Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

কিশোরীবেলা ও শরতের আগমন

॥ এক॥

সেকালে উজ্জয়িনী-বিদিশার এক গ্রামকন্যা কাপড়ে নক্সাপাড় তুলে ফোঁড় দিত রেবা-বেত্রবতীর ফোয়ারা। গ্রীষ্মকালের নতুন ইশারা তখন, না বলতেই বেলি জুঁই গাছালিতে সেপাই বুলবুলের নীল ডিম শুয়ে আছে; ঝাউয়ের পাতার জালিকায় কত যোজন দূর থেকে পাখিবউ সংগ্রহ করেছে পশমের ছেঁড়া সুতো, লাল কাঠবাদামের পত্রালি, সুপুরির হলুদ খোসা। রাঁধন-পাটন-তুলসীবীজে মুখ মেজে-নেওয়া কাঠবিড়ালির দুলকি চালের দৌড়ে যখন বউ ঈষৎ ব্যস্ত হয়ে উড়ে যায়, ঠিক তখন আমার নতুন-হওয়া-মা তাঁর অজস্র চুলের গুছি আমার কচিমুখের পান থেকে সরিয়ে উঠে বসেন আর আমিও যেন টের পাই মায়ের আঁচল আলগা করা হল। সেই আমার দেয়ালা পর্ব শুরু। চোখের পাতা ভূমার চাবিতে গিঁট বাঁধা, নাকের পাটা চিকচিক করছে ঘামে, ঢাক কপালের ঢাল, চুল যেন কাপাসগুছি। আধো ওষ্ঠ খুলে হাসির ফোকলা মুহূর্ত তখন স্থানীয় চাদর থেকে দুটো পা মাতালের মতো পাশ মুড়ে নিচ্ছে। সংজ্ঞা নেই, সম্বিত নেই, কেবল নদীগাত্রে শব তার ভাসান দেখতে দেখতে কখন, কত যুগের পরে যে পৃথিবী চুম্বন করবে তার ইয়ত্তা নেই। লাল মেঝের গাঙে সে আমার পড়ন্ত সূর্যের রেকাবিতে আগের দিনের মুখ ধুয়ে রাখা। তামারং আকাশে বকের পিঠে কে এক ঘুমন্ত শিশু, তার দু’পায়ে ঝুমকোলতার মল পরানো, বাজুতে নাগকেশরের ফুলের ডিবে। ফিরতিযাত্রার মাঝ-বরাবর তখন সূর্যাস্তের লাইন কাটা, রাজ্ঞীবকের নির্দেশ অমান্য করে যেদিন দিন আর রাত্রির গণ্ডি ভেঙে ঢুকে এল সাঁঝের মস্তান, সেই হল খুলি ফেটে চৌচির হবার দিন। ঝাঁকর সোহাগি বুনো কামিনীর গাছটি সেদিন সম্পূর্ণ ন্যাড়া। এভাবেই বর্ষা তার নীলাম্বরী ফেলে হঠাৎ একদিন কোথায় কুর্চিফুলের সুগন্ধি বাতাসের গা বেয়ে উঠে যায় অমলতাসের হলদে ডালপালার শিয়রে। যেন পাগল হরবোলা সেই ছেলেটা গানের শেষ কলিটুকু রেখে বনের কাপাসের মধ্যে দিয়ে মিলিয়ে যায়। আর আমার পড়ার ঘরের জানলায় ডাক আসে শরতের। আগমনীর।

॥ দুই॥

পাখির রাজত্বে এ এক আশ্চর্য বসন্তকাল; কৃষ্ণচূড়ার নিঃসঙ্গ ডালে গত তিনদিনের চতুষ্পাঠী জুড়ে আছে ফাল্গুনের পাখিরা। হলদে সোনাঝুরির পরিবর্তে বিল্ব-শাখায় নামছে গতরাতের মশকপ্রজাতি, পিঁপড়ের পাড়ায় সাবেক কালের বাসাবদল চলছে। ওরা প্রত্যেকেই অশান্ত, ক্রমাগত খবর আসছে বৃষ্টির, কিন্তু পিতামহী পিপীলিকা মাথা ঝাঁকিয়ে ‘না, না’ বলে। মৌমাছিরা তবু নিষ্প্রভ, আদি নীর প্রকল্পে ওদের কাছে খবর আছে, শিলাবৃষ্টির ফলে সূর্যমুখী ও শ্বেতকরবীর পরাগদণ্ড খসে পড়েছে অকালে। প্রকৃতির এমন বে-নিয়মের গুস্তাকি রাণী মৌমাছির হাড় হিম করে দিচ্ছে, আর কতদূর মানুষগুলো তাদের বর্বরতা শানাবে! এবার যে ফিঙের পড়শি বেনেবউ আর হাঁড়িচাচা তাদের বিচিত্র ডাক বদল করে নিল। হয়তো কয়েকমাস তাদের ভুল অঙ্কের শোধ তুলবে তাদের অভুক্ত ছানারা। অনাহূত ঘাসের ডিপোতে গজাবে আম্রপল্লব, কংক্রিটের গোপন শাসন সত্ত্বেও, সবুজ ছিটে প্রজাপতির কানে বাজবে রঙিন মরসুমি ফুলের ধুন, কে বলতে পারে!

আমাদের পুবের ঘরের লাগোয়া এক কাকবৌয়ের গেরস্থালি। পুরুষটা সারাদিন কুটো, লাল নীল প্লাস্টিক, ঝাঁটার হলদে ফুলের ডাঁটি ঠোঁটে টানছে, সেও জানতে পেরেছে শরৎকাল সমাগতপ্রায়। সেকালে এমন এক কৃষ্ণপুরে নবমীতিথিতে ১০৮ পদ্মের উপচারে বেলগাছের ছায়ায়, হৈমবতীর আরাধনা করেছিলেন শ্রীরামচন্দ্র। বাসন্তীপূজার প্রথা ভেঙে সীতাকে উদ্ধারের জন্য আকুল রামের উপাসনায় পৃথিবীতে তখন উৎসবের পর্ব। নিজের সর্বস্ব দিয়ে রাবণের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতিতে সৈন্যসামন্ত সে কী তৎপর!
আমের গাছে এবার টুক্ করে লুকিয়ে এসে বসে এক পথভোলা মাছরাঙা। ঘড়িতে এখন পাঁচটা বেজে চল্লিশ। আবছা শিশিরে গাছের পাতারা কেমন জিইয়ে আছে। ব্রাউন কলার ব্লু ওভারকোট পরনে, বেশ সুঠাম তার ঠোঁট আর পুচ্ছের সংকেত। আমারই ঘরের পানে মুখ নামানো তার ডাক ধেয়ে আসে। যেন কাউকে তার চাই, যেন সে এলেই বলবে— ‘‘এই নাও, এক পশলা আর্কিমিডিস। জলজ পুষ্পের পরাগরেণু নাও, নাও অমলতাসের বসন, পরে ফেলো।’’ এমতাবস্থায় শরতের আলো ঝাঁকায় ভরে এসে দাঁড়ালেন দশভুজা দানবদলনী স্বয়ং, রাবণবধপালা লেখা শুরু হল একালের এক ডাকসাইটে কবির কলমে। মাইকেলের রাবণবন্দনা দিয়ে আমাদেরও দুর্গাস্তোত্রের যবনিকা উত্তোলন।

পুরনো লাল স্কুলবাড়ি, শরৎচন্দ্রের বসতভিটে, ঘড়িঘণ্টার মোড় ঘুরে গরম জিলিপির লাইন। বাঙালিটোলার রাস্তায় পশ্চিমে হেলে যাচ্ছে আকাশপথ, আমি তখন পরিব্রাজকের মতো পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে পৌঁছে গেলাম আশালতার সেই গল্পে, যেখানে বাপের বাড়িতে তার মন টিকছে না। অথচ অবস্থাপন্ন সচ্ছল জীবনের সমস্ত আয়োজন অব্যাহত ছিল। গল্পের নেশায় নাওয়াখাওয়া ভুলে পুজোসংখ্যার মধ্যে সেঁধিয়ে আছি বিজয়ার পরেই। ভাগলপুরের মেয়ে আশালতা সিংহের নিজের চোখ দিয়ে দেখা তাঁর নৈহার পর্বের কত খুঁটিনাটি, কত আনুপুঙ্খিক তার বর্ণমালা। আমি শরৎকাল থেকে ক্রমশ বিরহের দিকে তাকিয়ে থাকি আর কী যে একটা আশ্চর্য অনুবেদনের মধ্যে ঘোর লেগে যায়…

দোলা চড়ে কৈলাসিনী সঙ্গে হল্লাদল।
এক্কা দোক্কা দস্যিপনা এ কী হট্টরোল!

বাপের বাড়ি লণ্ডভণ্ড অসুর ঘুমে কাদা।
দক্ষযজ্ঞে উঠল মেতে পাড়ার যত দাদা॥

ষষ্ঠীতে তার বোধন হবে বেলবৃক্ষতলে।
আলতা সিঁদুর পাঁচ শস্য গঙ্গামাটি জলে॥

পাঁচটি প্রদীপ কাঁসরঘণ্টা শঙ্খ ফুলডোরে।
ঠাকুরদালান উঠল মেতে ‘রূপম দেহি’ বলে॥

সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত দেবীপক্ষের ভোরে।
শিউলি রঙের জামদানিতে কাশের গুচ্ছ দোলে॥

‘যা দেবী সর্বভূতেষু’ উচ্চারণের ঘোরে
সঁপেছি আজ মনের লাগাম, ফুলপাতাটির জোড়ে

দেবী নিদ্রায় ব্যাঘাত হানো, বলো ‘জাগো— জাগো’
তর্পণের রাত্রি পেরিয়ে মর্ত্যে এসেছো মাগো…

মহাগৌরী জাগ্রত হও! চণ্ডমুণ্ড রক্তবীজ দাহ।
তৃতীয় নয়ন হতে ক্রমোৎকর্ষে উন্নীত আরোহ॥
মণ্ডলে অবয়বে ধীযুক্ত করো তুমি দেবী।
আগুন ছুটিয়ে দাও, বধ্যভূমি সন্নত হোক॥

শিকারে প্লীহার মতো গোল চাঁদ কালিকাবরণ
শিরার ভেতর পোড়ে ছাই, অস্ত্র ঝনঝনায় রণ
মাতাল মোহিনী। কৃষ্ণ আরাধনা তীব্র এ যজ্ঞ
আগমনীবৃন্দ, দোলায় এসেছে। যদি মাটিবিশ্ব
চৌচির হোক!

অসুর তাণ্ডবে তুমি স্বর্গ মর্ত্য পাতাল পেরোলে।

কুমারীরূপে বধ করলে, অসুরদেহ পড়লো ভূতলে।
গহনা, তিলক ও মুকুট— যুদ্ধে এলোচুলে॥
সাজলে তুমি হে সিন্ধুসূতা! গহন অরণ্যে নাদ।
মোচন করো স্বার্থ, গ্লানি, বর্বরতা— ত্রিলোক বিষাদ॥

আভূমি নিবিড় হল হোমরাত্রি, আজ এখানেই শেষ।
রাবণ বধের পর পৃথিবী মালিন্যহীন, ফিরে যাবে তুমি॥
মা মেনকার কান্না গুমরে-ওঠা কত না অভ্যেস।
ফুরিয়ে যায়; অশ্বখুরে চলে যাচ্ছে মেয়ে॥

॥ বিজয়া দশমী॥

রক্তপুষ্প ফুটেছে মূর্তিতে; দেবীর অঙ্গরাগ ছুঁয়ে যায়
গেরস্ত কন্যা, ননদিনী। ঢাকের কাঠিতে কাঁপে শব্দের
দূরপ্লাবী অশ্রুপাত, তরঙ্গমালায় তার খুদে মুঠি উঁচু করে
বারংবার চেঁচায় ছেলেটি— ‘আসছে বছর আবার হবে’
বলামাত্র চৌষট্টি পাপড়ি ভেঙে ঝুপ্ করে নেমে এল

॥ বিজয়া দশমী॥

চিত্রণ: আয়ুষ্মান সেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 4 =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »