Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

দক্ষিণী কবিদের কৃষ্ণপ্রেম

কর্নাটকের হৈসল প্রাচীন মন্দিরের সূক্ষ্ম ভাস্কর্যে কৃষ্ণও রয়েছেন। এই হৈসল মন্দির থেকে শুরু করে মহাবলিপুরমের গুহা পর্যন্ত হিন্দু পুরাণের অন্যতম ‘রোমান্টিক’ দেবতা যেভাবে দক্ষিণ ভারতকে মুগ্ধ করেছেন, তা কিন্তু অদেখা রয়ে যাওয়া অসম্ভব। ভুলে গেলে চলবে না ভক্তি আন্দোলনের শিকড় ভারতের তামিলভাষী অঞ্চলেই। এখানেই রচিত হয়েছিল বিখ্যাত শ্রীমদ্ভাগবতম। শঙ্করাচার্য, শ্রী রামানুচার্য এবং মধ্বাচার্যও দক্ষিণ ভারতেরই। আলওয়ারের সাধুরা কৃষ্ণের প্রশংসায় রচনা করেছিলেন অসাধারণ সমস্ত চরণ। কবি আণ্ডালের (অপর নাম গোডাদেবী, নচিয়ার ও কোতাই) ‘তিরুপ্পাভাই’ আজও প্রতিটি বৈষ্ণব মন্দিরে গাওয়া হয়। যদিও এরজন্য ধন্যবাদপ্রাপ্ত দক্ষিণ ভারতের মানুষরাই। তাঁরাই দক্ষিণের রাজ্যজুড়ে সঙ্গীত, নৃত্য এবং নাটকের মাধ্যমে সংস্কৃতির এই দিকটাকে জীবিত রেখে দিয়েছেন। অতি আধুনিকতার দোহাই দিয়ে তাঁরা তাঁদের সংস্কৃতির ইতিহাসকে দূরে ঠেলে দেননি। দক্ষিণের বেশ কিছু বিশিষ্ট কবি ও দার্শনিক, বিশেষ করে তেলেগু বংশোদ্ভূত যেমন বল্লভাচার্য, রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামী, গোপাল ভট্ট উত্তরে চলে এসে সমগ্র অঞ্চলে পুষ্টিমার্গী ও বৈষ্ণব শিক্ষা ছড়িয়ে দেন।

মহাবলিপুরমের গুহার ভাস্কর্যে কৃষ্ণ।

কর্নাটকে বৈষ্ণবধর্মের প্রসারের জন্য কবি ও লেখকদের অনেক সম্প্রদায়ের ভূমিকা রয়েছে। মধ্বাচার্যের অনুসারীরা, যাঁরা দ্বৈত বেদান্ত বা বিম্বপ্রতিবিম্ববাদের প্রস্তাবক, এই অঞ্চলজুড়ে একাধিক মঠ স্থাপন করেছিলেন তাঁরা। এই চিন্তাধারার মধ্যেই বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের গুরু ব্যাসতীর্থ দীক্ষা দিয়েছিলেন শ্রীনিবাস নায়ককে (১৪৮৪-১৫৬৪)। তিনি যে সন্ন্যাসী প্রথা অনুসরণ করেছিলেন, সেই অনুসারে তাঁর নামকরণ করা হয়েছিল পুরন্দর দাসা। কৃষ্ণের ভক্তিতে তিনি চার লক্ষ পঁচাত্তর হাজারেরও বেশি পদ ও গান রচনা করেছেন। একে অসাধ্য সাধনও বলা যেতে পারে। কন্নড় এবং সংস্কৃত ভাষায় লেখা কয়েকশো গান আজও টিকে আছে। গানগুলি গাওয়া হয় বিভিন্ন সংগীতানুষ্ঠানে। কর্নাটকী সঙ্গীতের ‘পিতামহ’ হিসাবে সমাদৃত তিনি। মিয়া তানসেনের শিক্ষক স্বামী হরিদাসের ছাত্র হওয়ার কথা ছিল পুরন্দর দাসার। তাই তিনি উত্তর ভারতেও শ্রদ্ধেয়। ২০ শতকে তাঁর গান হিন্দুস্তানি এবং কর্নাটকী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত উভয় ক্ষেত্রেই সমান জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পণ্ডিত ভীমসেন যোশির মত হিন্দুস্থানি কিংবদন্তিরা তাঁর সৃষ্টি গেয়েছিলেন। এম এস সুব্বলক্ষ্মীর মত কর্নাটকী সঙ্গীতজ্ঞরা তাঁদের নিজ নিজ ঘরানায় পুরন্দরের গান জনপ্রিয় করেছিলেন।

শ্রীনিবাস নায়ক (১৪৮৪-১৫৬৪)।

কেরালায় কৃষ্ণের সবচেয়ে বিখ্যাত মন্দির গুরুভায়ুর মন্দির। মন্দিরটিকে বলা হয় ‘ভূলোক বৈকুণ্ঠ’ বা মর্ত্যস্থিত বৈকুণ্ঠও। এই মন্দিরে শ্রীকৃষ্ণের যে মূর্তি পুজো হয় তা চতুর্ভুজ। তাঁর চার হাতে পাঞ্চজন্য শঙ্খ, সুদর্শন চক্র, কৌমোদকী গদা ও পদ্ম। কৃষ্ণ অবতার গ্রহণের সময় বাসুদেব ও দেবকীর কাছে প্রকাশিত মহাবিষ্ণুর প্রতীক একটি দিব্য তুলসী মালা দেবতার গলদেশে লম্বমান। এই কারণে এই মন্দিরটিকে দক্ষিণ ভারতের দ্বারকা বলা হয়। শ্রীকৃষ্ণও এখানে নানা নামে পরিচিত। যেমন— কান্নান, উন্নি-কান্নান (শিশু কৃষ্ণ), উন্নি-কৃষ্ণন, বালকৃষ্ণন ও গুরুভায়ুরাপ্পান। বিষয় হল, গুরুভায়ুর মন্দির কবি মেলপাথুর নারায়ণ ভট্টাথির (১৫৫৮-১৬৪৩) সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি বিখ্যাত মহাকাব্য ‘নারায়ণিয়াম’ লিখেছিলেন। নাম্বুদ্রি ব্রাহ্মণদের একটি পরিবারে জন্মগ্রহণকারী ভট্টাথির ছিলেন গণিত ও যুক্তিবিদ্যা এবং তর্ক ও ব্যাকারণে বিশেষজ্ঞ। কৃষ্ণভক্তিই তাঁকে দিয়ে ‘নারায়ণীয়ম’-এর ১০৩৬টি সংস্কৃত শ্লোক লিখিয়ে নিয়েছিল। এই ‘ম্যারাথন’ কবিতা রচনা করার সময় তাঁর বয়স তিরিশ বছরও হয়নি। এটাই তাঁর পাণ্ডিত্যের প্রতিভা। যদিও তিনি কেরালার প্রথম কবি নন, যিনি কৃষ্ণভক্তিকে এত আবেগপূর্ণভাবে পরিচালিত করেন। তাঁর বহু শতাব্দী আগে, দ্বাদশ শতাব্দীর কবি বিল্ব মঙ্গলা ‘শ্রীকৃষ্ণ কর্ণামৃতম্’ রচনা করেছিলেন। তিনিও উত্তরে চলে আসেন। বাকি জীবন বৃন্দাবনের উপকণ্ঠেই কাটিয়ে দেন। ২০ শতকে চেম্বাই বৈদ্যনাথ ভাগবতার এবং তাঁর ছাত্ররা ‘নারায়ণিয়াম’-এর গানগুলি গেয়ে কর্নাটকী সঙ্গীতে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন।

মেলপাথুর নারায়ণ ভট্টাথির (১৫৫৮-১৬৪৩)।

ভেঙ্কট সুব্রহ্মণ্যম (১৭০০- ১৭৬৫) তামিলনাড়ুর তাঞ্জাভুর জেলার পাপানাসাম তালুকে এক স্মার্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জায়গাটি একটি সমৃদ্ধশালী ভাগবত মেলা নৃত্য-নাট্য ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত। এখানকার কৃষ্ণের প্রাচীন মন্দিরটি ‘কলিঙ্গ নর্তানা’ নামে পূজা করা হয়। মন্দিরের ইতিহাস বলে, ভিতরে পূজিত মূর্তিটি ‘স্বয়ম্ভু’ বা স্বয়ং উৎপন্ন। প্রাচীন এই মন্দিরকে বেষ্টিত করে থাকে শহর, সঙ্গীতজ্ঞ এবং মহান পণ্ডিতরা। এই ভেঙ্কট সুব্রহ্মণ্যম শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তাঁর ভক্তিতে অসংখ্য গান রচনা করেন। বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি তামিল ও সংস্কৃত উভয় ভাষায় পাঁচ শতাধিক সঙ্গীত রচনা করেছেন, যার মধ্যে কয়েকটি অবশিষ্ট। উথুকাডু গ্রামে বসতি স্থাপনের পর তিনি উথুকাডু ভেঙ্কট সুব্বাইয়ের এবং উথুকাডু ভেঙ্কটা কবি নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। কবিতা ও গান ছাড়াও তিনি ভজনও রচনা করেন। বিশ শতকে নীদামঙ্গলম কৃষ্ণমূর্তি ভাগবতার তাঁকে আধুনিক কর্নাটকী সঙ্গীতে দীক্ষিত করেন। সাম্প্রতিক সময়ে চিত্রবীণা এবং গোটুবাদ্যম শিল্পী রবি কিরণ উথুকাডু কবির কাজ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে একটি অসাধারণ কাজ করেছেন। কর্নাটকী কণ্ঠশিল্পী অরুণাসাইরাম তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত ‘কলিঙ্গ নর্তানা থিল্লানা’ জনপ্রিয় করেছেন।

Advertisement
ভেঙ্কট সুব্রহ্মণ্যম (১৭০০- ১৭৬৫)।

এগুলি ছাড়াও আরও কয়েকজন, যেমন নারায়ণ তীর্থ (১৬৫০-১৭৪৫), অন্ধ্রের কারভেরিনগরমের সারঙ্গপানি (১৭ শতক), কর্নাটকের কনকদাসা (১৫০৯-১৬০৯) প্রমুখ কৃষ্ণভক্তিতে পদ এবং গান রচনা করেছেন। ভরতনাট্যম, কুচিপুড়ি, মণিপুরী এবং যক্ষগণ-এর মত কর্নাটকী সঙ্গীত এবং নৃত্যের প্রসারের জন্য তাঁদের একটি বড় অংশ একটি ‘জীবন্ত ঐতিহ্য’ হিসাবে রয়ে গিয়েছেন। যদিও এই গানগুলির বেশিরভাগই স্থানীয় ভাষা এবং আঞ্চলিক উপভাষায়। ভারতের একটি বৃহৎ অংশে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারেনি। তার অন্যতম কারণ হিসাবে হিন্দিভাষার আধিপত্যের কথা বলা যেতে পারে। তবে একটা কথা, কৃষ্ণ অনুরাগে দক্ষিণ ভারত কিন্তু কোনও অংশে কম নয় উত্তর ভারতের চেয়ে।

তথ্যঋণ: ফোর এনসিয়েন্ট পোয়েটস অফ ডিফারেন্ট সাউথ ইন্ডিয়ান লাঙ্গুয়েজেস হু ইমমর্টালাইসড লর্ড কৃষ্ণা – বিজয় সাই

চিত্র: গুগল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

six + nine =

Recent Posts

মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বুদ্ধদেব বসু: কালে কালান্তরে

বুদ্ধদেব বসুর অন্যতম অবদান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য (Comparative Literature) বিষয়টির প্রবর্তন। সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়-মানে এ বিষয়ে পড়ানোর সূচনা তাঁর মাধ্যমেই হয়েছিল। এর ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। এর ফলে তিনি যে বেশ কয়েকজন সার্থক আন্তর্জাতিক সাহিত্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যিক তৈরি করেছিলেন তা-ই নয়, বিশ্বসাহিত্যের বহু ধ্রুপদী রচনা বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলা অনুবাদসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অনুবাদকদের মধ্যে কয়েকজন হলেন নবনীতা দেবসেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবীর রায়চৌধুরী প্রমুখ। এবং স্বয়ং বুদ্ধদেব।

Read More »
দেবময় ঘোষ

দেবময় ঘোষের ছোটগল্প

দরজায় আটকানো কাগজটার থেকে চোখ সরিয়ে নিল বিজয়া। ওসব আইনের বুলি তার মুখস্থ। নতুন করে আর শেখার কিছু নেই। এরপর, লিফটের দিকে না গিয়ে সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে উঠে বসল গাড়িতে। চোখের সামনে পরপর ভেসে উঠছে স্মৃতির জলছবি। নিজের সুখের ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ‘ডিফল্ট ইএমআই’-এর নোটিস পড়তে মনের জোর চাই। অনেক কষ্ট করে সে দৃশ্য দেখে নিচে নেমে আসতে হল বিজয়াকে।

Read More »
সব্যসাচী সরকার

তালিবানি কবিতাগুচ্ছ

তালিবান। জঙ্গিগোষ্ঠী বলেই দুনিয়াজোড়া ডাক। আফগানিস্তানের ঊষর মরুভূমি, সশস্ত্র যোদ্ধা চলেছে হননের উদ্দেশ্যে। মানে, স্বাধীন হতে… দিনান্তে তাঁদের কেউ কেউ কবিতা লিখতেন। ২০১২ সালে লন্ডনের প্রকাশনা C. Hurst & Co Publishers Ltd প্রথম সংকলন প্রকাশ করে ‘Poetry of the Taliban’। সেই সম্ভার থেকে নির্বাচিত তিনটি কবিতার অনুবাদ।

Read More »
নিখিল চিত্রকর

নিখিল চিত্রকরের কবিতাগুচ্ছ

দূর পাহাড়ের গায়ে ডানা মেলে/ বসে আছে একটুকরো মেঘ। বৈরাগী প্রজাপতি।/ সন্ন্যাস-মৌনতা ভেঙে যে পাহাড় একদিন/ অশ্রাব্য-মুখর হবে, ছল-কোলাহলে ভেসে যাবে তার/ ভার্জিন-ফুলগোছা, হয়তো বা কোনও খরস্রোতা/ শুকিয়ে শুকিয়ে হবে কাঠ,/ অনভিপ্রেত প্রত্যয়-অসদ্গতি!

Read More »
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

নগর জীবন ছবির মতন হয়তো

আরও উপযুক্ত, আরও আরও সাশ্রয়ী, এসবের টানে প্রযুক্তি গবেষণা এগিয়ে চলে। সময়ের উদ্বর্তনে পুরনো সে-সব আলোর অনেকেই আজ আর নেই। নিয়ন আলো কিন্তু যাই যাই করে আজও পুরোপুরি যেতে পারেনি। এই এলইডি আলোর দাপটের সময়কালেও।

Read More »