তরুণবাবুর এবারও যাওয়া হল না আশ্রমে। প্রায় যাব যাব করেও নাকের পাশ, না না, কানের পাশ দিয়ে ফাঁড়াটা হুস করে চলে গেল। এবার বউমার পা ভেঙেছে।
এমনিতে দশটায় শুয়ে পড়েন। রাতে বার তিনেক বাথরুমে যান। প্রথম বার যাওয়ার সময় বসবার ঘরে তিয়াসা আর সন্দীপ গলা নামিয়ে কোন আশ্রম ভাল হবে সেই আলোচনা করছিল। প্রথমটা খেয়াল করেননি। বাথরুম থেকে বেরোবার সময় স্পষ্ট শুনলেন ‘গঙ্গার ধার বাবার খুব প্রিয় জায়গা। এটা তো ওখানেই, দেখো হয় কিনা।’
ভেবে দেখলেন তেমন গণ্ডগোল তো উনি ইদানীং করেননি। নিজের ঘরেই বেশি থাকেন। নাতিকে ছোটবেলায় পড়াতেন। এখন তিয়াসা টিচার রেখেছে। তিনি এসেই পড়িয়ে যান। মাত্র ক্লাস ফাইভ অভিবাবুর। বউমা ব্যাঙ্কে চাকরি করে। ছেলে আইটি কোম্পানিতে বেশ অনেক বছর। অসুবিধা বলতে তিনটি ঘর। অসুবিধা হয় বন্ধুবান্ধব এলে। রাত্রিবেলা অসুবিধা, বন্ধুবান্ধব নিয়ে পার্টি হলে। সেটা উনি মেনে নিয়েছেন। এই বয়েসে এদের ছেড়ে থাকতে যাতে না হয় তাই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। বাড়ি ছেড়ে পার্কে অনেক বন্ধু করে নিয়েছেন। ঘরে চুপচাপই থাকেন।
বাকি রাত মনটা ভিজে তুলতুলে হয়ে গেল। চোখের কোল দিয়ে সেই পুরনো বিচ্ছিরি লজ্জাজনক জলের ধারায় বালিশ ভিজে গেল। প্রথমবার তো, শুনে মন খুব ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। বয়সের জন্যে চোখের জল কথায় কথায় বাড়বাড়ন্ত। যেন জ্যান্ত পরপারে পাঠিয়ে দিচ্ছে। দু-রাত ঘুমোতে পারলেন না। ছেলে, ছেলের বউ আর নাতি— তিনজনের ওপরই খুব নেমোখারামির রাগ হল। কী করেননি ওদের জন্যে। সুবীরবাবুর উপদেশ মনে পড়ে গেল। সেই টাইগার আর মেষশাবকের গল্প। ‘তুমি কিছু করো আর না করো ভাসান ঠিক হবেই।’ দু-পাক হেঁটে সুবীরবাবু এইটাই বলতেন, ‘তুমি হচ্ছ মূর্তিমান বিবেক। পদে পদে ভুল ধরার জন্যে, আমার সময় এই হত’, মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বক্তৃতা দিতেই থাকবেন। ‘একটু হাত-পা ছড়িয়ে দু-দিন থাকব তার জো নেই। আমরা যাই খাই না কেন বাবার জন্যে মুড়ি, বাবার জন্যে দুধ, কলা, রোজ রোজ ডাক্তার, ডাকতেই হয়। ছুটি নিয়ে যে একটু এদিকওদিক যাব তখনই, বাবা কী করবে?’ সুবীরবাবু কিন্তু শেষ অবধি হুস করে করোনায় চলে গেলেন।
যে কোনও আঘাত প্রথম প্রথম কষ্ট হয় খুব, তারপর সহ্য হয়ে যায়। দু-দিন বাদে যখন আস্তে আস্তে সয়ে এল, ঠিক সেই সময় বাথরুমে পড়ে গিয়ে পা ভাঙল তিয়াসার। এমনই ভাঙল যে ডাক্তার বললে, স্ক্রু বসতে হবে। জায়গাটা ক্রিটিকাল। বউমাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাইরে সন্দীপ আর তরুণবাবু বসে। এখনি উত্তম সময় বলবার। একটু গলা কেশে ছেলেকে বললেন, ‘বাবু, বউমা ফিরে এলে আমি একটা জায়গা ঠিক করে রেখেছি, সেখানে চলে যাব।’
ওর এখন অনেক চিন্তা তিনমাস বউকে শুয়ে থাকতে হবে, তারপর ফিজিওথেরাপি। ঠিক হতে হতে ডাক্তারবাবু বলছেন পাক্কা ছয় মাস।
সন্দীপ মোবাইল ঘাঁটছিল, কিছুই শুনতে পেল না।
আবার রিপিট করলেন, ‘বলছি আমি একটা জায়গা দেখেছি। সেখানে আমার এক বন্ধু থাকে।’
এবার সন্দীপ শুনে মোবাইল থেকে মুখ তুলে তাকাল, ‘দেখছ, বাড়িতে এরকম অবস্থা। তোমার এখনই যাবার সময় হল? সত্যি বাবা। তিয়াসা ঠিক হোক তারপর গিয়ে থেকো ক’দিন।’ বলে আবার মোবাইলে ঢুকে যায় সন্দীপ। তার মানে স্ক্রু বসানো, তারপর বলবে স্ক্রু খোলা। না, ওরা মুখে বলার আগেই নিজেকেই গুছিয়ে নিতে হবে। বন্ধু নিবারণকে ফোন করে জানলেন জায়গা হবে কিনা। নিবারণ অনেকদিন ওখানে গিয়ে ঠেকেছে ঠোক্কর খেতে খেতে। জায়গা হলে কত ডিপোজিট আর কী মান্থলি দিতে হবে? সেটা যেন ফোন না করে এসএমএস করে জানায়। সন্ধেবেলা উত্তর এল, জায়গা আছে তবে খুব ডিমান্ড, কতদিন থাকবে জানা নেই। একটু বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। তিয়াসা বিছানায়। নাতি অভিবাবু একটু মনমরা মায়ের জন্যে। মোড়ের মাথায় স্কুলের বাসে তুলে দেওয়া নামিয়ে নেওয়া ওর মা করে, সেটা উল্টে এখন তরুণবাবুর ঘাড়ে। সকালের হাঁটাহাঁটিটা আরও সকালে যেতে হয়। না হলে নাতিবাবুর অসুবিধা।
বউমাকে দেখবার জন্যে আয়া আছে। কিন্তু যদি কাজের লোক কোনওদিন না আসে তাহলে বাড়ির অন্যান্য কাজে হাত লাগানো। যেই অপারেশন হল অমনি আশ্রমের কথা একদম বন্ধ। যেন কোনওদিন আলোচনা হয়ইনি। সত্যি এ নাকি নিজের ছেলে। ভাবতেও লজ্জা লাগে।
মাস পাঁচেক বাদে ফিজিওথেরাপি করবার পর বউমা অনেকটা সুস্থ। সন্ধেবেলা বারান্দায় একটু একটু হাঁটতে পারে। তরুণবাবু আবার ফোন করলেন নিবারণকে, ‘এখন কী অবস্থা? খালি কিছু আছে?’
নিবারণ আমতা আমতা করে বলল, ‘শেষ ছয় মাস হাড় জ্বালিয়ে অরুণ সামন্ত মারা গেছে দুদিন হল। এখনও ঘরে ওনার জিনিসপত্র আছে। নিয়ে যায়নি। তুই কি ওইভাবে ওখানে এসে থাকতে রাজি হবি? নাহলে একটু সময় লাগবে।’
তরুণবাবু একটু দমে গেলেন। বললেন, ‘পরে জানাচ্ছি মেসেজ করে।’ এদিকটা একটু আড়ালেই রাখতে চান। তিয়াসা হাঁটতে পারার পরও কিন্তু অভিবাবু বায়না ধরল, ‘দাদুই আমাকে তুলে দেবে নামিয়ে আনবে মোড়ের মাথা থেকে। আমি মায়ের সঙ্গে যাব না।’
সন্দীপ জিজ্ঞাসা করল, ‘কেন রে? মা তো এখন ভালই হয়ে গেছে। ডাক্তারও বলেছে স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতে। তোর কী ঝামেলা?’
‘‘না, মা আসা-যাওয়ার সময় খালি বকবক করে— ‘এই করবি কিন্তু, ওইটা জিজ্ঞাসা করব কিন্তু, টিচার কী পড়া জিজ্ঞাসা করল?’ আমি যাব না।’’
সন্দীপ বাবার দিকে মুখ তুলে হেসে ফেলল। জিজ্ঞাসা করল, ‘দাদু কী করে?’
‘‘দাদু শুধু শোনে। ‘আজ কী হল? ক’টা গোল করলে? কী খেললে?’ আর, বকে না।’’
তরুণবাবু ভাবলেন বড্ড মায়ায় জড়িয়ে যাচ্ছেন। এরমধ্যে গঙ্গার ধারে কী কী আশ্রম আছে কাছেপিঠে সে খবরও নিয়েছেন।
গতকাল থেকে গা-টা ম্যাজম্যাজ করছে। গলায় কী যেন আটকে। সকালের চা খেয়ে শুয়েই ছিলেন। কী হল কে জানে। কিছু হলে খুব লজ্জার। ছেলে, ছেলের বউয়ের বিরক্ত মুখ দেখতে হবে। এমন সময় সন্দীপ আর তিয়াসা হাসিমুখে এসে দাঁড়াল। ‘বাবা আপনার গঙ্গার ধারের প্রতি টান অনেক দিনের।’ বলতে বলতে মুখ গম্ভীর হয়। ‘কী হল বাবা?’
সচকিত হয়ে ওঠে সন্দীপ, ‘শরীর খারাপ নাকি?’
সেই মোক্ষম প্রশ্ন। উঠে বসলেন, ‘ওই, গা-টা একটু ব্যথা ব্যথা করছে।’
‘দেখি’, তিয়াসা তাড়াতাড়ি হাত রাখে কপালে। ওদের কথা আর শেষ হয় না। বলে, ‘এ কী? বাবার তো বেশ জ্বর।’
ব্যস, শুধু জ্বরে থামল না। গলাব্যথা, ডাক্তার ডাকা হল তরুণবাবুর প্রবল আপত্তিতেও। সব টেস্ট হয়ে কোভিড পজিটিভ হয়ে গেল। নিমেষে বাড়ির অবস্থা হয়ে গেল জেলখানার মত। লজ্জায় ওর মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু উপায় নেই। প্রথম পনেরোদিন কোভিড, তারপর পনেরো দিন দুর্বলতা। আবার মাসখানেকের ধাক্কা। খারাপ লেগেছে। ওর জন্যে সন্দীপ আর তিয়াসার বিড়ম্বনার শেষ নেই। দেখে তো মনে হচ্ছে ওরা খুব উদ্বিগ্ন। আসলে যে কী, সেটা তো উনি জেনে ফেলেছেন। কিন্তু একটু চাপা আনন্দ তো আছেই। নাতিবাবুকে আরও কিছুদিন কাছে পাবেন।
তালগোলে আশ্রম ব্যাপারটা একটু আবছা হয়ে গিয়েছিল। তাহলে বোধহয় এখন চাপা পড়েছে। আবার হাঁটাহাঁটি শুরু করেছেন। সেদিন সন্দীপ বাড়িতে, তরুণবাবু হেঁটে এসে বসার ঘরে বসেছেন। বউমা, ছেলে দুজনই টিভি দেখছে। তরুণবাবু আড়চোখে খেয়াল করলেন সেই বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে সিরিয়ালটা হচ্ছে। উনি আস্তে আস্তে উঠে যাচ্ছিলেন। এমন সময় ছেলে বলে উঠল, ‘বাবা, যেয়ো না। অনেকদিন ধরে তোমাকে একটা কথা বলব বলে ভাবছি কিন্তু কোনও না কোনও কারণে বলা হচ্ছে না।’
তরুণবাবুর বুকের মধ্যে ঘণ্টা বাজল। ছেলে-বউ নির্বিকার। এইবার আর নিস্তার নেই। শেষ সময় আগত। কিছুটা আহত ব্যক্তির মত বললেন, ‘বসলাম। বলো কী বলবে।’
সন্দীপ একটু অবাক হয়ে বলল, ‘তুমি কি খুব ডিস্টার্ব আছ? তাহলে পরে বলব।’
অনেক কষ্ট চেপে ম্লান হাসি দিলেন, ‘না না, একদম নয়। তুমি বলো।’
সন্দীপ টিভিটা মিউট করে বলল, ‘মনে আছে, তুমি বলতে তোমার গঙ্গার ধারে থাকার খুব ইচ্ছে ছিল একসময়?’
ছেলের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। মনে মনে বললেন, ‘বলে ফেলো, বলে ফেলো। ওসব ভনিতা করে কিছু লাভ নেই।’
সন্দীপ এগোয়, ‘তোমার ইচ্ছেমত তোমার জন্যে একটা জায়গা দেখেছি। কালকেই চলো দেখে আসি।’
এইটাই অনেক দিন ধরে এই আসব, এই আসব করছিল। আদেশ এসে গেছে। এখন সেটা কর্মে প্রয়োগ করতে হবে।
তরুণবাবু অন্যদিকে তাকিয়ে শুধু বললেন, ‘বেশ চলো।’
যেতে যেতে শুনলেন তিয়াসা বলছে, ‘বাবা মনে হচ্ছে খুশি হননি। কিন্তু এর থেকে সস্তায় এত ভাল জায়গা…।’ বাকিটা আর শুনতে পেলেন না।
জিটি রোড থেকে একটু ঢুকে একটা বিরাট পাঁচিল দেওয়া গেট। ওপরে লেখা ‘নিজের আশ্রম’। তার নীচে বয়স্কদের শহর। নামটা বেশ অদ্ভুত। ছেলে-বউমা দুজনই খুব উত্তেজিত দেখে। তরুণবাবু আজ নির্বিকার। বধ্যভূমিতে নিয়ে যাচ্ছে এরা। ভিতরে ঢুকে পিচের রাস্তা চলে গেছে তিনদিকে। ছোট ছোট একতলা দোতলা সুন্দর ঝকমকে বাড়ি। সঙ্গে সবুজ বাগান। ঠিক যেন ইউরোপের কোনও পাড়া উঠে এসেছে। গাড়ি নিয়ে যেতে যেতে মনে হল, অন্তত কিছু না হোক তিরিশ-চল্লিশটা ছোট ছোট বাড়ি। কিছুটা ভিতরে গেলে রাস্তার পাশেই গঙ্গা নদী বয়ে চলেছে। বড় বড় গাছের ছায়া রাস্তার ওপর। ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে চলেছে।
তাহলে এখানেই রেখে যাবে ওরা। মনটা আবার হুহু করে উঠল। একাকিত্বের বড় ভয়।
একটি বাংলোর সামনে এসে দাঁড়াল সন্দীপের গাড়ি। একজন ম্যানেজার গোছের কেউ দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনিই দরজা খুলে ভিতরে নিয়ে গেলেন। সুন্দর সাজানো ছিমছাম একটা এক শয্যাবিশিষ্ট বাংলো। পিছনে নানা গাছের সমারোহ। কিছু ফুল ফুটে আছে। সামনে বারান্দা, তার পর পিচের রাস্তা। পাঁচিলের ওপাশে সামনে দূরে গঙ্গা হয়ে। এককথায় বেড়াতে এলে অপূর্ব। ছাড়া ছাড়া বাংলো। যেন এদেশই নয়।
এরা কি দ্বীপান্তর দেবে? মতলবটা বোঝা যাচ্ছে না। লোকটি চলে গেলে সন্দীপ আর তিয়াসা ঘর, বারান্দা, বসার ঘর, শোবার ঘরের আসবাবপত্র নেড়েচেড়ে দেখছিল। এবার সোজাসুজি তরুণবাবু আবেগী গলায় বললেন, ‘খোকা, তোমরা কি আমাকে এখানে রেখে যেতে এসেছ? এই বয়সে এরকম একা থেকে নিজে বাজার রান্না করে…।’
তিয়াসা হাসতে হাসতে থামিয়ে দেয়, ‘বাবা, কুল। আপনার এরকম মনে হল? আপনাকে এইভাবে আমরা একা ছেড়ে যাব?’
রহস্যটা বুঝতে পারেন না তরুণবাবু। সন্দীপ বলল, ‘বসো, তোমায় খুলে বলি।’
তরুণবাবুর কাছে কেমন সব গোলমাল মনে হয়।
‘শোনো বাবা, আমি ইকোনমিকসের ছাত্র। তোমার পুরনো বাড়ি বেচে, কিছু লোন নিয়ে আমাদের ফ্ল্যাটটা করেছিলাম।’
তরুণবাবু ঘাড় নাড়েন দম দেওয়া যন্ত্রের মত।
‘তুমি তোমার বাড়ি আমাদের তুলে দিয়েছিলে। কারণ আমাদের ফ্ল্যাটের জন্যে অনেক টাকার দরকার হয়েছিল।’
‘সে তো বুঝলাম। কিন্তু এইটার ব্যাপার?’
‘হ্যাঁ, এখন আমরা পারি। তাই আমি আর তিয়াসা ভেবেছি তোমার জন্যে গঙ্গার ধারে একটা বাড়ি করে দেই। এই বাড়িগুলো ঠিক বৃদ্ধাবাস নয়। এগুলোতে থাকলে তুমি নিজে রান্না করে খেতে পারো, আবার কমন ক্যান্টিন আছে সেখানে গিয়ে খেতে পারো। কাজের লোক আছে চাইলে সে এসে বাসন মেজে ঘর মুছে, জামাকাপড় ধুয়ে দেবে, বাগান পরিচর্যা করবে দুদিন পর পর এসে। এখানে শুধু বৃদ্ধ মানুষরাই কিনতে পারে বাংলো। থাকতে পারে। তার ইচ্ছে করলে তার কাছে এসে তার ছেলেমেয়ে সবাই এসে থাকতে পারে। তবে মালিক ছেলেমেয়েরা হতে পারবে না। সিনিয়র সিটিজেন হতে হবে। এখন বলো তোমার পছন্দ কিনা? তুমি বললে এটা আমরা তোমার নামে কিনতে চাই।’
তরুণবাবু সব কিছুই ধোঁয়া ধোঁয়া শুনলেন। শেষে মাথা নামিয়ে বললেন, ‘কবে থেকে থাকতে হবে আমাকে?’
সন্দীপ এবার বাবার হাতটা ধরে ফেলল, ‘তুমি কোথায় যাবে? এ তো আমাদের ভবিষ্যতের ব্যবস্থা। তোমার তো বাবা অনেক কাজ এখন। আমাকে যেমন অঙ্ক ইংরেজি শিখিয়েছ, তেমনই অভিকে না শিখিয়ে দিলে তো তোমার ছুটি নেই।’
শিশুর মত এবার হেসে ওঠেন, এতদিনের বুকের ওপর জমে থাকা পাথরটা একনিমেষে নেমে যায়।
সন্দীপ বলল, ‘তোমাকে আমার একা ছাড়তে খুব ভয়। কোথায় কী করে ফেলবে? এই তো দেখলে কেমন হুস করে কোভিড হল। আমরা না থাকলে কী কেলেঙ্কারি হত?’
‘তাহলে এটা কিনছিস কেন?’
‘বুঝলে না? ধরে নাও এটা শোধবোধ। এটা তোমার গঙ্গার ধারে বাড়ি হল, আমাদের ভবিষ্যতের ঠিকানা হল, তোমার নামের বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়াও হল। আমরা সবাই মাঝে মাঝে এসে থাকব। বলো কেমন হবে?’
‘কিন্তু খোকা, আমি তো সবার থাকার জন্যেই বাড়ি বেচতে বলেছিলাম। আমার বলে কখনও কিছু ভাবিনি। বিনিময় কিছু চেয়েছি?’
তিয়াসা এতক্ষণ চুপচাপ বাবা-ছেলের কথাবার্তা শুনছিল। এবার এগিয়ে এসে বলল, ‘কিন্তু বাবা, আমরা তোমার মত এতটা ভাল নই। তোমার মত হলে আমাদের বয়েসকালে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে শূন্য হাতে। তাই তোমার হাত ধরে ভবিষ্যতের দিনযাপনের ব্যবস্থা করে রাখলাম।’
তিয়াসার মুখের দিকে তাকিয়ে তরুণবাবু আর দাঁড়াতে পারলেন না। জোরে হেঁটে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন। গঙ্গার দিকে অস্তমিত আলোয় চেয়ে রইলেন চুপ করে। অনেক কষ্ট করে নিজেকে সামলে নিলেন। এমন অপরাধী কখনও মনে হয়নি। লজ্জাও পেলেন, সঙ্গে কিছুটা চাপা আনন্দও মিশেছিল। তাকিয়ে অনেক কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক করে পিছন ফিরে বললেন, ‘তোমরা জানো না। আমিও ততটা ভাল নই। আমি খুব আনন্দিত এবং লজ্জিত।’ বলে বারান্দা পেরিয়ে রাস্তায় নামনেল। সন্দীপ আর তিয়াসা পরস্পরের দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। মনে ঘুরতে লাগল বাবার শেষ কথাগুলো।
কী সুন্দর গল্পটা! প্রচলিত বৃদ্ধ নিবাসের গল্প থেকে ভিন্ন। খুব অন্তর ছুঁয়ে গেল। আর টানাপোড়েনগুলো ভীষণ বিঁধলও।