Search
Generic filters
Search
Generic filters

আত্মপরিচয়

অ্যাটলাসটা কবেকার কে জানে! যখন থেকে নাড়াঘাঁটা শুরু করেছি, তখনই তার বেহাল দশা। মলাট নেই, বেশ কয়েকখানা পাতাও নেই। যদ্দুর মনে পড়ে, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের আবহাওয়া-চিত্র দিয়েই আমার ভূগোল পরিচয়ের সূচনা! যদিও সেই পরিচয়-প্রসঙ্গ বেশিদূর এগোয়নি, কেননা ইয়োরোপ-এশিয়া-উত্তর আমেরিকা-দক্ষিণ আমেরিকা ডিঙিয়ে ভারতের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক মানচিত্র তন্নতন্ন করে খুঁজেও, কিছুতেই নিজের ছোট্ট শহরটির সন্ধান পাইনি, আর তাতেই দ্রুত ভাটা পড়ে আমার মানচিত্রচর্চার উৎসাহে। পরবর্তীকালে, ক্লাস সেভেনের পর আর কখনও ভূগোল পরীক্ষায় বসতে হয়নি আমাকে। তাই হয়তো বা, আমার দিগবিদিক জ্ঞান এখনও ওয়ান আর মাইনাস ওয়ানের মাঝামাঝি কোনও ‘নো জিওগ্রাফারস ল্যান্ডে’ দাঁড়িয়ে! আমার নিজস্ব ভূগোল-পরিচয় তাই মাঝেমধ্যেই সংশয়ের মুখে ঠেলে দেয় আমাকে।

স্কুলের কথা যখন চলেই এল তখন বলি, নিচু ক্লাস থেকেই পরিচ্ছন্নতার প্রতি একটু বেশিই নজর আমার। সে-সময়কার মাস্টারমশাইরা শিশুমনে অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার গোছের জটিল প্রবণতা নিয়ে অবসেসড ছিলেন না বলেই হয়তো পরীক্ষার খাতায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার জন্য বরাদ্দ থাকত অতিরিক্ত চারটি নম্বর! সেই সুবাদে পাঠ্যবিষয়জনিত নম্বরের নিশ্চিত খামতি কিছুটা অন্তত পুষিয়ে নেওয়া যেত! পরিচ্ছন্নতার তাগিদেই, প্রতিটি সেশনে প্রথম দিন স্কুলে পৌঁছনোমাত্র, গাদাগুচ্ছের নতুন বইখাতায় নাম, ক্লাস, সেকশন, রোল নম্বর- সমস্ত লিখে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হত আমার এক বন্ধুকে, কেননা বয়সের মাপে ওর হাতের লেখা তখন অনেকটাই পরিণত। সেই সূত্রেই একবার সুদূরপ্রসারী একটি পরিবর্তন সংঘটিত হয়ে যায় আমার নাম-পরিচয়ে, খানিকটা নিঃশব্দ বিপ্লবের মতোই! তার আগে অব্দি আমি নামের বানানে SAU লিখতাম, বাবা যেভাবে শিখিয়েছিলেন, সেভাবেই। সেবার, নিতান্তই আমার অন্যমনস্কতার ফাঁকে বন্ধুটি যাবতীয় বইখাতায় লিখে ফেলে SOU। প্রাথমিকভাবে দারুণ মুষড়ে পড়লেও পরে ভেবে দেখলাম এতগুলো নাম কাটাকুটি করে শোধরানো মানে পরিচ্ছন্নতার বারোটা বাজানো, তার চেয়ে এই নতুন বানানটাকেই আপন করে নেওয়া বরং সহজ সমাধান। বছর কয়েক পর মাধ্যমিকের রেজিস্ট্রেশনের সময় এই বানানই আমার বাকি জীবনের জন্য সরকারি সিদ্ধতা পেয়ে যায়।

নতুন বইয়ের পাতায় নাম লিখতে গিয়ে ওই বন্ধুই আরেকবার অত্যুৎসাহী হয়ে নামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল আমার ঠিকানাও- সেই ঠিকানার ল্যাজ দীর্ঘ হতে হতে পৌঁছে যায় আসাম, ইন্ডিয়া, এশিয়া, ওয়ার্ল্ড, এমনকি ইউনিভার্স পর্যন্ত! পরিচয়ের ওই নতুনতর চেহারায় খুশি হওয়া তো দূরের কথা, বরং জীবনে সেই প্রথমবার যেন আত্মপরিচয়ের এক সংকটে পড়ে যাই আমি! কারণ, ওয়ার্ল্ড আর ইউনিভার্সের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ঠিক কোন তারে বাঁধা, দূর কল্পনাতেও তখন তা অস্পষ্ট। আর কেন জানি না, এশিয়া বলতে প্রথম বিবেচনায় শুধু মঙ্গোলয়েড চেহারাই চোখে ভাসে আমার! বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এশিয়ান গেমসে চীনের যে বাড়বাড়ন্ত প্রত্যক্ষ করে এসেছি প্রতিবার, হয়তো সেই স্মৃতিটাই কলকাঠি নাড়ে অবচেতনে! সেই আপাতসংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, কিন্তু তার স্মৃতি আবার ফিরে আসে ঘটনার প্রায় বছর বারো পর, যখন অমিত চৌধুরীর লেখা ‘আ স্ট্রেঞ্জ অ্যান্ড সাবলাইম অ্যাড্রেস’ পড়তে গিয়ে আবিষ্কার করি, কাহিনির নায়কের স্কুলের খাতায় লেখা, একই প্রকৃতির ঠিকানাজাত পরিচয়ের সূত্রে, তার বালকবেলার সঙ্গে আমারও ক্ষীণ যোগসূত্র রয়েছে!

কর্ম, জীবিকা এবং পেশাগত অধ্যয়নের সূত্রে, বহুকাল হল নিজের জন্মস্থানের বাইরে। হিসেব কষলে দেখব, দেশের একেবারে এক প্রান্তে ছোট্ট সীমান্ত শহর করিমগঞ্জে, জীবনের যেটুকু সময় কাটিয়েছি, একত্রীভূতভাবে তার ঢের বেশি দিন কাটিয়ে ফেলেছি অন্যত্র! আর সেই সঙ্গে, স্থানভেদে আত্মপরিচয়ের পরিসরটিও প্রসারিত হয়েছে, সময়-সমাজের নিজস্ব খেয়ালে। শিলং প্রবাসকালে যেমন বাঙালি পরিচয়টি সক্রিয় ছিল বন্ধুবৃত্ত তৈরিতে, তেমনি ভিনভাষী স্থানীয় কিছু লোকের কাছে ওই পরিচয়ই করে তুলেছিল অকারণ শত্রু! তবে আত্মপরিচয়ের সেই সংকটটি শিলংয়ে গিয়েই প্রথম উপলব্ধি করলাম, তেমন নয় মোটেই। ছাত্রজীবনে গৌহাটি বেড়াতে গিয়ে অসমীয়া ভাষার ওপর দখল না-থাকার দরুন, স্থানীয় এবং ভুক্তভোগী আত্মীয়-পরিজনের পরামর্শে, রাস্তাঘাটে ভুল করেও বাংলা বলে ফেলিনি কখনও, ভাঙা হিন্দিতেই কাজ চালাতে হয়েছিল! ‘বঙ্গাল খেদা’ আন্দোলনের সেই অসময়ে, আমার ‘বরাক-ভ্যালির-বাঙালি’ পরিচয়টাই ওখানকার অচেনা-অজানা লোকের কাছে আমাকে শত্রু বানিয়ে ফেলার পক্ষে যথেষ্ট ছিল! আজকের ভিন্ন চেহারায় সেদিনকার ওই শত্রুটি ও তার ভূগোলজাত সমগোত্রীয়রা সবাই এখন সন্দেহজনক ‘ঘুষপেটিয়া’, বেআইনি অনুপ্রবেশকারী!

পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গবাসী হওয়ার সুবাদে আমার আত্মপরিচয়টিকে অন্যতর সংকটের মুখোমুখি হতে হল! সিলেটিভাষী বাঙালি- এই পরিচয়টি আদপে যে সোনার পাথরবাটি নয়, তার যে বাস্তবিকই অস্তিত্ব আছে, সেই প্রমাণ প্রস্তুতকল্পে আমাকে বারবার টেনে আনতে হয় মাতৃভূমি বরাক উপত্যকায় মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার লড়াই, তার পুনরাবৃত্তির ইতিহাস, আর ভাষাশহিদের রক্তসাক্ষ্য!

আসলে, এক অসম্পূর্ণ ইতিহাসবোধ আচ্ছন্ন করে রেখেছে আমাদের সবাইকে। অমিত চৌধুরীর কাহিনির নায়ক তার বালকবেলায় ঠিকানা হিসেবে যেভাবে আত্মস্থ করে নেয় গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে, ঠিক সেভাবেই তো আমার স্কুলের খাতায়, সহপাঠী বন্ধুটিও ধাপে-ধাপে ঠিকানা-নির্দেশ করেছিল আমার! কোনও সচেতন বিশ্বজনীনতার প্রকাশ হিসেবে নয়, নিতান্তই খেয়ালখুশিতে। অথচ, শৈশবের সেই খেয়ালখুশিপনা জ্ঞানের বাড়বাড়ন্তর সঙ্গে তাল রাখতে পারল কই! নইলে কী আর আজীবন আত্মপরিচয় খুঁজতে গিয়ে হাতড়ে বেড়াতে হয় আমাদের! সঙ্গী থাকে শুধু ভয়, আর এক অন্তহীন লড়াই। নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার। তারপরও বাকি থাকে অন্যের পরিচয়কে স্বীকৃতি দেওয়ার। দেশের উত্তর-পূর্ব যখন মঙ্গোলয়েড মুখাবয়বে ছয়লাপ, তখন মঙ্গোলয়েড বলতে চিন-জাপানের বাসিন্দার কথাই যদি আগে ভেসে আসে মগজে ও মননে, তবে সে সমস্যা তো ইতিহাসবোধের, ভৌগোলিক চেতনার আর পারস্পরিক অপরিচয়ের। ‘অপরে’-র স্বীকৃতিতেই যে সাকার হয়ে উঠতে পারে ‘আত্ম’-পরিচয়, এই বোধই কি সময়ের দাবি নয়!

চিত্রণ: ক্রিস্তিনা সাহা

One Response

  1. সংখ্যাগুরুর আধিপত্য বিস্তারের অপরিচিত সময়ের চাহিদা অন্য কিছু। তোমার আত্মোপলব্ধি তো আমাদের সবাইকে একসুতোয় বেঁধে নিলো! কিন্তু যার প্রার্থনায় তোমার সুলিখিত প্রবন্ধ টি শেষ করেছো,তা কি দেখতে পাবো আমরা, অন্তত জীবিতাবস্থায়!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − 7 =

Recent Posts

পবিত্র সরকার

পবিত্র সরকারের বিশেষ রচনা

বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষদের রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে একটু বেশি দুর্বলতা আছে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে যত কিছু, তাঁদের কাছেও তত কিছু তো বটেই, কিন্তু তারও চেয়ে অনেকটা বেশি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেনাপতি। বাহান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকে, আয়ুব শাহি ফরমানে রেডিয়োতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষেধ আর রবীন্দ্র-শতবার্ষিকীর ওপর ফতোয়া জারি থেকে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের এক মহাশক্তিধর যোদ্ধা, তাঁর সম্বন্ধে এঁরা তাই এত স্পর্শকাতর।

Read More »
মীরাতুন নাহার

মীরাতুন নাহারের প্রবন্ধ

হিন্দু-সাম্প্রদায়িকতা এবং মুসলমান-সাম্প্রদায়িকতা উভয়কেই তিনি যুক্তি ও তথ্যদ্বারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধ্বংসাত্মক বলে বোঝাতে চেয়েছেন দেশবাসীকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত দেশবাসীকে তিনি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতার বিপদ সম্পর্কে অধিকতর সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যদিও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষ’ দেশবাসীর মন থেকে নিষ্কাশন করে দেশকে বিপন্মুক্ত করা।

Read More »
গৌতম ঘোষ

গৌতম ঘোষের প্রবন্ধ

চলচ্চিত্রের ধর্ম হল সময়কে ধরে রাখা, সময়ের স্মৃতিমালাকে ধরে রাখা। সেই পদ্ধতি, সেই প্রক্রিয়া কিন্তু চলতেই থাকবে। এখন আমাদের আরও মানবিক হতে হবে। চলচ্চিত্র যারা তৈরি করবেন তারা শুধুমাত্র সস্তার বিনোদন সরিয়ে রেখে একটু মানবিক ছবি করবেন। যেখানে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকবে। যা আমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্লাসিক সব সিনেমায় দেখেছি, সেই ভাবনায় ভাবতে হবে।

Read More »
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ নিবন্ধ

বস্তুত সুকান্ত কবিতার চাইতে বড়। তিনি এক প্রতীকচিহ্ন। সারা ভারতে যখন কবিকে ভাবা হয়েছে জনতার একজন প্রতিনিধি হিসেবে, তখন সুকান্তকেই ভাবা হয়েছে। তামিল বা হিন্দি সিনেমাতেও হয়েছে। যেমন রাজেশ খান্নার ‘অনুরোধ’ নামের ছবিটিতে যে কবিটি রাজেশের বন্ধু ছিলেন তার নাম সুকান্ত। অথবা অতদূরে কেন যাই, বাংলায় উত্তম-তনুজার ‘দেনা পাওনা’ ছবিতে উত্তম যে বন্ধুর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসেন, তার নামও তো সুকান্ত। তিনিও তো ফুসফুসের রোগী।

Read More »
কালীকৃষ্ণ গুহ

কালীকৃষ্ণ গুহর কবিতা

একটি রাত্রি কা লী কৃ ষ্ণ  গু হ প্রতিটি রাত্রিকেই নতুন মনে হয়— অচেনা লাগে। আজকের রাত্রিটা যেন চির-অচেনা যেন কিছু ঘটার ছিল যা ঘটেনি

Read More »
অভিজিৎ সিরাজ

অভিজিৎ সিরাজের ছোটগল্প

ফরেস্ট বাংলো অ ভি জি ৎ  সি রা জ শঙ্কর দত্তকে আমি শেষ দেখি আনন্দপুরে মাদুরদহের একটা স্কুল বাড়িতে। অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল সেদিন। বাড়ির

Read More »