Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ছোটগল্প: বিড়াল

এক-্এক জনের একেকটা নেশা থাকে। গোবর্ধনবাবুর নেশা লেখা। শুধু তাই নয়, গোবর্ধনবাবু চান পুরোদস্তুর লেখক হয়ে উঠতে। গোবর্ধনবাবুর অনেক লেখা ছাপাও হয়। কিন্তু পুরোদস্তুর লেখক হতে গেলে যতটুকু ছাপা হওয়া দরকার ততটা নয়। এই লেখা ছাপা নিয়ে গোবর্ধনবাবুর একটা অন্য দুঃখও আছে। পত্র-পত্রিকায় তাঁর যেসব লেখা ছাপার মুখ দেখে সেগুলোর বেশিরভাগই একবারে ছাপা হয় না। হয়তো একটা লেখা একটা পত্রিকায় পাঠালেন। চার-পাঁচমাস পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। কোনও সাড়া না পেলে সেটা আবার পাঠালেন অন্য কোথাও। আবার প্রতীক্ষা। ওখানে না ছাপা হলে আবার অন্য কোথাও। এভাবে ছাপার মুখ দেখতে কোনও কোনও লেখার দু’বছরও গড়িয়ে যায়। অনেক সময় গোবর্ধনবাবুর মনেই থাকে না, প্রথমে কোন পত্রিকা দিয়ে শুরু করেছিলেন।

এই লেখা পাঠানো আর প্রতীক্ষার টানাপোড়েনে গোবর্ধনবাবু বেশ কিছুদিন ধরে একটা লেখা নিয়ে খুব বিব্রত আছেন। লেখাটা ফিচার জাতীয়। লেখাটা তৈরি করেছিলেন অনেকদিন আগে। লেখাটা এখনও ছাপা হয়নি সেটা কোনও গল্প নয়। গল্পটা অন্য জায়গায়।

প্রথমে লেখাটা পাঠিয়েছিলেন ‘নবকুসুম’ দৈনিকের রবিবারের সাপ্লিমেন্টারিতে। ‘নবকুসুম’ তখন নতুন বেরোনো পত্রিকা। ওদের রবিবারের সাপ্লিমেন্টারিতে গল্প, ফিচার, কবিতা, ছোটদের বিভাগ সবই থাকে। লেখাটা ছোটদের উপযোগী ভেবে ছোটদের বিভাগেই দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, ছোটরা বিড়াল ভালবাসে। সুতরাং…

ওহ বলাই হয়নি। লেখাটা বিড়াল নিয়ে। বিড়াল কোথায় পাওয়া যায়, কত দাম, বাংলা এবং ইংরেজি সাহিত্যে বিড়াল কোথায় কোথায় রয়েছে, কোন কোন বিখ্যাত লোক বিড়াল পুষেছেন, পোষেন, কোন কোন চিত্রকর বিড়ালের ছবি এঁকে গেছেন এইসব। লেখাটা গোবর্ধনবাবুর নিজের কাছে খুব মূল্যবান লেগেছিল। উনি নাম দিয়েছিলেন— ‘বিড়াল কাহিনি।’

‘নবকুসুম’-এ পাঠাবার আগে লেখাটা ঘরোয়া মজলিসে একদিন পড়েওছিলেন। সেদিন বড়শালি ফু্ট কেটেছিল— ‘জামাইবাবু আপনার এ লাইনে কিন্তু অনেক স্কোপ আছে। বিড়ালটা ছাপা হলে ইঁদুরে যাবেন। ইঁদুরের পর ছুঁচো। তারপর—’

খানিকটা অভিমানী গলায় গোবর্ধনবাবু উত্তর দিয়েছিলেন— ‘তুমি এমনভাবে বলছ যেন কাজটা কত সহজ! এই লেখাটার জন্য কত পরিশ্রম করেছি জানো? কত বই খুঁজেছি, কত জার্নাল—’

বড়শালি জামাইবাবুর মনের ভাব টের পেয়ে তাড়াতাড়ি বলে উঠেছিল— ‘কাজটা যে কত কঠিন তা তো লেখাটাতেই পরিষ্কার। বাবাঃ, কত তথ্য!’

—‘তবেই বোঝো!’ অভিমান ভুলে গর্বে বুকটা টানটান হয়ে গেছিল গোবর্ধনবাবুর। বলেছিলেন— ‘এসব জানতে কম দূর হাঁটতে হয়েছে নাকি আমাকে!’

তিনপাতার লেখাটা নিয়ে গোবর্ধনবাবুর আশাও ছিল বিস্তর। তথ্যের সমাবেশ করতে ঠাকুরবাড়ি আর রায়বাড়ির বিখ্যাতদের রচনা তো চষে ফেলেছেন। গগন ঠাকুরের পার্শিয়ান বিড়ালের ছবি থেকে লীলা মজুমদারের ফুলীর মাছ পাহারা দেওয়া কিছুই বাদ দেননি।

লেখাটা তাড়াতাড়ি ছাপা হবে এটা তো ধরেই নিয়েছিলেন। এমনকী এ-ও ভেবেছিলেন যে প্রথা ভেঙে ‘নবকুসুম’, যে-রবিবার লেখাটা ছাপা হবে, তার আগে কোনও একদিন বিজ্ঞপ্তি মারফত লেখাটা প্রকাশের খবর পাঠকদের দিয়েও দেবে।

ক্যুরিয়রেই লেখাটা পাঠিয়েছিলেন এক মঙ্গলবার। গোবর্ধনবাবু মনে মনে হিসাব করছিলেন, লেখাটা যদি বুধবারে বিকেলে দপ্তরে পৌঁছয়, তবে কি তা সামনের রবিবারে ছাপা হতে পারে? দু-তিনটে রবিবারের সাপ্লিমেন্টারির সাবজেক্ট ম্যাটার ‘নবকুসুম’ কি আর আগাম ঠিক করে রাখেনি? তবু বলা যায় না। ভাল লেখা বলে কথা!

না, লেখাটা প্রকাশের আগাম খবরও দেখা গেল না, রবিবার লেখাটা ছাপাও হল না। হালকা নিরাশ হলেন গোবর্ধনবাবু। তবে সেটা ঝেড়ে ফেলতে দেরি হল না। মানসিকভাবে পরের রবিবার ‘নবকুসুম’-এর বিশেষ পাতায় লেখাটা দেখার জন্য তৈরি হতে লাগলেন।

পরের রবিবার ঘুম থেকে উঠলেন সকাল পাঁচটায়। মর্নিং ওয়াক গোবর্ধনবাবু কোনওকালেই করেন না। সেদিন বের হলেন। উদ্দেশ্য অবশ্য হাঁটা নয়, বাসস্ট্যান্ড থেকে ‘নবকুসুম’ সংগ্রহ করা। কিন্তু ‘নবকুসুম’ খুলে আবারও নিরাশ। গোবর্ধনবাবু মনকে প্রবোধ দিলেন, বড় কাগজ, দুসপ্তাহ লেট তো হতেই পারে। এত তাড়াতাড়ি ছাপার আশাটা একটু বেশিই আশা হয়ে যাচ্ছে।

পরের সপ্তাহে, শনিবার রাত্রিতে গোবর্ধনবাবু খাওয়ার সময় গল্প করতে করতে ভাইপো তিতাসকে বললেন— ‘নবকুসুম’-এর ছোটদের বিভাগটা কাল অবশ্যই নজর করবি। বিড়াল নিয়ে আমার সেই লেখাটা কাল পাবলিশ হবে।’

তিতাস বলল- ‘ওরা কি তোমাকে জানিয়েছে জেঠু?’

গোবর্ধনবাবু বললেন— ‘জানাবে কেন? দৈনিকের লেখা ছাপার খবর কি আগাম সব পত্রিকা জানায়? মনে তো হয় না।’

—‘তবে?’

—‘এটা আমার অনুমান। এরকম একটা লেখা ওরা আর কত ফেলে রাখবে?’

পরের দিন, ভোর পাঁচটায় উঠে আবার হেঁটে বাসস্ট্যান্ড। এদিন ‘নবকুসুম’-এর রবিবারের সাপ্লিমেন্টারি খুলে নিরাশ নয় একেবারে হতাশ হয়ে গেলেন গোবর্ধনবাবু। রবিবারের সাপ্লিমেন্টারির শেষ পাতায় থাকে ‘ছোটদের বিভাগ’। গোবর্ধনবাবু দেখলেন, সে বিভাগটাই পাল্টে গেছে। সব লেখাই ছোটদের কলমে। একটা ঘোষণাও রয়েছে— ‘এবার থেকে এই বিভাগে কেবল কচিকাঁচাদের লেখাই প্রকাশিত হবে।’

আর দেরি করার মানে হয় না। এবার ‘বাংলা মুলুক’ দৈনিক। সবচেয়ে পুরোনো, সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা। গোবর্ধনবাবুর মনে হল, ‘মারি তো গণ্ডার, লুটি তো ভাণ্ডার।’ তা ছাড়া লেখাটার যা মান তার জন্য এরকম ভাল পত্রিকা প্রথমে না বাছাটাই তো ভুল হয়েছিল!

‘বাংলা মুলুক’-এ গোবর্ধনবাবুর অনেক চিঠিপত্র আগে প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং ওখানে তিনি অপরিচিত মুখ নন। ওদেরও ছোটদের বিভাগ রয়েছে। শনিবার বের হয়। কিন্তু লেখাটার জন্য ছোটদের বিভাগই বা বাছবেন কেন? ওদের ‘রবিবারের সাময়িকী’-তে অনেক নিবন্ধও প্রকাশিত হয়। এই তো সেদিন, পুতুল নাচ নিয়ে একটা লেখা ছাপা হল। রবিবারের পাতাটায় প্রবন্ধ, নিবন্ধের একটা জায়গাই আছে। বিড়াল নিয়ে লেখাটা ওখানে ছাপা হতেই পারে।

বড় পত্রিকা। লেখাটা তাই টাইপ করে পাঠালেন। তিন পাতার লেখাটা দেড় পাতা মত দাঁড়াল। এটাও ক্যুরিয়র করলেন।

এবার প্রতীক্ষার পালা। আগে চিঠিপত্রের ক্ষেত্রে দেখেছেন ছাপতে কখনও কখনও এক মাসও সময় নিত ওরা। রবিবারের সাময়িকীর ক্ষেত্রে ওই সময়টার আগে কি কিছু হবার আশা আছে!

গোবর্ধনবাবু লেখাটা পাঠিয়ে অন্য লেখায় মন দিলেন। এক মাস পর থেকে ‘বাংলা মুলুক’-এর রবিবারের সাময়িকী নিয়ে আগ্রহটা বাড়তে শুরু করল। ‘বাংলা মুলুক’ বাড়িতে নিয়মিত আসে। সুতরাং বাইরে কিনতে যাবার প্রশ্ন নেই। কিন্তু মাস খানেক পর থেকে রবিবারগুলোতে কাগজওলা আসার সময়টাতে গোবর্ধনবাবু চঞ্চল হয়ে পড়তে লাগলেন। কাগজওলার আসতে একটু দেরি হলে অস্থিরভাবে পায়চারী করেন। তারপর কাগজটা দিলেই ব্যগ্রভাবে ওটা খোলেন।

Advertisement

কিন্তু কতদিন? মাস দেড়েক পরে, ‘বাংলা মুলুক’-এ লেখাটা প্রকাশিত হল না দেখে গোবর্ধনবাবু একটু মুষড়ে পড়লেন। এর সপ্তাহ দুয়েক পরে এক রবিবার আবার আগের মত আঘাত। যে জায়গায় প্রবন্ধ নিবন্ধ ছাপা হয়, সেখানে দেখা গেল এক ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস।
গোবর্ধনবাবু ‘বাংলা মুলুক’-এর রবিবারের সাময়িকী নিয়ে আগ্রহ হারালেন। ‘বিড়াল কাহিনি’ নিয়ে বেশ কিছুদিন আর কোনও নড়াচড়া করলেন না গোবর্ধনবাবু। গ্রীষ্মের এক ছুটির দুপুরে পুরোনো লেখার ফাইলটা ওল্টাতে ওল্টাতে আবার মাথায় এল লেখাটা কোথাও পাঠাবার কথা। কিন্তু কোথায়?

বিখ্যাত পত্রিকা অনেক হল। এবার একটু কম বিখ্যাত পত্রিকায় ট্রাই করা যাক। এক রবিবারে ‘সুপ্রভাত’-এর রবিবারের সাপ্লিমেন্টারি ‘রবিসভা’ দেখে গোবর্ধনবাবুর মনে হল, লেখাটা ছাপার এটাই বেস্ট জায়গা। একটা লেখাও ছাপা হয়েছে এই ধরনের। প্রাণী নিয়ে নয় অবশ্য। ফল নিয়ে। ‘আম— সমাজে, সাহিত্যে।’ আবার লেখাটার কপি করলেন সুন্দর করে। আর ক্যুরিয়র নয়। একটা পাঁচটাকার ডাকটিকিট দিয়ে সাধারণ ডাকে পাঠালেন লেখাটা।

সপ্তাহ তিনেক গেল। ছাপা হল না। তবু আশা ছাড়লেন না। আরও সপ্তাহ দুয়েক গেল। ছাপার খবর নেই। পরের সপ্তাহের সূচনাতে মনে হল, খুব বড় পত্রিকা তো নয়, একবার সম্পাদকীয় দপ্তরে ফোন করে দেখবেন। কিন্তু কখন ফোন করা যায়? সকালে না বিকালে? গোবর্ধনবাবুর মনে হল বিকেলটাই ভাল। চারটে নাগাদ ফোনটা করলেন। রিং হল। ফোন ধরলও যেন কেউ। কিন্তু শুধুই ভেসে এল ‘আগুন’ ‘আগুন’ আওয়াজ। ফোন কেটে দিলেন গোবর্ধনবাবু।

সন্ধেয় টিভির খবরে ব্যাপারটা জানা গেল। ‘সুপ্রভাত’-এর অফিসে আগুন লেগেছিল দুপুরে। ক্ষয়ক্ষতির কথা অবশ্য খবরে কিছু পাওয়া গেল না।

গোবর্ধনবাবু ভেবেছিলেন, ‘সুপ্রভাত’ বন্ধ হবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটল না। দিন দুই পর থেকে ‘সুপ্রভাত’ আবার প্রকাশিত হতে লাগল। তবে পাতা কমল। রবিবারে ‘সুপ্রভাত’ বের হল ‘রবিসভা’ ছাড়াই। পর পর তিন সপ্তাহ এরকম চলার পর গোবর্ধনবাবু রণে ভঙ্গ দিলেন। রবিবারে ‘সুপ্রভাত’ কেনা বন্ধ করলেন।

এবার আর তাড়াহুড়ো করলেন না গোবর্ধনবাবু। বেশ কয়েকদিন যেতে দিলেন। তারপর আবার সুন্দর করে কপি করলেন লেখাটার। এবারে কোথায় পাঠাবেন তা নিয়ে খুব বেশি ভাবতে হল না। ‘যুগদর্পণ’ বলে একটা কাগজ গত দুবছর ধরে বেশ ভাল চলছে। আগে কোনওদিন খুলে পড়া হয়নি। লেখাটা ‘সুপ্রভাত’-এ পাঠানোর পরেই কাগজটা একদিন খুলে দেখেছিলেন। বেশ ভাল লেগেছিল। তখনই মনে হয়েছিল লেখাটা ‘সুপ্রভাত’-এর পরিবর্তে ওখানে পাঠালেই ভাল করতেন। এবার তাই প্রথমেই ‘যুগদর্পণ’-এর কথা মনে পড়ল। ওদের রবিবারের সাময়িকীর নাম— ‘রবিবারের যুগদর্পণ’। গোবর্ধনবাবু সাধারণ ডাকেই লেখাটা পাঠালেন।

দুসপ্তাহ গিয়েছে কী যায়নি, ঘটল আর এক ঘটনা। ‘যুগদর্পণ’ পত্রিকাটি যিনি চালাতেন তিনি চিটফান্ড কেলেঙ্কারিতে ধরা পড়লেন হঠাৎ। অমনি বন্ধ হয়ে গেল পত্রিকার প্রকাশ।

গোবর্ধনবাবু এবার সত্যিই চিন্তায় পড়লেন। লেখা ছাপার জন্য একটা সময় লাগেই। যতই ঔৎসুক্য দেখান, কোনও পত্রিকাতেই সে সময়টা পার হয়নি। অথচ, ঘটেছে নানান ঘটনা। কোথাও পত্রিকার ফরম্যাট চেঞ্জ হয়ে গেছে, কোথাও আগুনে পত্রিকার রবিবারের পাতাটা উধাও, আবার কোথাও মালিকের গ্রেপ্তারে পত্রিকা বন্ধ। নাঃ, মানতেই হচ্ছে, বেশ শক্তিশালী লেখাটা।

‘বিড়াল কাহিনি’ নিয়ে আর এগোনো ঠিক মনে করলেন না গোবর্ধনবাবু। এবং শুধু তাইই নয়, নতুন কোনও ফিচার লিখতেও আর আগ্রহবোধ করলেন না। গল্প মাঝখানে বেশ কয়েকটা লিখেছেন। ছাপাও হয়েছে দু-একটা লিটল ম্যাগাজিনে। এবার পুরোপুরি গল্পতেই আত্মনিয়োগ করলেন।

সেদিন গল্পের একটা নতুন থিম মাথায়। কীভাবে শুরু করবেন ভাবছেন, এমন সময় পাশে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। সাধারণত ধরেন না। আজ কী মনে করে ধরলেন। তারপর ‘হ্যালো’ বলতেই ও প্রান্ত থেকে প্রশ্ন— ‘গোবর্ধন গোলদার বলছেন?’

—‘হ্যাঁ, আপনি?’

—‘আমি সুপ্রতিম ধর বলছি। ‘রবিবারের যুগদর্পণ’ আমার সম্পাদনাতেই বের হত। বলছিলাম—’

—‘হ্যাঁ, বলুন’, গোবর্ধনবাবুর গলায় কৌতূহল এবং বিস্ময়।

—‘আপনি ‘রবিবারের যুগদর্পণ’–এ ‘বিড়াল কাহিনি’ বলে একটা লেখা পাঠিয়েছিলেন। ‘যুগদর্পণ’ বন্ধ হয়ে গেছে জানেন নিশ্চয়।’

—‘জানি।’

—‘আমি ‘যুগদর্পণ’ থেকে আসার সময় লেখাটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম। আমার একটা লিটল ম্যাগাজিন আছে। নানান ধরনের লেখা ওখানে থাকে। আপনার লেখাটা ওখানে ছাপতে চাই। আপনার অনুমতি চাইছি।’

এমন একটা প্রস্তাব পেয়ে গোবর্ধনবাবু অভিভূত। —‘আমার অমত নেই’ কথাটাও ঠিকঠাক বলতে পারলেন না। গলা কেঁপে গেল।

ফোনটা রেখে একরকম চিৎকার করেই খবরটা স্ত্রী মণিকাকে জানালেন।

সুপ্রতিম ধর নামী কবি। উনি ‘রবিবারের যুগদর্পণ’ সম্পাদনা করতেন জানা ছিল না গোবর্ধনবাবুর। এসব লোকের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে লেখালেখির লাইনে অনেক উপকার পাওয়া যায়। সুপ্রতিম ধরের ফোন নম্বরটা মোবাইলে সেভ করে রাখলেন।

পরদিন সন্ধেয় মণিকার সঙ্গে ‘বিড়াল কাহিনি’ নিয়েই কথা বলছিলেন। —‘সেই কবে লিখেছিলাম লেখাটা। এতদিনে একটা হিল্লে হল। তবে লিটল ম্যাগাজিন তো! বেশিরভাগই ঠিক সময়ে প্রকাশিত হয় না। এটা কবে হবে কে জানে।’

—‘ক’দিন পরে ভদ্রলোককে একটা ফোন করে নিয়ো।’ মণিকা পরামর্শ দিল।

—‘ঠিকই বলেছ।’ কথাটা বলেই কিন্তু গোবর্ধনবাবুর হাত মাথায়। একেবারে স্তব্ধ হয়ে বসে গেলেন। মণিকাও দেখেছে। সামনের টিভি স্ক্রিনে খবর পড়ছে মেয়েটি। আর নিচ দিয়ে চলে যাচ্ছে, আগে পড়া বা গুরুত্বহীন নানা খবরের সারি। সেই সারিতেই এক জায়গায় লেখা রয়েছে— ‘প্রয়াত কবি সুপ্রতিম ধর।’

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight + ten =

Recent Posts

গৌতম চক্রবর্তী

দুই হুজুরের গপ্পো

১৯৩০ সালের ১৪ জুলাই, আলবার্ট আইনস্টাইন বার্লিনের উপকণ্ঠে নিজের বাড়িতে স্বাগত জানান ভারতীয় কবি, দার্শনিক ও সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। তিনি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয় নোবেল বিজয়ী। তাঁদের এই সাক্ষাৎকারটি ইতিহাসের অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত ও মননশীল আলাপচারিতায় পরিণত হয়, যেখানে তাঁরা বিজ্ঞান ও ধর্মের চিরন্তন দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করেন। “সায়েন্স অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান ট্রাডিশন: হোয়েন আইনস্টাইন মেট টেগোর” গ্রন্থে এই ঐতিহাসিক সাক্ষাতের বিবরণ পাওয়া যায়। এই বইতে বিশ শতকের শুরুতে ভারতের বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণ এবং ভারতীয় ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিক চিন্তার মেলবন্ধন তুলে ধরা হয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আশা ভোসলে ও তাঁর বাংলা গান

সুদীর্ঘ আট দশক ধরে তিনি তাঁর সঙ্গীতের সুধায় ভরিয়ে দিয়েছেন কেবল ভারত বা এই উপমহাদেশকেই নয়, বিশ্বকে। পরিণত বয়সেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর, যেমন কয়েক বছর আগে হয়েছিল তাঁর স্বনামখ্যাত অগ্রজা লতা মঙ্গেশকরের। আশা ভোসলে তাঁর সমগ্র জীবনে বারো হাজার গান গেয়ে গিনেস বুকে স্থান পেয়েছেন। একদিকে ধ্রুপদী সঙ্গীত, অন্যদিকে লঘু, পপ, এমনকী চটুল গানেও তাঁর সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। সমসাময়িক কিংবদন্তি শিল্পীদের মধ্যে এজন্য অনায়াসে স্থান করে নিয়েছিলেন তিনি।

Read More »
গৌতম চক্রবর্তী

স্প্যানিশ ছোটগল্প: পুতুল রানি

সত্যিকারের আমিলামিয়া আবার আমার স্মৃতিতে ফিরে এসেছে, আর আমি আবার— সম্পূর্ণ সুখী না হলেও সুস্থ বোধ করছি: পার্ক, জীবন্ত সেই শিশুটি, আমার কৈশোরের পঠনকাল— সব মিলিয়ে এক অসুস্থ উপাসনার প্রেতচ্ছায়ার ওপর জয়লাভ করেছে। জীবনের ছবিটাই বেশি শক্তিশালী। আমি নিজেকে বলি, আমি চিরকাল আমার সত্যিকারের আমিলামিয়ার সঙ্গেই বাঁচব, যে মৃত্যুর বিকৃত অনুকরণের ওপর জয়ী হয়েছে। একদিন সাহস করে আবার সেই খাতাটার দিকে তাকাই— গ্রাফ কাগজের খাতা, যেখানে আমি সেই ভুয়ো মূল্যায়নের তথ্য লিখে রেখেছিলাম। আর তার পাতার ভেতর থেকে আবার পড়ে যায় আমিলামিয়ার কার্ডটি— তার ভয়ানক শিশুসুলভ আঁকাবাঁকা লেখা আর পার্ক থেকে তার বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার মানচিত্র। আমি সেটা তুলে নিয়ে হাসি।

Read More »
যদুনাথ মুখোপাধ্যায়

বিজ্ঞানমনস্কতা কারে কয়?

শ্রদ্ধেয় বসুর বইতে হোমিওপ্যাথি সম্পর্কিত অধ্যায়টি তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্কদের, বিশেষ করে মুদ্রা-মূর্ছনায় মজে থাকা, বা রাজনীতিজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতির দাবেদার-ঘনিষ্ঠ চিকিৎসকদের বিরক্তিকর বা অপ্রীতিকরই মনে হবার কথা। কেননা, উল্লিখিত দুটি বিষয় নিয়ে তাদের মনের গহীন কোণে প্রোথিত বিজ্ঞানবাদিতার শেকড় ওপড়ানোর সম্ভাবনা নেই বলেই মনে হয়। প্রশ্ন হল, তাঁর উপরিউক্ত বইটির কারণে তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্ক বন্ধুদের চোখে ব্রাত্য বলে চিহ্নিত হবেন না তো? হলে আমি অন্তত আশ্চর্যচকিত হব না। দাগিয়ে দেবার পুরনো অভ্যাস বা পেটেন্ট এই মহলের বাসিন্দাদের প্রধান অস্ত্র, তা ভুক্তভোগীরা হাড়ে হাড়ে জানেন।

Read More »
প্রসেনজিৎ চৌধুরী

অগ্নিবীর: বন্দুকের মুখে ঈশ্বর

১৯৫০ দশকে নেপালের রাজতন্ত্র ও রাজার মন্ত্রিগোষ্ঠী রানাশাহী শাসনের বিরুদ্ধে সফল সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়েছিল। সেই বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন অনেক ভারতীয়। তাঁদের মধ্যে অনেকে বাঙালি। নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই প্রথম সংঘর্ষ সে-দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত। ভারত ও চীনের মধ্যে একফালি দেশ নেপালের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম সশস্ত্র ও নিরস্ত্র দুই পথ ধরে চলেছিল। ডান-বাম-অতিবাম— ত্রিমুখী রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের চূড়ান্ত সফলতা আসে ২০০৮ সালে রাজার শাসনের অবসানে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারী: এক দৈবী আখর

আমরা ৮-ই মার্চের আন্তর্জাতিক নারীদিবসে আবহমান নারীবিশ্বকে সামান্য একটু ছুঁয়ে যেতে চাইলাম মাত্র। হাজার হাজার বছর ধরেই তাঁদের ওপর কড়া অনুশাসন, জবরদস্ত পরওয়ানা আর পুরুষতন্ত্রের দাপট। সে-সবের ফল ভুগতে হয়েছে আন্তিগোনে থেকে সীতা, দ্রৌপদী; জোয়ান অফ আর্ক থেকে আনারকলি, হাইপেশিয়া; রানি লক্ষ্মীবাঈ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া; রোজা পার্কস থেকে মালালা ইউসুফজাই— তাঁদের মতো হাজারো নামহীন নারীকে।

Read More »