Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

বিশেষ নিবন্ধ: সিদ্ধার্থ মজুমদার

‘একাকী মহিলা যাঁর কোনও জীবিকা ছিল না’

প্রত্যেক মেয়ের স্বপ্নপূরণ আর সাফল্যের যাত্রাপথে দু’ধারে লেখা থাকে অজস্র টানাপড়েনের অন্ধকার কাহিনি। অনেক বঞ্চনা, অবজ্ঞা আর বৈষম্যের কাহিনি। এখন সেই ট্র্যাডিশনের কিছুটা বদল হয়েছে ঠিকই, তবু এই বৈষম্য পুরোপুরি নির্মূল হতে এখনও বহু দূর পথ পেরোনো বাকি। বিশেষ করে মানসিকতার পরিবর্তন। এই লেখায় একজন প্রতিভাময়ী মেয়ের কথা বলব, যাঁকেও পেরিয়ে আসতে হয়েছে অজস্র বাধার পাহাড়।
প্রায় দুশো বছর আগের কথা। ফরাসি দেশে জন্ম সেই মেয়েটির। ফরাসি বিপ্লবের আগুনের উত্তাপ যখন ছড়িয়ে পড়েছে, তখন তিনি বালিকা। মেয়েটির নাম মারি সফিয়া জমিঅ্যাঁ (Marie-Sophie Germain, ১৭৭৬–১৮৩১)। ফ্রান্সের প্যারিসে একটি সচ্ছল, সম্ভ্রান্ত ও ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম। তিন বোনের মধ্যে সফিয়া দ্বিতীয়। পূর্বপূরুষদের প্রায় সকলেই ব্যবসায়ী ছিলেন। সফিয়ার বাবারও ছিল সিল্কের ব্যবসা। এ ছাড়াও, রাজনৈতিকভাবে একজন সক্রিয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন তিনি। সফিয়ার বাবা ছিলেন একজন পণ্ডিত মানুষ। নানান বিষয়ে ছিল তাঁর পড়াশোনা। তাঁর নিজস্ব লাইব্রেরিতে ছিল নানান ধরনের অজস্র বই। ইতিহাস, ভাষা, প্রকৃতিবিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে ভূগোল।

একটু বড় হতেই সফিয়াও পড়াশোনা শিখতে চাইলেন। সে-সময় মেয়েদের পড়াশোনা করার কোনও সুযোগ ছিল না। প্রচলিত প্রথানুযায়ী তখন মেয়েদের পড়াশোনা শিখতে হত কেবলমাত্র বাড়িতে বসে। স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় সব কিছুই তখন শুধু ছেলেদের জায়গা। মেয়ে হয়ে জন্ম, তাই তাঁকেও যে লেখাপড়া শিখতে হবে বাড়িতে বসে, সে-কথা সফিয়া বুঝে গেলেন। সফিয়ার যখন তেরো বছর বয়স, তখন শুরু হয়েছে ফরাসি বিপ্লব। যে-কোনও মানুষেরই তখন বাইরে বেরোনো ছিল বিপজ্জনক। বাইরে বেরোনো মানে ছিল প্রাণ হাতে করে বেরোনো। তাই, সফিয়ার মা-বাবা মেয়েকে পইপই করে বারণ করে দিয়েছিলেন, কোনও কারণেই যেন সে বাড়ির বাইরে না যায়।
এই রকম একটা সময়ে বেড়ে উঠছিলেন সফিয়া জমিঅ্যাঁ। পড়াশোনা শেখায় অফুরান আগ্রহ অথচ স্কুলে পড়ার কোনও উপায়ই নেই। তারপর, বাবার লাইব্রেরিতে অজস্র বই দেখে সফিয়ার মনে হল, যেন হাতে স্বর্গ পেয়েছেন। একবার এ বই খোলেন, তো কিছুক্ষণ পরে অন্য বই। তন্ময় হয়ে বই পড়ে যান। দিনের পর দিন এইভাবে দিন কাটে সফিয়ার। একদিন বিজ্ঞান ইতিহাসের একটি বইয়ে আর্কিমিডিসের জীবনী রুদ্ধশ্বাসে পড়ে ফেললেন। সেই বইয়ে অন্য আরও গণিতজ্ঞের জীবন ও অবদান নিয়েও পড়ে ফেলেন সফিয়া। আর্কিমিডিসের জীবন, বিশেষ করে আর্কিমিডিস যখন তন্ময় হয়ে জ্যামিতির সমাধানে মগ্ন, সে-সময় রোমান সেনারা আর্কিমিডিসকে রোমান সেনাপতির কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। গণিতের সমাধান করায় গভীর মগ্ন আর্কিমিডিস বলেন, ‘বিরক্ত কোরো না আমাকে। সমস্যাটির সমাধান হওয়ার আগে আমি কোথাও যেতে পারব না। সরে যাও তোমরা।’ এই কথা শুনে ক্ষুব্ধ সৈনিক হাতের তরবারি দিয়ে আর্কিমিডিসের শিরশ্ছেদ করে। আর্কিমিডিসের ওইভাবে মৃত্যুর কথা পড়ার পর থেকে সফিয়া ভাবতে থাকেন, ‘কী এমন আছে গণিতে, যার জন্যে ওরকম তন্ময় হয়ে গণিতে ডুবে থাকা যায়?’ আর্কিমিডিসের মৃত্যুর এই ঘটনা কমবয়সি সফিয়ার মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। আচ্ছন্ন করে রেখেছিল সফিয়াকে দিনের পর দিন।

তারপর থেকেই সফিয়ার মনে জেগে ওঠে গণিতের প্রতি অনুরাগ। বাবার বিশাল লাইব্রেরিতে নিজে নিজে লাতিন ও গ্রিক ভাষা শিখেছেন সফিয়া, যাতে করে গণিতের ইতিহাস আর গণিতের অন্য বইগুলি পড়তে পারে। বাড়িতে বাবা-মা একদিন জানতে পারলেন, মেয়ের গণিতে আগ্রহের কথা। তারপর তাঁরা নানাভাবে মেয়েকে বুঝিয়ে নিরুৎসাহিত করতে চেষ্টা করেন। আসলে, মেয়েদের পড়াশোনা করার ব্যাপারে সামাজিক বিধিনিষেধের কথা সম্পর্কে তাঁরা ওয়াকিবহাল ছিলেন। মা-বাবার নিষেধের জন্যে তারপর থেকে বাবা-মাকে লুকিয়ে রাত জেগে নিজের ঘরে গণিতের বই পড়তে শুরু করেন সফিয়া। একদিন মেয়ের বালিশের পাশে রাখা গণিতের বই দেখে বাবা-মা বুঝতে পারেন সে-কথা। রাত জেগে যাতে মেয়ে আর পড়তে না পারে, তাই মেয়ের ঘর থেকে বাতি সরিয়ে নিলেন এবং শীতে ঢাকা নেওয়ার কম্বল রাখা বন্ধ করে দিলেন। এতেও কি গণিত পড়ায় আগ্রহ কমল মেয়ের? ঘরে মোমবাতি লুকিয়ে রেখে রাত্রে তা জ্বেলে পড়া চলতে থাকল। কয়েক দিন পরে সকলে দেখতে পেলেন মেয়ে সকালে বিছানায় শীতে কুঁকড়ে শুয়ে আছে, বিছানায় খোলা বই আর ঘরে মধ্যে রাখা জ্বলে যাওয়া মোমবাতির অবশিষ্টাংশ। কোনও কিছু করেই সফিয়াকে পড়াশোনা করা থেকে আটকাতে না পেরে শেষে মেয়ের ওপর সহানুভূতি হল তাঁদের। তারপর থেকে মেয়েকে আর বাধা দিলেন না।

নানান বাধার পাহাড় পেরিয়ে গণিতচর্চায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন মারি সফিয়া জমিঅ্যাঁ। প্যারিসের পুরুষ-অধ্যুষিত গণিতের সাম্রাজ্যে সফিয়া একা মহিলা আজীবন গণিত ও জ্যামিতির চর্চা করে গেছেন। শিখেছেন লাতিন ও গ্রিক, যাতে গণিতের সব ধরনের অগ্রগামী বই পড়তে পারেন।

সফিয়ার বয়স যখন আঠারো বছর। তখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একলে পলিটেকনিকস। মূলত অভিজাত ঘরের গণিতবিদ ও বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত সেখানে। মেয়েদের কোনও প্রবেশাধিকার ছিল না সেখানে। তবে ওই পলিটেকনিকসে ক্লাস নোটস অনুসরণ করে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারত যে-কোনও মেধাবী ছাত্র। আর ঠিক ওই সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করলেন মারি সফিয়া। তারপর একদিন একজন পুরুষের নাম ব্যবহার করে একলে পলিটেকনিকসে নাম নিবন্ধিত করলেন সফিয়া। সেই ছদ্মনামের আড়ালে একলে পলিটেকনিকসের ক্লাসে পড়ানো নোটস পাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে গেল। ওই সময় একলেতে বিখ্যাত গণিতবিদ লুগ্রেঞ্জ পড়াতেন। লুগ্রেঞ্জের ক্লাস নোটসে বিশেষ আগ্রহী হয়ে ওঠেন সফিয়া। কোর্সের পাঠক্রমের প্রয়োজন অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট সময়ে প্রজেক্ট লিখে জমা দিতে হত। সেটাও অসুবিধা হল না। ঠিক সময়ের মধ্যে সফিয়া তাঁর লেখা প্রোজেক্টটি জমা দিলেন ছদ্মনামে। অধ্যাপক ও গণিতবিদ লুগ্রেঞ্জ মারির সেই প্রোজেক্টের লেখা পড়ে ভীষণ প্রভাবিত হলেন এবং ওই মেধাবী ছাত্রের সঙ্গে দেখা করে কথা বলতে চাইলেন। এইবার মারি পড়লেন মুশকিলে। এবার তো অধ্যাপক জেনে যাবেন আসল পরিচয়। জেনে যাবেন পুরুষ নামের আড়ালে থাকা ছাত্রী মারি সফিয়াকে। আর কিছু করার ছিল না। দুজনের সাক্ষাৎকারের সময় অধ্যাপক লুগ্রেঞ্জ সফিয়ার পরিচয় আবিষ্কার করলেন। জহুরি যেমন ঠিক চিনে নেয় জহর, তেমনই অধ্যাপক লুগ্রেঞ্জ পরিচয় পেলেন মারির তীক্ষ্ণ মেধার। তারপর থেকে ছদ্মনামের সফিয়াকে প্রয়োজনীয় সাহায্য করে গেছেন অধ্যাপক লুগ্রেঞ্জ। প্রখ্যাত গণিতজ্ঞ লুগ্রেঞ্জের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখে গেছেন সফিয়া। লুগ্রেঞ্জ ছাড়াও অন্য একজন স্বনামধন্য গণিতবিদ কার্ল ফেড্রিক গাউসের সঙ্গে বেশ কয়েক বছর চিঠিপত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন সফিয়া। তবে গাউসের সঙ্গে সফিয়াকে যোগাযোগ রাখতে হয়েছিল ছদ্মনামের আড়াল থেকে। সফিয়ার বিশেষ মুগ্ধতা ছিল ফারমেন্ট’স উপপাদ্য বিষয়ে, যা নিয়ে তিনি গাউসের সঙ্গে বেশ কয়েকবার আদানপ্রদান করেছেন। ফারমেন্ট’স শেষ উপপাদ্যটি একটি বিশেষ ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী পদ্ধতির মাধ্যমে সমাধান করে গবেষণাপত্রে প্রকাশ করেন সফিয়া, যা পরে ‘সফিয়া জেরমান’স থিয়োরাম’ হিসেবে পরিচিত হয়।

সে সময়ের অন্য বিজ্ঞানীদের মতন, প্রথম মহিলা হিসেবে গণিত ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির জন্যে সফিয়া পরিচিত হয়ে ওঠেন। স্থিতিস্থাপকতা (ইলাস্টিসিটি) ও ধ্বনিবিজ্ঞান (অ্যাকোস্টিকস) সংক্রান্ত মৌলিক গবেষণা-কাজে রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। উদ্ভাবনী পদ্ধতির গণিতে সফিয়া, পুরুষ-অধিকৃত গণিতের জগতে একটি আদর্শ ও অনুপ্রেরণামূলক নাম। বিজ্ঞান মহলে, একজন উচ্চপ্রশংসিত দার্শনিক এবং ফিজিসিস্ট হিসেবেও পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন সফিয়া। ‘নাম্বার থিয়োরি’ কাজের জন্যে মারি সফিয়া জমিঅ্যাঁ পরিচিত হয়ে ওঠেন।

মহিলা বলে বিজ্ঞান ও গণিতের জগতে সফিয়ার প্রবেশাধিকার ছিল সীমাবদ্ধ। প্রাতিষ্ঠানিক গণিত শিক্ষায় তাঁকে সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাঁর গাণিতিক প্রস্তাবনাগুলি সঠিক নয় বলে দিনের পর দিন ব্যঙ্গ করা হয়েছে। অনেকেই চেয়েছিলেন, সফিয়াকে এইভাবে তাচ্ছিল্য করে তাঁকে বিব্রত করে তুলতে, যাতে তিনি তাঁর ফলাফলগুলি প্রকাশ করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। আর সেরকমটা হলে, সফিয়ার কাজ নিজেদের নামে প্রকাশ করে কৃতিত্ব নেওয়ার সুবিধা হয়ে যাবে অনায়াসে। ফরাসি বিজ্ঞান আকাদেমিতে প্রবেশাধিকার ছিল না সফিয়ার। তবুও হাল ছাড়েননি। নিজেকে পুরুষ নামের আড়ালে রেখে গণিতের মৌলিক গবেষণাপত্র পাঠিয়েছেন, একের পর এক। এইভাবে পুরুষদের সাম্রাজ্যে একদিন যোগ দেওয়ার ছাড়পত্র আদায় করে নিয়েছেন সফিয়া নিজের অধিকারে। আজ বিজ্ঞান ইতিহাসে নামজাদা গণিতবিদদের নামের সঙ্গে একসঙ্গে উচ্চারিত করতে হয় মারি সফিয়ার নাম।
উল্লেখ করতে হয়, গণিত নিয়ে গবেষণা ছাড়াও তিনি দর্শন আধারিত বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, যেগুলি সে-সময়ের কয়েকজন দার্শনিক গুরুত্ব সহকারে স্বীকৃতি দিলেও, উচ্চমানের তাঁর ওই রচনাগুলি সার্বিকভাবে গৃহীত হয়নি। এ ক্ষেত্রেও কারণ ছিল তিনি একজন মহিলা বলে।
১৮২৯-এ স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন জানতে পারেন। কিন্তু তিনি থেমে থাকার বান্দা নন। যন্ত্রণা সত্ত্বেও কাজ করে গেছেন ২৭ জুন ১৮৩১-এ মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত। প্যারিসে নিজের বাড়িতেই সফিয়ার মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর পরিচয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, ‘একাকী মহিলা যাঁর কোনও জীবিকা ছিল না’।

প্রতিভাময়ী ফরাসি গণিতবিদ মারি সফিয়া জমিঅ্যাঁ, আজ সময়ের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাওয়া একটি নাম। আমরা তাঁকে মনে রাখিনি। আসুন, আমরা এই প্রতিভাময়ী গণিতবিদের ছবিতে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে দিয়ে শ্রদ্ধা জানাই। আমাদের পাপস্খলন করি।

চিত্র: গুগল

4 Responses

  1. আহা, কি সুন্দর লেখনী– মন্ত্র- মুগ্ধের মতো পড়ে গেলাম অজানা গনিত- তপস্বিনীর হার না মানা অনবদ্য জীবনের কথা !

    1. খুব আনন্দ হল 😍🤩পাঠ প্রতিক্রিয়া দেওয়ার জন্যে।

  2. চমৎকার লাগল। কোন সুদূর অতীতে পুরুষ শাসিত গণিতের সাম্রাজ্যে মারি সফিয়ার এই অদম্য লড়াই ও অবশেষে সাফল্য ও স্বপ্নপূরণের দারুণ কাহিনী তুলে এনেছেন অনায়াস দক্ষতায় আপনার সিগনেচার স্টাইল কলমে। ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।

    1. অশেষ ধন্যবাদ জানাই আপনাকে। 🙏🏻❤️

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 3 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধ: অন্ধকারে আলোর দিশারী

তিনি বলেন গেছেন, হিংসা দিয়ে হিংসাকে জয় করা যায় না, তাকে জয় করতে প্রেম ও ভালবাসা দিয়ে। মৈত্রী ও করুণা— এই দুটি ছিল তাঁর আয়ুধ, মানুষের প্রতি ভালবাসার, সহযোগিতার, বিশ্বপ্রেমের। তাই তো তাঁর অহিংসার আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে,— চীন, জাপান, মায়ানমার, তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটানে। এই বাংলায় যে পালযুগ, তা চিহ্নিত হয়ে আছে বৌদ্ধযুগ-রূপে। সুদীর্ঘ পাঁচ শতাব্দী ধরে সমগ্র বাংলা বুদ্ধ-অনুশাসিত ছিল। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ বৌদ্ধ কবিদের দ্বারাই রচিত হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

স্যার রোনাল্ড রস, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য

রোনাল্ড রসকে তাঁর গবেষণার সহায়তাকারী এক বিস্মৃত বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯২৯)। তাঁর অবদান কিন্তু খুব কম নয়। তিনি ছিলেন রস-এর অধীনে সহ-গবেষক। রস নোবেল পেলে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর নেতৃত্বে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, শিবনাথ শাস্ত্রী, আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কিশোরীনাথের ভূমিকার বিষয়টি বড়লাট লর্ড কার্জনকে জানান। কার্জন এ-বিষয়টি ব্রিটিশ সরকারের গোচরে আনেন। এর ফলে ১৯০৩ সালে যখন দিল্লিতে দরবার বসে, তখন ডিউক অফ কনট-এর মাধ্যমে কিশোরীনাথকে ব্রিটিশরাজ সপ্তম এড‌ওয়ার্ড-এর তরফ থেকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। পরে কলকাতা
র সেনেট হলে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সভাপতি ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

দুই হুজুরের গপ্পো

১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই, আলবার্ট আইনস্টাইন বার্লিনের উপকণ্ঠে নিজের বাড়িতে স্বাগত জানান ভারতীয় কবি, দার্শনিক ও সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। তিনি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেল বিজয়ী। তাঁদের এই সাক্ষাৎকারটি ইতিহাসের অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত ও মননশীল আলাপচারিতায় পরিণত হয়, যেখানে তাঁরা বিজ্ঞান ও ধর্মের চিরন্তন দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেন। “সায়েন্স অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান ট্রাডিশন: হোয়েন আইনস্টাইন মেট টেগোর” গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের বিবরণ পাওয়া যায়। এই বইতে বিশ শতকের শুরুতে ভারতের বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণ এবং ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক চিন্তার মেলবন্ধন তুলে ধরা হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

শতবর্ষী বাঙালি

বাঙালিদের মধ্যেও শতায়ু লোক নেহাত কম নেই। একটা কথা মনে রাখা জরুরি, বিখ্যাত ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ মানুষের আয়ু নিয়ে বিশেষ কোনও গবেষণা থাকে না। আবার একটু বেশি বয়স্ক মানুষকে শতায়ু বলে চালিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ-ও রয়েছে। তবে শতবর্ষের আয়ুলাভ যে মানুষের কাঙ্ক্ষিত, তা উপনিষদের‌ একটি বাক্যে সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে— ‘জীবেম শরদঃ শতম্’, অর্থাৎ শতবর্ষ বাঁচতে ইচ্ছে করবে। কেবল অলস জীবন নিয়ে বাঁচবার ইচ্ছে করলেই হবে না, কর্ম করে বাঁচার কথাও বলা হয়েছে সেখানে— ‘কুর্বেন্নেবেহ কর্মাণি জিজীবিষেচ্ছতম্ সমাঃ’।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আশা ভোসলে ও তাঁর বাংলা গান

সুদীর্ঘ আট দশক ধরে তিনি তাঁর সঙ্গীতের সুধায় ভরিয়ে দিয়েছেন কেবল ভারত বা এই উপমহাদেশকেই নয়, বিশ্বকে। পরিণত বয়সেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর, যেমন কয়েক বছর আগে হয়েছিল তাঁর স্বনামখ্যাত অগ্রজা লতা মঙ্গেশকরের। আশা ভোসলে তাঁর সমগ্র জীবনে বারো হাজার গান গেয়ে গিনেস বুকে স্থান পেয়েছেন। একদিকে ধ্রুপদী সঙ্গীত, অন্যদিকে লঘু, পপ, এমনকী চটুল গানেও তাঁর সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সমসাময়িক কিংবদন্তি শিল্পীদের মধ্যে এজন্য অনায়াসে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

স্প্যানিশ ছোটগল্প: পুতুল রানি

সত্যিকারের আমিলামিয়া আবার আমার স্মৃতিতে ফিরে এসেছে, আর আমি আবার— সম্পূর্ণ সুখী না হলেও সুস্থ বোধ করছি: পার্ক, জীবন্ত সেই শিশুটি, আমার কৈশোরের পঠনকাল— সব মিলিয়ে এক অসুস্থ উপাসনার প্রেতচ্ছায়ার ওপর জয়লাভ করেছে। জীবনের ছবিটাই বেশি শক্তিশালী। আমি নিজেকে বলি, আমি চিরকাল আমার সত্যিকারের আমিলামিয়ার সঙ্গেই বাঁচব, যে মৃত্যুর বিকৃত অনুকরণের ওপর জয়ী হয়েছে। একদিন সাহস করে আবার সেই খাতাটার দিকে তাকাই— গ্রাফ কাগজের খাতা, যেখানে আমি সেই ভুয়ো মূল্যায়নের তথ্য লিখে রেখেছিলাম। আর তার পাতার ভেতর থেকে আবার পড়ে যায় আমিলামিয়ার কার্ডটি— তার ভয়ানক শিশুসুলভ আঁকাবাঁকা লেখা আর পার্ক থেকে তার বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার মানচিত্র। আমি সেটা তুলে নিয়ে হাসি।

Read More »