‘গোধূলি বলয়’। সাহিত্যে এই সুন্দর শব্দযুগলের অর্থ, কল্পনা আর বাস্তবের মধ্যবর্তী এক অবস্থা; an undefined state between fantasy and reality। তবে বিজ্ঞানের জগতে এই গোধূলি বলয় বা ট্যুইলাইট জোন (twilight zone) কিন্তু কোনও কাল্পনিক শব্দ নয়। সমুদ্রের তলায় ২০০ মিটার থেকে ১০০০ মিটার গভীরতার মধ্যবর্তী অঞ্চলকে বলা হয় ট্যুইলাইট জোন।
গভীরতা ও আলোর প্রবেশ ক্ষমতার সাপেক্ষে সমুদ্রের তলদেশকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রথম ২০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত অঞ্চলকে বলা হয় euphotic zone বা sunlight zone, এখানে সূর্যালোক পর্যাপ্ত পরিমাণে পৌঁছোতে পারে। সমস্ত রকমের সামুদ্রিক মাছ যা আমরা খাই, সব রকমের স্তন্যপায়ী সামুদ্রিক প্রাণী, আর নানান জাতের সামুদ্রিক কচ্ছপের বাসস্থান এই ‘ইউফোটিক জোন’। পরবর্তী ২০০ মিটার থেকে ১০০০ মিটার গভীরতার অঞ্চলকে বলা হয় ট্যুইলাইট জোন। এই অঞ্চলে গভীরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে আলোর প্রবেশ ক্রমাগত হ্রাস পেতে থাকে। এই ট্যুইলাইট জোনে আলোর intensity এতটাই কম যে, এখানে ফটো সিনথেসিস সম্ভব হয় না। এই ট্যুইলাইট জোনকে midwater zone বা mesopelagic zone-ও বলা হয়। হিমশীতল স্বল্পালোকিত (dim light) গভীর এই তলদেশ কিন্ত প্রাণের প্রবাহে ভরপুর। আর যে-সব সামুদ্রিক প্রাণী এই ট্যুইলাইট জোনে বাস করে, তাদের অনেকের দেহ থেকেই এক বিশেষ রকমের রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে নিঃসৃত হয় কোমল শীতল আলো (bioluminiscence)। শীতল গভীর নিঃশব্দ জলরাশি, আধো-অন্ধকারে মায়াময় আলোর ছটা (flashes of bioluminiscence), সবে মিলে এক অন্য জাগতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই ট্যুইলাইট জোন। আর এরই মাঝে প্রবাহিত হয়ে চলেছে অসংখ্য প্রাণের স্পন্দন। অসংখ্য প্রজাতির মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর বাস এখানে।

সাম্প্রতিক এক তথ্য অনুযায়ী, সমগ্র বিশ্বব্যাপী এই ট্যুইলাইট জোনের সামগ্রিক জৈব ভরের (total biomass) পরিমাণ বিশ্ব-সমুদ্রের বাকি সব অংশের মোট জৈব ভরের প্রায় দশ গুণ। মাইক্রোস্কোপিক ব্যাকটেরিয়া, অতি ক্ষুদ্র জীব জুপ্ল্যাঙ্কটন (zooplankton), জেলিফিশ থেকে শুরু করে এই গ্রহের বৃহত্তম আকারের প্রাণী, সবই বাস করে এই ট্যুইলাইট জোনে। এইসব জীবের মধ্যে কোনও কোনও প্রজাতি তাদের সারা জীবনই কাটিয়ে দেয় গভীর জলের তলার হিমশীতল আধো-অন্ধকার আবাসে। আবার এদের মধ্যে এক বিশাল সংখ্যক মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর দল আবার প্রতিদিন রাতের অন্ধকারে সাঁতরে চলে আসে সমুদ্রের উপরিভাগে খাবার সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। তবে দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই প্রিডেটরের আক্রমণের আশঙ্কায় ও আত্মরক্ষার তাগিদে এরা আবার ফিরে যায় হাজার মাইল সাঁতরে গভীর জলের অন্ধকারে তাদের নিজস্ব আবাসে। দীর্ঘ পথ সাঁতরে এক সুবিশাল জলজ প্রাণীর দলের প্রতিদিনের এই যে নিয়মিত আসাযাওয়া, এই ভার্টিকাল মাইগ্রেশন, বিজ্ঞানীদের মতে, “This is the largest animal migration on earth.” আর এই ফিরে যাওয়ার পথে বিশাল জলজ প্রাণীর দল আরও একটা কাজ করে। সেটা হল, পরিবেশ দূষণের ফলে যে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস সমুদ্রজলের উপরিতলে শোষিত হয়, তার একটা বড় অংশ এই জলজ প্রাণীর দল গভীর সমুদ্রে বহন করে নিয়ে যায়। আর এভাবেই কার্বন সিঙ্কের মাধ্যমে ট্যুইলাইট জোন বিশ্ব উষ্ণায়নের নিয়ন্ত্রণে বিশেষভাবে সহায়তা করে।
এছাড়াও সমুদ্রের খাদ্য-জালের (food web in ocean) ধারাবাহিকতা রক্ষাতেও ট্যুইলাইট জোনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কার্বনযৌগ সমৃদ্ধ নানান সামুদ্রিক প্রাণীর মৃতদেহ, মৃত প্ল্যাকটন, ব্যাকটেরিয়া, ফিকাল ম্যাটারস ইত্যাদি সমুদ্রের উপরিভাগ থেকে ট্যুইলাইট জোনের মধ্যে দিয়ে গভীর সমুদ্রে অধঃক্ষিপ্ত হওয়ার পথে এর একটা বড় অংশ ট্যুইলাইট জোনের প্রাণীদের খাদ্য হিসাবে গৃহীত হয়। আবার ট্যুইলাইট জোনের প্রাণীদের মৃত অবশিষ্ট, ফিকাল ম্যাটারস ইত্যাদি আরও নীচের গভীর সমুদ্রে অধঃক্ষিপ্ত হয়ে গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের খাদ্যের জোগান দেয়। সমুদ্রগর্ভে বাস্তুতন্ত্রের সাম্যতা রক্ষায় এভাবেই ট্যুইলাইট জোন এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলে।
তবে এখনও পর্যন্ত ট্যুইলাইট জোনের অতি সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য (biodiversity) অনেকাংশেই এবং অন্যান্য আরও বহু তথ্যই অনাবিষ্কৃত (unexplored) রয়ে গেছে। আসলে, ভাসমান জাহাজ থেকে sonar (sound navigation ranging) টেকনিকের সাহায্যে অথবা স্যাটেলাইট টেকনোলজির সাহায্যে সমুদ্রের উপরিতলে অথবা euphotic/ sunlight zone-এ যেভাবে ইমেজিং করা যায় ও অনুসন্ধান পর্ব চালানো যায়– গভীরতা, স্বল্প আলো, frequent migration of biomass ইত্যাদি নানা কারণ ট্যুইলাইট জোনে ইমেজিং করার পরিপন্থী। তাই অনুসন্ধান পর্ব অপেক্ষাকৃত জটিল ও ধীর। তবে বিজ্ঞানের অগ্রগতি তো থেমে থাকে না। উন্নততর গবেষণা ও অনুসন্ধানের কাজ অব্যাহত রয়েছে বিভিন্ন স্তরে।
প্রসঙ্গত, এই ট্যুইলাইট জোন আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফারদের এক অতি আকর্ষণীয় ফটোগ্রাফিক স্পট। এমনই এক আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফির নিদর্শন এখানে রাখছি।

UNESCO-র এক বিজ্ঞানীদলের পরিচালনায় ২০২১ সালের শেষের দিকে আবিষ্কৃত হয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরের তাহিতি উপকূলের অদূরে ট্যুইলাইট জোনে অসংখ্য গোলাপের পাপড়ির আকার বিশিষ্ট প্রবালের প্রাচীর। এই গবেষকদলেরই অন্তর্ভুক্ত অত্যন্ত অভিজ্ঞ ফটো-জার্নালিস্ট অ্যালেক্সিস রোজেনফেল্ড (the lead photographer of the research team) ক্যামেরাবন্দি করেছেন এই অপরূপ সুন্দর প্রবাল প্রাচীর।
অ্যালেক্সিস রোজেনফেল্ড ও তাঁর টিম Rebreather (এক বিশেষ ধরনের উন্নত মানের স্কুবা ইকুইপমেন্ট)-এর সাহায্যে ট্যুইলাইট জোনের এই প্রবাল সাম্রাজ্যে মোট ২০০ ঘণ্টা সময় কাটিয়েছেন এবং সুনিপুণ পর্যবেক্ষণ চালিয়েছেন।

গভীর জলের তলায় প্রায় ৩ কিমি বিস্তৃত এই অপূর্ব সৌন্দর্যমণ্ডিত প্রবাল প্রাচীর যেন গোলাপের পাপড়ি দিয়ে গড়া কোনও এক শিল্পীর অনুপম সৃষ্টি। আর শুধুই সৌন্দর্য নয়। আজ যেখানে সারা বিশ্ব-সমুদ্রের প্রায় অধিকাংশ প্রবাল প্রাচীরগুলো দূষণ, জলবায়ুর পরিবর্তন, অতিরিক্ত commercial fishing ইত্যাদির কবলে অতি দ্রুতহারে ক্ষয়িত হয়ে চলেছে– এই সময়ে দূষণমুক্ত, আদিম (pristine), সতেজ ও সপ্রাণ (living) এমন এক দীর্ঘ প্রবাল প্রাচীরের খোঁজ পাওয়া খুবই সদর্থক। আগামী দিনে এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের অবশ্যই উৎসাহিত করবে গভীর সমুদ্রের অভ্যন্তরের নানা স্তরে আরও বিশদে অনুসন্ধান ও গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে।
তথ্যসূত্র:
1. nature.com
2. twilightzone.whoi.edu
3. oceanservice.noaa.gov
4. wnet.com
5. whol.edu
চিত্র: গুগল







2 Responses
খুব ভালো লাগল ‘গোধূলি বলয়’ । Twilight Zone, শব্দবন্ধের বঙ্গীয়করণটিও বেশ কাব্যিক শিরোনাম। লেখাটি যথেষ্ট চিত্তাকর্ষক ও চিন্তা উদ্রেককারী। লেখাটি পড়লে জানা যায়, সমুদ্রতলের হিমশীতল-আলো আঁধার অঞ্চলটির ( Twilight zone) কী বিপুল গুরুত্ব! জীব বৈচিত্র্যময় এই সুগভীর অঞ্চল কীভাবে কার্বন সিঙ্ক হিসেবে কাজ করে, দূষণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে জানা গেল। কিংবা, সমুদ্রের জলজ প্রাণের খাদ্য শৃঙ্খলের সহায়ক হচ্ছে কীভাবে, এই লেখায় তার উল্লেখ আছে। সমুদ্র তলের জৈব-সাম্রাজ্য বিজ্ঞানীদের কাছে বহুলাংশেই অধরা। সেই সুবিশাল অধরা মাধুরির সৌন্দর্য সন্ধানের সামান্য ইংগিত দিয়েছেন লেখক।
সিদ্ধার্থ মজুমদার.. অনেক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে আমার লেখাটা এত যত্ন করে পড়েছেন ও আপনার সুচিন্তিত মন্তব্য জানিয়েছেন বলে।🙏🏽