Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ছোটগল্প: অথ রুরুকথা

কফিনবন্দি দেহটা কি একটু নড়ে উঠল? অনেকক্ষণ ধরে একটা যন্ত্রণা পাক খাচ্ছিল, কিন্তু সেটা শরীরে, না শরীরের ভিতরের কোনও অচেনা গহ্বরে, বুঝতে পারছিল না জিষ্ণু।

রাস্তা জুড়ে গাড়ির মিছিল। রাজনীতির বড়, মেজ, সেজ নেতা থেকে শুরু করে কনভয় সমেত রাজ্যের তাবড় মন্ত্রীরা এসে হাজির হয়েছেন। তার সঙ্গে ভেঙে পড়েছে এলাকার মানুষ। পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। এক পাশে বিভিন্ন নামী টিভি চ্যানেলের ওবি ভ্যানগুলো পথ আগলে দাঁড়িয়ে। বুম হাতে সাংবাদিকরা হন্যে হয়ে স্টোরি খুঁজছেন। তাঁদের পিত্তি জ্বালানো বোকা বোকা প্রশ্নে নেতা-মন্ত্রী থেকে সাধারণ মানুষ নাজেহাল। সদ্য সন্তানহারা মায়ের বুকফাটা হাহাকার এবং স্বামীহারা সোনালির গুমরে উঠে বারে বারে অচেতন হওয়া মুখের মহার্ঘ ছবি শিকারে ব্যস্ত ক্যামেরা।

জাতীয় পতাকায় মোড়া কফিনের ওপর অনেকগুলো বৃত্তাকার মালা। রাশি রাশি ঝুরো ফুল স্তূপাকার হয়ে বুকের ওপর চেপে বসেছে। পুলক বেঁচে থাকলে নিশ্চয় বিরক্ত হত। ও বরাবর বলত, ফুলের মধ্যে বকফুল আর কুমড়ো ফুল ওর সবচেয়ে প্রিয়। খুব ভাল বড়া ভেজে খাওয়া যায়! বাকি ফুল কোনও কম্মে লাগে না!

হঠাৎ কিছুদিন আগের একটা ঘটনা জিষ্ণুর মনে পড়ে গেল। সেদিন ফুলে ফুলে আলো হয়ে থাকা একটা বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় পুলক হাসতে হাসতে বলেছিল, এখানকার মানুষরা কী বোকা দেখ! এখানে শাক-সবজির এত দাম, ভাল কিছু পাওয়াও যায় না, অথচ এরা যতসব আজেবাজে গাছ লাগিয়ে রেখেছে! ফুল গাছই যদি বসাতে হয়, তাহলে ফুলকপির চারা বসাক না, অন্তত এই বন্ধের আকালে খেয়ে বাঁচে!

কফিনের মধ্যে যদি ছেলেটা দুম করে জেগে উঠত, তাহলে হয়তো বুকের উপর ডাঁই করা সাদা ফুলগুলোর মধ্যে সেই পছন্দের বকফুলই খুঁজত।

জিষ্ণু আরেকবার পথের দু’ধারে চাইল। অপেক্ষমাণ জনতার কারও কারও হাতে ফুল কিংবা মালা। শহীদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য। ওরা সম্ভবত কফিনটা কাঁধ থেকে নামানোর জন্যে অপেক্ষা করছে।

রাজনৈতিক কেষ্টবিষ্টুরা ঘন ঘন টিভি ক্যামেরার সামনে ভাবগম্ভীর বাইট দিচ্ছেন। চামচাগুলো তাঁদের কানের পাশ দিয়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে, যাতে একঝলকের জন্যে হলেও নেতার সঙ্গে তাদের নৈকট্যজ্ঞাপক ছবিটা দর্শকদের স্মৃতিতে ধরা থাকে। ছোটখাটো উঠতি নেতারাও গম্ভীর মুখে টিভি ক্যামেরার লেন্সের আওতায় ঢুকে পড়বার জন্যে ঠেলাঠেলি করছে। কেউ কেউ তো রীতিমত তোষামোদ শুরু করেছে, যাতে এই মওকায় দু’একটা জ্বালাময়ী কথা বলে ব্রেকিং নিউজে ঢুকে পড়া যায়। টিভি চ্যানেলগুলোর ব্রেকিং নিউজ মানে তো সেই একই জিনিস দিনভর ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে অসংখ্যবার দেখানো! একজন রাজনীতিজীবীর পক্ষে এর চাইতে বড় বিজ্ঞাপন আর কীই বা হতে পারে!

দু’দিন আগে সংক্ষিপ্ত লাঞ্চ করার সময় পুলক হাসতে হাসতে বলেছিল, ওর যদি ছেলে হয়, তা হলে নাম রাখবে ‘রাইফেল’। এটা হাতে থাকলে হাজার প্রতিকূলতার মধ্যেও নাকি বুকে বেশ বল পাওয়া যায়। বলেই এঁটো মুখে ঠান্ডা রাইফেলের নলে চকাস করে একটা চুমু খেয়েছিল।

ওর কাণ্ড দেখে অত কষ্টের মধ্যেও হো হো করে হেসে উঠেছিল জিষ্ণু। কয়েক মাস ধরে ভয়ংকর অশান্ত পাহাড়। পাকদণ্ডীতে অশেষ আতঙ্কের আবহে দাঁড়িয়ে দিন-রাত্রি ডিউটি করতে করতে ক্লান্ত সকলে। ওরা জানত, মৃত্যু যেকোনও মুহূর্তে এসে থাবা বসাতে পারে। এমন দমবন্ধ করা পরিবেশে দাঁড়িয়ে যে নিজের অজাত পুত্রের নাম নিয়ে ভাবতে পারে, তাকে মনে মনে কুর্নিশ করা ছাড়া উপায় কী!

ওর স্বপ্নালু চোখের দিকে তাকিয়ে জিষ্ণু জিজ্ঞেস করেছিল, আর যদি মেয়ে হয়?

ও বিন্দুমাত্র না ভেবে উত্তর দিয়েছিল, তা হলে নাম রাখব মায়া। এই মায়াই তো আমাদের বাঁচার প্রেরণা।

জিষ্ণু জিজ্ঞেস করেছিল, প্রেরণা, না অনুপ্রেরণা?

পুলক রসিকতাটা ধরতে না পেরে ভ্যাবলার তাকিয়ে আছে দেখে জিষ্ণু আর-এক ধাপ এগিয়ে বলেছিল, এখন এ রাজ্যে ‘মায়া’-র একটা প্রতিশব্দও খুব হিট, মেয়ের নামের জন্যে তুই সেটাও ভেবে দেখতে পারিস!

অবশেষে বিষয়টা যখন ওর মাথায় ঢুকল, তখন চোখ গোল গোল করে বলেছিল, তুমি সব ব্যাপারে বড় বেশি ইয়ার্কি করো, জিষ্ণুদা! আমি কোথায় একটা সিরিয়াস কথা বলছিলাম—

আসলে পুলক কথার মারপ্যাঁচ একেবারেই বুঝত না, কেউ কিছু বললে শিশুর সারল্যে বিশ্বাস করত।

ওর কথা ভাবতে গিয়ে ‘করত’ ক্রিয়াপদটি মনে আসতে খুব অবাক হল জিষ্ণু। যে মানুষটা এখনও কফিনে শুয়ে দিব্বি ওর কাঁধে চড়ে দুলতে দুলতে চলেছে, সে যে ওর অবচেতনে কখন পাস্ট টেন্স হয়ে গেছে, টেরই পায়নি। ভাবল, ক্ষুধিত পাষাণের মেহের আলির মত প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে ‘ঝুটা হ্যায়, সব ঝুটা হ্যায়’ বলে উঠতে পারলে বুঝি একটু স্বস্তি হত।

—সামলে, সামলে! সামালকে চলো, ইয়ার!

আর-একটু হলেই লাইটপোস্টে ধাক্কা খাচ্ছিল জিষ্ণু।

ছেলেটির দিকে সরু চোখে তাকাল জিষ্ণু। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, গলায় উড়নির মত তেরঙ্গা উত্তরীয়, পুলিশকে ‘ইয়ার’ বলার ছাড়পত্র!

জিষ্ণুর চাউনি দেখে ছেলেটি বুঝি একটু ঘাবড়ে গেল। ‘পুলক বারিক জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে দিতে সামনে এগিয়ে গেল।

খুব সরু গলি, কাঁচা নর্দমা, ভ্যাটের মধ্যে উপচে পড়া আবর্জনা, তার মধ্যে পথের দু’পাশে সার সার থমথমে মুখের সারি। এসব সামলে কফিন-কাঁধে চারজন একসঙ্গে এগোনো দুষ্কর।

জিষ্ণুর মনে হল, এ সময়ে যদি কেউ জন ডেনভারের ‘সানশাইন অন মাই সোল্ডারস’ গাইত, তাহলে হয়ত পুলক একটু শান্তি পেত।

পুলকের বড় প্রিয় ছিল এই গানগুলো। ডিউটির ফাঁকে ফাঁকে কিংবা ব্যারাকের সংক্ষিপ্ত অবসরে সুযোগ পেলেই ও পকেট থেকে মাউথ অরগ্যানটা বের করে দু’এক কলি বাজিয়ে নিত। এত আয়োজনের মাঝে ওর পছন্দের সুরের সামান্য একটু মূর্ছনা থাকলে কী এমন ক্ষতি হত!

জিষ্ণুর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। কী সব আজেবাজে কথা ভাবছে! কফিনের মধ্যে শুয়ে থাকা নিথর দেহটার মধ্যে কি আর পছন্দের গান শোনার জন্যে মনটা জেগে আছে!

কাঁধের কাছে হয়তো একটু ছড়ে গিয়েছে, চিড়চিড়ে জ্বালা করছে। সারা শরীরে বিজবিজে ঘাম, কফিনের হাতলটা যেন ক্রমশ কাঁধে চেপে বসছে। হঠাৎ কী মনে করে ও কফিনের গায়ে কান ঠেকিয়ে ভেতরের শব্দ শোনার চেষ্টা করল।

পরক্ষণেই চমকে উঠল। ও কী তবে একটু একটু করে পাগল হয়ে যাচ্ছে? মৃত মানুষের ভাল লাগা বোঝার জন্যে এভাবে কফিনে কান ঠেকানো তো সুস্থতার লক্ষণ নয়!

পুলিশের সামান্য একজন সাবইন্সপেক্টর, তার জন্যে এমন সাড়ম্বর শোক, এত আবেগ, মিডিয়ার এমন আদেখলেপনা দেখে জিষ্ণুর সব কিছু কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। পাহাড়ে অপারেশান শুরুর পর থেকে গত কয়েক মাসে পুলিশ তো কম মরেনি! কই, অন্য কারও জন্যে তো সর্বস্তরে এতটা উন্মাদনা দেখা যায়নি! বরং জনমানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ভয়ে সেই মৃত্যুগুলোকে যথাসম্ভব আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে।

মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা আগেও তরতাজা ছেলেটা ওর পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ডিউটি করেছে। বিশ্রাম নেই, খাওয়াদাওয়ার ঠিক নেই, দুরন্ত শীতে ঝমঝমে বৃষ্টির মধ্যে মাথার উপর কোনও আচ্ছাদন নেই, পায়ের নিচে এবড়োখেবড়ো অচেনা পিচ্ছিল পথ, অথচ এসবের মধ্যেই আবেগসর্বস্ব ছেলেটা যেন টগবগ করে ফুটছিল।

অবশ্য ওর ওই আবেগের পেছনে ভার্মা সাহেবের একটা ভূমিকা ছিল। পাহাড়ের আগুন যখন ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে পাহাড়ে এসেছিলেন জি এস ভার্মা, পোড় খাওয়া আই পি এস অফিসার। মাওবাদী থেকে হার্মাদ, অনেকগুলো এনকাউন্টারের সফল নায়ক। রাফ অ্যান্ড টাফ অফিসার হিসেবে রাজ্যজোড়া খ্যাতি।

বাহিনীর অফিসার থেকে কনস্টেবল, সকলেই তটস্থ হয়ে উঠেছিল। জনশ্রুতি ছিল, তাঁর কড়া ডিসিপ্লিনে পান থেকে চুন খসলেই নাকি ভয়ংকর বিপদ। অথচ অল্প কয়েকদিনের মধ্যে উনি সবাইকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন, ‘আমি তোমাদেরই লোক’। অত্যন্ত অমায়িক ব্যবহার, সকলের সঙ্গে হেসে কথা বলেন, পদমর্যাদার ব্যবধান ভুলে কথায় কথায় কাঁধে স্নেহের চাপড় মেরে ‘আরে ইয়ার’ বলে সম্বোধন করেন, এমন ঊর্ধ্বতন অফিসারের অনুগত হতে সময় লাগার কথা নয়!

কয়েকদিন যেতে না যেতেই জিষ্ণুরা ভার্মা সাহেবের একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে উঠেছিল। তবে শুরু থেকেই ওর মনে হত, পুলকের ওপর সাহেবের যেন কিঞ্চিৎ পক্ষপাতিত্ব রয়েছে।

কফিন-কাঁধে ওরা একটা ছোট্ট অর্ধসমাপ্ত বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। পলেস্তারাহীন ইটের দেয়াল, রংহীন সস্তা কাঠের দরজা, প্রাইমার লাগানো গ্রিল, সদ্য ইট-বিছানো এবড়োখেবড়ো বারান্দা।

একচিলতে উঠোনে ছোট্ট তুলসীমঞ্চে একটা ঝাঁকড়া তুলসীগাছ। সেটার দুপাশে ছোট বাঁশের খুঁটিতে কঞ্চির ভারায় ঝোলানো ছোট্ট মাটির কলসি। একেবারে নতুন। কলসির নিচের শুকনো কাশ গোঁজা কৈশিক ছিদ্র থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে তুলসীগাছটার ওপর।

কফিনটা ঘাড় থেকে নামাতে পেরে যেন একটু স্বস্তি পেল জিষ্ণু। অন্যমনস্কভাবে আঙুল দিয়ে ব্যথায় টনটন করতে থাকা কাঁধটা বার কয়েক ডলে নিল।

দুই

ভিড়ের চাপে দমবন্ধ হয়ে আসছিল। চৈত্রের আকাশে সূর্যটা ক্রমশ মারমুখী হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন পাহাড়ের ঠান্ডার মধ্যে কাটানোর পর সদ্য সমতলে নেমে মনে হচ্ছিল যে অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে পড়ে গেছে। একটু ছায়ার জন্যে জিষ্ণু ইতিউতি চাইছিল।

আচমকা দৃশ্যপট বদলে গেল। এতক্ষণ দাওয়ায় বসে যে আলুথালু প্রৌঢ়া চিৎকার করে কাঁদছিলেন, তিনি আচমকা নেমে এসে কফিনে মাথা ঠুকতে শুরু করলেন। মুহূর্তে ফাটা কপালের ফিনকি দেওয়া রক্তে শুকিয়ে আসা সাদা ফুলগুলো ভিজে লাল হয়ে উঠল। উপস্থিত মহিলাদের অনেকের চোখে শাড়ির আঁচল। দু’জন মানুষ অনেক কষ্টে মহিলাকে ধরে আবার ঘরে নিয়ে গেলেন।

একপাশে পাথরের মত মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধ, মুখে অযত্নে বেড়ে ওঠা সাদা দাড়িগোঁফ, গলায় আঁটোসাঁটো তুলসীর কণ্ঠি। বৃদ্ধের ঠোঁটদুটো তির তির করে কাঁপছে। দু’চোখে অবিরল জলের ধারা, মাঝে মাঝে নিজেই হাতের চেটোয় মুছে নিচ্ছেন।

জিষ্ণুর অসহ্য লাগছিল। একটা দুঃসহ যন্ত্রণার তরঙ্গ যেন দলা পাকিয়ে গলার কাছে উঠে আসছে। এত হাহাকার, এমন বুকফাটা কান্নার রোল, প্রতি মুহূর্তে বুকে যেন হাতুড়ির ঘা পড়ছে।

যাঁরা বুক চাপড়ে কাঁদছেন কিংবা বোবা কফিনে মাথা ঠুকছেন, তাঁদের কাউকেই আগে কখনও দেখেনি জিষ্ণু। তবু এই ভয়ংকর বিপর্যয়ের শোক যেন ওকে মানুষগুলির সঙ্গে বড় বেশি একাত্ম করে তুলছিল।

বিয়ের পর শৈলশহরে আলাদা সংসার পাতলেও এদের প্রত্যেকের প্রতিই অসম্ভব টান ছিল পুলকের। সারাক্ষণ শুধু বাড়ির কথা বলত। শত ব্যস্ততার মধ্যেও স্যালারি অ্যাকাউন্টে বেতনের টাকা ঢুকলে ওদের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করতে এক মুহূর্তও দেরি করত না। জিষ্ণুর মাঝে মাঝে মনে হত, ও বুঝি কোনও অপরাধবোধে ভোগে। কারণটাও অনুমান করেছিল।

সোনালিকে বিয়ে করা নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে হয়তো একটু মনান্তর হয়েছিল পুলকের। নিম্নবিত্ত পরিবারের একমাত্র ছেলে চাকরি পেলে সব বাবা-মা-ই একটু গুছিয়ে নিতে চান। তাঁদের মনে হয়তো নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কাও তৈরি হয়, পাছে ছেলে বাপ-মায়ের ভার নিতে অস্বীকার করে! তাছাড়া, অপেক্ষাকৃত উচ্চবিত্ত পরিবারের মেয়ে সোনালি, নতুন পরিবেশে সে-ই বা কতটা মানিয়ে নিতে পারবে, এসব ভেবে এ বিয়েতে ওঁদের কারও মত ছিল না।

ওদিকে সোনালির পরিবারও চায়নি, তাদের মেয়েটা অমন একটা হাড়হাভাতে পরিবারের সামান্য পুলিশকর্মীকে বিয়ে করুক। দোটানায় পড়ে অমন আমুদে ছেলেটা সারাক্ষণ মনমরা হয়ে থাকত। তবে ওদের দু’জনেরই অনড় মনোভাব দেখে উভয়পক্ষই কিছুটা নমনীয় হতে বাধ্য হয়েছিল।

মাত্র মাস ছয়েক আগে সোনালিকে নিয়ে পুলিশ কোয়ার্টারে উঠেছিল পুলক।

হঠাৎ সোনালির কথা মনে হতে চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে নিল জিষ্ণু। ওকে বড় ভালবাসত সোনালি। বলত, বাপের বাড়ির লোকরা আমাকে ত্যাগ করেছে, শ্বশুরবাড়ির লোকরাও আমাকে মন থেকে গ্রহণ করেনি। নিকটাত্মীয় বলতে একমাত্র আপনি। দাদা, এবার আমার কাছে ভাইফোঁটা নিতে হবে কিন্তু!

আসবার সময় কাঁদতে কাঁদতে মাঝে মাঝেই অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিল মেয়েটা। কাল দুপুরের পর থেকে জল পর্যন্ত খাওয়ানো যায়নি ওকে। জ্ঞান ফিরলেই আছাড়িবিছাড়ি কান্না শুরু করছে। এ বাড়ির কেউ যদি সান্ত্বনার সঙ্গে সঙ্গে ওকে একটু খাওয়ানোর চেষ্টা করত, তবে স্বস্তি পেত জিষ্ণু।

কিন্তু কাকেই বা বলবে কথাটা? বাড়ির সবাই একেবারে ভেঙে পড়েছে। ওদের সামলাতে নিকট পরিজনেরাও হিমশিম খাচ্ছেন। আলাদা করে সোনালিকে খাওয়ানোর কথা ভাবার মত অবস্থা নেই কারও।

ভিড়ের চাপ ক্রমশ বাড়ছিল। রাস্তায় তিলধারণের জায়গা নেই। রাজ্যের এক হেভিওয়েট মন্ত্রী আসছেন। গাড়ি থেকে নেমে এঁদো গলি পেরিয়ে সপারিষদ আসতে তাঁর একটু সময় লাগছে। ফলে অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

অবশেষে তিনি এলেন। নিকটাত্মীয় বিয়োগের মত থমথমে মুখ, ধবধবে সাদা পাঞ্জাবির বুকে একটুকরো কালো ফিতে সেফটিপিন দিয়ে আটকানো।

ছোট্ট উঠোনটাতে পা দিয়েই দক্ষ নটের মত গলার শিরা ফুলিয়ে বক্তৃতা শুরু করলেন, ‘নির্ভীক’, ‘বীর’, ‘দেশব্রতী’— বিশেষণের পর বিশেষণ। তার মধ্যেই সুকৌশলে সোনালির জন্যে সরকারি চাকরির প্রতিশ্রুতি ঘোষণা হয়ে গেল।

সঙ্গে সঙ্গে হাততালির ফোয়ারা, ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল জিষ্ণু।

দাঁতে দাঁত চেপে এই কুনাট্য দেখতে দেখতে জিষ্ণু ভাবছিল, কী অসাধারণ পেশাদারিত্ব এদের! এমন শোকের আবহেও কী নিটোল রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন! সরকারি নিয়মেই কম্প্যাশনেট গ্রাউন্ডে মৃতের নিকটাত্মীয়র চাকরি পাওয়ার কথা! অথচ ঘোষণাটি এমনভাবে করা হল, যেন এটা এক মহান দলীয় বদান্যতা!

বোকা পাবলিককে দেখে দয়া হলেও দোষ দিতে পারল না জিষ্ণু। সরকারি দানখয়রাতি নিতে অভ্যস্ত হাতের তো এখন তালিই একমাত্র হাতিয়ার!

আবার কাঁধে তোলা হল কফিন। এবার গন্তব্য স্থানীয় ফুটবল মাঠ। সেখানে আপাতত রাখা থাকবে মৃতদেহ। আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতা-মন্ত্রীর আসবার কথা। কয়েকজন সরকার-পোষিত বিদ্বজ্জনও আসবেন। রাজদ্বার থেকে শ্মশান, আনুগত্য প্রমাণ করবার জন্যে তাঁরা নেতা-মন্ত্রীদের পেছনে ফেউয়ের মত সর্বত্র উপস্থিত থাকেন। হাসেন, কাঁদেন, হাততালি দেন এবং ক্যামেরা পেলে নিতান্ত অপ্রয়োজনেও চিবিয়ে চিবিয়ে ভাট বকেন।

গান স্যালুট দেওয়ার কথা আগেই ঘোষণা করা হয়েছে। এখন শুধু তাঁদের আসবার জন্যে অপেক্ষা!

দেশের জন্যে প্রাণ দেওয়া শহিদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে সরকার যে কতটা আন্তরিক, সেকথা জনসাধারণের মগজে গজাল মেরে না ঢোকানো পর্যন্ত হয়ত এই কুৎসিত প্রদর্শনী শেষ হওয়ার নয়!

পুরো বিষয়টার তদারকি করছেন সেই ভার্মা সাহেব! উনিও কী সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়ার চলমান বিজ্ঞাপন হয়ে উঠতে চাইছেন?

একটা অসহ্য যন্ত্রণায় জিষ্ণুর অন্তরটা ছারখার হয়ে যাচ্ছিল। অথচ ও বুঝে উঠতে পারছিল না, সেটা ঘৃণা, ক্রোধ, নাকি অবদমিত প্রতিশোধস্পৃহা।

কফিন কাঁধে হাঁটতে হাঁটতে হাতটা বার বার কোমরের সার্ভিস রিভলবারে চলে যাচ্ছিল। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সংযত রাখতে চেষ্টা করছিল সে।

তিন

অপারেশানের রাতের কথা মনে পড়ে গেল জিষ্ণুর। সেদিন মাঝরাতে বাছাই করা কয়েকজনকে নিয়ে গঠিত ফোর্স পাথরের আড়ালে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ফ্রন্ট লাইনে ওরা পাঁচজন, জিষ্ণু, অরিত্র, পুলক এবং দু’টি অপরিচিত ছেলে, ভার্মা সাহেবের আমদানি। উনি বলেছিলেন, অন্ধকারেও নাকি ওদের নিশানা অব্যর্থ! তবে ওদের পরিচয় খোলসা করেননি।

ফ্রন্ট লাইনকে কভার করে গাছের আড়ালে পাথুরে দেয়ালের পেছনে উদ্যত অস্ত্র হাতে বিরাট বাহিনী। রীতিমত যুদ্ধের আবহ।

সামনেই সেই তিরতির করে বয়ে চলা ছোট্ট পাহাড়ি নদীটি। দিনের বেলা স্বচ্ছ জলের নিচে নানা রঙের নুড়িপাথর স্পষ্ট দেখা যায়। বড়জোর হাঁটুজল। ওটা পেরোলেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অরণ্যবেষ্টিত উত্তুঙ্গ পাহাড়।

মাত্র মাস দু’য়েক আগেও পার্বত্য পরিষদের এই প্রধান ছিলেন পাহাড়ের শেষকথা, সরকারের চোখের মণি! ওদের প্রকৃত দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। অথচ ভাগ্যের এমনই পরিহাস, আজ তাঁকে হেফাজতে নেওয়ার জন্যেই এই গোপন অভিযান।

—জিন্দা ইয়া মুর্দা, অ্যাট ইনি কস্ট, উনকো চাহিয়ে!

ভার্মা সাহেব বলে দিয়েছেন, এটাই হায়েস্ট অথরিটির অর্ডার!

অসম্ভব নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পুলক বুঝি ওই কথাগুলোই ভাবছিল।

লোকটা নাকি নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্রে জামাই আদরে রয়েছেন। থাকবেন নাই বা কেন? তাঁর মেয়ের বয়েসি সবচাইতে ছোট বউ যে ওখানকারই মেয়ে!

তিনি নাকি গভীর রাতে এই করিডর দিয়ে মাঝে মাঝে এ রাজ্যে ঢুকে দলের লোকজনের সঙ্গে গোপন মিটিং করে সকাল হওয়ার আগেই ফিরে যাচ্ছেন। সোর্সের ইনফর্মেশন অনুযায়ী সেদিনও ওই পথে আসবার কথা তাঁর।

অত্যন্ত পুরনো এবং ঐতিহ্যশালী এই শৈলশহর। সাহেবরা আদর করে নাম দিয়েছিল পাহাড়ের রানি। গত একমাস ধরে লাগাতার বন্ধে সেই রানিরই নাভিশ্বাস ওঠার যোগাড়। দোকানপাট বন্ধ, রাস্তাঘাট শুনশান, দিনের বেলাতেও পুরো শহরটা জুড়ে যেন গা ছমছমে ভূতুড়ে আবহ। মাঝে মাঝে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে সরকারি অফিস, পর্যটন আবাস, সরকারি গাড়ি। সপ্তাহান্তে কয়েকঘণ্টার জন্যে বন্ধ শিথিল হলে শহরে আছড়ে পড়ছে ভিড়।

শহর এবং পার্শ্ববর্তী গাঁয়ের অবরুদ্ধ মানুষরা পাগলের মত হাতের সামনে যা পাচ্ছিলেন, তাই কিনছিলেন।

আশপাশের পাহাড়ের মাথায়, গিরিকন্দরে এবং শহরে তো বাসিন্দার সংখ্যা কম নয়! তাদের প্রয়োজনীয় খাবারদাবার থেকে শুরু করে ওষুধপত্র, সবেরই যোগান আসে সমতল থেকে। ফলে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসেরই দাম আকাশছোঁয়া। অথচ অসহায় নাগরিকদের সবকিছুই মুখ বুজে হজম করতে হচ্ছে।

আসলে এটা পাহাড়ে পুরনো রোগ। বিপাকে পড়লেই এখানকার নেতারা বড় বেশি জাতিসত্ত্বাবাদী হয়ে পড়েন। সাধারণ মানুষকে কখনও ধমকেচমকে, কখনও বা পৃথক রাজ্যের স্বপ্নালু ললিপপ দেখিয়ে এককাট্টা করতে উঠে পড়ে লাগেন। স্বভাব-সরল পাহাড়ের মানুষরাও আনুগত্যের ব্যাপারে বরাবর প্রশ্নহীন।

পাহাড়ি ঐতিহ্য হল, ক্ষমতা পেলে সকলেই ফ্রাঙ্কেস্টাইন হয়ে ওঠেন! ফলে আপাত শান্ত জনপদগুলির নিয়ন্ত্রক শক্তি বরাবরই বিপাকে পড়লে বারুদের স্তূপে একটুখানি আগুনের ফুলকি ছুড়ে দিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে উত্তেজনার আঁচ পোহান।

এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আজও পাহাড়ের এক বিরাট সংখ্যক মানুষ ওই পলাতক নেতার হাতের পুতুল, যন্ত্রমানবের মত বোধহীন আজ্ঞাবাহী।

ট্রাডিশন অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে রাজ্যের শাসকের প্রয়োজনেই পাহাড়ে একের পর এক বশংবদ তৈরি হয়েছে। যতদিন সে শাসকের পক্ষে থেকেছে, ততদিন সে চূড়ান্ত গণতন্ত্রপন্থী এবং শাসকের নয়নের মণি। কিন্তু হাতের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে কিংবা বিপক্ষে গেলেই তাঁকে ফের তালুবন্দি করার জন্যে মরিয়া চেষ্টা শুরু হয়। এ যেন বোতল থেকে বেরিয়ে পড়া দৈত্যকে ফের বোতলবন্দি করার উদ্যোগ।

বেশ কিছুদিন ধরে একটু একটু করে সমতলের সঙ্গে পাহাড়ের মতানৈক্য তৈরি হচ্ছিল। অবশ্য আন্দোলনটা শুরু হয়েছিল একটা আপাত-নিরীহ বিষয়কে কেন্দ্র করে। স্বায়ত্তশাসন মানে যে স্বেচ্ছাচার নয়, সর্বসাধারণের কাছে এটা তুলে ধরার জন্যে রাজ্যের দেওয়া উন্নয়নের টাকা কীভাবে, কোথায়, কতটা খরচ হল, তার হিসেব চেয়েছিল রাজ্য। আর সেটা বুঝে নিতে পাঠানো হয়েছিল স্পেশাল অডিট টিম।

ব্যাস, এতদিনকার পারস্পরিক চাপানউতোরের আগুন তো ছিলই, তাতে ঘৃতাহুতি পড়তে যেটুকু সময়। সুপ্ত আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটালেন সেই পাহাড়ি নেতা, যার চোখধাঁধানো বৈভব চিরকালই পাহাড়ি মানুষরা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে এসেছেন।

প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশি দমনে কিছুটা কাজ হয়েছিল। প্রশাসন সুরক্ষার আশ্বাস দেওয়াতে হরতাল উপেক্ষা করে দোকান-বাজার, অফিস-কাছারি খুলতেও শুরু করেছিল। কিন্তু কয়েকজন বিরুদ্ধপন্থী (ওদের ভাষায় ‘গদ্দার’)-র ওপর চোরাগোপ্তা আক্রমণ, দোকান পুড়িয়ে দেওয়া এবং বারংবার জিনিসপত্র লুট হতে থাকায় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে শুরু করেছিল।

সেই আগুন-খেকো নেতা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেলেন বটে, কিন্তু তার চ্যালারা সুকৌশলে পাহাড়ি জনজাতির প্রতি সমতলের বঞ্চনার ধুয়ো তুলে আবার পাহাড়ি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে লেগে পড়ল। আগুনের মত গুজব ছড়ানো হল, সমতলের পুলিশ পাহাড়ি ভাই-বোনদের নিগ্রহ করছে! নতুন করে শুরু হল বনধ সমর্থকদের মিটিং, মিছিল এবং সন্ত্রাস।

অনিবার্যভাবে পুলিশ হয়ে উঠল আন্দোলনকারীদের সফট টার্গেট। সকাল থেকে সন্ধে, শহর জুড়ে ভারি বুটের টহলের মধ্যে আশপাশের বাড়ির জানালা কিংবা ছাদ থেকে উড়ে আসা চোরাগোপ্তা বুলেট এফোঁড়ওফোঁড় করে দিতে লাগল ভিনরাজ্যের আইনরক্ষকদের! হ্যাঁ, ওদের চোখে জিষ্ণুরা অনেক আগে থেকেই ভিনরাজ্যের পুলিশ।

পাহাড়ের আবেগের সঙ্গে মিশতে লাগল আত্মগোপনকারী নেতাদের ক্রমাগত উস্কানি। ফলে পাহাড়ি ঐক্য ফের দানা বাঁধতে শুরু করল।

ঠিক এই সময়ে এক জরুরি মিটিং ডাকলেন ভার্মা সাহেব। গভীর রাতে, যাতে কাকপক্ষীতেও কিছু আঁচ করতে না পারে। ওঁর হাতে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর রিপোর্ট, ক্রমাগত বন্ধ-অবরোধে পাহাড়ের বেশিরভাগ মানুষ বীতশ্রদ্ধ। শুধু প্রাণের ভয়ে তাঁরা নাকি এগিয়ে আসতে পারছেন না।

উনি বোঝালেন, পাহাড়ের আগুন নেভাতে এবার এই অসন্তোষকেই কাজে লাগাতে হবে। মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনবিরোধী এবং রাজ্য প্রশাসনের প্রতি আস্থাশীল করে তুলতে হবে। আর এর জন্যে দরকার একটা বিরুদ্ধ আবেগ। যাতে ধীরে ধীরে জনমত বদলাতে শুরু করে। এই আন্দোলনের নামে বনধের নায়ককে যে করেই হোক জনমানসে খলনায়ক হিসেবে তুলে ধরতে হবে!

তিনি অত্যন্ত গোপনে তৈরি করলেন অপারেশনের ব্লু-প্রিন্ট, কিন্তু প্রকাশ করলেন না। অপারেশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে কিছু জানানো যাবে না, হায়ার অথরিটির নির্দেশ!

ইতিমধ্যেই তিনি বাহিনীর সকলের বড় কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। তবে পুলককে যেন একটু বেশি-ই পছন্দ করতে শুরু করেছিলেন সাহেব। বলতেন, আমি লড়াকু এবং সাহসী মানুষ পছন্দ করি। একটা নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় লেখাপড়া শিখে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেখলেই আমার নিজের অতীত মনে পড়ে যায়!

একদিন বিনা নিমন্ত্রণে পুলকের কোয়ার্টারে গিয়ে লাঞ্চও করে এলেন তিনি। পুলক তো কৃতজ্ঞতায় একেবারে আত্মহারা! বলেছিল, এসব ঝামেলা মিটলে খুব ভাল করে পরীক্ষাটা দিতে হবে, বুঝলি। যে করেই হোক, পুলিশ সার্ভিসটা ক্র্যাক করতে হবে। ভার্মা সাহেব আমার আদর্শ, সবকা সাথ, সবকা পাস!

হাড় হিম করা ঠান্ডার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কাঁপুনি ধরে যাচ্ছিল। আগের দিন পূর্ণিমা ছিল, আকাশে বিরাট থালার মত চাঁদ। দুধসাদা জ্যোৎস্নায় চরাচর যেন ভেসে যাচ্ছিল। নদীখাতের শুকনো বালি আর নুড়ির উপর চাঁদের আলো পড়ে ঝিকমিক করছিল।

ওদের দায়িত্ব ছিল নদী পেরিয়ে কাউকে আসতে দেখলেই বাহিনীকে সংকেত পাঠানো।

পিছনে লুকিয়ে থাকা বিরাট পুলিসবাহিনীর ভরসায় ওরা হয়তো কিছুটা হালকা মেজাজে ছিল। ওই এলাকাটাতে ভয়ংকর জোঁকের উপদ্রব। জিষ্ণুর মনে হচ্ছিল, মোজা টপকে যেন দু-একটা জোঁক পায়ে উঠে পড়েছে। সেগুলোকে খোঁজার জন্যে ও সবে নিচু হয়েছে, ঠিক সেই সময়ে একটা শিসের মত তীক্ষ্ণ আওয়াজ যেন কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে দ্বিতীয় বার একই শব্দ।

রাত্রির নৈঃশব্দ্য খান খান করে গা-ঘেঁষা একটা আর্তচিৎকার, তার পরেই ঝুপ করে ভারি কিছু পড়ার শব্দ। জিষ্ণুর মেরুদণ্ড বেয়ে ভয়ের একটা হিমেল স্রোত যেন নেমে গেল। ধবধবে চাঁদের আলোয় সে অবাক হয়ে দেখল, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে একজন উর্দিধারীর দেহ পাক খেতে খেতে গড়িয়ে নেমে যাচ্ছে।

চার

ভার্মা সাহেবের অনুমান যে কতটা অভ্রান্ত, দু’চার দিন যেতে না যেতেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। খবরের কাগজ খুললেই সন্তানহারা মায়ের করুণ মুখের ছবি। টিভির পর্দায় মায়ের রক্তে ভিজে ওঠা ছেলের কফিনের ওপরকার সাদা ফুলের ক্লোজ আপ, বুকফাটা কান্নার শব্দ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বুদ্ধিজীবীদের বিদগ্ধ আলোচনা, সব মিলিয়ে যেন দ্বিতীয় কার্গিলের চিত্রকল্প। সোনালিকে নিয়ে টিভি চ্যানেলগুলির কাড়াকাড়ি, সদ্যবিধবা সুন্দরী যুবতীর চোখের জলের টি আর পি বোধ হয় সবচেয়ে বেশি।

সমতলের সহানুভূতির ঢেউ আস্তে আস্তে আছড়ে পড়তে লাগল পাহাড়ে। দুর্দান্ত জনরোষে দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল সেই পলাতক পাহাড়ি নেতার গাড়ি, বাড়ি এবং মহার্ঘ আসবাবপত্র। রাতের অন্ধকারে চুরি হয়ে যেতে লাগল নানা মূল্যবান সামগ্রী। অত্যন্ত দ্রুত হাওয়া ঘুরতে শুরু করল। কয়েকদিনের মধ্যে পাহাড়ের একদা অবিসংবাদিত নেতা এই একটামাত্র মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাতারাতি খলনায়ক হয়ে গেলেন।

মাসখানেকের মধ্যে পাহাড়ের জনজীবন স্বাভাবিক হয়ে এল। ভার্মা সাহেবের মুখে চওড়া হাসি। তবে সে রাতের পর থেকেই ভার্মা সাহেব যেন দ্রুত বদলাতে শুরু করলেন। নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে আজকাল দেখা হলে আর আগের মত হেসে কথা বলেন না। কারণে-অকারণে অধস্তনদের প্রতি পুলিশি গালাগাল, এক্সপ্ল্যানেশন আর শো-কজ শুরু হল! তিনি যেন রাতারাতি হারুন আল রসিদের জনপ্রিয় জোব্বাটা ছুড়ে ফেলে কড়া পুলিশকর্তার পুরনো উর্দিতে ফিরে গেলেন।

বিজ্ঞ মানুষেরা বলেন, পলিটিক্যাল ভ্যাকুয়াম নাকি স্থায়ী হয় না। কথাটা যে কতখানি সত্যি, পাহাড়ের দ্রুত বদলাতে থাকা পরিস্থিতি তার প্রমাণ। অল্পদিনের মধ্যে নতুন নেতারা জায়গা করে নিতে লাগলেন, শোনা গেল, তাদের হাতেই দেওয়া হবে স্বায়ত্তশাসনের ভার। আর ক্ষমতা প্রত্যর্পণের গুরু দায়িত্বটুকু মিটিয়েই ভার্মা সাহেব সমতলে ফিরে যাবেন।

ছুটিতে ছিল জিষ্ণু। পুলকের শেষকৃত্য সেরে ফেরার পরেই জ্বরে পড়েছিল। এখনও শরীর পুরোপুরি সুস্থ হয়নি।

সোনালির চাকরির ব্যাপারে একবার ভার্মা সাহেবের সঙ্গে দেখা করার দরকার ছিল। চেম্বারের সামনে ওকে দেখে একান্ত সচিব রোশন তামাং হ্যান্ডশেক করার জন্যে হাত বাড়িয়ে দিল।

হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল, সাবকো মিলনা হ্যায়? যাইয়ে না! অন্দরমে কোই নেহি হ্যায়। আজ সাহাব ভি বহোত খুশ হ্যায়, উনকা প্রোমোশন মিল গিয়া। আভি আভি অর্ডার আয়া!

জিষ্ণু দরজার সামনে পৌঁছে শুনল, সাহেব টেলিফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছেন। ভেতরে ঢুকতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল। মনে পড়ল, ইদানীং প্রোটোকলের ব্যাপারেও সাহেব খুব কড়া হয়ে উঠেছেন, সামান্য বিচ্যুতিতে অনেকেরই চোদ্দো পুরুষ উদ্ধার করে ছেড়েছেন। সুতরাং এই টেলি-আলাপের মধ্যে ঢুকে পড়লে বিপদ হতে পারে!

সাহেবের ঘরের সামনে ভারি পর্দাটা তির তির করে দুলছিল। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ ওর মনে হল, সাহেব টেলিফোনে যেন সেদিনকার অপারেশন নিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলছেন।

উনি কাউকে বলছেন, ইট ওয়াজ মাই চয়েস স্যার! ইয়ং, গুডলুকিং, ব্ল্যান্ট, ফ্রম অ্যা ভেরি পুয়োর ফ্যামিলি অ্যান্ড অ্যাবভ অল, নিউলি ম্যারেড টু অ্যা বিউটিফুল গার্ল! পাবলিক সিমপ্যাথির জন্যে আর কী চাই?

একটু থেমে আবার বললেন, বাট সাম ক্রেডিট শুড গো টু য়্যু অলসো, স্যার! আনলেস য়্যু হ্যাড ম্যনেজড দ্য মিডিয়া—

জিষ্ণুর মনে হল, ওর পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে, মাথার ওপর হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছে আস্ত একটা পাহাড়।

ওকে মাতালের মত টলতে টলতে নেমে আসতে দেখে রোশন ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ক্যা হুয়া জিষ্ণুজি? তবিয়ত ঠিক হ্যায় তো? লিজিয়ে, পানি পিজিয়ে।

জিষ্ণু চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, পানিউনি কুছ নেহি চাহিয়ে ভাইয়া! আগর সির্ফ এক লোডেড রিভলবার মিলতা, আভি, ইসি ওয়াক্ত—

রোশন ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেল। মনে হল, লোকটা যেন হঠাৎ পাগল হয়ে গেছে!

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়
Advertisement
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »