Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

কাজী নজরুল: ত্রস্ত ছায়াপথ

‘ধূমকেতু’, ‘লাঙল’, ‘নবযুগ’ শব্দসমূহ যাঁর নামের সঙ্গে ওতপ্রোত, আজ তাঁর প্রয়াণদিবস। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁকে নিয়ে যে বই লেখেন, তার নাম দেন ‘জ্যৈষ্ঠের ঝড়’, আর রবীন্দ্রনাথ তো তাঁকে সরাসরি ‘পাগল’-ই বলেন। জনগণ ডাকেন ‘বিদ্রোহী কবি’ বলে। আসলে তিনি কী?

আসলে তিনি কবি। কবিকে প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে বলা হয়েছে ক্রান্তদর্শী, যিনি ভূত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দেখতে পান। বলা হয়েছে পরিভূ, স্বয়ম্ভূ। শব্দদুটি গভীর তাৎপর্যবাহী। প্রথমটির অর্থ সর্বোত্তম, জগতের সবকিছুকেই পরিবেষ্টন করে থাকেন যিনি, অর্থাৎ ব্রহ্ম। আর স্বয়ম্ভু, কি না নিজেই নিজের জন্মদাতা। নজরুল কি তাই নন? জগতের কোন জিনিসটি-ই না তাঁর দৃষ্টির অগোচর ছিল, দুঃখ আর আনন্দ, হাহাকার ও উল্লাস, তা সে সৃষ্টিসুখের-ই হোক বা পরশুরামের কুঠার হাতেই হোক, তিনি জীবিতকালে যেন পরিব্যাপ্ত এই মহাজগতের মহাকাল। গানে, কবিতায়, জীবনযাপনে, সবক্ষেত্রেই। বাংলা সাহিত্যে, বাঙালির জীবনে আর ইতিহাসে তিনি যথার্থ এক ধূমকেতু।

মাত্র বাইশ বছরের সাহিত্যসাধনায় তিনি ফুটিয়েছেন অজস্র কুসুম, যা গান হয়ে, কবিতা হয়ে, গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ নাটক হয়ে মোহন বিভা ছড়াচ্ছে। এর-ই মধ্যে পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন যেমন, তেমনই চলচ্চিত্রে অভিনয়, পরিচালনা, সঙ্গীত পরিচালনাও করেন। তাঁর লেখা পাঁচ-পাঁচটি বই বাজেয়াপ্ত করে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার, জেল, অনশনের মধ্যেও যেতে হয়েছে তাঁকে, তাঁর জীবনের সক্রিয় পর্বে। এইচ.এম.ভি.-র মিউজিক ট্রেনারের দায়িত্ব, আকাশবাণী কলকাতায় সঙ্গীতবিষয়ক একাধিক অনুষ্ঠান প্রযোজনা, এবং অবশেষে ১৯৪২-এ, মাত্র বাইশ বছর বয়সে ওই আকাশবাণীতেই অনুষ্ঠান করতে করতে চিরতরে মূক হয়ে যাওয়া!

তাঁর সমবয়সী কবি জীবনানন্দ লিখেছিলেন, ‘বেদনার আমরা সন্তান’! নজরুল সেই বেদনাজাতকের-ই যেন মহিমময় প্রতিমূর্তি। কী বেদনাহত নাম তাঁর, দুখুমিয়া! বাস্তবেও তাই। তেইশ বছরের যুবক একটিমাত্র কবিতার মাধ্যমে বিখ্যাত হলেন, প্রমথ চৌধুরী শিরোপা দিলেন ‘বিদ্রোহী কবি’ বলে, আর এই বরেণ্য মানুষটি দারিদ্র্য আর আর্তির বৈভবে জীবন কাটালেন, ঘরে মৃত সন্তানকে রেখে অর্থ সংগ্রহে যেতে হল তাঁকে, পুত্রের শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য! স্ত্রীর মৃত্যুসংবাদটির উপলব্ধিও এল না তাঁর, যেহেতু সেসময়ে তিনি জাগতিক সব উপলব্ধির বাইরে। তাঁকে স্থান দেওয়া হয় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে, তাঁকে নিয়ে দেশে বিদেশে গবেষণা করেন রফিকুল ইসলাম, ইরশাদুল আহমেদ শাহীন, আনোয়ারুল হক, অরুণকুমার বসু, পল্লব সেনগুপ্ত, গোলাম মুরশীদ, শাহাবুদ্দীন আহমদ, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মিসেস রেচেল প্রমুখ! তাঁকে নিয়ে উপন্যাস লেখা হয়। কত না ভাষায় আজ তিনি অনূদিত, পঠিত আর চর্চিত! কত যে ইন্সটিটিউট তাঁকে নিয়ে! অথচ পরিহাস এটাই, অর্থাভাবে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়া হয়নি মেধাবী এই ছাত্রের! আর তাঁর গান লাখো কণ্ঠে গীত হয় রোজ। তাঁর গান ব্যবহৃত হয় চলচ্চিত্রে, অবাঙালি শিল্পী মহম্মদ রফি, অনুপ জালোটা প্রমুখ তাঁর গানের রেকর্ড করেন, তাঁর নামে মঞ্চ-ও আছে। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় কবি হিসেবে সম্মানিত করেছে, ভারতে ও বাংলাদেশে তাঁর নামে আছে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। যত দিন যাচ্ছে, তাঁর পরিসর ক্রম-প্রসারিত হচ্ছে, হয়েই চলেছে। মনে প্রশ্ন না জেগে পারে না, হচ্ছে কেন?

রবীন্দ্রনাথের একটি উদ্ধৃতি দিয়েই বোঝানো যাক বাঙালির কাছে নজরুলের গ্রহণযোগ্যতা। ‘আঁধারের গায়ে গায়ে পরশ তব, সারারাত ফোটাক তারা নব নব’। নজরুল তাঁর এই জাদু-অঙ্গুলির ছোঁয়ায় অগণিত তারা ফুটিয়ে গেছেন, যা আমাদের চিত্ত জাগিয়ে তুলতে পারে, যদি আমরা তাকে মান্যতা দিই। তিনি সাম্যের গান গেয়ে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর করার কথা বলেন। এই পৃথিবীর গড়ে ওঠা নারী-পুরুষের যৌথতায়, জানান আমাদের। কুলি, মজুর, সর্বহারাদের কথা বলেন, বলেন আন্তর্জাতিকতার কথা। ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম’? বলে আমাদের সাম্প্রদায়িক বীজাণুর কোষে আঘাত দেন, বলেন, ‘আমরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম’। তিনি গজল, ইসলামি গান, হজরত মুহাম্মদ রসুলল্লাহকে নিয়ে ‘মরুভাস্কর’ লেখেন, ফার্সি থেকে অনুবাদ করেন হাফিজ আর ওমরখৈয়াম। যে হাত দিয়ে লেখেন ‘দেখে যা রে দুলা সাজে সেজেছেন মোদের নবী’ এবং ‘রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’, আবার সেই এক-ই হাতে রচনা করেন ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন’ আর ‘বল রে জবা বল, কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণতল’-এর মতো শ্যামাসঙ্গীত। হিন্দু-মুসলমানের গালাগালিকে চান গলাগলিতে পরিণত করতে। আবার স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস নয়, স্বরাজ-টরাজ বুঝতে চান না তিনি, সূচ্যগ্র মেদিনী ছাড় নেই এক্ষেত্রে, নির্ভীক বাক্যে জানিয়ে দেন ঔপনিবেশিক শাসককে। এসব কি উজ্জ্বল আর আমাদের বোধ-অর্জনের জন্য এক একটি শাশ্বত তারা ফোটানো নয়? আমাদের যুগ যুগ সঞ্চিত অমা-রাতে, যেখানে কেবল বিভেদের আবাদ করছি আমরা আবহমান সময় ধরে, আঁধার রাতে, সেখানে মহাবীজ পুঁতে গেছেন তিনি সম্প্রীতি ও যুগলমিলনের। রবীন্দ্রনাথ মাটির কাছাকাছি কোনও কবিকে চেয়েছিলেন। তাঁর সাধ অনেকটাই পূর্ণ করেছিলেন নজরুল। নিজের গ্রন্থ ‘বসন্ত’ উৎসর্গ করা বিফলে যায়নি তাঁর।

আমরা যদি তাঁর লেখা পড়ে তাঁকে অনুসরণ না করি, তাহলে বৃথাই তাঁকে স্মরণ। যেকোনও প্রতিভা আমাদের মানুষ হিসেবে আদর্শিক হয়ে উঠতে পারে তখনি, যখন আমরা তাঁর মানসিকতাকে অনুভব করে অন্তত চেষ্টা করব তাঁর পথকে ভালবাসতে। একদিকে পাঠ নিচ্ছি ‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো মন্দির কাবা নাই’ আর আচরণে ভিন্ন থাকছি, এ হল তাঁকে প্রকৃত অসম্মান। তাহলে তাঁর পাঠ না-ই বা নিলাম! তাহলে আমাদের বিনাশ কিন্তু আমরা নিজেরাই ডেকে আনব। নজরুল ঠিক-ই থেকে যাবেন, তারা ফোটাবেন, ফোটাবেন, ফোটাতেই থাকবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 + nine =

Recent Posts

কাজী তানভীর হোসেন

চেতনার বিবর্তন ও ঈশ্বরের নৃবিজ্ঞান

মানুষের অজ্ঞানতা ও ভুলের গর্ভেই ঈশ্বরের জন্ম হয়েছিল; আর মানুষের জ্ঞান ও সভ্যতার ঐতিহাসিক অগ্রগতিই একদিন ঈশ্বরের কবরে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেবে। জ্ঞানতাত্ত্বিক আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান তাত্ত্বিকভাবে বিনাশ করবে অলৌকিক সৃষ্টিকর্তার ধারণা, আর সম্পদের সুষম বণ্টন ও সাম্যবাদ (Communism) বিলুপ্ত করবে প্রাচীন টোটেমীয় কুসংস্কারকে। একদিন ধর্মের এই অন্ধ খোলস ভেদ করে স্থান করে নেবে উচ্চতর গণিত, আধুনিক সৃষ্টিতত্ত্ব এবং বিজ্ঞানসম্মত মানবিক কর্তব্যবোধ।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

ব্রিটিশ ছোটগল্প

আমি আগে থেকেই আমেরিকার পাখি বইটি সম্পর্কে জানতাম, কিন্তু কখনও বইটির সঙ্গে তেমনভাবে সময় কাটাইনি। ঠিক যেভাবে কেউ নদীর ধারে বসে সময় কাটায়। বাবার হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে থাকতে থাকতে আমি যেন ধৈর্যের অর্থ শিখে নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করতে শিখেছিলাম। এডি ঠিকই বলেছিল— আমিও মাছ ধরতে যেতে চাইছিলাম। জলের ধারে বসে থাকতে চাইছিলাম। কিন্তু বাবাকে দেখতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো সম্ভব হয়নি। তাই আমি অডুবন-এর সরোবরসম বইয়ে আমার জাল ফেললাম।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »