দধীচির তনুত্যাগ
একটুও না থেমে ‘দধীচির তনুত্যাগ’ গড়গড় করে বলে গেল অক্ষয় সরকার। একদমে অতবড় কবিতা! চমকিত সবাই।
‘থামলেই ভুল হত।’ খৈনি-খাওয়া দাঁত বের করে অক্ষয় সরকার হাসে। গণেশ সাহা বলে— ‘ধরে নিন এটাই আপনার ফেয়ারওয়েলের অনুষ্ঠান। গানের বদলে আবৃত্তি।’
‘কিন্তু মিষ্টিমুখ?’ পাশে দাঁড়িয়ে ফিটার প্রশান্ত শুধোয়।
সুযশ আজ অবধি কখনও এর কাছ থেকে সুবাক্য শোনেনি। আজ যে একেবারে বিগলিত করুণা জাহ্নবী যমুনা!
গণেশ সাহা জবার। অর্ধনারীশ্বরের মতো কিছুটা শ্রমিক আর কিছুটা উপরওয়ালার ভূমিকা ওর। যে কথাটা সুযশ বলতে পারছে না সেটাই বলে দেয় গণেশ সাহা। ‘মিষ্টিমুখের জন্য তোমরা তো আছই। দিয়ে দাও দুটো প্রাণ খুলে গাল!’
‘কী যে বলেন! গাঙ্গুলিদার মতো মানুষ হয়!’ প্রশান্ত জিভ কাটে।
‘স্বীকার করছ তা হলে?’
‘স্বীকার কে না করবে! আসলে মিলের শ্রমিক-ঠেঙানো লাইন ওনার জন্য নয়। এতদিনে ঠিক লাইনে চললেন।’
রাত্রি আটটায়, বসেরা বেরিয়ে গেলে এমনই জমায়েত হয় রোজ। রোজ মানে বি শিফটে। অন্যদিন সে জমায়েতের সুর আলাদা। অভিযোগ, হুঙ্কার, কখনও গালাগালি, কখনও বচসা। আজ এই স্পিনিং মিলে সুযশের শেষ দিন। তাই আজ অন্য মেজাজ। অন্য সুর।
‘মাইনে তো বোধহয় অনেকটাই কম হয়ে গেল?’ হাল্কা মেজাজ থেকে সহসা গণেশ সাহার ভিন্ন ডিরেকশন।
বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল সুযশের।
মাইনের কথাটা এই নিয়ে আজ চতুর্থবার শুনল। প্রথমবার রেজিগনেশনটা দেবার সময়। ‘চললেন তা হলে!’
ম্যানেজার সাহেবের গলায় বিষাদ নয় কিন্তু। বরং, মিটিমিটি হাসি আর ভুরু নাচানোয় স্পষ্ট, ওঁর কাছে বেশ উপভোগ্য সুযশের এই প্রস্থান। এটা আরও বোঝা গেল গলায় শ্লেষ এনে যখন বললেন— ‘মাইনে তো অর্ধেক হয়ে গেল। যা দ্রব্যমূল্য— সংসার কি চলবে!’
আবার সেই মাইনেরই প্রসঙ্গ। একটা ঢোঁক গিলে সুযশ গণেশ সাহাকে বলল— ‘টাকাটাই কি সব?’
ঘরের জমায়েতটা এসময় হাল্কা হয়ে গেল সুযশের ইমিডিয়েট বস তালুকদার ঢোকায়। তালুকদারের হাতে একটা মেমো বই। অন্যদিন এমন জমায়েত দেখলে তালুকদার নিশ্চিত একটা চিমটি কাটতেন— ‘প্রোডাকশনের দিকে নজর না দিয়ে শুধু আড্ডাই চলছে। ‘আজ সুযশের শেষ দিন। তাই কি তালুকদারও বিগলিত করুণা, জাহ্নবী যমুনা!
‘চললে তা হলে! চোদ্দোটা বছর সুখে দুঃখে একসঙ্গে— খারাপ লাগছে।’
তালুকদারের এই বিগলিত করুণার আসল উদ্দেশ্য অবশ্য অন্য। তা প্রকাশ পেল পরের কথায়— ‘গণেশবাবুও আছেন, ভালই হল। শোনো, ওই যে অনুতোষের কেসটা— মেমো তোমাকে লিখতে হবে না। কাল রিলিজ পেয়ে যাবে, মানে আজই তোমার শেষদিন। শেষদিনে আর! মেমো আমিই লিখে এনেছি। ঘটনাটা তো জানিই। বিরোধী ইউনিয়নের চাঁই। কেসটা যাতে দাঁড়ায়— সেভাবেই লেখা।— নাও সই করো। গণেশবাবুও উইটনেস হিসাবে পাশে।’
মেমোটা সুযশের দিকে বাড়িয়ে দেন তালুকদার।
সুযশ বলে- ‘বাবাঃ, লিখেছেন তো অনেক। একেবারে তিনপাতা। একটু পড়ে নিই।’
‘আবার পড়ার কী দরকার? তুমি তো চলেই যাবে। আমার আর ম্যানেজার সাহেবের ওপর চাপ আছে। কেসটা দাঁড় করাতেই হবে। শেষটায় একটু হেল্প করে যাও আমাদের। ইনসিডেন্টটা তোমার জায়গায় অন্য কোনও সুপারভাইজারের সামনে হলে তাকে বলতেও হত না।’
‘একটু পড়েই নিই না!’
‘বেশ পড়ো। গণেশবাবুও বসুন।’ একটা চেয়ার টেনে বসতে যান তালুকদার। এমন সময় ‘আগুন আগুন’ চিৎকার। হাঁফাতে হাঁপাতে ঢোকে রোরুমের বীরেন। —’এক নম্বর লাইনের কার্সনার বিটারের মোটরের পাশে আগুন লেগেছে। পাশে অনেক তুলোর বস্তা। সব জ্বলছে। আমি ড্রাই পাওডার ফাটিয়েছিলাম দুটো, কাজ হয়নি। শিগগির ফায়ার ব্রিগেড কল করুন।’
মেমো ফেলে সুযশ গণেশ সাহাকে নিয়ে ব্লোকমের দিকে ছোটে। তালুকদার মেমোটা বগলে নিয়ে ফায়ার ব্রিগেডকে ফোন করতে দৌড়োন।
ফায়ার ব্রিগেড আসার আগেই অবশ্য আগুন নেভে কর্মীদের চেষ্টায়। শিফট শেষের ভোঁও পড়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। তালুকদার সুযশের দিকে তাকান— ‘চলো মেমোটায় সইটা সেরে নেবে।’
‘কিন্তু গণেশবাবু?’
‘গনেশবাবুকে নিয়ে অসুবিধে হবে না। ওর ইউনিয়ানের চাপেই তো এসব করতে হচ্ছে। তুমি তোমারটা করে চলে যাও।’
‘মেমোটা পড়লামও না তো!’
‘পড়ার দরকার নেই। তোমাকে কে ধরবে?’
‘ধরাধরির প্রশ্ন নয়। চোদ্দো বছর কোনও পাপ কাজ করিনি। আজ শেষ বেলায়-‘
‘ও, তা হলে তুমি সই করবে না?’ সহসা তালুকদারের ভিন্ন মূর্তি।— ‘এই জন্যই তোমার এখানে কিছু হল না। একটুও আপস করবে না।’
‘তার জন্য আপনারাও তো কিছু কম করে দেননি। ন্যায্য প্রোমোশন আটকেছেন। একসঙ্গে তিনমাস নাইট শিফট করিয়েছেন। তিনবার সাসপেন্ড হয়েছি। আর শোকজ ওয়ার্নিংয়ের তো শেষ নেই।’
‘কিছুই হত না, যদি তাল মিলিয়ে চলতে। যাকগে, বড় ভাই হিসাবে বলছি— মেমোটায় সই করে দিয়ে যাও। না হলে আমাদের খুব অসুবিধে হয়ে যাবে। এবং হয়তো তোমারও।’
সুযশের আজ শেষদিন। আর অসুবিধের ভয় ওর নেই। ভয় থাকবেই বা কেন? যেখানে যাচ্ছে, ফ্রেশ অ্যাপয়েন্টমেন্ট। রিলিজ অর্ডার না পেলেও কিছু যাবে আসবে না। এখানে পিএফে কিছু টাকা আছে ঠিকই, তবে তার জন্য একজনকে বধ করে যেতে ও পারবে না। তালুকদারের কথায় কান না দিয়ে হনহন করে ও এসে ঢোকে অফিসে। তালুকদার ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারপর ওর পিছুপিছু কিছুটা এসে কোয়ার্টারের দিকে চলে যান।
সুযশ শিফট শেষের কাজগুলো সেরে নেয় দ্রুত। তারপর পরের শিফটকে চার্জ বুঝিয়ে দিয়ে কোয়ার্টারের দিকে পা বাড়ায়।
‘শেষ দিনটা দারুণ কাটল জানো!’ কোয়ার্টারে ফিরে সোফায় ধপ করে বসে তিতলিকে বলল সুযশ।
‘কী রকম?’
‘শেষদিন বলে একটুও অন্যরকম নয়— সেই টেনশন, আগুন। মিল বোধহয় এরকমই হয়। সব থেকে আশ্চর্যের কি জানো, এতদিন থেকে একটা লোক চলে যাচ্ছে— অথচ কারও কোনও হেলদোল নেই।’
‘অন্য জায়গা হলে ফেয়ারওয়েল পেতে।’
‘এখানেও একটা ফেয়ারওয়েল হয়েছে।’ অক্ষয় সরকারের একদমে ‘দধীচির তনুত্যাগ’ আবৃত্তির গল্পটা সুযশ বলে তিতলিকে।
তিতলি বাংলার ছাত্রী। তথ্য দেয়— ‘‘এটা আছে ‘বৃত্রসংহার’ কাব্যের ত্রয়োদশ সর্গে।’’ হঠাৎ-ই প্রসঙ্গ বদলে তিতলি বলে— ‘ফোন নিয়ে যাওনি, ওদিকে মেজদা ফোন করেছিল জানো। আবারও করবে।— আরে দ্যাখো বলতে বলতেই— নিশ্চয় মেজদা— যাও ধরোগে।’
সুযশ ছুটে যায়। টিভির টেবিল থেকে মোবাইলটা নিয়ে কানে ধরে।
‘তুই নাকি চাকরি ছেড়ে দিচ্ছিস?’
‘দিচ্ছি নয়, দিয়েছি।’
‘এত এত পয়সা খরচ করে তোকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ালাম, এই জন্য?’
‘কেন শিক্ষকতা কি খারাপ?’
‘খারাপ-ভালর কথা নয়। কথাটা প্রেস্টিজের। লোককে কী বলব? সব্বাইকে কত গর্ব করে বলতাম, আমার একটা ভাই ইঞ্জিনিয়ার। আর এখন বলব, ভাই একটা স্কুলে ওয়ার্ক এডুকেশনের টিচার! আমাদের কথাটা একটু ভাবলি না?’ ঘট করে ফোন রাখার আওয়াজ হল।
তিতলি বলল— ‘ও তোমাকে বলা হয়নি, দুপুরে বড়দাও ফোন করেছিল। চাকরি ছাড়ার জন্য খুব তড়পাল।’
সুযশ খুব ঘন হয়ে এল তিতলির। বলল— ‘দাদাদের কথা তো শুনলাম। এবার তোমার কথা বলো, এই যে চাকরি ছাড়লাম, তোমার ফিলিংসটা কী?’
তিতলি বলল— ‘আমি তোমার স্ত্রী। তুমি যেখানে যাবে, আমিও সেখানে যাব। তবে বাবা ইঞ্জিনিয়ার পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন। তখন স্কুল-শিক্ষক পাত্র অনেক এসেছিল, আমরা বাতিল করেছিলাম।’
‘তার মানে তুমিও খুশি নও!’ মাথায় আগুন জ্বলে উঠল সুযশের।—’বসো, একটু আসছি।’
বলে ঘর থেকে এক লাফে বেরিয়ে দ্রুতপায়ে হেঁটে তালুকদারের কোয়ার্টারের কলিংবেল বাজাল।
‘কী ব্যাপার?’ দরজা খুলে গম্ভীর তালুকদার।
‘যদি আমি না যাই?’
‘মানে!’ তালুকদারের চোখে বিস্ময়। ‘সত্যি যাবে না?’
‘সত্যি। রেজিগনেশন ক্যানসেল করা যাবে?’
‘যাবে না মানে, তবে তার পরিবর্তে তোমাকেও মেমোটায়—’
‘রাজি।’
‘ঠিক আছে আমি এক্ষুনি ব্যবস্থা করছি।’
তালুকদার ম্যানেজার সাহেবকে ফোনে ধরে— ‘স্যর অনুতোষের কেসটা দাঁড়াচ্ছে। সুযশ চাকরি ছাড়ছে না। ওর রেজিগনেশনটা ক্যানসেল করতে হবে। তার পরিবর্তে ও মেমোটায় সই দিয়ে দেবে। না মেমোটা তো অফিসে— হ্যাঁ, হ্যাঁ সই কাল সকালেই করিয়ে নেব। চিন্তা নেই।’
‘বাঁচালে আমাদের, যা চাপে পড়েছিলাম!’ সুযশের দিকে ফিরে বলে তালুকদার।
তালুকদারের কোয়ার্টার থেকে যখন নিজের কোয়ার্টারে ফিরল সুযশ, তখন ও আর সুযশ নয়, হয়ে গেছে দধীচি। তবে আসল দধীচি তাঁর হাড় ক’খানা কেবল বিপন্ন দেবতাদলের উদ্ধারকল্পে উৎসর্গ করেছিলেন। কিন্তু সুযশের সামনে বিপন্ন দল একটা নয়। অনেক।
চিত্রণ: মনিকা সাহা







