Search
Generic filters
Search
Generic filters

কাজী নজরুল: ত্রস্ত ছায়াপথ

‘ধূমকেতু’, ‘লাঙল’, ‘নবযুগ’ শব্দসমূহ যাঁর নামের সঙ্গে ওতপ্রোত, আজ তাঁর প্রয়াণদিবস। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁকে নিয়ে যে বই লেখেন, তার নাম দেন ‘জ্যৈষ্ঠের ঝড়’, আর রবীন্দ্রনাথ তো তাঁকে সরাসরি ‘পাগল’-ই বলেন। জনগণ ডাকেন ‘বিদ্রোহী কবি’ বলে। আসলে তিনি কী?

আসলে তিনি কবি। কবিকে প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে বলা হয়েছে ক্রান্তদর্শী, যিনি ভূত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দেখতে পান। বলা হয়েছে পরিভূ, স্বয়ম্ভূ। শব্দদুটি গভীর তাৎপর্যবাহী। প্রথমটির অর্থ সর্বোত্তম, জগতের সবকিছুকেই পরিবেষ্টন করে থাকেন যিনি, অর্থাৎ ব্রহ্ম। আর স্বয়ম্ভু, কি না নিজেই নিজের জন্মদাতা। নজরুল কি তাই নন? জগতের কোন জিনিসটি-ই না তাঁর দৃষ্টির অগোচর ছিল, দুঃখ আর আনন্দ, হাহাকার ও উল্লাস, তা সে সৃষ্টিসুখের-ই হোক বা পরশুরামের কুঠার হাতেই হোক, তিনি জীবিতকালে যেন পরিব্যাপ্ত এই মহাজগতের মহাকাল। গানে, কবিতায়, জীবনযাপনে, সবক্ষেত্রেই। বাংলা সাহিত্যে, বাঙালির জীবনে আর ইতিহাসে তিনি যথার্থ এক ধূমকেতু।

মাত্র বাইশ বছরের সাহিত্যসাধনায় তিনি ফুটিয়েছেন অজস্র কুসুম, যা গান হয়ে, কবিতা হয়ে, গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ নাটক হয়ে মোহন বিভা ছড়াচ্ছে। এর-ই মধ্যে পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন যেমন, তেমনই চলচ্চিত্রে অভিনয়, পরিচালনা, সঙ্গীত পরিচালনাও করেন। তাঁর লেখা পাঁচ-পাঁচটি বই বাজেয়াপ্ত করে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার, জেল, অনশনের মধ্যেও যেতে হয়েছে তাঁকে, তাঁর জীবনের সক্রিয় পর্বে। এইচ.এম.ভি.-র মিউজিক ট্রেনারের দায়িত্ব, আকাশবাণী কলকাতায় সঙ্গীতবিষয়ক একাধিক অনুষ্ঠান প্রযোজনা, এবং অবশেষে ১৯৪২-এ, মাত্র বাইশ বছর বয়সে ওই আকাশবাণীতেই অনুষ্ঠান করতে করতে চিরতরে মূক হয়ে যাওয়া!

তাঁর সমবয়সী কবি জীবনানন্দ লিখেছিলেন, ‘বেদনার আমরা সন্তান’! নজরুল সেই বেদনাজাতকের-ই যেন মহিমময় প্রতিমূর্তি। কী বেদনাহত নাম তাঁর, দুখুমিয়া! বাস্তবেও তাই। তেইশ বছরের যুবক একটিমাত্র কবিতার মাধ্যমে বিখ্যাত হলেন, প্রমথ চৌধুরী শিরোপা দিলেন ‘বিদ্রোহী কবি’ বলে, আর এই বরেণ্য মানুষটি দারিদ্র্য আর আর্তির বৈভবে জীবন কাটালেন, ঘরে মৃত সন্তানকে রেখে অর্থ সংগ্রহে যেতে হল তাঁকে, পুত্রের শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য! স্ত্রীর মৃত্যুসংবাদটির উপলব্ধিও এল না তাঁর, যেহেতু সেসময়ে তিনি জাগতিক সব উপলব্ধির বাইরে। তাঁকে স্থান দেওয়া হয় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে, তাঁকে নিয়ে দেশে বিদেশে গবেষণা করেন রফিকুল ইসলাম, ইরশাদুল আহমেদ শাহীন, আনোয়ারুল হক, অরুণকুমার বসু, পল্লব সেনগুপ্ত, গোলাম মুরশীদ, শাহাবুদ্দীন আহমদ, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মিসেস রেচেল প্রমুখ! তাঁকে নিয়ে উপন্যাস লেখা হয়। কত না ভাষায় আজ তিনি অনূদিত, পঠিত আর চর্চিত! কত যে ইন্সটিটিউট তাঁকে নিয়ে! অথচ পরিহাস এটাই, অর্থাভাবে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়া হয়নি মেধাবী এই ছাত্রের! আর তাঁর গান লাখো কণ্ঠে গীত হয় রোজ। তাঁর গান ব্যবহৃত হয় চলচ্চিত্রে, অবাঙালি শিল্পী মহম্মদ রফি, অনুপ জালোটা প্রমুখ তাঁর গানের রেকর্ড করেন, তাঁর নামে মঞ্চ-ও আছে। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় কবি হিসেবে সম্মানিত করেছে, ভারতে ও বাংলাদেশে তাঁর নামে আছে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। যত দিন যাচ্ছে, তাঁর পরিসর ক্রম-প্রসারিত হচ্ছে, হয়েই চলেছে। মনে প্রশ্ন না জেগে পারে না, হচ্ছে কেন?

রবীন্দ্রনাথের একটি উদ্ধৃতি দিয়েই বোঝানো যাক বাঙালির কাছে নজরুলের গ্রহণযোগ্যতা। ‘আঁধারের গায়ে গায়ে পরশ তব, সারারাত ফোটাক তারা নব নব’। নজরুল তাঁর এই জাদু-অঙ্গুলির ছোঁয়ায় অগণিত তারা ফুটিয়ে গেছেন, যা আমাদের চিত্ত জাগিয়ে তুলতে পারে, যদি আমরা তাকে মান্যতা দিই। তিনি সাম্যের গান গেয়ে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর করার কথা বলেন। এই পৃথিবীর গড়ে ওঠা নারী-পুরুষের যৌথতায়, জানান আমাদের। কুলি, মজুর, সর্বহারাদের কথা বলেন, বলেন আন্তর্জাতিকতার কথা। ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম’? বলে আমাদের সাম্প্রদায়িক বীজাণুর কোষে আঘাত দেন, বলেন, ‘আমরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম’। তিনি গজল, ইসলামি গান, হজরত মুহাম্মদ রসুলল্লাহকে নিয়ে ‘মরুভাস্কর’ লেখেন, ফার্সি থেকে অনুবাদ করেন হাফিজ আর ওমরখৈয়াম। যে হাত দিয়ে লেখেন ‘দেখে যা রে দুলা সাজে সেজেছেন মোদের নবী’ এবং ‘রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’, আবার সেই এক-ই হাতে রচনা করেন ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন’ আর ‘বল রে জবা বল, কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণতল’-এর মতো শ্যামাসঙ্গীত। হিন্দু-মুসলমানের গালাগালিকে চান গলাগলিতে পরিণত করতে। আবার স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস নয়, স্বরাজ-টরাজ বুঝতে চান না তিনি, সূচ্যগ্র মেদিনী ছাড় নেই এক্ষেত্রে, নির্ভীক বাক্যে জানিয়ে দেন ঔপনিবেশিক শাসককে। এসব কি উজ্জ্বল আর আমাদের বোধ-অর্জনের জন্য এক একটি শাশ্বত তারা ফোটানো নয়? আমাদের যুগ যুগ সঞ্চিত অমা-রাতে, যেখানে কেবল বিভেদের আবাদ করছি আমরা আবহমান সময় ধরে, আঁধার রাতে, সেখানে মহাবীজ পুঁতে গেছেন তিনি সম্প্রীতি ও যুগলমিলনের। রবীন্দ্রনাথ মাটির কাছাকাছি কোনও কবিকে চেয়েছিলেন। তাঁর সাধ অনেকটাই পূর্ণ করেছিলেন নজরুল। নিজের গ্রন্থ ‘বসন্ত’ উৎসর্গ করা বিফলে যায়নি তাঁর।

আমরা যদি তাঁর লেখা পড়ে তাঁকে অনুসরণ না করি, তাহলে বৃথাই তাঁকে স্মরণ। যেকোনও প্রতিভা আমাদের মানুষ হিসেবে আদর্শিক হয়ে উঠতে পারে তখনি, যখন আমরা তাঁর মানসিকতাকে অনুভব করে অন্তত চেষ্টা করব তাঁর পথকে ভালবাসতে। একদিকে পাঠ নিচ্ছি ‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো মন্দির কাবা নাই’ আর আচরণে ভিন্ন থাকছি, এ হল তাঁকে প্রকৃত অসম্মান। তাহলে তাঁর পাঠ না-ই বা নিলাম! তাহলে আমাদের বিনাশ কিন্তু আমরা নিজেরাই ডেকে আনব। নজরুল ঠিক-ই থেকে যাবেন, তারা ফোটাবেন, ফোটাবেন, ফোটাতেই থাকবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 − 1 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »