Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

আত্মপরিচয়

অ্যাটলাসটা কবেকার কে জানে! যখন থেকে নাড়াঘাঁটা শুরু করেছি, তখনই তার বেহাল দশা। মলাট নেই, বেশ কয়েকখানা পাতাও নেই। যদ্দুর মনে পড়ে, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের আবহাওয়া-চিত্র দিয়েই আমার ভূগোল পরিচয়ের সূচনা! যদিও সেই পরিচয়-প্রসঙ্গ বেশিদূর এগোয়নি, কেননা ইয়োরোপ-এশিয়া-উত্তর আমেরিকা-দক্ষিণ আমেরিকা ডিঙিয়ে ভারতের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক মানচিত্র তন্নতন্ন করে খুঁজেও, কিছুতেই নিজের ছোট্ট শহরটির সন্ধান পাইনি, আর তাতেই দ্রুত ভাটা পড়ে আমার মানচিত্রচর্চার উৎসাহে। পরবর্তীকালে, ক্লাস সেভেনের পর আর কখনও ভূগোল পরীক্ষায় বসতে হয়নি আমাকে। তাই হয়তো বা, আমার দিগবিদিক জ্ঞান এখনও ওয়ান আর মাইনাস ওয়ানের মাঝামাঝি কোনও ‘নো জিওগ্রাফারস ল্যান্ডে’ দাঁড়িয়ে! আমার নিজস্ব ভূগোল-পরিচয় তাই মাঝেমধ্যেই সংশয়ের মুখে ঠেলে দেয় আমাকে।

স্কুলের কথা যখন চলেই এল তখন বলি, নিচু ক্লাস থেকেই পরিচ্ছন্নতার প্রতি একটু বেশিই নজর আমার। সে-সময়কার মাস্টারমশাইরা শিশুমনে অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার গোছের জটিল প্রবণতা নিয়ে অবসেসড ছিলেন না বলেই হয়তো পরীক্ষার খাতায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার জন্য বরাদ্দ থাকত অতিরিক্ত চারটি নম্বর! সেই সুবাদে পাঠ্যবিষয়জনিত নম্বরের নিশ্চিত খামতি কিছুটা অন্তত পুষিয়ে নেওয়া যেত! পরিচ্ছন্নতার তাগিদেই, প্রতিটি সেশনে প্রথম দিন স্কুলে পৌঁছনোমাত্র, গাদাগুচ্ছের নতুন বইখাতায় নাম, ক্লাস, সেকশন, রোল নম্বর- সমস্ত লিখে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হত আমার এক বন্ধুকে, কেননা বয়সের মাপে ওর হাতের লেখা তখন অনেকটাই পরিণত। সেই সূত্রেই একবার সুদূরপ্রসারী একটি পরিবর্তন সংঘটিত হয়ে যায় আমার নাম-পরিচয়ে, খানিকটা নিঃশব্দ বিপ্লবের মতোই! তার আগে অব্দি আমি নামের বানানে SAU লিখতাম, বাবা যেভাবে শিখিয়েছিলেন, সেভাবেই। সেবার, নিতান্তই আমার অন্যমনস্কতার ফাঁকে বন্ধুটি যাবতীয় বইখাতায় লিখে ফেলে SOU। প্রাথমিকভাবে দারুণ মুষড়ে পড়লেও পরে ভেবে দেখলাম এতগুলো নাম কাটাকুটি করে শোধরানো মানে পরিচ্ছন্নতার বারোটা বাজানো, তার চেয়ে এই নতুন বানানটাকেই আপন করে নেওয়া বরং সহজ সমাধান। বছর কয়েক পর মাধ্যমিকের রেজিস্ট্রেশনের সময় এই বানানই আমার বাকি জীবনের জন্য সরকারি সিদ্ধতা পেয়ে যায়।

নতুন বইয়ের পাতায় নাম লিখতে গিয়ে ওই বন্ধুই আরেকবার অত্যুৎসাহী হয়ে নামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল আমার ঠিকানাও- সেই ঠিকানার ল্যাজ দীর্ঘ হতে হতে পৌঁছে যায় আসাম, ইন্ডিয়া, এশিয়া, ওয়ার্ল্ড, এমনকি ইউনিভার্স পর্যন্ত! পরিচয়ের ওই নতুনতর চেহারায় খুশি হওয়া তো দূরের কথা, বরং জীবনে সেই প্রথমবার যেন আত্মপরিচয়ের এক সংকটে পড়ে যাই আমি! কারণ, ওয়ার্ল্ড আর ইউনিভার্সের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ঠিক কোন তারে বাঁধা, দূর কল্পনাতেও তখন তা অস্পষ্ট। আর কেন জানি না, এশিয়া বলতে প্রথম বিবেচনায় শুধু মঙ্গোলয়েড চেহারাই চোখে ভাসে আমার! বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এশিয়ান গেমসে চীনের যে বাড়বাড়ন্ত প্রত্যক্ষ করে এসেছি প্রতিবার, হয়তো সেই স্মৃতিটাই কলকাঠি নাড়ে অবচেতনে! সেই আপাতসংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, কিন্তু তার স্মৃতি আবার ফিরে আসে ঘটনার প্রায় বছর বারো পর, যখন অমিত চৌধুরীর লেখা ‘আ স্ট্রেঞ্জ অ্যান্ড সাবলাইম অ্যাড্রেস’ পড়তে গিয়ে আবিষ্কার করি, কাহিনির নায়কের স্কুলের খাতায় লেখা, একই প্রকৃতির ঠিকানাজাত পরিচয়ের সূত্রে, তার বালকবেলার সঙ্গে আমারও ক্ষীণ যোগসূত্র রয়েছে!

কর্ম, জীবিকা এবং পেশাগত অধ্যয়নের সূত্রে, বহুকাল হল নিজের জন্মস্থানের বাইরে। হিসেব কষলে দেখব, দেশের একেবারে এক প্রান্তে ছোট্ট সীমান্ত শহর করিমগঞ্জে, জীবনের যেটুকু সময় কাটিয়েছি, একত্রীভূতভাবে তার ঢের বেশি দিন কাটিয়ে ফেলেছি অন্যত্র! আর সেই সঙ্গে, স্থানভেদে আত্মপরিচয়ের পরিসরটিও প্রসারিত হয়েছে, সময়-সমাজের নিজস্ব খেয়ালে। শিলং প্রবাসকালে যেমন বাঙালি পরিচয়টি সক্রিয় ছিল বন্ধুবৃত্ত তৈরিতে, তেমনি ভিনভাষী স্থানীয় কিছু লোকের কাছে ওই পরিচয়ই করে তুলেছিল অকারণ শত্রু! তবে আত্মপরিচয়ের সেই সংকটটি শিলংয়ে গিয়েই প্রথম উপলব্ধি করলাম, তেমন নয় মোটেই। ছাত্রজীবনে গৌহাটি বেড়াতে গিয়ে অসমীয়া ভাষার ওপর দখল না-থাকার দরুন, স্থানীয় এবং ভুক্তভোগী আত্মীয়-পরিজনের পরামর্শে, রাস্তাঘাটে ভুল করেও বাংলা বলে ফেলিনি কখনও, ভাঙা হিন্দিতেই কাজ চালাতে হয়েছিল! ‘বঙ্গাল খেদা’ আন্দোলনের সেই অসময়ে, আমার ‘বরাক-ভ্যালির-বাঙালি’ পরিচয়টাই ওখানকার অচেনা-অজানা লোকের কাছে আমাকে শত্রু বানিয়ে ফেলার পক্ষে যথেষ্ট ছিল! আজকের ভিন্ন চেহারায় সেদিনকার ওই শত্রুটি ও তার ভূগোলজাত সমগোত্রীয়রা সবাই এখন সন্দেহজনক ‘ঘুষপেটিয়া’, বেআইনি অনুপ্রবেশকারী!

Advertisement

পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গবাসী হওয়ার সুবাদে আমার আত্মপরিচয়টিকে অন্যতর সংকটের মুখোমুখি হতে হল! সিলেটিভাষী বাঙালি- এই পরিচয়টি আদপে যে সোনার পাথরবাটি নয়, তার যে বাস্তবিকই অস্তিত্ব আছে, সেই প্রমাণ প্রস্তুতকল্পে আমাকে বারবার টেনে আনতে হয় মাতৃভূমি বরাক উপত্যকায় মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার লড়াই, তার পুনরাবৃত্তির ইতিহাস, আর ভাষাশহিদের রক্তসাক্ষ্য!

আসলে, এক অসম্পূর্ণ ইতিহাসবোধ আচ্ছন্ন করে রেখেছে আমাদের সবাইকে। অমিত চৌধুরীর কাহিনির নায়ক তার বালকবেলায় ঠিকানা হিসেবে যেভাবে আত্মস্থ করে নেয় গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে, ঠিক সেভাবেই তো আমার স্কুলের খাতায়, সহপাঠী বন্ধুটিও ধাপে-ধাপে ঠিকানা-নির্দেশ করেছিল আমার! কোনও সচেতন বিশ্বজনীনতার প্রকাশ হিসেবে নয়, নিতান্তই খেয়ালখুশিতে। অথচ, শৈশবের সেই খেয়ালখুশিপনা জ্ঞানের বাড়বাড়ন্তর সঙ্গে তাল রাখতে পারল কই! নইলে কী আর আজীবন আত্মপরিচয় খুঁজতে গিয়ে হাতড়ে বেড়াতে হয় আমাদের! সঙ্গী থাকে শুধু ভয়, আর এক অন্তহীন লড়াই। নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার। তারপরও বাকি থাকে অন্যের পরিচয়কে স্বীকৃতি দেওয়ার। দেশের উত্তর-পূর্ব যখন মঙ্গোলয়েড মুখাবয়বে ছয়লাপ, তখন মঙ্গোলয়েড বলতে চিন-জাপানের বাসিন্দার কথাই যদি আগে ভেসে আসে মগজে ও মননে, তবে সে সমস্যা তো ইতিহাসবোধের, ভৌগোলিক চেতনার আর পারস্পরিক অপরিচয়ের। ‘অপরে’-র স্বীকৃতিতেই যে সাকার হয়ে উঠতে পারে ‘আত্ম’-পরিচয়, এই বোধই কি সময়ের দাবি নয়!

চিত্রণ: ক্রিস্তিনা সাহা

One Response

  1. সংখ্যাগুরুর আধিপত্য বিস্তারের অপরিচিত সময়ের চাহিদা অন্য কিছু। তোমার আত্মোপলব্ধি তো আমাদের সবাইকে একসুতোয় বেঁধে নিলো! কিন্তু যার প্রার্থনায় তোমার সুলিখিত প্রবন্ধ টি শেষ করেছো,তা কি দেখতে পাবো আমরা, অন্তত জীবিতাবস্থায়!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen − six =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »