গা খুঁজে ও ট্রিপড বসাল। এক সময়ে ধীরে ধীরে খুলে গেল ব্রিজ। ১৯৮০ সালে অভি কলকাতার খিদিরপুর ডকে গিয়েছিল এই ব্রিজ খোলা দেখতে। তবে পিতেরের এই ব্যাপারটার মজাই আলাদা। যাকে বলে দর্শনীয় ব্যাপার। একের পর এক শিপ যাচ্ছে ব্রিজের সেই খোলা জায়গাটুকু দিয়ে। নেভা এখন আলোয় আলোময়। বড় বড় শিপের বাইরেও অনেক ছোট ছোট নৌকা নেভার বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে ট্যুরিস্টদের নিয়ে। লোকজন ছবি তুলছে। কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে নদীর ধার ধরে। ওপারে ঝলমল করছে কুন্সকামেরা। এক কথায় এ যেন এক বিশাল শো। সোভিয়েত আমলে নেভার ধারে শ্বেত রাত্রি ছিলও আর দশটা রাতের মতই অনাড়ম্বর। এখন পুঁজিবাদের কল্যাণে সব কিছুকেই শোতে পরিণত হয়েছে। এতে খরচ হলেও লাভ কম নয়। প্রতিদিন হাজার হাজার ট্যুরিস্ট আসছে এসব দেখতে, পূর্ণ হচ্ছে শহরের কোষাগার, সাধারণ মানুষও এই সুযোগে দু পয়সা ইনকাম করছে। বাজার অর্থনীতিতে সব কিছুই আজ পণ্য আর সব জায়গাই বাজার।

 

নেভা— কী অপূর্ব এক নাম। নাম শুনেই যেন রক্ত টগবগ করে ফুটতে থাকে ধমনীতে। নেভা মানেই অরোরা, নেভা মানেই বিপ্লব, নেভা মানেই সমাজতন্ত্রের জন্মের সময়ের গগনবিদারী চিৎকার। যদিও লম্বায় মাত্রই ৭৪ কিলোমিটার, ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের কল্যাণে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের আনাচেকানাচে। লাদঝস্কয়ে লেক থেকে বেরিয়ে আসা একমাত্র নদী এই নেভা শ্লিসসেলবুরগ, কিরোভস্ক, অত্রাদনোয়ে আর সাঙ্কত পিতেরবুরগ এই চারটি শহরকে বিধৌত করে মিলিয়ে গেছে বাল্টিক সাগরের ফিন উপসাগরে। এছাড়াও নেভা ভোলগা-বাল্টিক এবং বেলামোর-বাল্টিক জলপথের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে যেহেতু পিতেরে সমুদ্র সমতল থেকে এই নদীর উচ্চতা মাত্র ৩ সেন্টিমিটার তাই সে প্রায় প্রতি বছরই পিতেরে বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাশিয়ার প্রায় সব নদীর মতই নেভাও বছরের বেশিরভাগ সময় বরফের কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে তাই এখানে জাহাজ চলাচল করতে পারে গরমের মাসগুলো। পিতেরবুরগ যখন স্থাপন করা হয় তখন নেভা শুধু এর যাতায়াতের/ যোগাযোগের অংশই ছিল না, ছিলও প্রতিরক্ষার অংশও। তাই তো এই ব্রিজের ব্যবস্থা যেগুলো রাতে তুলে রাখা যায় যাতে শত্রু অতর্কিতে রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করতে না পারে।

ইতিমধ্যে নেভা অপূর্ব সাজে সজ্জিত। এর আগে সেই ১৯৮৯ সালে মাস্টার্স থিসিস ডিফেণ্ড করে অভি লেনিনগ্রাদ বেড়াতে এসেছিল বন্ধু দীপুর সাথে। দীপু এ শহরেই ভাষা কোর্স করেছিল। সেবার অভির অনেকটা সময় কেটেছে মেডিক্যালের হোস্টেলে। কিন্তু অভি দুদিনেই মস্কোর জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। কেন?

 

আসলে সেখানে ছিল যাকে বলে বিরামহীন আড্ডা। কিছুটা সময় একা কাটাতে না পারলে অভির যেন মাথা খারাপ হয়ে যায়। মস্কোয় যত আড্ডাই দিক, ও রুমে চলে আসত। লেনিনগ্রাদে সেটা হয়নি। যাহোক সেবার রাত কাটাতে ওরা গেছিল অরোরার ওখানে। তখন ওরা বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত। মনে হয় সে জন্যেই। সেই রাতে হঠাৎ কোথা থেকে যেন নাস্তেঙ্কা এসে হাজির। একদিকে ওর পুরনো প্রেমিককে হারানোর বেদনা, অন্যদিকে নতুন ভালবাসার মানুষের আবির্ভাব ওর জীবনে। ঠিক যখন ও নতুন করে জীবন গড়বে ভাবছে, অপেক্ষার ইতি ঘটিয়ে মঞ্চে আসে পুরনো প্রেমিক। ওরা যেন অভির সাথে দেখা করতেই সেবার অরোরার আশেপাশে ঘুরঘুর করছিল। তবে এখন আর সেদিন নেই। তখনকার শান্ত শ্বেত রাত্রের জায়গা নিয়েছে উৎসব মুখর রাত। চারিদিকে মানুষ আর মানুষ। সমস্ত নেভা যেন এক আলোর মেলা। দীপাবলি বা দেওয়ালির রাতে ওদের বাড়িঘর যেমন মোমবাতির আলোকে আলোকিত হয়ে উঠত, তেমনি ছোটবড় বিভিন্ন সাইজের নৌকা, লঞ্চ আর শিপের আলোয় সেজে উঠেছে নেভা। নদীর ধারের আলো তো আছেই। বাজার অর্থনীতির যুগে সবই পণ্য, এমনকি সাদা রাতও। হাজার হাজার মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে আসে রাতের নেভা দেখতে। স্কারলেট বা লাল পাল তোলা জাহাজ দেখার জন্য পিতেরবুরগে ভিড় করে এ সময়ে। রাশিয়ায় তরুণ-তরুণীরা স্কুল শেষ করে এখানে আসে স্বপ্নের মত এই নৌকায় নিজেদের স্বপ্নগুলো ভাসিয়ে দিতে। ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে। আর সেই উৎসবের রেশ থাকে আরও অনেক দিন। ঠিক এমন সময় অভির পিতের আগমন। ও হাঁটছে আর ঠিক করছে কোথায় ট্রিপড সেট করা যায়। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে ইতিমধ্যেই ও বেশ কিছু ছবিও তুলেছে। এক জায়গায় দেখে অনেকে সিঁড়ি বেয়ে নেভা নদীতে নেমে যাচ্ছে। ভাল কিছু ছবির জন্য অভি সেদিকে পা বাড়াল। হঠাৎ এক বিদঘুটে লোক এসে বলল,

 

—এবার যদি ধাক্কা দিয়ে তোমাকে নদীতে ফেলে দিই?

অভির প্রথমে মনে হয়েছিল মাতাল কেউ হবে। তবে জামাকাপড় দেখে অবাক হল। এখন তো এরকম পোশাক কেউ পরে না। তাহলে?

—বা রে। ধাক্কা দিতে চাইলেই হল? মগের মুল্লুক নাকি?

—মগের মুল্লুক হবে কেন? ইচ্ছে হচ্ছে, তাই ফেলে দেব।

—ইচ্ছে হলেই সব করা যায়?

—যাবে না কেন? কোনও মানা তো নেই।

—মানা নেই বলেই করা যাবে?

 

—ইভান ফিওদরভিচ বলেন ‘স্তো নি জাপ্রেশেনো, তো ই রাজরেশেনো’, বুঝলে ‘যদি কোনও কিছু করায় বাধা না থাকে সেটা করা যায়।’
অভি আঁতকে উঠল। তার সাথে স্মেরদিয়াকভ কথা বলছে। সর্বনাশ। এই লোকই তো বুড়ো কারামাজভকে খুন করেছিল। এর না আছে নীতি, না আছে বিবেক। এখন উপায়? হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে দেখা গেল এই গরমেও মাথায় সিলিন্ডার পরে চুরুট হাতে একজন ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। ইভান ফিওদরোভিচ! অভি আত্মায় যেন জল ফিরে এল। সাহস করে সে বলল,

—যুগ বদলে গেছে। তোমার যুগের নিয়ম এ যুগে কাজ করে না। বিশ্বাস না হয় ইভান ফিওদরোভিচকে জিজ্ঞেস কর। ওই যে উনি দাঁড়িয়ে আমাদের দিকেই তাকিয়ে দেখছেন।

স্মেরদিয়াকভ ঘাড় ঘুরিয়ে ইভান কারামাজভকে দেখে ভয়ে চুপসে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল চোখের সামনে থেকে। ইভান কারামাজভও ইতিমধ্যেই হারিয়ে গেলেন মানুষের ভিড়ে।

মস্কোভস্কি ভকজাল

দেখতে দেখতে সময় যে কোথায় দিয়ে চলে গেল! ব্রিজগুলো ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। মানুষ ফিরে যাচ্ছে যে যার গন্তব্যে। দস্তয়েভস্কির নায়ক-নায়িকাদের মত বাস্তবের নায়ক-নায়িকারাও ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল আধো আলো আধো আঁধারে। অভি এখনও তাকিয়ে আছে নেভার দিকে। তাকিয়ে দেখছে ব্রিজগুলো। ওর মনে পড়বে লেজেন্ডারি বিমানচালক ভ্যালেরি কচালভের জীবনী নিয়ে তৈরি ফিল্মের কথা। সেখানে তিনি নেভার উপরে ত্রৈতস্কি সেতুর, যা সে সময় রাভেনস্তভা সেতু নামে বিখ্যাত ছিল, নীচ দিয়ে বিমান চালিয়ে চলে গেছিলেন তাঁর প্রেমিকা ওলগা এরাজমভনার মন জয় করার জন্য। যদিও এর সত্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে তবে সত্যই হোক আর মিথ্যাই হোক এটা যে খুবই রোম্যান্টিক একটা কাহিনি সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

—কী ভাবছ?

নাস্তিয়ার এ প্রশ্ন শুনে অভি যেন বাস্তবে ফিরে এল। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

—ভাবছি এই রাত যদি কখনওই শেষ না হত!

—কী হত তাহলে?

—তুমিই বলো।

—না না, তুমিই বলো।

অভিকে কিছুই বলতে হল না। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে নাস্তিয়া সব বুঝতে নিল। যেন ও দুটি চোখেই সব লেখা ছিল।

এত দিন তুমি কোথায় ছিলে? মনে হচ্ছে আমি যেন সারা জীবন এ রাতটার জন্যই অপেক্ষা করে ছিলাম।

নেভা নদীর ধারে ওরা এখন মাত্র দুটো প্রাণী। শুধু নেভা নদী কেন, গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ওরা ছাড়া তখন আর কেউই ছিল না। অভি ওর গালে অনুভব করবে নাস্তিয়ার নিশ্বাসের গরম হাওয়া। হঠাৎ করেই ওরা দুজনে মিলেমিশে এক অভিন্ন স্বত্ত্বায় পরিণত হবে।

পূর্ব দিগন্তে সূর্য আড়মোড়া দিতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই। নাস্তিয়াকে জড়িয়ে ধরেই অভি ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিস ফিস করে বলবে,

সে অনেক দিন আগের কথা
এতই আগের যে মনে হয় অন্য জীবনে
অন্য দেশে…
অপ্সরা আর কিন্নরদের মত
আমরা তখন বাস করতাম স্বর্গরাজ্যে

সেই স্বর্গে কোনও এক সন্ধ্যায়
যখন রুপালি চাঁদটা ভাসতে ভাসতে
হঠাৎ আটকে গেছিল
শরতের সোনারঙা বার্চের মাথায়
তুমি বললে, যদি বলতে পারো
শুক্লপক্ষ এটা না কৃষ্ণপক্ষ
একটা চুমু খাব…

সেই প্রথম তুমি আমাকে তুমি বলে ডাকলে
এতটাই হচকে গেছিলাম যে উত্তরটা আর দেয়া হয়নি…

আমি তোমার চোখে খুঁজতাম নিজের ছবি
পড়তে চাইতাম মন আর
দেখতে চাইতাম তোমার মনের আয়নায়
প্রতিচ্ছবি পরে কিনা আমার ভালবাসার

কিন্তু সামনে এসে দাঁড়ালেই তুমি বন্ধ করতে দুচোখ,
তাই তোমার চোখে আমার ছবি আমি কখনও খুঁজতেই পারিনি

আজ আমরা দুই ভিনগ্রহের বাসিন্দা
যাদের মধ্যে কাজ করে না কোনও টেলিফোন
কিংবা মেসেঞ্জার, স্কাইপে বা ফেসবুক
কে জানে, হয়তো মৃত্যুও মানুষকে এত দূরে সরায় না

তবুও আজও হঠাৎই আকাশের নীলে, সাগরের ঢেউয়ে
বনের গভীরে বা বাতাসের ঘূর্ণিতে দেখি
তোমার সেই হাসি, আর অপেক্ষা করি, এই তো বলবে,
বলো তো আজ শুক্লপক্ষ না কৃষ্ণপক্ষ?

—তোমার অপেক্ষার শেষ কবে হবে কে জানে? দিনের বেলায় তো আর চাঁদ দেখা যাবে না।

—তা যা বলেছ।

—তোমার মনে আছে খ্রিস্টের গল্প? পিটারকে বলেছিলেন তিন বার মোরগ ডাকার পর তিনি জেসাসকে অস্বীকার করবেন। রাত পোহালে দস্তয়েভস্কিও কিন্তু বেমালুম হারিয়ে যান। তাহলে কি তুমি হোটেলে ফিরে যাবে নাকি আমার বাসায়?

—দুটোর একটাতেও নয়।

—মানে?

—মস্কোভস্কি ভকজালে যাব।

—সেখানে আবার কী হারালে?

—গুলিয়া আসবে মস্কো থেকে। ওকে মিট করতে হবে।

—গুলিয়া, মানে তোমার বউ।

—হুম।

—তাহলে আমি তো যেতে পারব না।

—কেন?

—এসব তুমি বুঝবে না।

—আচ্ছা বলো তো, আমার তো ভালবাসার কোনও অভাব নেই। তোমরা দুজন কেন হাজার হাজার মানুষকে ভালবাসলেও আমার ভালবাসা ফুরোবে না। অথচ তোমরা কখনওই এই ভাগবাঁটোয়ারার মধ্যে না এসে থাকতে পারো না কেন?

—এই যে পারি না এখানেই আমরা নারীরা অনন্যা।

—যাকগে, আমি তো এখানকার রাস্তাঘাট চিনি না, আমাকে অন্তত সেখানে পৌঁছে দিয়ো।

—তা দেব। তবে ট্রেন আসার দশ মিনিট আগে চলে যাব।

—মানে তুমি গুলিয়ার সাথে পরিচিত হতে চাও না?

—আমি সেটা বলছি না। পরে। এখন যদি আলাপ করিয়ে দিতে চাও তাতে আলাপ তো হবেই না, উল্টো স্ক্যান্ডাল হবে। তুমি মেয়েদের চেনো না।

এরপর ওরা রওনা হবে মস্কোভস্কি ভকজালের পথে। এখান থেকেই ১৯১৮ সালে লেনিন পিতেরবুরগ থেকে রাজধানী মস্কোয় স্তানান্তরিত করেছিলেন। এই মস্কোভস্কি ভকজাল বা রেলওয়ে স্টেশন পিতেরবুরগের সাথে মস্কোর সংযোগ ঘটায়। আর মস্কোয় সেই স্টেশনটির নাম লেনিনগ্রাদস্কি ভকজাল। ১৯৯১ সালে নামটি আর পরিবর্তন করা হয়নি। গুরুত্বের দিক থেকে মস্কোভস্কি ভকজাল এগিয়ে থাকলেও এটা পিতেরবুরগ বা রাশিয়ার প্রথম ভকজাল নয়। রাশিয়ার প্রথম ভকজালের নাম ভিতেভস্কি যা ১৮৩৭ সালে সাঙ্কত-পিতেরবুরগস্কি ভকজাল নাম নিয়ে আলোর মুখ দেখে। এই প্রথম রেললাইন সাঙ্কত-পিতেরবুরগের সাথে তসারস্কোয়ে সেলোর সংযোগ রক্ষা করার জন্য তৈরি। এরপর বিভিন্ন সময় এর নাম পরিবর্তিত হয়, তবে ১৯৩৫ সালে থেকে ভিতেভস্কি ভকজাল নামেই পরিচিত।

ইতিমধ্যে শহর জেগে উঠেছে। ভকজালের সামনে বাবুশাকারা ফুল বিক্রি শুরু করেছেন। অভি এক বাবুশকার কাছ থেকে একটা ফুলের তোড়া কিনে নাস্তিয়াকে দিল।

—এত চমৎকার একটা রাতের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

—আবার এসো।

নাস্তিয়া ঘড়ি দেখতে শুরু করেছে। আর মাত্র মিনিট পনের পরে মস্কোর ট্রেন আসবে।

—শোনো, আমি এখন যাই। দেখা হবে।

—যাই বলতে নেই। বলো আসি।

—ঠিক আছে। আমি আসি।

এই বলে অভিকে আলতো করে চুমু দিয়ে নাস্তিয়া বেরিয়ে গেল। অভি গেল ওর পেছন পেছন, যদিও জানে নাস্তিয়া আর ফিরেও তাকাবে না। অভি এবার আর-এক তোড়া ফুল কিনে দাঁড়িয়ে রইল গুলিয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু কোথায় গুলিয়া? স্টেশন লোকে লোকারণ্য। বন্দিদের ভিড়। সাথে তাদের আত্মীয়স্বজন। কারও হাতে হাতকড়া, কারও পায়ে বেড়ি। একটু একটু করে অভি আবার ফিরে যাচ্ছে উনবিংশ শতাব্দীতে। হঠাৎ ওর চোখ পড়ল দ্মিত্রি কারামাজভের ওপর। ওকে পাঠানো হচ্ছে সাইবেরিয়ায়। ওর পেছন পেছন যাচ্ছে গ্রুশেঙ্কা। এই সেই সুন্দরী নারী যার জন্য দ্মিত্রি আর তার পিতা ফিওদর কারামাজভের মধ্য বাকবিতণ্ডা। সুযোগ বুঝে স্মেরদিয়াকভ বুড়োকে খুন করে সব দোষ চাপিয়েছিল দ্মিত্রির কাঁধে। সে এখন সাইবেরিয়া যাচ্ছে সাজা বহন করতে। ইভান আর আলিওশা এসেছে বড় ভাইকে বিদায় জানাতে। সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। অভি আর পারছে না নিতে। ঠিক তখনই যেন পর্দা উঠে যাবে। ট্রেন থেকে হাসতে হাসতে নামবে গুলিয়া। সোজা চলে আসবে অভির কাছে। অভি ফুলের তোড়াটা বাড়িয়ে দেবে গুলিয়ার দিকে। আনন্দে আর সুখে চিকচিক করে উঠবে গুলিয়ার চোখ। এক দীর্ঘ আলিঙ্গনে একে অন্যেকে আবদ্ধ করবে ওর। আবেগ কেটে গেলে গুলিয়া জিজ্ঞেস করবে,

—তুমি আমার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছ?

—সারা জীবন!

চিত্র: লেখক
Advertisement
4 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »