Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

দেশলাইয়ের বাক্স, দশটাকার নোট আর লোকবিশ্বাস: মৈথিলের মাঘিয়া কালী

“…অ্যাজ পার ডিটেইলড ট্রাভেল লিস্ট ইউ মে ভিজিট রাখালকালী অফ শৈলপুর, জোড়াকালী অফ টিপাজানি, জগত্তারিণী সর্বমঙ্গলা কালী অফ কালিয়াচক বালুগ্রাম, কালী টেম্পলস অফ লস্করপুর অ্যান্ড হিলসামারি ভিলেজ আন্ডার রতুয়া পি এস, হরিশ্চন্দ্রপুর কালীবাড়ি, গোবর্জনা কালী অফ আড়াইডাঙা, জহরাকালী (?) অ্যান্ড মা মনস্কামনা আন্ডার ইংলিশবাজার পি এস, ঝাপড়িকালী অফ বানপুর আন্ডার হবিবপুর পি এস, একবর্ণা অ্যান্ড উল্কা কালী আন্ডার শোভানগর পি এস, মা মুক্তকেশী অফ বাঙ্গিটোলা আন্ডার মোথাবাড়ি পি এস এটসেটরা ইন সার্চ অফ সেকেন্ডারি অ্যান্ড টারশিয়ারি ডক্যুমেন্ট, ইফ এনি”।

যেখানে গল্পগুলো শুরুর আগেই শেষ…

রিসার্চ প্রোজেক্ট স্যাংশন হওয়ার চিঠিটা একঝলক দেখেই ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “যদি শেষ হয়, ভাল কাজ হবে”। ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় সরকার অনুমোদিত গবেষণা প্রকল্পটির শিরোনাম ছিল: “দ্য অরিজিন অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট অফ শাক্ত কাল্ট ইন সিলেক্টিভ রিজিয়নস অফ মালদা ডিস্ট্রিক্ট (১৫০০-১৮০০)”। কলকাতার একটি নামকরা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকজন রিসার্চ স্কলার খাতাকলমে যুক্ত ছিলেন এই প্রোজেক্টের সঙ্গে। ধবধবে সাদা ধুতিপাঞ্জাবি পরা দীর্ঘদেহী মণিস্যার, ইতিহাস গবেষক ড. তুষারকান্তি ঘোষ সিঁড়ির সামনের ধাপগুলোকে কীভাবে যেন দেখতে পেতেন! কোভিডে তাঁর চলে যাওয়ার খবর যখন আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে সারা জেলায়; পাগলের মতো দৌড়াদৌড়ি করে তাঁর লেখাপত্র ও বইয়ের সংগ্রহ বাঁচানোর চেষ্টা করছে তাঁর মানসপুত্র আদর্শ মিশ্র, ঋষির মাথায় কে যেন পেরেকের মতো ঠুকে ঠুকে বসিয়ে দিচ্ছে তাঁর বলা কথার প্রথম অংশটা— “যদি শেষ হয়…”।

বাঙ্গিটোলা গ্রামের মলয় কুমার ঝা-র পারিবারিক মাঘিয়া কালী।

আকাশস্থ নিরালম্ব বায়ুভূত নিরাশ্রয়…

“খুব তো মানসিংহের কালী নিয়ে আমাকে জ্ঞান দিলি! মৈথিল গ্রামদেবকিদের নিয়ে কিছু জানিস? জানিস, যে মুক্তকেশী বা গোবর্জনা কালী নিয়ে এত মাতামাতি হয়, কোন কোন গ্রামদেবকির থান তার থেকেও অনেক পুরনো। কখনও ভেবে দেখেছিস, বাংলা-বিহারের বর্ডারলাইন মৈথিল মাইগ্রেশনের সঙ্গে সঙ্গে এই পারিবারিক পুজোগুলোরও মাইগ্রেশন ঘটেছে? এই পুজোগুলোর ক্ষেত্রে চার পুরুষ বা দেড়শো-দুশো বছর কোনও ব্যাপার নয়… অন্য কিছু না, যে এলাকাটার কথা তুই বলছিস, তার নাম জোতকস্তুরী। এই ‘জোত’ শব্দটাই তো মুঘল আমলের ভূমিরাজস্ব বিভাগের চালু করা। দুটো বলদ আর একটা হাল দিয়ে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যতটা চাষযোগ্য জমি কর্ষণ করা যায়, সেই একককেই বলা হত জোত। এই স্থাননাম থেকেই তো প্রাচীনত্বের আভাস পাওয়া যায়। যা বললাম ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখ— গৌড়ভূমির শাক্তসাধনার ইতিহাসে এই মৈথিল গ্রামদেবকিদের বাইরে রেখে কী ভুল করেছি আমরা!”

শেষ ডিসেম্বরে মাঘী অমাবস্যার কনকনে মধ্যরাতে নদী আর শ্মশানের ধারে খোলা আকাশের নিচে পাটকাঠি আর খড়ির আগুন খুঁচিয়ে তোলার মতো উসকে উঠছিল পুরনো কথাগুলো… ঢাক থেমে গেছে, বলির রক্তের ওপর বালি ছড়িয়ে দিয়ে গেছে কেউ। ঋষির মনে হচ্ছিল: ওর সামনেই বসে আছেন মণিস্যার— ড. তুষারকান্তি ঘোষ।

পূজার মধ্যপথে।

হাম চান্দ পে রোটি কি চাদর ডাল কর সো জায়েঙ্গে…

“ঋষি, ফর গড’স সেক— ডোন্ট বি ওভারডিটারমাইনড ইন দিস সাবজেক্ট… তুমি যা বলছ, অ্যাজ সাবজেক্ট মৈথিল গ্রামের মাঘিয়া কালী ইজ ইন্টারেস্টিং— বাট রিমেম্বার, হাউজ ইজ নট গিভিং ইউ দ্য অ্যাসাইনমেন্ট। আমরা সবাই জানি: কালী তোমার প্রিয় বিষয়, অ্যান্ড ইউ হ্যাভ কম্যান্ড ওভার দ্যাট। কিন্তু বি ভেরি ইমপার্শিয়াল… নীলাদ্রির মতো কেউ বলতে না পারে— যা বাড়াবাড়ি আরম্ভ করেছে, বাকি আছে একটা মৈথিল মেয়েকে বিয়ে করে নেওয়া!” অভ্যাসমতো নিউজ চিফের ধাতানি খেয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে ঋষি ভাবে— আবার একটা নন-কমিশনড অ্যাসাইনমেন্ট! স্টোরি ভাল হলে ক্রেডিট সবার আর খারাপ হলে দায় তার একার, সে তো চিরকালের ‘আউটসাইডার’; চিরকালের ‘ইনট্রুডার’, চিরকালের ‘ঘরেও নহে পারেও নহে…’।

দুটো বাইকে ওরা তিনজন যখন মালদা টাউন ছাড়ছে, শীতের রাত সাড়ে দশটার রাজপথ প্রায় জনহীন। চাপ-চাপ কুয়াশা, অমৃতির ধাবার তরকা-রুটি আর গরম চা পেরিয়ে এগোতে থাকে ওরা— সৌমেন্দু, হরষিত ও ঋষি। জ্যাকেট আর উইন্ডচিটারের ওপর হালকা সরের মতো কুয়াশা জমতে থাকে… শহর পিছনে পড়ে থাকে, ব্রেক আর ক্লাচের ওপরে রাখা আঙুলগুলো অবশ হয়ে আসতে থাকে; ঠান্ডার কামড় বাড়তে থাকে।

মৈথিল জনজাতির সাংস্কৃতিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা সৌমেন্দু মনে করিয়ে দেয়— উত্তর বিহার আর মিথিলাঞ্চলের ঠান্ডা আর কুয়াশার কথা। মনে করিয়ে দেয়, এই মাঘিয়া কালীপূজা ওই অঞ্চলগুলিতেও বিশেষ পরিচিত ও প্রসিদ্ধ। মাইগ্রেশনের সময় এই সংস্কৃতিও সরাসরি সংবাহিত হয়েছে। উত্তরাধিকারীরা সযত্নে বাঁচিয়ে রেখেছেন রক্তের বিশুদ্ধতার সেই উত্তরাধিকার।

অন্যমনস্ক ঋষির হঠাৎ মনে পড়ে যায়— ‘গামক ঘর’ খ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক অচল মিশ্রের আগামী সিনেমার কথা, যার কেন্দ্রীয় বিষয়ই শীতকালের দ্বারভাঙ্গার কুয়াশা। হিন্দি আর মৈথিলিতে একযোগে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটির নাম ‘ধুঁই’, যার অর্থই কুয়াশা। এই কুয়াশা যে কীভাবে নিজেই একটা চরিত্র হয়ে ওঠে, কুয়াশায় কীভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় স্মৃতি, সত্তা ও ভবিষ্যৎ— দর্শক তার সাক্ষী। আগের সিনেমাতেও ছটপূজার সময়কালীন কুয়াশা অচলের ক্যামেরায় মায়াবী হয়ে উঠেছিল।

বিসর্জনের আগে বিদায় (স্থানীয় ভাষায় ‘চুমানো’)।

ইস আঞ্জুমান মে আপকো আনা হ্যায় বার বার…

সেই যে সৌমেন্দু বলেছিল, বাঙ্গিটোলার বয়স্ক পুরুষমাত্রেই তার মামা— এ তার মামাবাড়ির গ্রাম, সেই জগৎ পেরিয়ে যাওয়া গেল না। প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এই মৈথিল গ্রামটিতে মা মুক্তকেশী মন্দিরের সামনের চাতালে তারা তিনজনেই কতবার, কতসময়ে এসে দাঁড়িয়েছে… পেশাদার রিপোর্টার হরষিত এসেছে খবর শিকারে; ঋষিও সঙ্গী হয়েছে তার— সৌমেন্দুও এড়াতে পারেনি সেই আহ্বান। কিন্তু এই নির্জন মধ্যরাতে, যখন মন্দিরের সামনের বাঁধানো চাতাল ধুইয়ে দিচ্ছে হ্যালোজেনের আলো… গঙ্গার চর থেকে ভেসে আসা কনকনে ঠান্ডা হাওয়া আর রাতচরা পাখির ডানার ঝটপটানি মিলেমিশে এক অতিপ্রাকৃত ধ্বনিতরঙ্গ আটকে রাখছে তিনজনকে, নীরবতা ভেঙে সৌমেন্দুই প্রথম বলে ওঠে— “আমাদের গোবিন্দগঞ্জ যেতে হবে”। ঋষির হঠাৎ মনে পড়ে যায়, বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’-র বিশালাক্ষী মন্দিরের দেবীর মতোই মা মুক্তকেশী জড়িয়ে থাকেন এখানকার মানুষের সঙ্গে। সে-ই খুঁজে বের করেছিল: ১৮১৩ সালে প্রকাশিত ব্রিটিশ বায়োলজিস্ট ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিলটনের গবেষণাপত্রে পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে এই দেবীর অস্তিত্ব।

পূজা-অন্তে মধ্যরাতের আশ্রয়।

ভোগের নাম দোস্তি

সোয়া কেজি আটা দিয়ে বিনা তেল-লবণে তৈরি রুটি— সেই রুটি আবার সেঁকা হবে আমকাঠের জ্বালে। সঙ্গে বাঁধাকপি ও নতুন আলু মেশানো সবজি আর চিনি। তেল বা লবণের কোনও সংশ্রব নেই। এই ভোগের নাম দোস্তি। বাঙ্গিটোলার বাসিন্দা মলয়কুমার ঝা-র বাড়ির মাঘিয়া কালীর পূজায় এই ভোগ বাধ্যতামূলক। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মলয়বাবুর স্বর্গীয় পিতা শান্তিশেখর ঝা এই পূজার অধিকার লাভ করেন তাঁর মাতৃদেবী স্বর্গতা বরুণী দেব্যার কাছ থেকে। অর্থাৎ, এই অধিকার পিতৃকূলের নয়। মৈথিল সমাজের মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার এক কৌমচিহ্ন মিশে রইল এই উত্তরাধিকারের মধ্যে। থেকে গেল কিছু গভীর বিশ্বাস ও লোকজীবনের ইতিহাস; একটি সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের দুঃখ, অভাব আর মৃত্যু পেরিয়ে শুধু বিশ্বাসকে অবলম্বন করে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প… ওরা তিনজনেই নিজের নিজের মতো করে দেখে ঝা পরিবারের সকলের চোখেমুখে বিশ্বাসের সেই অতিপ্রাকৃত আলো। ছোটবেলায় আবৃত্তিতে প্রাইজ পাওয়া সৌমেন্দুর মনে পড়ে যায় অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতা— “সে আলো টলে না দুঃখের কালো ঝড়ে/ তর্জনি তুলে জেগে থাকে ঘরে ঘরে”।

হরষিত ঘোষিতভাবেই বলে— কবিতা বুঝি না। সে হার্ডকোর সাংবাদিক— একেবারে ফ্রন্টলাইন রিপোর্টার। তার মন পড়ে আছে মলয়বাবুর বলা একটা গল্পের দিকে। প্রাথমিকভাবে এই পরিবারে উদাসপূজা প্রচলিত ছিল। অর্থাৎ, খোলা আকাশের নিচে বিনা মূর্তিতে কাঁচা মাটির থানে পূজিতা হতেন দেবী। পূজার আয়োজনের ব্যস্ততার ফাঁকে মলয়বাবু বলেন, একসময় এই ঝা পরিবার আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এমনকি মাঘ মাসের প্রথম অমাবস্যায় পূজা আদৌ হবে কি না, তা নিয়েও চিন্তিত ছিলেন শান্তিশেখর ঝা। তিন ছেলে আর তিন মেয়ের সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। পূজার জোগাড়ের জন্য যখন দিশেহারা অবস্থা, তখন হঠাৎই হাট থেকে ফেরার পথে অন্যমনস্কভাবে একটি খালি দেশলাইয়ের বাক্স কুড়িয়ে পান তিনি। খুলে দেখেন— সেখানে ভাঁজ করে ঢোকানো আছে দুটি দশটাকার নোট! সাতের দশকের গোড়ায় সেই টাকা দিয়েই পূজার যোগাড় হয়। পারিবারিক বিশ্বাস দৃঢ়মূল হয়— এই পূজায় কোন ছেদ পড়বে না; পড়েওনি আজ অবধি।

বাঙ্গিটোলার বিখ্যাত মুক্তকেশী কালীর পূজায়।

সাংস্কৃতিক মাৎস্যন্যায়

“আমাকে পয়সা দিলেও ঐ রুই-কাতল বড়ো মাছ খাবো না। নিজের হাতে ছোট ছোট মাছ ধরবো, সেটাই খাবো, নাতিটাকেও তাইই খাওয়াবো”— পাটকাঠি, খড়ি আর কাঠকুটো দিয়ে আগুন করা হয়েছে; তার ধারে গোল হয়ে বসে আছে মানুষগুলো। এরমধ্যেই হরষিতকে কথাগুলো বলে ফেলেন এক প্রবীণ। আগুন ঘিরে গোল হয়ে বসে আছে জনাদশেক ভাঙাচোরা চেহারার মানুষ। আশপাশের গ্রাম থেকে তারা এসেছেন পূজা দেখতে, প্রসাদ পেতে। দূর থেকে ক্যামেরার লেন্সে দৃশ্যটা দেখতে দেখতে ঋষির মনে পড়ে যায় ভ্যানগখের আঁকা ‘দ্য পটেটো ইটার্স’ ছবিটার কথা… একদম একরকম লাগছে! ক্যামেরা হাতে নিয়েই ছবি নিয়ে পাগলামির সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায় তার।

সারা মালদা জেলায় গঙ্গার মাছের একধরনের বিশেষ কৌলীন্য আছে ঋষি জানে সে কথা। ঝা বাড়ির এই পূজায় এসে তার হঠাৎ মনে পড়ে যায় মিথিলাঞ্চলের সেই প্রাচীন প্রবাদ— “পগ পগ পোখর মাছ মাখান, মধুর বোল মুস্কি মুখপান/ বিদ্যা বৈভব শান্তি প্রতীক, ললিত নগর হি মিথিলা থি।” অর্থাৎ, প্রতি পদক্ষেপে পুকুর বা জলাশয়, তাতে মাছ ও পদ্মের মাখনা; হাসিমুখে মিষ্টি কথা ও পান; বিদ্যাচর্চার শান্ত পরিবেশ ও সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার- এই সবকিছু নিয়েই মিথিলাঞ্চল ও মৈথিল জনসংস্কৃতি। ছোটবেলার ইতিহাস বইতে পড়া গৌড় সম্রাট শশাঙ্কের শাসনকালে ষোড়শ মহাজনপদের মাৎস্যন্যায়ের মতো, ক্রমাগত বড়ো মাছের ছোট মাছকে গিলে ফেলার মতো আধুনিকতার আগ্রাসনে উত্তরাধিকারের ঐতিহ্য থেকে ক্রমশ দূরে সরে সরে যাচ্ছে এই অঞ্চলের মৈথিল জনসংস্কৃতির ধারা-সৌমেন্দু তার গবেষণায় এ কথাটা বারবার জোরের সঙ্গে বলার চেষ্টা করেছে। সে আর ঋষি একটা পর্যায়ে এসে একমত হয়েছে— এই অঞ্চলে বসবাসকারী বাঙালি মৈথিলরা সর্বভারতীয় ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে অনেকটা দূরে অবস্থান করেন; কিন্তু শাক্ত সাধনার একটা সাধারণ মৈথিল ঐতিহ্য এখানে আবহমান কাল থেকে রয়ে গেছে।

থার্মোকট, তার ওপর জ্যাকেট, তার উপর উইন্ডচিটার— কিছুতেই শীত মানছে না। মলয়বাবুর দেওয়া লেপ-কম্বলও প্যান্ডেলের নিচের শিশিরে ভিজে সপসপে। মাঝে মাঝে গঙ্গার হাওয়া এসে একেবারে হাড়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে। এই আগুনই একমাত্র ভরসা। সৌমেন্দু আঁতকে উঠে খেয়াল করে, আগুন জ্বেলে রাখার তাড়াহুড়োয় হরষিত প্যান্ডেলের একটা ফেলে রাখা বাঁশকেও অসাবধানবশত আগুনে গুঁজে দিয়েছে! সে কাতর গলায় বলে ওঠে— “দেখিস, প্যান্ডেলটাকে আস্ত রাখিস!”

বঙ্কিমচন্দ্রের ভবানী পাঠকের কালীমন্দির হিসাবে খ্যাত গোবর্জনা কালীমন্দিরে।

পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, সংস্কার…

পুজো যথানিয়মে এগোতে থাকে। ঋষি আর হরষিত টুকরো টুকরো দৃশ্যগুলোকে লেন্সবন্দি করার কাজটা এগোতে থাকে। এই পূজায় বলি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সৌমেন্দুই বাঙ্গিটোলা থেকে বাইকে চাপিয়ে ঘাতককে নিয়ে আসে। পারিবারিক খঙ্গ প্রস্তুত। বলি শুরু হয়— সৌমেন্দু পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়ায়, এই রক্তস্রোত তার স্নায়ুকে ভারাক্রান্ত করে।

ঋষি একটু হালকা রসিকতা করে বলে, “কী ব্যাপার! তোমার বামপন্থী সংস্কারে বাধছে?” অন্য সময় হলে একটা তীব্র উত্তর আসত, কিন্তু সৌমেন্দু কেমন একটা অন্যমনস্ক হয়ে বলে, “শাহরুখ-অমিতাভের ‘মহব্বতে, সিনেমটা দেখেছিলে? সেখানে কড়া প্রিন্সিপাল অভিতাভ বচ্চনের একটা ডায়ালগ ছিল— ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, সংস্কার’। যতই বিরোধিতা করি না কেন, আমরা এই তিনটের বাইরে বেরোতে পারি না। আমি লেখাপড়া শিখে বামপন্থী চিন্তায় বিশ্বাসী হয়েছি এই সেদিন, কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমার রক্তে বাহিত যে ‘পরম্পরা, প্রতিষ্ঠা, সংস্কার’— তাকে এড়াই কী করে? তাই আমার মৈথিল সংস্কারে এই মাঘিয়া কালীর পূজা জ্বলজ্বল করবেই। বলির আধ্যাত্মিক তাৎপর্য গভীরভাবে বিশ্বাস করি আজও; আর রক্তপাত সহ্য করতে পারি না— সেটা একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার।”

ঋষির হঠাৎ মনে পড়ে যায় এম.এ.-র স্পেশাল পেপার রবীন্দ্রনাথের ক্লাস— ‘বিসর্জন’ নাটকের রঘুপতির সংলাপের সেই অসামান্য অংশটা, ব্রাহ্ম সংস্কার পেরিয়ে যে চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।

“…পাপপুণ্য কিছু নাই। কে বা ভ্রাতা, কে বা
আত্মপর! কে বলিল হত্যাকাণ্ড পাপ!
এ জগৎ মহা হত্যাশালা। জানো না কি
প্রত্যেক পলকপাতে লক্ষকোটি প্রাণী
চির আঁখি মুদিতেছে! সে কাহার খেলা?
হত্যায় খচিত এই ধরণীর ধূলি।
প্রতিপদে চরণে দলিত শত কীট—
তাহারা কী জীব নহে? রক্তের অক্ষরে
অবিশ্রাম লিখিতেছে বৃদ্ধ মহাকাল
বিশ্বপত্রে জীবের ক্ষণিক ইতিহাস।
হত্যা অরণ্যের মাঝে, হত্যা লোকালয়ে,
হত্যা বিহঙ্গের নীড়ে, কীটের গহ্বরে,
অগাধ সাগর-জলে, নির্মল আকাশে,
হত্যা অকারণে, হত্যা অনিচ্ছার বশে—
চলেছে নিখিল বিশ্ব হত্যার তাড়নে
ঊর্ধ্বশ্বাসে প্রাণপণে, ব্যাঘ্রের আক্রমে
মৃগসম, মুহূর্ত দাঁড়াতে নাহি পারে।
মহাকালী কালস্বরূপিণী, রয়েছেন
দাঁড়াইয়া তৃষাতীক্ষ্ণ লোলজিহ্বা মেলি—
বিশ্বের চৌদিক বেয়ে চির রক্তধারা
ফেটে পড়িতেছে, নিষ্পেষিত দ্রাক্ষা হতে
রসের মতন, অনন্ত খর্পরে তাঁর—”

Advertisement
বলির প্রতীক্ষা!

‘চণ্ডী’ ও/বনাম ‘কালী’

ঋষি যখন যাদবপুরে পড়ত, অধ্যাপক তপোব্রত ঘোষের ক্লাসগুলি একেবারে ভিতর থেকে গ্রস্ত করে রেখেছিল তার মতো অনেককেই। স্যরের মুখেই শোনা, নয়ের দশকে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তেন তিনি। যাদবপুরে পড়ার সময় যাঁর ক্লাসের খ্যাতি ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেও, সেই সারকেই সে বলতে শুনেছিল তাঁর এক শিক্ষকের কথা। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক ননীগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়। তপোব্রতবাবু আক্ষেপ করে বলতেন— আমরা বাংলার ছাত্ররা অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, শশিভূষণ দাশগুপ্ত, হরপ্রসাদ মিত্র বা নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্লাস নেওয়ার খ্যাতি শুনি বটে; কিন্তু ননীবাবুর মতো অনেক অধ্যাপক বিস্মৃতির অতলে চলে যান। উল্লেখ্য, এই ননীবাবুর পুত্র প্রখ্যাত ঐতিহাসিক শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়। কী ছিল তাঁর অধ্যাপনার বৈশিষ্ট্য, যে কারণে তাঁকে আজীবন মনে রাখেন তপোব্রত ঘোষের মতো শিক্ষক? ননীবাবু পড়াতেন মূলত মধ্যযুগের সাহিত্য এবং দেখাতেন তন্ত্রের বিবর্তনের ইতিহাস দিয়ে মধ্যযুগের সাহিত্যকে কীভাবে পড়া যায়। স্যর বলেছিলেন, সেই ক্লাসগুলি ভোলার নয়।

ঋষি কাজ করতে গিয়ে একসময় বুঝতে পেরেছিল, গৌড়বঙ্গে চণ্ডী ও কালীকে খানিকটা সচেতনভাবে, অনেকটাই অসচেতনভাবে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু গবেষক বা গণমাধ্যম— কেউই এই ফারাকগুলো নিয়ে তেমন উৎসাহ দেখাননি, তাই জনমানসে এই দুই শক্তিদেবীও কোথাও যেন মিলেমিশে এক হয়ে গেছেন।

মহাসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের সময়কালকে যদি প্রামাণ্য ধরি, তা হলে বাংলায় কালীপূজার সূত্রপাত মোটামুটি চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতাব্দীতে। কিন্তু লোকদেবী চণ্ডী আছেন একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দী থেকেই। দুই দেবী ভিন্ন। তাদের আবাহনমন্ত্রও ভিন্ন। মা কালীর ক্ষেত্রে— “ওঁ করালবদনাং ঘোরাং মুক্তকেশীং চতুর্ভুজাং/ কালিকাং দক্ষিণাং দিব্যাং মুণ্ডমালাবিভূষিতাম্…। আর মা চণ্ডীর ক্ষেত্রে— “ওঁ ঐং হ্রীং ক্লীং চামুণ্ডায়ৈ বীচ্চে”। ভুললে চলবে না, গৌড়বঙ্গে চণ্ডী এবং কালী— দুই দেবীরই পৃথক অস্তিত্ব আছে। জহরাচণ্ডী, পাতালচণ্ডী বা দেবী দুয়ারবাসিনী চণ্ডীরূপে পূজিতা; কিন্তু মা মনস্কামনা, মা মুক্তকেশী বা গোবর্জনার মা কালী। তাঁদের ইতিহাস যেমন বিপুল ও বৈচিত্র্যময়, তেমন পূজাপদ্ধতিও ভিন্ন। সৌমেন্দু সমর্থন করে বলে, সিদ্ধসাধকের বংশধরেরা পূজা করলেই চণ্ডী আর কালী এক হয়ে যান না।

সেন বংশের কুলদেবী ছিলেন চণ্ডী। পাল বংশের রাজা তৃতীয় বিগ্রহপালের পুত্র রামপাল তাঁর নিজ নামে প্রতিষ্ঠিত রাজধানী রামাবতীতে নিজের শাসনকেন্দ্র স্থানান্তরিত করেন। পূর্ববর্তী শাসক লক্ষ্মণ সেন রামাবতী থেকে আরও দক্ষিণে নিজের রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যান। নিজের নামানুসারে এই নতুন রাজধানীর তিনি নাম দেন লক্ষণাবতী বা লখনৌতি। এই রাজধানী পরবর্তী সময়ে গৌড়। এই গৌড়ের নগরদুর্গের চারদিকে চারজন রক্ষাকর্ত্রী দেবী চারটি মন্দির বা পীঠ ছিল। তাদের মধ্যে উত্তরদিকের মাধাইচণ্ডীর পীঠ গঙ্গাগর্ভে বিলীন। পূর্বদিকে জহরাচণ্ডী, পশ্চিমে দেবী দুয়ারবাসিনী ও দক্ষিণে পাতালচণ্ডী এখনও স্বমহিমায় বিদ্যমান। এই মন্দিরগুলির সবগুলির প্রতিষ্ঠাকাল ১১৭৯ থেকে ১২০৭ খ্রিস্টাব্দ। ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ বলে, ১৯২০-র প্রথমদিকে লর্ড কার্জনের যে ভারত ভ্রমণের নকশা তৈরি হয়েছিল, তাতে গৌড়ের উল্লেখযোগ্য স্থান হিসাবে ‘পাটলচণ্ডী’ বা ‘পাতালচণ্ডী’-র নাম উল্লেখ আছে।

হরষিতও যোগ করে— ঠিক যেমন সব পূজারী ব্রাহ্মণ মৈথিল নন, তেমন নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করার সুবিধার জন্য বা কিছু তাড়াহুড়োর গবেষণার সুবিধার্ধে এই ভুলগুলো হয়েই চলেছে— সব দোষ সংবাদমাধ্যমকে দিয়ে চলবে না।

মৈথিল জনসংস্কৃতির সঙ্গে কালীপূজার এক অসামান্য সাংস্কৃতিক যোগাযোগ রয়েছে। প্রকৃত প্রস্তাবে তাঁরাই এই বৈষ্ণব অধ্যুষিত গৌড়বঙ্গে শাক্ত সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছেন প্রায় চারশো বছর ধরে। ইতিহাস তার সাক্ষী।

ফিরতি পথ…

কাজ হয়ে যাওয়ার পর হরষিত আর ঋষি সৌমেন্দুকে নিয়ে একফাঁকে ঘুরে আসে খাসকোলের পাগলিতলা থেকে। শ্মশানের দিক থেকে ভেসে আসা এক অন্যরকম হাওয়া আর গঙ্গার কনকনে এলোমেলো হাওয়ার কাটাকুটি পেরিয়ে মন্দিরের সামনের হাঁড়িকাঠের সামনে দাঁড়ায় ওরা। ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে গ্রিলের জাফরিকাটা আলো মন্দির চত্বরে এক অতিপ্রাকৃত জগৎ তৈরি করেছে। এবার ফিরতে হবে ওদের।
খাসকোল থেকে বেরিয়ে গোবিন্দগঞ্জ হয়ে বাঙ্গিটোলায় ঝা পরিবারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ সেরে এবার ফেরার পালা। এই শীতের রাতে ফেরাটা বিপজ্জনক— এটা বারবার মনে করিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও পেশার প্রয়োজনে ঋষি আর হরষিতকে ফিরতেই হবে। সৌমেন্দু থেকে যায়।

চরাচরব্যাপী কুয়াশা যখন সামনের একহাতের জিনিসকেও দেখতে দিচ্ছে না; মনে হচ্ছে— বাইকের হেডলাইটের আলো কুয়াশায় নয়, কোনও পাথুরে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে… এমন অবস্থায় তারা এগোতে থাকে। মাঝে গ্রামের রাস্তা হারিয়ে ফেলার মতো দু-একটা ঘটনাও ঘটেছিল। সৌমেন্দু রসিকতা করে— “গ্রামের লোক শীতের রাত দুটায় তিনজনকে ধরলে চোরের মার মারবে”, হরষিত যোগ করে— “রিপোর্টার জানলে আরও বেশি মারবে”।

মুক্তকেশী মন্দিরের সামনে গাড়ি সামান্য আস্তে হয়। ওদের দুজনেরই মনে পড়ে যায় স্থানীয় বিখ্যাত মিষ্টি বাঙ্গিটোলার ছানার মণ্ডা নিয়ে স্টোরি করার দিনটা। মা মুক্তকেশী এবং এই মিষ্টির মধ্যে একটা নিবিড় সাংস্কৃতিক যোগ আছে, সেটা ওরাই প্রথম দেখিয়েছিল। দুজনে দুজনের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে একটু হাসে। একটা পুরনো ঘটনা— যার কুশীলবও ওরা তিনজনই!

সেদিন মন্দিরে কী একটা পূজা চলছে। সৌমেন্দু টানতে টানতে সদ্য চাকরি বদলানো হরষিতকে মন্দিরের চাতালে এনে বলে— “চা, মায়ের কাছ থেকে আজ যা চাওয়ার চেয়ে নে!” এই বলে নিজেই উচ্চকণ্ঠে বলে— “মা, মা গো— সামনে পিএইড ডি-র পরীক্ষা। ভাইভাটা সামলে নেব মা, সে কনফিডেন্স আছে। তুমি শুধু রিটেনটা দেখে নিয়ো।” ঋষি একটা মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করতে থাকে— কিন্তু সৌমেন্দুর মাথায় কিছু একটা ঢুকলে তাকে সামলানো মুস্কিল। ঋষিও সে-চাপ নিতে না পেরে একসময় জোড়হাতে বলে ওঠে— “দেখো মা, তুমি তো শুধু মৈথিলের মা নও— তুমি সবার মা। কাজেই অমৈথিল হয়ে এই মৈথিলচর্চায় আমার যদি কোনও পাপ হয়ে থাকে— মাথায় রেখো সে পাপ আমি একা করিনি। সে পাপ শুচিব্রত সেন করেছেন, ক্যারোল এন ডেভিস করেছেন, বরুণ সাঁই করেছেন, দীপাঞ্জনা শর্মা করেছেন। তাঁরাও আমার মতো অমৈথিল। কাজেই শাস্তি যদি দাও মা— সবাইকে ভাগ করে করে দেবে, কেমন?” এদিকে হরষিত গ্যাস-অম্বলের সমস্যায় খুব ভুগছিল। সৌমেন্দুকে ঠেকাতে সে হাতজোড় করে বলে ফেলে, “মা, গ্যাস কমাও”।

এই গল্পের একটা চূড়ান্ত অ্যান্টিক্লাইম্যাক্স আছে। হরষিত আজও গ্যাসের ব্যথায় কষ্ট পায়; আর সৌমেন্দুকে গালাগালি দেয়। সৌমেন্দু আবার পাল্টা ঝাঁঝিয়ে বলে, “মা মুক্তকেশীর কোনও দোষ আমি শুনবই না। তুই গ্যাস কমাতে বলেছিস, মা কমিয়ে দিয়েছে। সারিয়ে দিতে বললে পুরোপুরি সারিয়ে দিত।”
বিশ্বাস আর আপাত মজাটুকু পেরিয়ে এই মন্দির চত্বর পেরিয়ে রাজ্য সড়কে ওঠে ওরা। পিছনে পড়ে থাকে সেই টিলার উপরের বাড়িটির স্মৃতি, সেখানে ঢুকে ঋষি প্রথম বুঝতে পেরেছিল ‘গামক ঘর’ কথাটার আসল মানে কী… সেই একজন লিখেছিল ‘স্মৃতির স্মৃতি’-র মতো একটা শব্দবন্ধ। নদীর নামে তার নাম। মুঠোখোলা পেশেন্সের তাসের মতো সামনে অসংখ্য স্মৃতি সামনে ছড়িয়ে বসে থাকে সে। সেগুলোকে সে নিজের মতো করে সাজায়, নিজের মতো করে তাস বাঁটে— চাল দেয়। চাল পছন্দ হলে নিজের মনেই খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে, চাল পছন্দ না হলে নিজের উপরেই ক্রুদ্ধ হয়— দাঁত কিড়মিড় করে; কিন্তু কোনও চাল ফেরায় না। বাইরের জগৎকে ভুলে সে খেলে চলে। ঋষির কানে গমগম করে ওঠে তাদের দুজনের খুব প্রিয় একটা কবিতার স্মৃতি, শক্তির ‘আনন্দভৈরবী’— “সে কি জানিত না যতো বড়ো রাজধানী, ততো বিখ্যাত নয় এ হৃদয়পুর/ সে কি জানিত না আমি তারে যতো জানি, আনখ সমুদ্দুর”।

কাশিমবাজার ও সাতটারি পেরিয়ে পথের শেয়াল আর কুয়াশা বাঁচিয়ে তারা অমৃতি থেকে ডানদিকে শহরের পথ ধরে। শেষ যে মৈথিল গ্রামটি তারা পেরিয়ে এসেছে, তার নাম রথবাড়ি। দূর থেকে মৃদু আলো আর কেঁপে যাওয়া অস্পষ্ট মাইকের শব্দে তারা বুঝতে পারছিল, সেখানে একটা নয়— একাধিক মাঘিয়া কালীপূজা হচ্ছে।

হায় কিতনে বরস বিতে/ তুম ঘর না আয়ে রে…

বিহার ও মিথিলাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মৈথিল বিবাহগীতি যেমন মালদায় এসে অবলুপ্তপ্রায়, তেমনই প্রায় প্রতিটি কালীপূজায় বেজে চলা রামপ্রসাদী বা কমলাকান্তের শাক্তসঙ্গীত আবার ওখানে পাওয়া যাবে না। এইভাবে ‘মৈথিল’ থেকে ‘বাঙালি মৈথিল’ হতে গিয়ে সর্বভারতীয় মৈথিল সংস্কৃতির সঙ্গে একটা অসেতুসম্ভব দূরত্ব তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু আবহমানের শাক্ত ঐতিহ্য অমলিন থাকে। তা মিশে যায় উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতির বিপুল বৈচিত্র্যময় আবহমান ধারার সঙ্গে। ফলে পদ্মশ্রী পাওয়া জাতীয় স্তরের মৈথিল বিবাহগীতির শিল্পী শারদা সিনহা এ জেলায় শ্যুটিংয়ের অনুমতি পান না, আবার পাশাপাশি লোকসঙ্গীতের একনিষ্ঠ শ্রোতা হরষিত ঋষিকে একবার দেখিয়ে দিয়েছিল— জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সিনেমায় ব্যবহৃত মৈথিল বিবাহগীতের সুর একেবারেই কোচবিহারের ভাওয়াইয়া আধারিত।

মালদা জেলার মানিকচক, মোথাবাড়ি, রতুয়া ও চাঁচল বিধানসভা কেন্দ্রের এককালের সমৃদ্ধ মৈথিল গ্রামগুলি আজ অনাবাসী বাসিন্দায় পরিপূর্ণ। সারিসারি তালাবন্ধ বাড়ির জঙ্গলে ঘেরা উঠোন, শুকনো তুলসিমঞ্চ আর ধুলোমাখা আসবাব অপেক্ষা করে ছটপূজা, হরিয়ালি তিজ, জিতাষ্টমী বা এমনই কোন মাথিয়া কালীপূজার। এও তো এক ‘ফাইন্ডিং নেভারল্যান্ড’-এর গল্প! রথবাড়ি মোড়ে একা দাঁড়িয়ে ঋষি ভাবছিল… ফ্লাইওভারের উপরে সূর্যটা তখন কোনওমতে কুয়াশা ছাড়িয়ে উঠি-উঠি করছে।

“দাদা, তোমার বিনাচিনির চা— ধরো”। হঠাৎ ডাকে চমকে চায়ের গ্লাসটা দুহাতে ধরে সে। গরম ভাপটা নিতে নিতে সে দেখে, ফ্লাইওভারের নিচে আর রাস্তার দুধারে কর্পোরেশনের ফেলে রাখা অতিকায় সিমেন্টের পাইপের পেটে আঁধার কাটিয়ে যে সব মানুষেরা শীতের সকালে পৌঁছল নিশ্চিন্তে, আর এখন যারা রাশিকৃত ছেঁড়া টায়ারে আগুন ধরিয়ে একটু উষ্ণতার স্পর্শ পেতে চাইছে।

বামদিকে তাকিয়ে ঋষি দেখে— সেই পাগল রিকশাওয়ালাটা না! সারারাত রিকশা নিয়ে রথবাড়িতে বসে থাকে। ইচ্ছে হলে ভাড়া যায়, না হলে যায় না। মাঝেমধ্যেই চিৎকার করে উর্দু শায়েরি বলে ওঠে। একঠোঙা মুড়ি আর একটা কাঁচালঙ্কা সামলে আজ তার গলায় ফার্সি শায়ের উম্মিদ ফাজলির যন্ত্রণা— “ইয়ে সর্দরাত ইয়ে আওয়ারগি ইয়ে নিন্দ বা বোঝ/ হাম আপনে শহরমে হোতে তো ঘর গ্যয়ে হোতে।”

ঋষির হঠাৎ মনে হয়— সত্যিই, এ তো তার শহর নয়! চোখ বন্ধ করে কলেজ স্ট্রিটের ভোরবেলাকে দেখতে পায় সে। গঙ্গাস্নানের ট্রাম ফিরে গেছে ঘটাং ঘটাং করে, পাঁউরুটির ভ্যানগুলো রওনা দিচ্ছে সারসার, চা দোকানের রাজুদা প্রাণপণে হাওয়া মারছে কয়লার উনুনে— দোকানের সামনে ভিড় বাড়ছে মর্নিং ওয়াকারদের। ভাবে, মালদার গ্রাম আর উত্তর কলকাতা— দুই জায়গাতেই তো থাকলো সে! নাকি কোথাওই থাকল না ঠিকভাবে! তার তো আবাহন নেই, আবার বিসর্জনও নেই। সকলের থেকে আলাদা বলেই সে একা, না কি একা বলেই সকলের থেকে আলাদা! কোনটা ঠিক?

ঋষির হাসি পায়। নিউজ চিফের বরাদ্দ করা আড়াই হাজার শব্দের ক্ষমতা কি তার সবটা ধরে রাখে? তার কলার টিউনে বেজে ওঠে মিনার রহমান: “আমি তোমার দ্বিধায় বাঁচি/ তোমার দ্বিধায় পুড়ে যাই/ এমন দ্বিধার পৃথিবীতে/ তোমাকে চেয়েছি পুরোটাই!”

[এই লেখার উপশিরোনামগুলির জন্য অনুপম রায়-এর গান, অগ্নিদগ্ধা পিণ্ডদানের মন্ত্র, পীযূষ মিশ্র-র কাব্যগীতি, কাইফি আজমি-র কাব্যগীতি, রাজর্ষি দাশভৌমিক-এর কাব্যগ্রন্থ এবং পদ্মশ্রী শারদা সিনহা-র মৈথিল বিবাহগীতের কাছে ঋণী।]

চিত্র: লেখক

2 Responses

  1. ভালো লেখা…তবে শুধু মালদা জেলা কেন?উত্তর বা দক্ষিণ দিনাজপুরের অনেক কালীপূজার সঙ্গে এই দৃশ্যের মিল রয়েছে।বিশেষত বলি ও বিশ্বাসের অংশগুলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven + ten =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »