Search
Generic filters
Search
Generic filters

হাতে হাত রাখো

সকাল থেকেই ফেসবুক অলিন্দে বন্ধুত্বের রংবেরঙের পাখি। রেশমি সুতোর বিনুনি। ছোটমেয়েকে জিগ্যেস করতে সে বলল, আগস্ট মাসের প্রথম রবিবার friendship day। বন্ধু রঞ্জন ভট্টাচার্য ফেসবুকে শিব্রাম চক্রবর্তীর একটি লেখা পোস্ট করলেন, ‘বন্ধু পাওয়া যায় সেই ছেলেবেলায় স্কুল-কলেজেই। প্রাণের বন্ধু। তারপর আর না।’ ‘আর না? সারা জীবনে আর না।’ ‘জীবন জুড়ে যারা থাকে তারা কেউ কারো বন্ধু নয়। তারা দু’রকমের। এনিমি আর নন-এনিমি। নন-এনিমিদেরি বন্ধু বলে ধরতে হয়।’

বন্ধু কি কেবল মানুষের সঙ্গে মানুষের? নির্জনতার সঙ্গে, আকাশভরা নক্ষত্রের সঙ্গে, নদীর তীরে ভাঙা ছোট্ট ডিঙিটির সঙ্গে বন্ধুত্ব কি হয় না? বন্ধু তো সেই যার সঙ্গে মগ্ন স্বরে সব কথা বলা যায়। নিজের মনের আয়নাই তো বন্ধু। নিশীথ রাত্রিতে যে যুবকটি ঘন পাইনবনের মধ্যে দিয়ে একা একা হেঁটে যায়, তার মনে হয়তো বাজে না ‘ধীরে ধীরে ধীরে বও ওগো উতল হাওয়া’, কিন্তু ঘন পাইনের নির্জনতা বন্ধুর মতো তার সঙ্গে হাঁটে। ফিরে যাই সেই অতীতে, শকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রা— তপোবন ছেড়ে যেতে শকুন্তলার মন চায়নি। সেখানকার শ্যামল বনানী তাঁর যে সমগ্র সত্তায়, মনে। তারাই তো ছিল তাঁর দিন-রাত্রির সখা। প্রিয়ংবদাকে বলেওছিলেন, ‘তপোবন পরিত্যাগ করিয়া যাইতে আমার পা উঠিতেছে না।’ কিংবা কবিগুরুর সেই ‘বলাই’, যে বালকের রক্তে মিশেছিল প্রকৃতির শ্বাস। ছবি ও গান-ও তো কখনও কখনও বন্ধু হয়। রবীন্দ্রনাথ তো ছবির সঙ্গে কথা বলতেন। ছবি তখন তাঁর বন্ধু বা প্রিয়া।

ক্ষয়ে যাওয়া পেন্সিল, ক্যাশমেমোর উল্টোদিকের সাদা অংশ, খাটের ওপর যে ছোট্ট টেবিলটায় কাগজ রেখে শেষ করেছিলেন ‘নেঙটি’-র মতো একটি কালজয়ী উপন্যাস, তার সঙ্গে কি মণীন্দ্র গুপ্তের বন্ধুত্ব হয়নি? যার আশ্রয়ে প্রাণের কথা ঝরনার মতো বয়ে যায়, মনে আসে নিবিড় আকাশের উদারতা, সেই তো বন্ধু? বরানগর বাজার পেরিয়ে বি টি রোডের সেই দীর্ঘ রাস্তায়, ঠোঁটে ফিল্টার উইলস আর কাঁধদুটো উঁচু করে যে ভাস্কর চক্রবর্তী হেঁটেছেন অনেক সকাল-দুপুর-বিকেল-রাত্রি, সেই রাস্তা কি ভাস্কর চক্রবর্তীর বন্ধু হয়ে ওঠেনি? বসন্ত নয় হেমন্ত, কোকিল বা ময়ূর নয়, কর্কশনিনাদী পেঁচাই তো হয়ে উঠেছিল জীবনানন্দের আত্মার বন্ধু। তাদের সঙ্গেই তো তাঁর যাপন, তাঁর দিন ও রাত্রি। পড়ছিলাম ফরাসি শিল্পী ক্লোদ মনের শিল্পচর্চা। জলের সঙ্গে বন্ধুত্ব। কী সুতীব্র টান। নৌকার ওপর বানিয়েছিলেন একটি ছোট্ট স্টুডিও আর সেই নৌকা ভাসিয়েছিলেন সেইন নদীতে।

ছেলেবেলায় আমার কোনও বন্ধু ছিল না। সহপাঠী ছিল। আমার বন্ধু ছিল ঘুড়ি। স্কুল থেকে বিকেলবেলায় ফেরার পথে পাড়ার মোড়ে গোপাল পাইনের দোকান থেকে ঘুড়ি কিনে আনতাম। বাড়িতে এসেই গোগ্রাসে ভাত ডাল আলু সেদ্ধ খেয়ে ছাদে উঠে যেতাম। সঙ্গে নিয়ে যেতাম সাত-আট দানা ভাত। ঘুড়ি ছিঁড়ে গেলে জোড়া লাগাবার জন্যে ভাত অব্যর্থ। একটা সময় সন্ধে নামত। ঘুড়ি কেটে না গেলে বন্ধুকে আকাশ থেকে নামিয়ে আনতাম। বন্ধুর গায়ে তখন বিকেলের ছায়া। চিলেকোঠার একটা কোণে বন্ধু থাকত। মনখারাপ হলেও কিছু করার ছিল না। সঙ্গে রেখে দিয়ে আসতাম তার বন্ধুকে— লাটাই। একেকদিন রাত্রে মায়ের চোখ এড়িয়ে চিলেকোঠায় দেখে আসতাম বন্ধুকে। বিশ্বকর্মা পুজোর দিন আকাশে ছেয়ে যেত নানারঙের নানা আকারের ঘুড়ি— চাঁদিয়াল, পেটকাটি। আমি সেদিন ঘুড়ি ওড়াতাম না। আকাশের দিকে চেয়ে চুপচাপ বসে থাকতাম। খুব ভাল লাগত। আকাশ জুড়ে রংবেরঙের ঘুড়ি। ঘুড়ির প্যাঁচ। সে এক উত্তেজনা। যারা ঘুড়ি কাটত, ছাদে ছাদে ছড়িয়ে পড়ত ভো-কাট্টা, কাঁসরঘণ্টার আওয়াজ। সে এক বিপুল উন্মাদনা। সন্ধে নামলে আবার মনখারাপ।

বন্ধুত্ব যেন উলের গোলা। গড়িয়ে গড়িয়ে কোথায় যে যেতে পারে, যে জানে সেই জানে।

চিত্রণ: মনিকা সাহা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen − 15 =

Recent Posts

পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »
কালীকৃষ্ণ গুহ

কালীকৃষ্ণ গুহর কবিতা

একটি রাত্রি কা লী কৃ ষ্ণ  গু হ প্রতিটি রাত্রিকেই নতুন মনে হয়— অচেনা লাগে। আজকের রাত্রিটা যেন চির-অচেনা যেন কিছু ঘটার ছিল যা ঘটেনি

Read More »
অভিজিৎ সিরাজ

অভিজিৎ সিরাজের ছোটগল্প

ফরেস্ট বাংলো অ ভি জি ৎ  সি রা জ শঙ্কর দত্তকে আমি শেষ দেখি আনন্দপুরে মাদুরদহের একটা স্কুল বাড়িতে। অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল সেদিন। বাড়ির

Read More »