Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

একাঙ্ক নাটক: দুঃশলা-জননী

মূল কথা: অনুপম সৌরীশ সরকার
নাট্যরূপ: সুব্রত নাগ

চরিত্র

ধৃতরাষ্ট্র

দুর্যোধন

শকুনি

সঞ্জয়

গান্ধারী

দুঃশলা

দাসী

 

[গান্ধারী ও ধৃতরাষ্ট্রের বিশ্রামকক্ষ। কক্ষটি প্রায় অন্ধকার। খুব মৃদু আলো মঞ্চে। গান্ধারী ও ধৃতরাষ্ট্রকে পাশাপাশি বসে থাকতে দেখা যায়। নেপথ্যে কিছু শোরগোলের আওয়াজ শোনা যায়।]

গান্ধারী।। ও কীসের গোলমাল শোনা যাচ্ছে আর্যপুত্র?

ধৃতরাষ্ট্র।। গোলমাল? গোলমাল কিছু নয়। আর কিছুক্ষণ পরেই রাজসভায় দ্যূতক্রীড়া শুরু হবে। তারই প্রস্তুতি চলছে। আগ্রহী দর্শকরা যাচ্ছে।

গান্ধারী।। [বিদ্রুপের সুরে] দ্যূতক্রীড়া! না ধ্বংসক্রীড়া!

ধৃতরাষ্ট্র।। কী বলছ তুমি?

গান্ধারী।। ভুল বলেছি কিছু?

ধৃতরাষ্ট্র।। আমি তো বুঝতে পারছি না তোমার কথা।

গান্ধারী।। বুঝতে পারছেন না, নাকি বুঝতে চাইছেন না?

ধৃতরাষ্ট্র।। দ্যূতক্রীড়া ধ্বংসক্রীড়া কেন হবে প্রিয়ে?

গান্ধারী।। নয়তো কি শান্তিক্রীড়া হবে বলে আপনি আশা করেন?

ধৃতরাষ্ট্র।। এই আশংকার কথা মাথায় আসছে কেন তোমার?

গান্ধারী।। মাথায় সেই আশংকার কথা আসাটাই তো স্বাভাবিক মহারাজ। ছলে, কৌশলে দ্যূতক্রীড়ায় জয়লাভ করার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন…

ধৃতরাষ্ট্র।। দাঁড়াও, দাঁড়াও মহারানি। ছল-কৌশলের কথা আসছে কেন? দ্যূতক্রীড়ায় যার নৈপুণ্য বেশি, সে-ই জয়লাভ করবে।

গান্ধারী।। নৈপুণ্য! অন্যায় পথে নৈপুণ্য প্রদর্শন করাকেই ছল বলে মহারাজ। আমার জ্যেষ্ঠপুত্র এবং আমার অগ্রজ শকুনি যখন দ্যূতক্রীড়ায় উপস্থিত থাকবেন— তখন ছল প্রদর্শন, প্রবঞ্চনার কি অভাব হবে? নিজপুত্র এবং সম্বন্ধীকে চেনেন না আপনি?

ধৃতরাষ্ট্র।। [আসন ছেড়ে উঠে পড়েন] চুপ করো গান্ধারী, চুপ করো। ছল, কৌশল, প্রবঞ্চনা— এই বিষাক্ত শব্দগুলি চিরকাল আমাকে তাড়া করে আসছে। চিরকাল আমি শুনে আসছি আমার প্রিয় পুত্র দুর্যোধন নাকি ঈর্ষান্বিত, প্রবঞ্চক। ছলনা করে সে ভীমকে হত্যার পরিকল্পনা করেছে; বারনাবতে পাণ্ডব পরিবারকে জীবন্ত দগ্ধ করার নকশা রচনা করেছে। যত ছল, অন্যায় শুধু আমার পুত্ররাই করেছে— তাই না?

গান্ধারী।। আপনি অহেতুক উত্তেজিত হচ্ছেন।

ধৃতরাষ্ট্র।। অহেতুক! চিরকাল আমাকেও উপেক্ষা আর প্রবঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে গান্ধারী। অন্ধত্বের অজুহাতে হস্তিনাপুরের রাজসিংহাসন আমার কাছে অধরা থেকে গেছে। ভোগ করেছে পাণ্ডু— রাজমুকুট শোভা পেয়েছে তার মস্তকে। আর আমি শুধুই শ্রদ্ধাভাজন রাজ অগ্রজ! বলো গান্ধারী, তাতশ্রী অন্যায় করেননি?

গান্ধারী।। [আসন ছেড়ে ওঠেন] যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই তাতশ্রী ভীষ্ম আপনাকে সিংহাসনে না বসিয়ে অন্যায় করেছিলেন তাহলে সে পাপ তাঁর। মহাকালের কাছে তাঁকে কৈফিয়ৎ দিতে হবে। কিন্তু তাই বলে আপনি স্বয়ং আরও বড় একটা অন্যায় করে পূর্বেকার অন্যায়কে চাপা দিতে চাইছেন কেন? আপনি তো তাতশ্রীর চেয়েও বড় অন্যায়কারী।

ধৃতরাষ্ট্র।। আমি জন্মান্ধ বলে আমি নাকি সিংহাসন রক্ষা করতে অক্ষম ছিলাম। কিন্তু আমার দুর্যোধন তো অন্ধ নয়। যুধিষ্ঠির তার থেকে কোন দিক থেকে শ্রেষ্ঠ? শুধু বয়সে? আর কী তফাত রয়েছে?

গান্ধারী।। তফাত রয়েছে আর্যপুত্র। দুর্যোধন পাপান্ধ, যুধিষ্ঠির সত্যান্ধ। পাপান্ধের চাইতে সত্যান্ধ কি শ্রেয় নয়?

ধৃতরাষ্ট্র।। তুমি মাতা গান্ধারী। আপন সন্তানকে দোষারোপ করতে দ্বিধা হচ্ছে না তোমার?

গান্ধারী।। [বিদ্রুপের হাসি হেসে] মহারাজ, আপনি শুধু জন্মান্ধই নন, মোহান্ধও। তাই দুর্যোধনের একের পর এক পাপকার্যকে আপনি নীরব সমর্থন যুগিয়ে গেছেন।

[দুর্যোধন ও শকুনির প্রবেশ]

দুর্যোধন।। প্রণাম পিতাশ্রী, প্রণাম মাতাশ্রী।

শকুনি।। প্রণাম মহারাজ—

ধৃতরাষ্ট্র।। আশীর্বাদ করি বিজয়ী হও।

দুর্যোধন।। এ কি পিতাশ্রী! আপনার কক্ষ এমন অন্ধকার কেন? কোনও আলো নেই! দাসী— দাসী—

গান্ধারী।। দাসীকে ডাকছ কেন পুত্র?

দুর্যোধন।। আলো নিয়ে আসুক—

গান্ধারী।। কী হবে তাতে? আলো জ্বেলে আমাদের কী লাভ? আমরা উভয়েই তো চির অন্ধকারের বাসিন্দা।

দুর্যোধন।। কিন্তু তাই বলে রাজ অন্তঃপুর আলোহীন থাকবে? মামাশ্রী, সত্বর আলোর ব্যবস্থা করুন।

গান্ধারী।। [হাত তুলে] থাক পুত্র। তোমার মামাশ্রীকে নিরস্ত করো। প্রদীপের কিংবা মশালের আলো হয়তো এই কক্ষের অন্ধকার দূর করবে কিন্তু হস্তিনাপুরের অন্ধকার? তাকে দূর করবে কে?

শকুনি।। কী বলছ ভগ্নী গান্ধারী? এখন তো দিবাভাগ। হস্তিনাপুর রাজপ্রাসাদ সূর্যের উজ্জ্বল কিরণে ঝলমল করছে। অন্ধকার তো নেই কোথাও!

গান্ধারী।। ভ্রাতাশ্রী, যদি দুর্যোধন একথা উচ্চারণ করত, তাহলে আমি বলতাম তার অজ্ঞতা, বুদ্ধির অভাব। কিন্তু আপনার মত তীক্ষ্ম বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি যখন এই উক্তি করে, তখন আমার কী বলা উচিত বলুন তো?

ধৃতরাষ্ট্র।। আহ্ গান্ধারী; আবার কেন…

গান্ধারী।। শুধু দিবাভাগের আলোকরশ্মিই আপনাদের চোখে ধরা পড়ল! আর ভবিষ্যতের গাঢ় অন্ধকার নজর এড়িয়ে গেল! পাশা খেলার নামে যে অন্ধকারকে আপনারা আজ আহ্বান করছেন— শত সূর্যের ছটাও তাকে দূর করতে অক্ষম হবে।

দুর্যোধন।। এ আপনার অন্যায় অনুযোগ মাতাশ্রী।

গান্ধারী।। অন্যায় অনুযোগ না অহেতুক আশংকা— সে কথা মহাকাল স্থির করবে। তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ দ্যূতক্রীড়ার অঙ্গন যেন ভবিষ্যতের রণাঙ্গনে পরিণত না হয়।

শকুনি।। সে সম্বন্ধে তুমি নিশ্চিন্তে থাকো ভগ্নী। হস্তিনাপুরের পক্ষে অমঙ্গলকর কোনও কাজ আমরা করব না। [দুর্যোধনকে ইশারা করে] আমরা এখন প্রস্থান করি ভগ্নী। [ধৃতরাষ্ট্রকে] মহারাজ, আপনি সভাস্থলে কখন উপস্থিত হবেন?

ধৃতরাষ্ট্র।। এই তো, শীঘ্রই যাচ্ছি।

[দুর্যোধন ও শকুনি প্রস্থান করে।]

আর তো কোনও দুশ্চিন্তা নেই গান্ধারী। তোমার ভ্রাতাশ্রী তো অঙ্গীকার করে গেল।

গান্ধারী।। সেজন্যই তো দুশ্চিন্তা আরও প্রবল হচ্ছে মহারাজ। আমার ভ্রাতাকে আমার চাইতে অধিক আর কে জানে? আপনার কাছে আমার একটাই অনুরোধ মহারাজ— ক্ষুদ্র পিতৃধর্ম পালন করতে গিয়ে বৃহৎ রাজধর্মকে যেন জলাঞ্জলি দেবেন না। আপনি শুধু শতপুত্রের পিতা কিন্তু হাজার হাজার হস্তিনাপুরবাসীর মহারাজ। শুধু এইটুকু স্মরণ রাখবেন।

[সঞ্জয় এসে দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ায়।]

সঞ্জয়।। মহারাজের জয় হোক।

ধৃতরাষ্ট্র।। কে? ও সঞ্জয়— এসো, এসো—

সঞ্জয়।। [প্রবেশ করে] সভাস্থল প্রস্তুত মহারাজ। পাণ্ডব, কৌরব উভয়পক্ষই আপনার জন্য অপেক্ষমাণ।

ধৃতরাষ্ট্র।। চলো, আমিও প্রস্তুত। আসি গান্ধারী।

গান্ধারী।। মহারাজ, হস্তিনাপুরের ভবিষ্যৎ আপনার হাতে।

[ধৃতরাষ্ট্র মাথা নাড়েন। তারপর সঞ্জয়ের সঙ্গে প্রস্থান করেন।]

আর কিছুক্ষণ পরেই এক ইতিহাস রচিত হতে চলেছে। জানি না সেই ইতিহাসের সমাপ্তি কী হবে। দ্যূতক্রীড়ার ফলাফলের দিকে শুধু সভাকক্ষে উপস্থিত দর্শকমণ্ডলী নয়; সমগ্র আর্যাবর্ত অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রয়েছে। আজ দ্যূতক্রীড়ায় বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের উপস্থিতি ভীষণ প্রয়োজনীয় ছিল। বাসুদেব উপস্থিত থাকলে আমি অনেকটাই নিশ্চিন্ত বোধ করতাম। কোনও চরম পরিণতি বাসুদেবের উপস্থিতিতে সম্ভব হত না। কিন্তু এখন— [উঠে দাঁড়ান] প্রতীক্ষা… অসহায়ভাবে শুধু প্রতীক্ষা করে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই।

[দুঃশলার প্রবেশ]

দুঃশলা।। মাতাশ্রী—

গান্ধারী।। কে? দুঃশলা?

দুঃশলা।। হ্যাঁ। পিতাশ্রী কি চলে গেলেন?

গান্ধারী।। হ্যাঁ— এইমাত্র সঞ্জয়ের সঙ্গে সভাস্থলে গেলেন।

[গান্ধারী উঠতে যাচ্ছিলেন। দুঃশলা ধরে তাকে বসায়।]

জয়দ্রথও গেছে নিশ্চয়ই?

দুঃশলা।। হ্যাঁ— অনেকক্ষণ।

গান্ধারী।। তুই কিছু বলেছিস ওকে?

দুঃশলা।। কী বলব?

গান্ধারী।। দ্যূতক্রীড়ার ব্যাপারে। বুঝতেই তো পারছিস কী হতে চলেছে।

দুঃশলা।। তোমার কী মনে হয়? আমি বারণ করলে আমার স্বামী শুনবেন?

গান্ধারী।। কিন্তু শুনতে তো হবে। কারও না কারও কথা তো পাণ্ডব আর কৌরবদের শুনতে হবে। না হলে যে বড় অনর্থ বেধে যাবে।

দুঃশলা।। কী হবে মাতা? সত্যিই কি কুরুবংশ ধ্বংস হয়ে যাবে?

গান্ধারী।। জানি না— অনাগত ভবিষ্যতের জন্য একরাশ আতঙ্ক আমাকে প্রতিমুহূর্তে তাড়া করে।

দুঃশলা।। তুমি পিতাশ্রী কিংবা অগ্রজকে নিষেধ করোনি কেন?

গান্ধারী।। আমি? আমি নিষেধ করব?

দুঃশলা।। হ্যাঁ করবে। তুমি রাজমাতা— তোমার সেই অধিকার রয়েছে।

গান্ধারী।। অধিকার? কীসের অধিকার দুঃশলা? হস্তিনাপুর কখনও নারীকে সম্মান দেয়নি, স্বীকৃতিও দেয়নি।

দুঃশলা।। সাধারণ নারীকে হয়তো দেয়নি কিন্তু মহারানিকে? তাঁকেও দেয়নি?

গান্ধারী।। না, দেয়নি। কারণ মহারানিও তো আসলে নারীই।

দুঃশলা।। আশ্চর্য! মহারানি আর সাধারণ নারীর মধ্যে কোনও প্রভেদ নেই? এক্কেবারে নিখুঁত গণতন্ত্র!

গান্ধারী।। [হেসে] অবশ্যই। তবে এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কিন্তু নারী— সামাজিক দিক দিয়ে যত উচ্চপদেই থাকুক না কেন— তার কোনও গুরুত্ব নেই।

[সভাস্থল থেকে একটা হর্ষধ্বনি ভেসে এল। গান্ধারী ও দুঃশলা উৎকর্ণ হয়ে শুনতে চান।]

দুঃশলা।। দ্যূতক্রীড়া বোধহয় শুরু হয়ে গেল মাতা!

[দুর্যোধন ও ধৃতরাষ্ট্রের নামে জয়ধ্বনি ভেসে আসে।]

গান্ধারী।। [দীর্ঘশ্বাস ফেলে] ক্রীড়া নয় দুঃশলা— সর্বনাশের সূচনা হল। আমার অগ্রজ আর তোর অগ্রজ একধাপ করে জয়ের দিকে অগ্রসর হবে আর হস্তিনাপুর একধাপ করে বিনাশের দিকে এগিয়ে যাবে। কৃষ্ণ— বাসুদেব যদি আজ দ্যূতসভায় উপস্থিত থাকত!

দুঃশলা।। বাসুদেব উপস্থিত থাকলে মাতুল আর অগ্রজ জয়লাভ করতে পারত না।

গান্ধারী।। ওরা হয়তো পরাজিত হত কিন্তু বেঁচে যেত হস্তিনাপুর।

[দাসী ছুটে আসে]

দাসী।। মহারানি, মহারানি—

গান্ধারী।। কী হল? কী সংবাদ?

দাসী।। সংবাদ খুব শুভ মহারানি। রাজপুত্র দুর্যোধন আর মাতুল শকুনি দ্যূতক্রীড়ায় প্রথম পর্বে জয়লাভ করেছেন।

[দুঃশলা গান্ধারীর মুখের দিকে তাকায়]

গান্ধারী।। ঠিক আছে। তুমি এখন এসো— [দাসী চলে যাচ্ছিল] আর শোনো, পরের পর্বের ফলাফলের কথা শীঘ্র জানিয়ে যেয়ো।

[দাসী মাথা নেড়ে চলে যায়]

গান্ধারী।। সর্বনাশের পালা শুরু হয়ে গেল দুঃশলা।

দুঃশলা।। মাতা!

গান্ধারী।। কী অদ্ভুত ব্যাপার দ্যাখ দুঃশলা— পুত্রের বিজয় সংবাদে মাতৃহৃদয় আনন্দে, গর্বে উদ্বেল হওয়ার কথা— অথচ… অথচ আমার হৃদয় আশঙ্কায় কম্পিত হচ্ছে।

দুঃশলা।। একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করব মাতা?

গান্ধারী।। একটা কেন? একশোটা কর—

দুঃশলা।। মাতা, তোমার সন্তানভাগ্য যদি অন্যরকম হত?

গান্ধারী।। অন্যরকম হত মানে?

দুঃশলা।। যদি বিপরীত হত। যদি তোমার কন্যার সংখ্যা হত একশত আর পুত্রের সংখ্যা হত এক— তাহলে কি তুমি বেশি খুশি হতে?

[গান্ধারী থমকে যান। মুখে কিছু অভিব্যক্তি খেলা করে যায়]

বলো না মাতা, তুমি কি একপুত্র আর একশত কন্যাকে নিয়ে অধিক সন্তুষ্ট হতে?

গান্ধারী।। [এগিয়ে আসে দুঃশলার দিকে] জানতে চাস?

[দুঃশলা গান্ধারীর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। গান্ধারী দুঃশলার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।]

হতাম- অনেক, অনেক বেশি খুশি হতাম।

দুঃশলা।। সত্যি— সত্যি বলছ মাতা?

গান্ধারী।। হ্যাঁ দুঃশলা— জানিস তো, তোর মা কখনও মিথ্যা বলে না। যদি সত্যিই আমার সন্তানভাগ্য বিপরীত হত; যদি সত্যিই আমার গৃহপ্রাঙ্গণ একশত পুত্রের বদলে একশত শিশুকন্যার কলকাকলিতে মুখরিত হত— অস্ত্রের ঝনঝনির বদলে নূপুরের নিক্কন, সঙ্গীতের সুর, নৃত্যের তাল ভেসে আসত; তাহলে অনেক বেশি খুশি হতাম— অন্তত কৌরববংশ ধ্বংসের মুখ দেখত না।

দুঃশলা।। যদি সত্যিই আমার একশত ভ্রাতার বদলে একশত ভগ্নী হত—

গান্ধারী।। [ম্লান হেসে] হত না দুঃশলা; অন্তত অদ্যাবধি হয়নি। কুরুবংশের মত অভিজাত বংশে নারীদের খুশির দাম কে দেয়?

দুঃশলা।। দেয়নি?

গান্ধারী।। বোকা মেয়ে। তাই যদি দিত তবে দেবী গঙ্গার কোনও কন্যা নেই কেন? সত্যবতী, কুন্তী, অম্বা, অম্বিকা— প্রত্যেকে, প্রত্যেকেই পুত্রবতী। একের পর এক পুত্রসন্তান প্রসব করে গেছেন।

দুঃশলা।। সত্যি মাতা— কী আশ্চর্য!

গান্ধারী।। আশ্চর্য বলে আশ্চর্য! চিত্রাঙ্গদ, বিচিত্রবীর্য, ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু, পঞ্চপাণ্ডব, শত কৌরব— শুধু পুত্র, পুত্র আর পুত্র— শুধু পুরুষ, পুরুষ আর পুরুষ—

[গান্ধারী উত্তেজনায় হাঁফাচ্ছিলেন। দুঃশলা তাঁকে ধরে বসায়।]

কেন জানিস? কারণ হস্তিনাপুর রাজবংশের রাজারা— শুধু রাজারাই কেন, সমস্ত পুরুষরাই মনে করে ‘কৃচ্ছন্ত দুহিতা কিল’, মানে কন্যা নাকি কৃচ্ছস্বরূপ, কন্যা নাকি ক্লেশদায়ক, কন্যা নাকি অনিষ্টরূপী—

দুঃশলা।। কন্যার এত দোষ মাতা?

গান্ধারী।। কন্যার এত দোষ বলেই তো সে পরিত্যাজ্য। কন্যার জন্ম তাই আনন্দের নয়, গৌরবের নয়— তা ঘৃণার, তা বিরক্তির।

দুঃশলা।। আমরা— নারীরা, পুরুষদের কাছে এতটাই ব্রাত্য?

গান্ধারী।। পুরুষতন্ত্রের এই একটা ধারণাই নারীর অবস্থানের উপর পুরুষশক্তির নিষ্ঠুরতম পদাঘাত। পুরুষতন্ত্রের এই একটা মনোভাবই নারীর অধিকারের ওপর নিক্ষিপ্ত বিষাক্ততম প্রাণঘাতী বাণ। পুরুষতন্ত্রের এই একটা বিধানই নারীর সম্ভ্রম, সম্মানের উপর সবচেয়ে ঘৃণাবর্ষী অগ্নিশলাকা।

দুঃশলা।। আমাদের কি তাহলে কোনও মূল্যই নেই?

গান্ধারী।। নেই-ই তো। আর নেই বলেই তো জন্মাবার পর কন্যাসন্তানকে কণ্ঠরোধ করা হয়, খুন করা হয়।

দুঃশলা।। [আতঙ্কিত হয়ে] মাতা!

গান্ধারী।। অবাক হচ্ছিস! ভীত হচ্ছিস! সত্যি, সত্যি— ঘোর সত্যি। আর কাদের দিয়ে এই নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ডগুলো সংঘটিত হত জানিস?

দুঃশলা।। [ভয়ার্ত মুখে] কাদের দিয়ে?

গান্ধারী।। ধাত্রীদের দিয়ে। যারা নবজাতক কিংবা নবজাতিকাকে সুস্থভাবে পৃথিবীর আলো দেখাবার দায়িত্বে থাকত— তারা, তারাই লিপ্ত থাকত এই জঘন্য কাজে। প্রসবযন্ত্রণায় পূর্ণগর্ভিনী যখন কাতর, বিপর্যস্ত— ধাত্রী তখন অপেক্ষা করত— নবজাতক না নবজাতিকা— কে মাতৃগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসছে।

দুঃশলা।। যদি— যদি কন্যা জন্ম নিত?

গান্ধারী।। প্রসবের পরে সদ্য জননী যখন শ্রান্ত, ক্লান্ত— তখন ধাত্রী কন্যাসন্তানের কণ্ঠরোধ করে হত্যা করত। নবজাতিকার কান্নার আওয়াজ সূতিকাগারে ধ্বনিত হত না। নবজাতিকা চোখ মেলে পৃথিবীর আলো দেখতে পেত না। জননীকে জানানো হত সে মৃতবৎসা।

দুঃশলা।। আর পুত্রসন্তানের জন্ম হলে?

গান্ধারী।। [মলিন হেসে] আনন্দের বন্যা বয়ে যেত চারপাশে। শঙ্খনাদে, উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠত সূতিকাগার।

দুঃশলা।। তাহলে মাতা, একশত পুত্রের ভিড়ে আমি একা কন্যা হয়েও রক্ষা পেলাম কী করে? একশত পূর্ণিমার আলোর মধ্যে অমাবস্যার অন্ধকার হয়েও আমি পৃথিবীর আলো দেখলাম কীভাবে?

গান্ধারী।। কেন বেঁচে গেলি জানিস? তুই না বাঁচলে আমার নিজস্ব নারীধর্ম, জননীধর্ম মিথ্যা হয়ে যেত, অসম্পূর্ণ রয়ে যেত। দুঃশলা, তুই তো কেবলমাত্র তুই নোস— তুই যে এক প্রতিবাদের নাম। তোর জন্ম এক প্রতিবাদের জন্ম। তোর মাতা গান্ধারী সেই প্রতিবাদের সূতিকাগৃহ এবং এই গান্ধারী-ই সেই প্রতিবাদের রক্ষাকর্মী।

দুঃশলা।। তোমার কথাগুলো কেমন অন্যরকম লাগছে! অন্যরকম লাগছে তোমাকেও!

গান্ধারী।। যখন এই বংশে কন্যাসন্তানের জন্মদানকে কোনও নারী ভাবনাতে আনতেও ভয় পেত, তখন আমি সাহস সঞ্চয় করেছিলাম। আমার বুকে, আমার চেতনায় তিল তিল করে সেই সাহস জমিয়েছিলাম।

দুঃশলা।। [গান্ধারীর হাত দুটো ধরে] মাতা!

গান্ধারী।। সব বিপদের আশঙ্কাকে উপেক্ষা করে, সদ্যেজাত কন্যার হত্যা পরবর্তী শোকের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, একটি [দুঃশলার দুই কাঁধে হাত রাখে] অন্তত একটি কন্যার জননী আমায় হতেই হবে। নইলে আমার মাতৃত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

দুঃশলা।। তোমার ভয় করেনি?

গান্ধারী।। কী জানিস মা— নারী যদি চায়, তবে অনেক অসম্ভব সম্ভব হয়ে যায়। তাই আমার প্রসব করা ভ্রুণপিণ্ড কেটে একশত মাংসখণ্ড ঘৃতকুম্ভে প্রতিস্থাপন কালে আমার ধাত্রী আমারই পূর্বনির্দেশমত মাংসপিণ্ডটিকে ভাগ করল— না— একশত ভাগে নয়; একশত এক ভাগে। নারীতে নারীতে মিলন হল ভাবনায় আর উদরের নাড়িতে নাড়িতে সংঘটিত হল যোগাযোগ। একশত ভাগের তুলনায় একটি পিণ্ডাংশ আমার কাছে সবচেয়ে মহার্ঘ হয়ে উঠল— কারণ সেই পিণ্ডাংশ থেকে এক কন্যা— তোর জন্ম হল।

[দুঃশলা গান্ধারীর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে] কী করছিস? প্রণাম করছিস কেন?

দুঃশলা।। মাতা, তোমার সাহসকে প্রণাম।

গান্ধারী।। শুধু আমাকে নয়, প্রণাম জানাতে গেলে প্রণাম জানা তোর ধাত্রীমাতাকেও। নিজের হেনস্থার ভয়, সর্বোপরি মৃত্যুভয়কেও জয় করে সে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল। আমার আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়িত করার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল, জিতিয়ে দিয়েছিল আমার বহুদিনের সুপ্ত ইচ্ছাকে।

দুঃশলা।। আশ্চর্য! তার তো কোনও বিশেষ স্বার্থ ছিল না!

গান্ধারী।। না— অতিরিক্ত কিছুই পায়নি সে। আমার কী মনে হয় জানিস— আমার নিজস্ব প্রতিবাদ, ইচ্ছে হয়তো তার মনের গভীরেও সুরক্ষিত ছিল। আকাঙ্ক্ষার বীজ মনের কোন অতলে লুকিয়ে ছিল। হয়তো তারও মনে হয়েছিল ধাত্রী হিসাবে একবার, অন্তত একবার তার হাতে হস্তিনাপুরের কোনও রাজকন্যার জন্ম হোক। যে কঠিন আঙুলগুলো শিশুকন্যার কণ্ঠরোধে অভ্যস্ত ছিল, সেই আঙুলগুলো বোধহয় একবার অন্তত কোমল হয়ে একটি শিশুকন্যাকে পরিচর্যা করে তাকে কণ্ঠ ছেড়ে ক্রন্দনে সাহায্য করতে উৎসুক হয়েছিল।

দুঃশলা।। আমি নিজে একজন নারী হিসাবে বুঝতে পারছি মাতা— তোমার এই জয় কত বড়!

গান্ধারী।। জয়? হবেও বা। জানিস দুঃশলা, জীবনে কত কিছুই পারিনি। ভবিষ্যৎ বলবে গান্ধারী তার পতিদেবকে রাজ্যলোভের হাত থেকে মুক্ত করতে পারেনি; ভবিষ্যৎ বলবে গান্ধারী তার পুত্রদের ধর্মাশ্রয়ী করতে পারেনি।

দুঃশলা।। ভবিষ্যৎ কী বলল তাতে কী এসে যায়?

গান্ধারী।। এসে যায় দুঃশলা। আমরা যে ভবিষ্যতের কাছে দায়বদ্ধ। ভবিষ্যৎ হয়তো এও বলবে, গান্ধারী কুন্তীকে ঈর্ষা করে চরম অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারেনি। কিন্তু ভবিষ্যৎ এটাও বলবে, গান্ধারী পেরেছিল, গান্ধারীই পেরেছিল। বহুকাল ধরে ভরত বংশে চলে আসা কন্যা অবমাননার ইতিহাসকে বদলে দিয়ে এক কন্যাকে দিনের আলো দেখাতে— একা, একা [গান্ধারী নিজের বুকে আঙুলের টোকা দিয়ে] এই গান্ধারীই পেরেছিল।

দুঃশলা।। আমার অনেক সৌভাগ্য যে আমি তোমাকে জননী হিসেবে পেয়েছি।

গান্ধারী।। [বসে] দুঃশলা— আমি গান্ধারী, আমি সৌবলেয়ী, আমি ভরত বংশের বধূ, আমি ধৃতরাষ্ট্রপত্নী, আমি শতপুত্রের মাতা— তবু এগুলোর কোনওটাই আমার প্রকৃত পরিচয় নয়। আমি দুঃশলাজননী— এই আমার প্রকৃত পরিচয়। এই পরিচয়টুকুই আমার গভীরতম সুখের উৎসভূমি। আমি দুঃশলাজননী— এই পরিচয়টিই ছিনিয়ে এনেছে আমার পরমাকাঙ্ক্ষিত জয়। আমি দুঃশলাজননী— এই পরিচয়ের আলোতেই প্রতিদিন জন্ম নেয় আমার আকাশ, জন্ম নেয় নতুন নতুন আনন্দ। আমি দুঃশলাজননী— এই পরিচয়ের আলোতেই প্রতিদিন জন্ম নেয় আমার জীবন। মাতৃত্বের নবীন দীপ্তিতে আর পূর্ণতার অসীম অতল তৃপ্তিতে এই হোক আমার প্রথম আর শেষ পরিচয়।

[রাজসভা থেকে তুমুল হৈ-হুল্লোড়, চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ ভেসে আসে]

দুঃশলা।। কী ব্যাপার? দ্যূতসভায় এত গোলমাল কীসের?

গান্ধারী।। তাই তো! কোনও গণ্ডগোল হল কি? দাসী— দাসী—

[দাসী ছুটে আসে]

দাসী।। মহারানি, আনন্দ সংবাদ, আনন্দ সংবাদ। রাজপুত্র দুর্যোধন আর মাতুল শকুনি দ্যূতক্রীড়ায় জয়লাভ করেছেন। পাণ্ডবরা পরাজিত।

দুঃশলা।। কী বলছিস তুই?

দাসী।। হ্যাঁ রাজকুমারী। পাণ্ডবদের ধনরত্ন, সম্পত্তি, প্রাসাদ— সবকিছু কৌবরদের দখলে।

[গান্ধারী উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। ধপ করে বসে পড়েন।]

দুঃশলা।। কী হল মাতা?

গান্ধারী।। ওকে যেতে বল দুঃশলা।

দুঃশলা।। [দাসীর কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলে] তুই এখন আয়। দ্যূতসভার দিকে নজর রাখিস। এরপর কী হয় জানিয়ে যাস। যা এখন—

[দাসী প্রণাম করে চলে যায়]

দুঃশলা।। ও চলে গেছে মাতা।

গান্ধারী।। কী বলে গেল ও? পাণ্ডবদের সমস্ত সম্পত্তি কৌরবদের করায়ত্ত?

দুঃশলা।। তাই তো বলে গেল?

গান্ধারী।। আর কিছু নয়তো?

দুঃশলা।। আর কিছু মানে?

গান্ধারী।। দুর্যোধন বা অগ্রজ শকুনি পাণ্ডবদের অভিমান, আত্মসম্মান, মর্যাদা— এগুলোর দিকে হাত বাড়ায়নি তো?

দুঃশলা।। কী বলছ মাতা?

গান্ধারী।। দুঃশলা, [নিজের চোখে হাত দিয়ে] এই যে একখণ্ড বস্ত্র— এ তো শুধু আমার বাহ্যিক দৃষ্টিকে ব্যাহত করে। কিন্তু আমার আভ্যন্তরীণ দৃষ্টি? আমার দূরদৃষ্টি? তাকে আটকাবে কে?

দুঃশলা।। তুমি কি কোনও ভয়ংকর ঘটনার আশঙ্কা করছ মাতা?

গান্ধারী।। এমন একটা ঘটনা যা ভরত বংশ কোনওদিন দেখেনি, হস্তিনাপুর দেখেনি— শুধু হস্তিনাপুর কেন, সমগ্র আর্যাবর্ত কোনওদিন এমন ভয়ংকর ঘটনার সাক্ষী থাকেনি।

দুঃশলা।। কী ভয়ংকর ঘটনা মাতা?

[দ্যূতসভা থেকে নারীকণ্ঠের তীব্র চিৎকার ভেসে এল। একবার-দুবার-তিনবার]

দুঃশলা।। ও কীসের চিৎকার? না, না, চিৎকার নয়, আর্তনাদ। দ্যূতসভায় নারীকণ্ঠে কে আর্তনাদ করছে?

গান্ধারী।। আমার যদি ভুল না হয়— তাহলে দ্রৌপদী।

দুঃশলা।। দ্রৌপদী, সে কী! দ্যূতসভায় দ্রৌপদীর আর্তনাদ কেন? সে ওখানে কী করছে? দাসী, দাসী—

গান্ধারী।। এতক্ষণ ছিল খণ্ডগ্রাসগ্রহণ। এবার পূর্ণগ্রাস।

দুঃশলা।। হেঁয়ালির মত কী বলছ মাতা? বুঝতে পারছি না আমি, দাসী— [দাসী নতমস্তকে এসে দাঁড়ায়] দ্যূতসভায় কী ঘটেছে? নারীকণ্ঠের আর্তনাদ কার?

[দাসী মুখ নীচু করে থাকে] কী হল? উত্তর দিচ্ছিস না কেন? কে চিৎকার করছিল?

দাসী।। [মুখ না তুলে] পাণ্ডবজায়া দ্রৌপদী।

দুঃশলা।। [ছিটকে পিছিয়ে আসে] কী? সত্যি? সত্যিই দ্রৌপদী? [দাসী মাথা নাড়ে] কেন?

[দাসী ইতস্তত করে। হাবেভাবে অস্বস্তি ফুটে ওঠে।]

গান্ধারী।। ওকে সব কথা খুলে বলতে বল দুঃশলা।

[দাসী ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দুঃশলার দিকে তাকায়]

দুঃশলা।। বল কী হয়েছে?

দাসী।। [কিছুক্ষণ ইতস্তত করে] মহারাজ যুধিষ্ঠির প্রথমে তাঁর ইন্দ্রপ্রস্থের রাজপ্রাসাদ, ধনসম্পত্তি পণ রাখেন। পরাজিত হলে তিনি নিজের ভ্রাতাদের এবং শেষে নিজেকেও পণ রাখেন।

দুঃশলা।। তারপর?

দাসী।। তারপর… তারপর নিজেও পরাজিত হলে রানি দ্রৌপদীকে পণ রাখেন।

দুঃশলা।। কী বলছিস তুই? ভ্রাতা যুধিষ্ঠির কি উন্মাদ হয়ে গেছিলেন?

দাসী।। দেবী দ্রৌপদীও পণে পরাজিত হলেন। তখন রাজপুত্র দুর্যোধন বললেন দ্রৌপদী কৌরবদের ক্রীতদাসী।

দুঃশলা।। অগ্রজ বললেন এই কথা?

দাসী।। উনি বললেন, গান্ধাররাজ বললেন। রাজপুত্র দুর্যোধন এরপর রাজপুত্র দুঃশাসনকে হুকুম দিলেন বলপূর্বক দেবী দ্রৌপদীকে সভাস্থলে নিয়ে আসতে।

দুঃশলা।। ভ্রাতা দুঃশাসন নিয়ে এল দ্রৌপদীকে?

দাসী।। কেশ আকর্ষণ করে টানতে টানতে নিয়ে এলেন।

দুঃশলা।। অসহ্য! অসম্ভব! [গান্ধারীর কাছে ছুটে যায়] শুনলে মাতা, শুনলে? হ্যাঁরে [দাসীকে] সেজন্যই দ্রৌপদী আর্তনাদ করছিল?

[দাসী চুপ করে থাকে]

গান্ধারী।। ওকে জিজ্ঞেস কর দুঃশলা, ঘটনা কি এখানেই শেষ না আরও মর্মান্তিক কিছু অবশিষ্ট রয়েছে?

[দুঃশলা দাসীর দিকে তাকায়]

দাসী।। [মাথা নাড়িয়ে] আছে মহারানি।

দুঃশলা।। বল, বল— আমরা যে আর ধৈর্য রাখতে পারছি না।

দাসী।। সে ঘটনা বড় ভয়ংকর, বড় লজ্জার।

[দুঃশলা একবার গান্ধারীর দিকে তাকায়]

দুঃশলা।। হোক ভয়ংকর, হোক লজ্জার— তবু তুই বল।

দাসী।। দেবী দ্রৌপদী রজঃস্বলা— তাই একবস্ত্রে তাঁকে আসতে হল সভাস্থলে। রাজপুত্র দুর্যোধন, অঙ্গরাজ কর্ণ রাজপুত্র দুঃশাসনকে নির্দেশ দিলেন… নির্দেশ দিলেন—

দুঃশলা।। কী নির্দেশ দিলেন?

দাসী।। [ঠোঁট কামড়ায়, এদিক ওদিক তাকায়] নির্দেশ দিলেন দেবী দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের জন্য।

গান্ধারী।। না— আ— আ [গান্ধারী ছিটকে উঠে দাঁড়ান। দুঃশলা ছুটে যায়, আঁকড়ে ধরে মাকে। গান্ধারী দুহাত দিয়ে যেন বাতাস আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করেন।] আর দুঃশাসন—

দাসী।। অগ্রজের নির্দেশমত দেবী দ্রৌপদীর বস্ত্র আকর্ষণ করতে লাগলেন।

[গান্ধারী নিজের কপালে করাঘাত করতে থাকেন]

দুঃশলা।। তুমি একটু শান্ত হও মাতা।

গান্ধারী।। শান্ত! এরপরেও তুই আমাকে শান্ত হতে বলছিস দুঃশলা? আমার গর্ভের সন্তান তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃবধূকে সর্বসমক্ষে…

দাসী।। পারেননি মহারানি, রাজপুত্র দুঃশাসন শেষ পর্যন্ত পারেননি। কী অবাক কাণ্ড মহারানি, দেবী দ্রৌপদী সভায় কারও কাছ থেকে কোনও সাহায্য না পেয়ে শ্রীকৃষ্ণকে ডাকতে লাগলেন। আর তারপরেই সেই আশ্চর্য ব্যাপার। রাজপুত্র দুঃশাসন বস্ত্র টেনে খুলে যাচ্ছেন কিন্তু দেবী দ্রৌপদীর বস্ত্র যেন শেষ হচ্ছে না। সভাগৃহে প্রচুর বস্ত্রের স্তূপ জমা হয়ে গেল কিন্তু দেবী দ্রৌপদীকে কিছুতেই উন্মুক্ত করা গেল না। পাণ্ডবরা শ্রীকৃষ্ণের নামে জয়ধ্বনি দিতে লাগলেন।

[গান্ধারী হাতের ইশারায় দাসীকে চলে যেতে বললেন]

দুঃশলা।। তুই এখন আয়।

[দাসী চলে যাচ্ছিল]

গান্ধারী।। একটা কথা ওকে জিজ্ঞেস কর দুঃশলা; [দাসী যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়ায়] রাজসভায় যারা উপস্থিত ছিলেন, তাদের মধ্যে একজনও এই বীভৎস কাণ্ডের প্রতিবাদ জানালেন না? মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, মহামতি ভীষ্ম, দেবর বিদুর, অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য, কৃতবর্মা— কেউ না?

দাসী।। [মাথা নেড়ে] না মহারানি। সবাই চুপ করে বসেছিলেন।

দুঃশলা।। একটা কথা দাসী— আমার স্বামী জয়দ্রথ— তিনি কী করছিলেন?

দাসী।। কৌরবপক্ষের জয়ে আনন্দ প্রকাশ করছিলেন।

দুঃশলা।। আর বস্ত্রহরণের সময়? সক্রিয় ছিলেন?

দাসী।। না, তবে প্রতিবাদও করেননি।

দুঃশলা।। [কিছুক্ষণ দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে থাকে] ঠিক আছে। তুই এখন আয়।

[দাসী চলে যায়। গান্ধারী শয্যার ওপর উপুড় হয়ে পড়ে ছিলেন। দুঃশলা তার পিঠে হাত রাখে]

মাতা— [কোনও সাড়া নেই] মাতা— [গান্ধারী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন] তুমি কাঁদছ? [দুঃশলা গান্ধারীকে ধরে বসায়]

গান্ধারী।। আমি হেরে গেলাম দুঃশলা; আমি হেরে গেলাম।

দুঃশলা।। তুমি কেন হেরে যাবে মাতা?

গান্ধারী।। কী বলিস! আমার জ্যেষ্ঠপুত্র এই জঘন্য কর্মের নির্দেশ দিয়েছে; আর এক পুত্র পৈশাচিক কাণ্ড ঘটিয়েছে! বাকি পুত্রেরাও কোনও প্রতিবাদ করেনি। আমার স্বামী স্বয়ং হস্তিনাপুরের মহারাজও কুলবধূর লাঞ্ছনা মুখ বুজে সহ্য করেছেন। এরপরেও বলবি আমি হেরে যাইনি? কুন্তীর কাছে এরপর আমি দাঁড়াব কীভাবে?

দুঃশলা।। [গান্ধারীর মাথায়, পিঠে হাত বুলোয়] শান্ত হও, তুমি একটু শান্ত হও মাতা।

গান্ধারী।। এতবড় ভুল কীভাবে হল বল তো দুঃশলা? কেনই বা হল?

দুঃশলা।। কোন ভুলের কথা বলছ তুমি?

গান্ধারী।। আমারই গর্ভে দুর্যোধন আর দুঃশাসনের জন্ম হয়েছিল। এটা ভুল নয়?

দুঃশলা।। মাতা!

গান্ধারী।। কোনওদিন অধর্মপথে পা বাড়াইনি; কোনও দিন অধর্ম আচরণ করিনি। স্বামীর যোগ্য সহধর্মিণী হওয়ার জন্য কতকাল পৃথিবীর রং, আলো দর্শন থেকে নিজেকে বঞ্চিত রেখেছি। তবু আমারই গর্ভে কেন এই পাপিষ্ঠরা জন্ম নিল? কেন যুধিষ্ঠিরের জন্ম হল না? কুন্তী কি আমার চেয়েও পুণ্যবতী?

দুঃশলা।। তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে মাতা।

গান্ধারী।। কী আসে যায়? দুঃশলা— মিথ্যা— সবকিছুই আজ মিথ্যা। এই সিংহাসন মিথ্যা, এত ধনবৈভব মিথ্যা, আমার এই মহারানি পরিচয় মিথ্যা। হস্তিনাপুরের দরিদ্রতম প্রজার পরিবারও বোধহয় আমার চেয়ে সুখী। তাদের জীর্ণ মাটির কুটীরে কোনও শোভা নেই, ভাণ্ডারে যথেষ্ট খাদ্য নেই, পরনে ভদ্র বস্ত্র নেই— তবু, তবু সেই দরিদ্র বধূ আমার চেয়েও সুখী। স্বামী, পুত্র নিয়ে শান্তিতে, তৃপ্তিতে বাস করে।

দুঃশলা।। আমি কি পিতাকে আসার জন্য খবর পাঠাব?

গান্ধারী।। [চিৎকার করে] না— একদম না।

দুঃশলা।। কেন? উনি এলে তোমাকে শান্ত করতে পারতেন।

গান্ধারী।। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র তোর পিতা নন, আমার স্বামীও নন— উনি শুধু একজন পুরুষ।

দুঃশলা।। কী বলছ মাতা?

গান্ধারী।। শুধু মহারাজই নন; মহামতি ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য, বিদুর, কৃপাচার্য, কৃতবর্মা, আমার শত পুত্র, আমার অগ্রজ, অঙ্গরাজ, জয়দ্রথ— প্রত্যেকের অন্য পরিচয় আজ গৌণ। তাদের মুখ্য পরিচয় তারা সবাই পুরুষ।

দুঃশলা।। শুধুই পুরুষ?

গান্ধারী।। শুধুই পুরুষ। আর সেজন্যেই তো দ্যূতক্রীড়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, অপমানিত, লাঞ্ছিত হল দ্রৌপদী— কারণ সে একজন নারী। পঞ্চপাণ্ডব তো কৌরবদের ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছিল— কই তাদের তো কোনও শারীরিক নিগ্রহ সহ্য করতে হয়নি! ভীম তো দুর্যোধনের সবচেয়ে বড় শত্রু। কই, দুর্যোধন তো ভীমকে পদসেবা করার নির্দেশ দেয়নি। অর্জুন তো অঙ্গরাজের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। কই কর্ণ তো অর্জুনকে বলেনি— যাও অর্জুন, তোমার গাণ্ডীব নিয়ে এসে আমার পদতলে রাখো। বলেনি, বলবেও না। শত শত্রুতা সত্ত্বেও বলবে না— কারণ বিজয়ী ও বিজিত— দু’পক্ষই যে পুরুষ।

দুঃশলা।। তুমি সত্য বলছ মাতা।

গান্ধারী।। আজ থেকে জেনে রাখবি দুঃশলা, পৃথিবীতে শুধু দুটি পক্ষ রয়েছে— তারা ধনী-দরিদ্র নয়, সবল-দুর্বল নয়, রাজা-প্রজা নয়, তারা শুধু পুরুষ আর নারী।

দুঃশলা।। আজ যদি অগ্রজ পরাজিত হতেন? তাহলে কি ভানুমতিকেও এভাবেই…

গান্ধারী।। জানি না, জানি না। হয়তো তাকেও লাঞ্ছিত হতে হত। কারণ পাণ্ডবরাও তো শেষ পর্যন্ত পুরুষই—

দুঃশলা।। সভাস্থল এখন আশ্চর্য রকম নিস্তব্ধ মাতা! কোনও জয়োল্লাস ভেসে আসছে না।

গান্ধারী।। শ্মশানভূমি থেকে কোনও জয়োল্লাস ভেসে আসে না। দ্যূতসভা এখন শ্মশানভূমি আর সেখানে চিতার আগুনে দগ্ধ হচ্ছে হস্তিনাপুরের মর্যাদা।

দুঃশলা।। মাতা, এই যে কৌরববা আজ দ্যূতক্রীড়ায় জয়লাভ করল…

গান্ধারী।। করেনি। কৌরবরা জয়ী হয়নি, পাণ্ডবরাও পরাজিত হয়নি। জিতেছে আজ পুরুষের অহমিকা, কামনা। আর হেরেছে নারীর লজ্জা, সম্ভ্রম। কিছুক্ষণ আগে গর্ব করে বলেছিলাম না যে তোকে জন্ম দেওয়াটা আমার সবচেয়ে বড় জয়, আমার সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ।

দুশলা।। সত্যিই তো; কত যুদ্ধ তুমি করেছ।

গান্ধারী।। সেই যুদ্ধ, সেই জয় তো ছিল আমার একান্ত নিজের। কিন্তু এবার যে আরও বড় প্রতিবাদ, আরও বড় যুদ্ধ অপেক্ষা করে আছে।

দুঃশলা।। যুদ্ধ?

গান্ধারী।। হ্যাঁ দুঃশলা, যুদ্ধ। আমি জানি না আজকের দ্যূতসভার জয়-পরাজয় আগামী দিনে পাণ্ডব-কৌরবদের মধ্যে যুদ্ধ বাধাবে কিনা। কিন্তু আমি নিশ্চিত তার আগে নতুন এক যুদ্ধের সূচনা হবে। হস্তিনাপুর থেকে শুরু হয়ে সে যুদ্ধ ক্রমশ আর্যাবর্তে ছড়িয়ে পড়বে। দুঃশলা, ভানুমতিকে একবার ডেকে পাঠা তো।

দুঃশলা।। [অবাক হয়ে] সে আমি ডেকে পাঠাচ্ছি। কিন্তু তাকে কেন?

গান্ধারী।। আমার পুত্রবধূকে বলব, স্বামীর জয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ো না বরং শোকে নিমজ্জিত হও। তোমার স্বামী জয়লাভ করেছে একজন পুরুষ হিসাবে; আর তোমার মতই এক নারী, রাজকুলবধূ— সে হেরেছে, নিগৃহীতা হয়েছে। দুঃশলা, তোর স্বামী জেতেনি, পুরুষ জিতেছে। আমার স্বামী স্বয়ং মহারাজও জেতেননি— জিতেছে রাজসিংহাসনে বসা একজন পুরুষ।

দুঃশলা।। আমরা এখন কী করব মাতা?

গান্ধারী।। হস্তিনাপুরের যত অন্তঃপুরবাসিনী আছে, প্রত্যেককে সঙ্গে নিয়ে দ্রৌপদীর কাছে যাব। এই যে দাসী— ওকেও সঙ্গে নেব। সেও হয়তো প্রতিনিয়ত তার স্বামীর দ্বারা লাঞ্ছিতা হয়।

দুঃশলা।। আমরা কি দ্রৌপদীর কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইব?

গান্ধারী।। না, আমরা শুধু ক্ষমা চাইব কেন? আমরা তার পাশে গিয়ে দাঁড়াব। বলব, এই লাঞ্ছনা শুধু তোমার একার নয়, আমাদের প্রত্যেকের। বস্ত্রহরণ শুধু তোমার হয়নি— হয়েছে ভরত বংশের প্রতিটি কুলবধূর। এ লজ্জা শুধু দ্রৌপদীর নয়, শুধু ইন্দ্রপ্রস্থের নয়, হস্তিনাপুরের নয়— সমগ্র আর্যাবর্তের। এই লজ্জা শুধু দ্বাপরের নয়— এই লজ্জা অনাগত ভবিষ্যতেরও।

[দাসী ছুটে আসে]

দুঃশলা।। কী হল?

দাসী।। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র আসছেন।

দুঃশলা।। ঠিক আছে, তুই যা। [দাসী চলে যায়] মাতা, পিতা আসছেন।

গান্ধারী।। দরজা বন্ধ করে দে।

দুঃশলা।। কী বললে?

গান্ধারী।। দরজা বন্ধ করে দিতে বললাম।

দুঃশলা।। পিতা আসছেন যে?

গান্ধারী।। সেজন্যই তো বললাম। বন্ধ কর দরজা।

[দুঃশলা বিভ্রান্তের মতো দরজা বন্ধ করে]

দুঃশলা।। পিতা দাঁড়িয়ে থাকবেন তো!

গান্ধারী।। থাকুন কিছুক্ষণ।

দুঃশলা।। খুলবে না দরজা?

গান্ধারী।। খুলব নিশ্চয়ই কিন্তু ওই অপূর্ব কারুকার্য শোভিত বহুমূল্য দরজাটিই খুলব। মনের অমূল্য দরজাটা আর খুলব না। ওটা এরপর থেকে বন্ধই থাকবে। আর শুধু আমার দরজা নয়, জয়দ্রথের জন্য তোর মনের দরজা, দুর্যোধনের জন্য ভানুমতির মনের দরজা— সব এরপর থেকে বন্ধ থাকবে।

দুঃশলা।। আমরা পারব বন্ধ রাখতে?

গান্ধারী।। পারতেই হবে। আমাদের নারীদের প্রধান দুর্বলতা কী জানিস? হৃদয়ের দরজা আমরা সবসময় উন্মুক্ত রাখি। তাই পুরুষ যখন চায় বড় সহজে আমাদের মনের ঘরে ঢুকতে পারে আবার ইচ্ছে হলে সহজে বেরিয়েও যায়। ফিরেও তাকায় না।

[দরজার বাইরে পদশব্দ। করাঘাতের শব্দ শোনা যায়]

দুঃশলা।। [ফিসফিস করে] পিতা এসেছেন!

ধৃতরাষ্ট্র।। দরজা খোলো গান্ধারী— আমি; আমি দ্যূতসভা থেকে ফিরে এসেছি। গান্ধারী— গান্ধারী— দরজা খোলো…

[আবার করাঘাতের শব্দ শোনা যায়। গান্ধারী আর দুঃশলা উভয়ে উভয়কে শক্ত করে ধরে রাখেন।]

।। সমাপ্ত।।

চিত্র: গুগল
Advertisement
4 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

সনজীদা খাতুন: শ্রদ্ধাঞ্জলি

সাতচল্লিশ-পরবর্তী পূর্ববঙ্গে বেশ কিছু সাংস্কৃতিক সংস্থা গড়ে ওঠে, যাদের মধ‍্যে ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমী’, ‘ক্রান্তি’, ‘উদীচী’ অন‍্যতম। রাজনৈতিক শোষণ ও পূর্ববঙ্গকে নিপীড়নের প্রতিবাদে কখনও পরোক্ষভাবে কখনও সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল এইসব সংগঠন। ‘ছায়ানট’ এমনি আর এক আগ্নেয় প্রতিষ্ঠান, ১৯৬৭-তে জন্মে আজ পর্যন্ত যার ভূমিকা দেশের সুমহান ঐতিহ‍্যকে বাংলাদেশের গভীর থেকে গভীরতরতায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে সুস্থ ও সংস্কৃতিবান নাগরিক গড়ে তোলা। ওয়াহিদুল হক ও সনজীদা খাতুনের মানসসন্তান এই ছায়ানট। মূলত রবীন্দ্রনাথের আদর্শে গড়ে ওঠা সঙ্ঘ, কাজী নজরুলের প্রিয় নামটিকে জয়ধ্বজা করে এগিয়ে চলেছে বহু চড়াই-উৎরাই, উপলব‍্যথিত গতি নিয়ে।

Read More »
সুজিত বসু

সুজিত বসুর গুচ্ছকবিতা

বিলাপ অভিসার জল আনতে চল রে সখী, জল আনতে চল নিভু নিভু আলোর সাজে সূর্য অস্তাচলে শেষবিকেলের রশ্মিমালায় বুকে ব্যথার ঢল লজ্জা আমার আবির হয়ে

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

যত মত তত পথ

বহুদিক দিয়েই একজন স্বতন্ত্র মননের ধর্মীয় সাধক। তাঁর অনুগামীর সংখ্যা ধারণাতীত, আর তা কেবল তাঁর স্বদেশ বা এই উপমহাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, সারা বিশ্বব্যাপী। এবং দিনের পর দিন তাঁর অনুগামীর সংখ্যা বাড়ছে। শ্রীরামকৃষ্ণ এবং সারদামণি ও স্বামী বিবেকানন্দকে কেন্দ্র করে যে ভাব-আন্দোলন, তার ফলশ্রুতিতে তাঁদের নিয়ে নিয়ত চর্চা ও গবেষণা হয়ে চলেছে। পৃথিবীব্যাপী দুশোর ওপর রামকৃষ্ণ মিশনের কার্যাবলি প্রমাণ করে (প্রতিবছর এর সংখ্যা বাড়ছে), আজকের এই অশান্ত বিশ্বে তাঁরা মানুষের কতখানি আশ্রয়।

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব ছয়]

রবীন্দ্রভাবনায় যে নৃত্যধারা গড়ে উঠল তা দেশিবিদেশি নৃত্যের সমন্বয়ে এক মিশ্র নৃত্যধারা, তৎকালীন শিক্ষিত শহুরে বাঙালির সংস্কৃতিতে যা নতুন মাত্রা যোগ করল। নাচের প্রতি একরকম আগ্রহ তৈরি করল, কিছু প্রাচীন সংস্কার ভাঙল, মেয়েরা খানিক শরীরের ভাষা প্রকাশে সক্ষম হল। এ কম বড় পাওনা নয়। আরও একটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হল, শিল্পক্ষেত্রে ভাবের সাথে ভাবনার মিল ঘটিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টির প্রচেষ্টা। গতে বাঁধা প্র্যাক্টিস নয়। নিজের গড়ে নেওয়া নাচ নিজের বোধ অনুযায়ী।

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব পাঁচ]

বাংলার মাটি থেকে একদা এই সুদূর দ্বীপপুঞ্জে ভেসে যেত আসত সপ্তডিঙা মধুকর। আর রবীন্দ্রনাথের পিতামহ, যাঁর কথা তিনি কোথাও প্রায় উল্লেখই করেন না, সেই দ্বারকানাথ-ও বাংলার তৎকালীন ব্যবসায়ীকুলের মধ্যে প্রধান ছিলেন। শুধু তাই-ই নয়, একদা তাঁর প্রিয় জ্যোতিদাদাও স্টিমারের ব্যবসা করতে গিয়ে ডুবিয়েছেন ঠাকুর পরিবারের সম্পদ। নিজে রবীন্দ্রনাথ বাণিজ্য সেভাবে না করলেও, জমির সম্পর্কে যুক্ত থাকলেও একদা বাংলার সাম্রাজ্য বিস্তার, বাণিজ্য-বিস্তার কী তাঁরও মাথার মধ্যে ছাপ ফেলে রেখেছিল? তাই ইউরোপ থেকে আনা বাল্মিকী প্রতিভার ধারাকে প্রতিস্থাপন করলেন জাভা বালির কৌমনৃত্য দিয়ে?

Read More »
ড. সোমা দত্ত

রবীন্দ্রনৃত্যভাবনা: প্রেক্ষিত ও চলন [পর্ব চার]

তৎকালীন দেশের বাস্তব সত্যের সঙ্গে মিলছে না বর্ণবাদ, উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ, মিলছে না পিকেটিং ও বিদেশি দ্রব্য পোড়ানোর আন্দোলন। রবীন্দ্রনাথ দেখতে পাচ্ছেন গ্রামে গ্রামে গরিব মানুষের খাওয়া নেই, নেই বেশি দাম দিয়ে দেশি ছাপ মারা কাপড় কেনার ক্ষমতা। দেখছেন পিকেটিংয়ের নামে গরিব মুসলমানের কাপড়ের গাঁঠরি পুড়ে যাচ্ছে যা দিয়ে সে তার পরিবার প্রতিপালন করে। রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ করছেন তাঁর লেখায়। ‘গোরা’ ও ‘ঘরে বাইরে’ এমনই দু’টি উপন্যাস। গোরা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় প্রবাসী পত্রিকায়। পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশ ১৯১০ সালে। ঘরে বাইরের প্রকাশকাল ১৯১৬।

Read More »