Search
Generic filters
Search
Generic filters

হাম্পি: পুরাণ-ইতিহাস-মহাকাব্য ছুঁয়ে

‘গঙ্গার জলে স্নান, তুঙ্গার জল পান’।

প্রথমবার শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ পড়ার সময়ে এই লাইন দুটো মনে গেঁথে গিয়েছিল। আর সেই থেকেই তুঙ্গভদ্রাকে দেখার ও ভারতের একসময়ের সমৃদ্ধ বিজয়নগর সাম্রাজ্যের স্পর্শ পাওয়ার ইচ্ছে। ছেলেবেলার সেই ইচ্ছে সম্প্রতি পূরণ হল হাম্পি গিয়ে। হাম্পি, সে তো শুধু বিজয়নগর সাম্রাজ্যের ইতিহাসের গল্প নয়। একদিকে, সে বিশ্বের চার মহাকাব্যের অন্যতম ‘রামায়ণ’-এর এক অংশ এবং অন্যদিকে পুরাণের নানা গল্পগাথার মণিমাণিক্যে পরিপূর্ণ। যদিও অন্যান্য জায়গার মত কিষ্কিন্ধ্যা পর্বত পরিবৃত হাম্পি যাওয়ারও সবচেয়ে ভাল সময় অক্টোবর থেকে মার্চের প্রথম দিক। কিন্তু আমার ছুটিছাটা ম্যানেজ করে মার্চের শেষের দিকে হাম্পি যাওয়া সাব্যস্ত হল।

বিজয় বিট্‌ঠল মন্দিরের সামনে পাথরের রথ।

বিজয়নগর সাম্রাজ্যের গল্পগুলো ছুঁতে গেলে একবিংশ শতকের ভারতবর্ষের আইটি সাম্রাজ্যের রাজধানী ব্যাঙ্গালোর ছুঁয়ে যেতে হয়। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হয়নি। সকালে ব্যাঙ্গালোরে নেমে দিনের বেলাটা শহরের তাপউত্তাপ বুঝে রাত্রে হাম্পির উদ্দেশে যাত্রা। এখানে বলে রাখা ভাল, হাম্পি যেতে গেলে রাতের বাস বা ট্রেন ধরতে হয় ব্যাঙ্গালোর থেকে যা আপনাকে হস্পেট পৌঁছে দেবে। সেখান থেকে অটো করে হাম্পি। আর ব্যাঙ্গালোর থেকে কর্নাটক সরকারের কিছু বাস আছে যা সোজা হাম্পি পৌঁছে দেয়। তবে সেই বাসে সারা রাত বসেই যেতে হবে, কারণ, সেইসব বাসে এসি বা শুয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা নেই। আর তাই আমি আগে থেকে রেড বাসের মাধ্যমে বুক করে রাখা এসি স্লিপার বাসে আনন্দ রাও সার্কেল বাস টার্মিনাস থেকে হাম্পি টু হস্পেট যাত্রা শুরু করি।

বিজয় বিট্‌ঠল মন্দিরের ভেতর।

থাকার জায়গা বলতে হাম্পির একাধিক হোমস্টে। সেই হোমস্টে আগে থেকে বুক করে রাখতে পারলে ভাল। আর যদি সেটা একান্তই সম্ভব না হয় তবে সোজা হাম্পি পৌঁছে সেখানে গিয়েও হোমস্টে বুক করা যায়। হোমস্টে ও গাইডের পেশাই হল বর্তমানে এই মূলত হাম্পির মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি।

রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে যখন হাম্পির বাসে উঠছি তখন হোমস্টে থেকে গাইড কাম অটো ড্রাইভার যোগাযোগ করেন। নাম পরশুরাম। এ যেন মহাকাব্যের জায়গা ছুঁতে যাওয়ার আগে মহাকাব্যের আমাকে ছুঁয়ে যাওয়া।

বিজয় বিট্‌ঠল বাজার।

বাস ভোর চারটে-সাড়ে চারটে নাগাদ হস্পেট পৌঁছে যায় আর বাস পৌঁছানোর কিছুক্ষণ আগেই পরশুরাম ফোন করে জানিয়ে দেন যে তিনি আমায় নিতে এসে গেছেন। আধা-ঘুম আধা-জাগরণে যখন হস্পেট পৌঁছাই, হাস্যময় এক যুবক আমার দিকে এগিয়ে এসে হোমস্টের নাম কনফার্ম করেন, বুঝলাম এই হলেন পরশুরাম। যদিও রাতে বাস আসে বলে আপনার অটো বুক না থাকলেও হস্পেট থেকে হাম্পি যাওয়ার অটো বাসস্ট্যান্ডে পেয়ে যাবেন।

হস্পেট থেকে হাম্পি ২০ কিমির কিছু বেশি দূর। এই রাস্তা নিশ্চয়ই কিষ্কিন্ধ্যা পর্বতমালা ও দক্ষিণ ভারতের গ্রামগুলি ছুঁয়ে যায়। তবে এই পথে দুবারের যাত্রাপথই সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের আগে পরে হওয়ায় তার প্রকৃত রূপ আমি ধরতে পারিনি। কিন্তু আঁধারের মধ্যেও এই পথ আমায় এটুকু ভাল করেই বুঝিয়ে দেয় যে, এই ছিল বিজয়নগর সাম্রাজ্যে যাওয়ার পথ। এই পথ শুধুই নতুন জার্নির গল্পের পথ নয়, এ তার চেয়ে অনেক বেশি পুরাণ-ইতিহাস-মহাকাব্য ছুঁয়ে থাকার পথ।

২

ভোর পাঁচটায় যখন হাম্পি পৌঁছে বিছানায় গা এলিয়ে জার্নির ক্লান্তি সারাব ভাবছি, তখনই আমায় পরশুরাম জানান যে আমি যদি আজই সূর্যোদয় দেখতে চাই তবে এখনই ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে যাওয়া ভাল। কারণ সামনেই মাতঙ্গা পর্বতের চূড়া হাম্পির সূর্যোদয় দেখার অন্যতম স্পট। তাই সেই সুযোগ আমিও হাতছাড়া করতে চাইনি। আর ফ্রেশ হয়ে আবার আমার হাম্পি রথে চেপেই চলে গেলাম হোমস্টে থেকে একটু দূরে অবস্থিত ‘মাতঙ্গা’ পর্বতে। মাতঙ্গা পর্বতের শিখরে উঠতে যদিও কিঞ্চিৎ বেগ পেতে হয়েছিল।

কৃষ্ণ বাজার।

কিষ্কিন্ধ্যা পর্বতমালার গায়ে কোনও সিঁড়ি নেই, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে পা রেখে এগিয়ে যেতে হয়। বেশ কিছুটা ওঠার পরে দেখা যায় শ্রী মাতঙ্গা বীরভদ্র মন্দির। এই মন্দিরে বীরভদ্ররূপে মহাদেব আজও পূজিত হন। দিনে একবার বাইরে থেকে পুরোহিত এসে পুজো করে যান। আর এই মন্দিরকে বাঁদিকে রেখে একটু এগিয়ে গেলেই সূর্যোদয় স্পট। সারারাতের বাস জার্নি ও মাতঙ্গা পর্বতে ওঠার ক্লান্তি একনিমেষে শেষ হয়ে যায় এখানে এলে। সূর্যদেব যেন অপেক্ষায় থাকেন বিশ্বচরাচরকে আলোকিত করার জন্য। ধীরে ধীরে যখন সূর্য উদয় হয় সেই রূপ বর্ণনা করা আমার পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু এটুকু বলতে পারি সেই দিনের সেই ভোর ও সকাল হওয়ার মুহূর্ত আজীবন স্মৃতির পাতায় থেকে যাবে। ভিউ হয়তো ক্যামেরাবন্দি করা যায়, কিন্তু মুহূর্ত? নাহ মুহূর্তকে বন্দি করা যায় শুধু মনের মণিকোঠায়। সূর্যোদয় দেখতে গিয়ে সেদিন জীবনে প্রথম বিশ্বাস হল যে, সত্যি সপ্তাশ্বের রথে চড়ে বিশ্ব চরাচর চরে বেড়ান আদিত্য। তবে আমার এই থমকে যাওয়া এখানেই শেষ না, দুদিনের হাম্পি ট্রিপের পুরোটাই ছিল বারংবার বিহ্বল হওয়ার মুহূর্ত।

কৃষ্ণ মন্দির।

সূর্যোদয় দেখে ফিরে দিনের বেলা হোমস্টের আতিথ্যে কাটিয়ে, দুপুরে খেয়েদেয়ে আমার সারথি পরশুরামের সঙ্গে বেরলাম হাম্পির বাইরের কিছু জায়গা দেখতে। বাইরে বলতে তুঙ্গভদ্রার অন্য পাড়ে। যেদিকে আছে পম্পা সরোবর, আছে বিজয়নগরের মূল রাজধানী, আছে মহাকাব্যের মহাবীর হনুমানের জন্মস্থান।

৩

নদীর ওপারে আমাদের প্রথম গন্তব্য ‘হানিগুন্দি’ যা কিনা ছিল বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজধানী। এবং আছে ‘গগনাপ্যালেস’ (স্থানীয় উচ্চারণ), যা উৎসবের সময় রাজারা ব্যাবহার করতেন। ছোট্ট এই প্রাসাদের ভেতরে এখন ঢোকা যায় না, সংস্কার কার্য চলছে বলে। তবে এই প্রাসাদের ভেতর দিয়ে মূল প্রাসাদে যাওয়ার গুপ্তপথ ছিল বলে কথিত। উৎসবে গান-নাচ বা মল্লযুদ্ধের প্রদর্শন হত এই প্রাসাদের সামনেই।

বালি গুহা। এখানেই নাকি মায়াবী ও বালির যুদ্ধ হয়।

এই একই দিনের গন্তব্যে ছিল ‘বালিকেল্লা’, ‘বালি গুহা’, ‘অঞ্জনেরি’, ‘শবরী গুহা’। কথিত এই বালিকেল্লাতে আজও বিজয়নগর সাম্রাজ্যের গুপ্তধন গুপ্ত অবস্থায় সুরক্ষিত। যদিও বালিকেল্লা প্রবেশের আগে আপনাকে দেবী দুর্গার মন্দির পেরিয়ে যেতে হবে। দেবী এখানে সিংহবাহিনীরূপেই পূজিতা।

এর পরের গন্তব্য অঞ্জনেরি যা হনুমানের জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত। এই রাস্তায় পড়বে বালি গুহা। বালি গুহাই রামায়ণের সেই বিখ্যাত জায়গা যেখানে নাকি মায়াবী ও বালির যুদ্ধ হয় ও সুগ্রীব বালি হত হয়েছেন ভেবে সেই গুহার দরজা বন্ধ করে দিয়ে আসেন। এই গুহায় অবশ্য যাওয়া যায় না। তবে গুহার গায়ে সেই যুদ্ধের মোটিফ দেখা যায়।

বালি গুহার গায়ে যুদ্ধের মোটিফ।

এর মধ্যে শবরী গুহা ও পম্পা সরোবরও যাওয়া হল। কথিত, এখানেই রামচন্দ্রের সঙ্গে তপস্বী শবরীর সাক্ষাৎ হয়।

এর পরে অঞ্জনেরি। এই পাহাড়টি বেশ উঁচু। এখানে প্রসাদ হিসাবে নারকেল দেওয়া হয়। পাহাড় চূড়ার মন্দিরে পৌঁছানোর জন্য সিঁড়ি, শেড, বসার জায়গা ও পানীয়জলের ব্যবস্থা আছে। কারণ তা না হলে এই মন্দির পর্যন্ত পৌঁছাতে বেগ পেতে হত বিস্তর। দীর্ঘ সিঁড়ি ভাঙার পরে মন্দির (কথিত আছে, এখানেই হনুমানের জন্ম হয়)। ছোট্ট এই মন্দিরটি খুব পরিষ্কার-পরিছন্ন। পুজো বলতে আপনার ইচ্ছেমত দক্ষিণা ও প্রসাদের প্যাকেটে যা থাকে সব পুরোহিতকে দিয়ে দিতে হয়, শুধু নারকেল ভেঙে দেওয়ার জন্য মন্দিরের বাইরে একটি নির্দিষ্ট জায়গা আছে।

অঞ্জনেরি। কথিত আছে, এখানেই হনুমানের জন্ম হয়।

এই পাহাড় চূড়াও হাম্পির সূর্যাস্ত দেখার চারটি স্পটের একটি। বাকি দুটি স্পটের একটি মাতঙ্গা হিল ও অন্যটি মাল্যবন্ত পর্বত (দুই জায়গাই একইসঙ্গে সূর্যোদয় দেখার জন্যও বিখ্যাত) এবং চতুর্থ স্পট হল বিরুপাক্ষ মন্দির। যদিও আমি দিনেদুপুরে যাওয়ায় অঞ্জনেরি থেকে সূর্যাস্ত দেখতে পারিনি। তবে এখান থেকে দেখেছি দূরে রূপালি রেখার ন্যায় তুঙ্গভদ্রাকে, চারিদিকের কিষ্কিন্ধ্যা পর্বতমালাকে।

অঞ্জনেরি থেকে।

পরের গন্তব্য মাল্যবন্ত রঘুনাথ মন্দির। পূর্বমুখী এই মন্দিরটির গাত্র-কারুকার্য ও স্ট্রাকচার আর পাঁচটা বিজয়নগর সাম্রাজ্যের স্থাপত্যের মতই। এই মন্দিরটি ষোড়শ শতকে তৈরি। এবং লোককথা অনুসারে এখানেই প্রথমবার দেখা হয় রাম-হনুমানের। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে, তারও আগে বনবাসকালে এখানেই নাকি রামচন্দ্র পিতৃবিয়োগের কথা অনুভব করেন এবং পিতৃতর্পণ করেন। তবে রুক্ষ কিষ্কিন্ধ্যায় জল না থাকায় রামচন্দ্র ও লক্ষ্মণ তির দিয়ে পাথর ভেদ করে জল আনেন ও সেখানেই ২৪টি শিবলিঙ্গ স্থাপনা করে পুজো করেন। সেই জায়গাটি বর্তমানে আছে এবং সেখানে পাথরের মধ্যে ক্ষীণ জলের স্রোত দেখা যায় আর সঙ্গে শিবলিঙ্গ ও নন্দীর মোটিফ দেখা যায়। তবে সেইসব প্রথমেই না।

মাল্যবন্ত রঘুনাথ মন্দির।

মন্দিরের প্রথমে দেখা যাবে রাম-লক্ষণ ও সীতার মূর্তি, সেখানে আজও চব্বিশ ঘণ্টা রামায়ণ পাঠ চলে। এখানে রামমূর্তির বৈশিষ্ট্য এই যে, রাম-লক্ষ্মণের মূর্তি এখানে বসা অবস্থায় দেখা যায়। পাশে আছে হনুমান মন্দিরও। মন্দির থেকে বেরিয়ে পেছনের দিকে গেলেই সেই জলের স্রোত দেখা যায়। আর এখানে আর একটি শিব মন্দির আছে, যেখানে আপনি ইচ্ছে হলে নিজে পুজো দিতে পারেন। আর সঙ্গে ২৪টি শিবলিঙ্গের অনতিদূরে শ্বেত শিবলিঙ্গও দেখার মত।

মাল্যবন্ত রঘুনাথ মন্দির।

মাল্যবন্ত পর্বতের এই শেষ প্রান্তটিই হচ্ছে সূর্যাস্ত দেখার জায়গা। সকালের সূর্যোদয় যেমন আমায় বিশ্বাস করিয়েছিল আদিত্য সপ্তাশ্ব রথে চেপে বিশ্বজুড়ে আলো দেন, সন্ধ্যা নামার প্রাক্‌মুহূর্ত আমায় বিশ্বাস করাল যে, ঠিক এইখানেই মহাকাব্যিক রাম ও হনুমানের দেখা অবশ্যই হয়েছিল।

মাল্যবন্ত রঘুনাথ মন্দিরের সেই জলাধার।

৪

পরের দিন সকাল থেকে শুরু আমার বিজয়নগর সাম্রাজ্য পরিদর্শন। পনেরোশো শতকের ভারতবর্ষে যে ক’টি সমৃদ্ধ নগরী ছিল তার মধ্যে অন্যতম এই বিজয়নগর। তবে বিজয়নগর সাম্রাজ্য পরিদর্শনের আগে হাম্পির বিরূপাক্ষ মন্দির একবার ভাল করে ঘুরে নেওয়া ভাল। এই মন্দিরে আজও নিত্য পুজো হয়। সকাল ছ’টা থেকে রাত ছটা সাড়ে ছটা পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে। মন্দিরে বিরূপাক্ষ মহাদেবের সঙ্গে দেবী দুর্গার দুই রূপও পূজিতা হন। এখানকার কারুকার্য বিজয়নগর সাম্রাজ্যের মন্দির গাত্রের কারুকার্যের মতই। এই মন্দিরে বর্তমানে একটি হাতিই আছে যার নাম লক্ষ্মী। শান্ত লক্ষ্মীর সঙ্গে আলাপ-পরিচয় পর্বটিও বেশ মনোরম।

বিরূপাক্ষ মন্দির।

হাম্পি বা বলা ভাল বিজয়নগরে ছিল মূল পাঁচটি বাজার। প্রথম বাজারের নাম ‘বিরূপাক্ষ’ বাজার, যা মন্দিরের সামনেই অবস্থিত। এই বাজারটি ছিল মূলত জুয়েলারি বাজার, যা সারা সপ্তাহই খোলা থাকত। বাজারের পাথরের স্ট্রাকচার আজও বর্তমান। বর্তমান হাম্পির ছোট্ট বাজারও এই অঞ্চলেই বসে, তবে তা নেহাতই একবিংশ শতকের দক্ষিণ ভারতীয় এক বাজার, সেখানে জুয়েলারি খুঁজে না পেলেও কল্পনার সাম্রাজ্যে রত্নখচিত সেই পুরাতন বাজারকে চিনে নিতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। এছাড়া আছে ‘কৃষ্ণ বাজার’। সেই বাজারে সব্জি ও মশলাপাতি বিক্রি হত। এই বাজারের উল্টো দিকেই কৃষ্ণ মন্দির, যে মন্দিরের গায়ে বিষ্ণুর কল্কি অবতারের অবয়ব অঙ্কিত আছে। তৃতীয় বাজার মাতঙ্গা হিলের পাশে অবস্থিত ‘সুলে বাজার’। সুলে অর্থে স্লেভ, এই বাজারে মূলত দাস কেনাবেচা হত। চতুর্থ বাজার ‘হাজারি রামা বাজার’, যেখানে তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি হত। পঞ্চম ও শেষ বাজার হল ‘বিজয় বিট্‌ঠল’ বাজার। যা বিজয় বিট্‌ঠল মন্দিরের সামনে অবস্থিত। সেই বাজারে বিক্রি হত হাতি-ঘোড়া-শিকারি কুকুর সহ বিভিন্ন পশু-পাখি। এর মধ্যে সুলে বাজার, বিরূপাক্ষ বাজার ও বিজয় বিট্‌ঠল বাজার প্রতিদিন খোলা থাকত। বাকি দুই বাজার সপ্তাহে তিনদিন খোলা থাকত।

বিরূপাক্ষ বাজার।

প্রতিটি বাজারের বৈশিষ্ট্য এই, বাজারগুলিতে বড় বড় জলাশয় ছিল তবে এইসব জলাশয় বাজারের পানীয়জলের জন্যই ছিল। শুধু মন্দিরের উৎসবের সময়ে এই জলাশয়গুলিতে বিশেষ পুজো হত।

বিরূপাক্ষ মন্দির।

হাম্পির প্রতিটি সৌধ ও মন্দিরের কথা বলতে গেলে সেগুলির বিষয়ে আলাদা আলাদা করে না বললেই নয়। তবে তাতে এই লেখনী অতি লেখায় দুষ্ট হবে। ইচ্ছে আছে কখনও প্রতিটি জায়গা নিয়ে আলাদা করে লেখার। তবে হ্যাঁ, কিছু স্থাপত্যের কথা না বললেই নয়। তার মধ্যে অন্যতম হাজারি রামা মন্দির। এই মন্দিরগাত্র রামায়ণ চিত্রিত। এই মন্দিরে আছে কালো পাথরের চারটি পিলার এই পিলার আনা হয়েছিল বাইরে থেকে।

হাজারি রামা বাজার।

এছাড়া আছে রানিদের গ্রীষ্মকালীন আবাস, পুরাতন ভগ্ন রাজপ্রাসাদ। আছে পাতাল শিবমন্দির। আর অবশ্যই বলতে হয় বিজয় বিট্‌ঠল মন্দিরের কথা। এই মন্দিরেই একমাত্র পাথরের তৈরি রথ দেখা যায়। অন্যান্য সব মন্দিরের রথ কাঠের। এই মন্দিরের থেকে অনতিদূরে অবস্থিত তুঙ্গভদ্রা।

ভগ্ন রাজপ্রাসাদ।

সব শেষে বিরূপাক্ষ মন্দির থেকে দেখা সূর্যাস্তের কথা না বললে হাম্পি দর্শন বিষয়ে বলা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে আর সঙ্গে বলতেই হয় ‘হেমকুন্তা’-র কথা। কথিত, দেবী সতীর মৃত্যুর পরে দেবাদিদেব মহাদেব এই হাম্পিতেই কঠোর তপস্যায় রত ছিলেন। সমস্ত দেবকুলের চিন্তা নিবারণের জন্য যখন মদনদেব (কামদেব) মহাদেবের ওপর নিজ বাণ বর্ষণ করেন, তখন মহাদেবের তৃতীয় নেত্র ক্রোধে উন্মোচিত হয় ও মদনদেবকে ভস্মীভূত করেন এই ‘হেমকুন্তা’-তেই।

হেমকুন্তা থেকে সূর্যাস্ত।

৫

শুরুতেই বলেছিলাম তুঙ্গভদ্রার কথা। শেষে যদি তাকে ছুঁয়ে না যাই তবে আমার এই ভ্রমণকাহিনি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তুঙ্গভদ্রার যে রুদ্ররূপের কথা পড়া সেই রূপ না দেখতে পেলেও তাকে অনুভব করতে কোনও অসুবিধা হয়নি। আর সবচেয়ে ভাল আমার হোমস্টের ছাদ থেকে এক দিকে বিরূপাক্ষ মন্দির ও অন্য দিকে তুঙ্গভদ্রা, যাকে না ছুঁয়ে থাকা যায় না।

তুঙ্গভদ্রা তীরে।

দ্বিতীয় দিন রাতে হাম্পিকে বিদায় জানিয়ে আসার সময়ে গহন আঁধারে মনে হল বিজয়নগর সাম্রাজ্য আমায় যে সম্পদে পূর্ণ করল, আজীবন সে অতুলনীয় সম্পদ হয়ে থেকে যাবে।

কভার: হেমকুন্তা থেকে বিরূপাক্ষ মন্দির।

চিত্র: লেখক

2 Responses

  1. আরেকবার হাম্পি যাওয়ার ইচ্ছেকে উসকে দিলেন লেখা ও ছবির মাধ্যমে। ধন্যবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two + 2 =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »