Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

নিখিল সচানের হিন্দি কবিতার অনুবাদ

ওদের ভয় পেত না, শুধু মুসলমানদের ভয় পেত

আমার এক বন্ধু প্রায়ই বলত
বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য বলতেই ভাল লাগে
বলত, কখনও একা গেছ কোনও মুসলমান মহল্লায়?
কখনও গিয়ে দেখো, ভয় লাগে!
ও মুসলমানদের খুব ভয় পেত।
অথচ শাহরুখ খান ওর খুব পছন্দের,
পছন্দ করত তার গালের টোল-পড়া
আর দিওয়ালিতে রিলিজ় হওয়া শাহরুখের ফিল্ম।
দিলীপকুমার যে ইউসুফ, জানত না সে,
তার ছবিও সে দেখত আবেগ ভরে।
দিলীপকুমারকে ভয় পেত না,
শুধু মুসলমানদের খুব ভয় পেত।

সে অপেক্ষা করত
বড়দিনে আমির খানের ছবি রিলিজ়ের,
আর ঈদে সলমন খানের।
ব্ল্যাকে হলেও টিকিট কাটত সে,
হলে বসে সিটি মেরে আনন্দও উপভোগ করত!
তাদের মোটেও ভয় পেত না,
শুধু মুসলমানদের খুব ভয় পেত।

আমার সঙ্গে সেও ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে,
বিজ্ঞানে তার বরাবরের আগ্রহ
বলত, আব্দুল কালামের মতো বিজ্ঞানী হতে চাই;
বাড়াতে চাই দেশের সম্মান।
তাকে সে ভয় পেত না
শুধু মুসলমানদের খুব ভয় পেত।

ক্রিকেট ছিল তার খুব পছন্দের খেলা—
বিশেষ করে মনসুর আলি খানের নবাবী ছক্কা
আর আজহারউদ্দিনের কব্জির মোচড়!
পাগল ছিল জাহির খান আর
ইরফান পাঠানের বোলিংয়ের।
বলত, ওরা সব জাদুকর, বুঝলে জাদুকর!
ওরা খেলে দিলে
কখনওই হারি না আমরা পাকিস্তানের কাছে।
তাদের থেকে ভয় ছিল না কোনও,
শুধু মুসলমানদের খুব ভয় পেত।

সে ছিল নার্গিস আর মধুবালার রূপে অন্ধ,
ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটেই দেখতে চাইত ওদের,
পাগল ছিল ওয়াহিদা রহমানের হাসির
আর পারভীন বাবির প্রেমে!
ভয় ছিল না তাতেও,
শুধু মুসলমানদের সে খুব ভয় পেত।

কখনও উদাস হলে মন
ডুব দিত মুহম্মদ রফির গানে,
বলত, রফি সাহেবের গলায়
ভগবান আছেন ভগবান!
কান ছুঁয়ে নাম নিত রফির
আর নামের পরে সব সময় সাহেব!
যদি সে গান হত সাহিরের লেখা—
খুশিতে কাঁদতে ইচ্ছে হত তার।
তাদের থেকে কোনও ভয় ছিল না,
শুধু মুসলমানদের খুব ভয় পেত।

প্রতি বছর ছাব্বিশে জানুয়ারি
ইকবালের ‘সারে জহাঁ সে অচ্ছা’ সে গাইত,
বলত, কোনও কথা হবে না—
গানে যদি হয় বিসমিল্লাহ খানের সানাই
আর জাকির হোসেনের তবলা!
তাদের ভয় পেত না সে,
শুধু মুসলমানদের খুব ভয় পেত।

ও যখন প্রেম করত,
মেয়েটিকে গজ়ল শোনাত গালিবের,
পাঠাত ফৈজ় সাহেবের শের—
ধার করা শেরেই মেতে উঠত তার প্রেমিকা;
সেই প্রেমিকা আজ তার বউ।
সমস্ত শায়েরিদের থেকে তার কোনও ভয় ছিল না,
শুধু মুসলমানদের খুব ভয় পেত।

মিথ্যেবাদী ছিল আমার বন্ধু!
ছিল বড্ড বেশি সিধেসাদা,
না জেনেই মুসলমানদের খুব ভালবাসত।
তবু কেন যে বলত, মুসলমানদের ভয় পাই!
মুসলমানদের দেশে সে থাকত খুশিতে, ভালবেসেই;
অথচ মুসলমানদের কোন্ মহল্লায়
একা যেতে ভয় পেত সে, কে জানে!

আসলে, ভগবানের বানানো মুসলমানদের সে ভয় পেত না,
ভয় পেত হয়তো রাজনীতি খবরকাগজ আর ভোটের বানানো
সেই সব কাল্পনিক মুসলমানদের—
কল্পনায় যা সত্যিই ভয় পাবার মতোই!

অথচ সত্য কিন্তু ঈদের সিমুইয়ের চেয়েও মিষ্টি…

[মূল হিন্দি থেকে অনূদিত]

চিত্রণ: ক্রিস্তিনা সাহা

 ***

লেখক পরিচিতি

১৯৮৬ সালের ৪ঠা আগস্ট, উত্তরপ্রদেশের ফতেহপুরে জন্ম নিখিল সচান-এর। কানপুরে বেড়ে ওঠা এবং পড়াশোনা। পড়াশোনায় মেধাবী নিখিল সচান পড়েছেন বেনারস আই.আই.টি. থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আই.আই.এম. কোঝিকোড় থেকে ম্যানেজমেন্ট। প্রকাশিত হয়েছে ‘নমক স্বাদানুসার’ ও ‘জিন্দগি আইস পাইস’ শিরোনামের দুটি লঘুকথার বই। প্রকাশিত হবার সাথে সাথেই বইদুটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ ছাড়াও ‘ইউপি ৬৫’ নামের উপন্যাসটিও পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়। মূলত গদ্যেই তাঁর দখল। তুলনায় কবিতা লেখেন কম। কমসংখ্যক কবিতার মধ্যে ‘ও উনসে নহী ডরতা থা, বস্ মুসলমানোঁ সে ডরতা থা’ একটি অন্যতম কবিতা, যেটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকমহলে আশ্চর্য রকমের সাড়া ফেলে দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen + 15 =

Recent Posts

কাজী তানভীর হোসেন

চেতনার বিবর্তন ও ঈশ্বরের নৃবিজ্ঞান

মানুষের অজ্ঞানতা ও ভুলের গর্ভেই ঈশ্বরের জন্ম হয়েছিল; আর মানুষের জ্ঞান ও সভ্যতার ঐতিহাসিক অগ্রগতিই একদিন ঈশ্বরের কবরে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেবে। জ্ঞানতাত্ত্বিক আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান তাত্ত্বিকভাবে বিনাশ করবে অলৌকিক সৃষ্টিকর্তার ধারণা, আর সম্পদের সুষম বণ্টন ও সাম্যবাদ (Communism) বিলুপ্ত করবে প্রাচীন টোটেমীয় কুসংস্কারকে। একদিন ধর্মের এই অন্ধ খোলস ভেদ করে স্থান করে নেবে উচ্চতর গণিত, আধুনিক সৃষ্টিতত্ত্ব এবং বিজ্ঞানসম্মত মানবিক কর্তব্যবোধ।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

ব্রিটিশ ছোটগল্প

আমি আগে থেকেই আমেরিকার পাখি বইটি সম্পর্কে জানতাম, কিন্তু কখনও বইটির সঙ্গে তেমনভাবে সময় কাটাইনি। ঠিক যেভাবে কেউ নদীর ধারে বসে সময় কাটায়। বাবার হাসপাতালের শয্যার পাশে বসে থাকতে থাকতে আমি যেন ধৈর্যের অর্থ শিখে নিয়েছিলাম। অপেক্ষা করতে শিখেছিলাম। এডি ঠিকই বলেছিল— আমিও মাছ ধরতে যেতে চাইছিলাম। জলের ধারে বসে থাকতে চাইছিলাম। কিন্তু বাবাকে দেখতে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও কাজে বাড়ি থেকে বেরোনো সম্ভব হয়নি। তাই আমি অডুবন-এর সরোবরসম বইয়ে আমার জাল ফেললাম।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের বিস্ফোরণ: তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নীরব পূর্বাভাস

পণ্যের এই ভয়াবহ সঞ্চালন সংকটে পড়ে পুঁজিপতিরা এখন আগের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। তাই অবিক্রীত পণ্য গছিয়ে দেওয়ার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো হচ্ছে। এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় নির্মাণের এক নজিরবিহীন বিস্ফোরণ ঘটেছে। যখন বিশ্বের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ দু’বেলা অন্নসংস্থানে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ইন্টারনেটে ছোটখাটো ভিডিও প্রচার করে ক্রিয়েটররা বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। এটি আসলে জমে যাওয়া শ্রম ও পণ্যের এক অস্বাভাবিক বণ্টন প্রক্রিয়া। যে পণ্যের রিভিউ করে একজন ক্রিয়েটর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন, সেই পণ্যের প্রকৃত উৎপাদনকারী শ্রমিক হয়তো আজ কর্মহীন কিংবা নিম্নতম মজুরিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চন্দ্রাবতী: বঙ্গের প্রথম পদকর্ত্রী

চন্দ্রাবতীর জীবনের যেটি শ্রদ্ধেয় দিক, তা হল গরলকে অমৃতে পরিণত করা। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোককে কাটিয়ে উঠে একাগ্রতা নিয়ে পঠনপাঠন‌ ও সৃষ্টিকর্মে মন দেন। পিতাকে সহায়তা করেন কাব্যরচনায়। ১৫৭৫ নাগাদ, যখন চন্দ্রাবতীর বয়স মাত্র পঁচিশ, সেসময় তিনি পিতার লেখা মনসার ভাসান-এ সহযোগিতা করেছিলেন। তারপর একের পর এক নিজস্ব রচনায় ভাস্বর হয়ে থাকে তাঁর কারুবাসনা।

Read More »
কাজী তানভীর হোসেন

মহাজনী সভ্যতা

অর্থের লোভ আজ মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্পূর্ণ গিলে ফেলেছে। আজ আভিজাত্য, ভদ্রতা আর গুণের একমাত্র মাপকাঠি হল টাকা। যার কাছে টাকা আছে, তার চরিত্র যত কালোই হোক, সে-ই দেবতা। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প— সবই আজ টাকার পায়ে মাথা ঠুকছে। এই বিষাক্ত বাতাসে বেঁচে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ডাক্তাররা মোটা ফিজ ছাড়া কথা বলেন না, আইনজীবীরা মিনিটের হিসাব করেন মোহর দিয়ে। গুণ ও যোগ্যতার বিচার হয় তার বাজারমূল্য দিয়ে। মৌলভি-পণ্ডিতরাও আজ ধনীদের কেনা গোলাম, আর সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদেরই গুণগান গায়।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ইসলাম

হিন্দুকে মুসলমানদের আপন বলে মনে করতে হবে, একথা তিনি ‌বারবার উচ্চারণ করে গেছেন। ‘যদি ভাবি, মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের‌ সকল মঙ্গলপ্রচেষ্টা সফল হবে, তাহলে বড়‌ই ভুল করব’— বলেছেন তিনি। বাউলদের সাধনার মধ্যে তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্মিলন আবিষ্কার করেন, অনুবাদ করেন মারাঠি সন্ত কবি তুকারামের ‘অভঙ্গ’ যেমন, ঠিক তেমনই কবীরের দোহা। মধ্যযুগের মরমী সুফি কবি কবীর, জোলা, রজব, দাদু প্রমুখের জীবনবৃত্তান্ত উৎসাহের সঙ্গে জেনে নেন ক্ষিতিমোহন সেনের কাছ থেকে, আর সত্তরোর্ধ্ব কবি পারস্যে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসেন কবি হাফেজকে।

Read More »