Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

রামকেলির মেলার পাঁচসিকের বোষ্টমী ও সাংবাদিক লালবিহারী মজুমদার

মীরা নায়ার ২০০৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তাঁর বিতর্কিত সিনেমা ‘ওয়াটার’-এ বেনারসের ঘাটে ঘাটে ঘুরে পেটের তাড়নায় পতিতাবৃত্তি অবলম্বনে বাধ্য হওয়া মনোরমা নামের এক বিধবাকে দেখিয়েছিলেন। কিছুটা আত্মপক্ষ সমর্থনের ঢঙে সে বলেছিল বাংলার বৈষ্ণব আখড়াগুলোয় ধর্মের নামে ব্যাভিচারের কাহিনি। সিনেমাটিকে কেন্দ্র করে বিতর্কের পরিসর তৈরি হয়েছিল, কিন্তু নানা সময়ে সমাজ ইতিহাসের গবেষকরা একমত— চৈতন্য-পরবর্তী বৈষ্ণবধর্মে এই অনাচারের ইতিহাস নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

অধ্যাপক সুধীর চক্রবর্তী তাঁর কালজয়ী গবেষণাগ্রন্থ ‘গভীর নির্জন পথে’-তে স্পষ্ট বলছেন— ১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দে চৈতন্যদেবের মৃত্যুর পর মোটামুটি ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে একদিকে যেমন বহু সম্প্রদায় বা আখড়ায় বিভক্ত হয়ে বৈষ্ণবধর্ম একটা অন্য চেহারা পায়, তেমন সহজিয়া বৈষ্ণবধর্মের চর্চা বাড়ে। বাউল বা বৈষ্ণবদের এই সহজিয়া ধর্মে দেহসাধনার বিষয়টিকে নিজেদের মত করে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা থেকেই ধর্মীয় সাধনার মধ্যে ব্যাভিচারের অনুপ্রবেশ ঘটে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে আরম্ভ করে বিংশ শতাব্দীর কিছুটা সময় পর্যন্ত এই অনাচারের নানা প্রমাণ সাহিত্যে বা সংবাদপত্রে ছড়িয়ে আছে। তারকেশ্বরের ‘মোহান্ত এলোকেশী সম্বাদ’ থেকে আরম্ভ করে কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’-র ‘গুরুগিরি ও গোঁসাইগিরি’-র অংশগুলিতে এই ধর্মীয় অনাচারের রসালো কেচ্ছা তীব্র ভাষায় ফুটে উঠেছে। অনেক পরবর্তীতে বৈষ্ণব তাত্ত্বিক অজিত দাস তাঁর আত্মজীবনী ‘জাতবৈষ্ণব কথা’-য় খোদ সুকুমার সেনের তথ্যসূত্র উল্লেখ করে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, রামকেলিধামের মত পবিত্র বৈষ্ণব তীর্থক্ষেত্রও এই ধর্মীয় অনাচারের বাইরে থাকতে পারেনি। নেড়ানেড়ির কন্ঠীবদলের মত স্বীকৃত গণবিবাহের আসরের আড়ালে এমন অনেককিছুই হয়ে গেছে, যাকে কোনওমতেই অনুমোদন দেওয়া যায় না।

ইতিহাস বলে, ১৫৭৪-এর প্লেগে গৌড় নগরী জনশূন্য হওয়ার পর দীর্ঘকাল এই রামকেলি উৎসব ও মেলা বন্ধ থাকে। তারপর যখন চালু হয়, তখন থেকেই এই বৈষ্ণব গণবিবাহের রমরমা। বাউল, খুশিবিশ্বাসী, তিলকদাসী, দরবেশ, সাহেবধনী, বলাহাড়ি— মেলায় আগত সব সম্প্রদায়ের বৈষ্ণবদের মধ্যে এ প্রথা চালু ছিল। পাতলা কাপড়ের একদিকে একেবারে বুক পর্যন্ত ঘোমটা টেনে দাঁড়াতেন বৈষ্ণবীরা। কাপড়ে ছোট ছোট ছিদ্র করে কনিষ্ঠা আঙুল বাড়িয়ে দেওয়া হত। পাঁচসিকে বা চার আনার বিনিময়ে সেই আঙুল দেখেই বৈষ্ণব বেছে নিতেন তার ‘মনের মানুষ’-কে। তারপর ওই কড়ে আঙুল ধরে বাইরে এনে ঘোমটা খুলিয়ে চারচক্ষুর মিলন, কন্ঠীবদল— অনেকক্ষেত্রে মালাচন্দন করে আনুষ্ঠানিক বিবাহ। কিন্তু বৈষ্ণবী পছন্দ না হলে তাৎক্ষণিক বিচ্ছেদ। গলার কন্ঠী নিষ্ঠুরভাবে ছিঁড়ে ফেলে, শেষবারের মত একবার দই-চিঁড়ে খাইয়ে বিদায়। সেই পরিত্যক্ত বোষ্টমীর দিকে ফিরেও তাকাত না কেউ।

কবি গীতা চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘বেদানাদাসীর আশ্চর্যচরিত’ কবিতায় কন্ঠীছেঁড়া বৈষ্ণবীর এই বুকভাঙা কান্নাকে বাংলা সাহিত্যে অমর করে রেখেছেন। প্রাচীন মানুষেরা বলেন, এই অসহায় মেয়েরা অনেকক্ষেত্রেই লালসার শিকার হত। মেলাকে কেন্দ্র করে অস্থায়ী পতিতাপল্লির বিস্তারের কথাও অনেকে বলেছেন।

এই জায়গাটাতেই প্রতিবাদ করেছিলেন ‘গৌড়দূত’ পত্রিকার সম্পাদক লালবিহারী মজুমদার। ইতিহাস গবেষক অধ্যাপক প্রদ্যোৎ ঘোষ তাঁর ‘বৈষ্ণবতীর্থ রামকেলি ও তার উৎসব’ প্রবন্ধে বলছেন— ‘‘প্রায় শতবর্ষ পূর্বে এখানে বারাঙ্গনাদের ব্যাপক উপস্থিতি হওয়ায় ‘গৌড়দূত’ পত্রিকার বিখ্যাত সম্পাদক লালবিহারী মজুমদার তীব্র প্রতিবাদ করায় তৎকালীন জেলাশাসক জে.এন.রায় তা রদ করেন।’’ এ নিয়ে লালবিহারীর সঙ্গে মন্দির সংলগ্ন আখড়ার মোহান্ত বাবাজিদের মতানৈক্য তৈরি হয়। মিথ্যা অভিযোগ তুলে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করা হচ্ছে— এই অভিযোগ ওঠে তাঁদের তরফ থেকে। কর্তব্যে অটল লালবিহারীর পরিষ্কার যুক্তি ছিল— ঐতিহ্যশালী রামকেলি প্রাঙ্গণের পবিত্রতা রক্ষা করা সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক ও মালদাবাসী হিসাবে তাঁরও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। অসহায় কন্ঠীছেঁড়া বৈষ্ণবীদের কেন কোনও সুস্থ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে না— এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।

১৯১২ পরবর্তী সময় থেকে অগ্রজপ্রতিম রাধেশচন্দ্র শেঠের ছায়া সরে যাচ্ছে লালবিহারীর মাথার ওপর থেকে। ‘গৌড়দূত’-এর সম্পাদক ও প্রকাশক হিসাবে লালবিহারী একক এবং অনন্য— ফলে তিনি কার্যত একাই লড়ে যান। তিনি তাঁর লেখায় মালদায় ফিমেল স্কুল স্থাপনকে গুরুত্ব দিয়েছেন, বাল্যবিবাহের প্রতিবাদ করেছেন, সমর্থন করেছেন শিক্ষিত মেয়েদের আর্থিক স্বনির্ভরতাকে— অসহায় মেয়েদের চোখের জল তাঁকে যে বিচলিত করেছিল, ‘গৌড়দূত’-এর একাধিক লেখাই তার প্রমাণ।

Advertisement

মজুমদার পরিবারের লোকশ্রুতিতে আছে, পুলিশ পাঠিয়ে নির্দেশ কার্যকর করার আগে জেলাশাসক জে. এন. রায় নিজে এসেছিলেন বর্তমান জুবিলি রোডে অবস্থিত মজুমদারবাড়ির বিখ্যাত চাতালটিতে— যে চাতাল আর ডিসপেনসারি ঘর নানা ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী। মেলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পতিতাবৃত্তি রোধ করার জন্য লালবিহারীর এই সাহসী পদক্ষেপ কালের গর্ভে তলিয়ে গেলেও ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে।

অধ্যাপক রমাকান্ত চক্রবর্তী তাঁর ‘বৈষ্ণবিজম ইন বেঙ্গল’ নামক বৈষ্ণব ধর্মবিষয়ক আকরগ্রন্থে রামকেলি প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে একজন দৃঢ়চেতা (আপরাইট) সাংবাদিকের কথা উল্লেখ করেছেন— যিনি শুধু এই মেলার প্রচার ও প্রসারে সাহায্য করেছেন, তাইই নয়— এই মেলাকেন্দ্রিক কুপ্রথা দূর করতেও কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছেন। অনুমান করা অসংগত নয়: এই সাংবাদিক আর কেউ নন, লালবিহারী মজুমদার।

শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্তকে ঘরছাড়ার আহ্বান জানিয়ে বৈষ্ণবী কমললতা বলেছিল, চলো ঠাকুর— বেরিয়ে পড়ি। দেহসাধনা নিয়ে শ্রীকান্তের কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তরে এই কন্ঠীছেঁড়া বোষ্টমী বলেছিল— এ পথ সত্যি যাদের জন্য নয়, তাদের সাধনা চিরকাল জলের ধারাপথে শুকনো বালির মতো আলগা থেকে যায়, কোনওদিন জমাট বাঁধে না। মেয়েরা দুঃখকে ভয় পায় না— আবার চোখের জলকেও এড়াতে চায় না। দ্বারিকাদাসের আখড়ায় এই চিরসত্য খুঁজে পেয়েছিলেন শ্রীকান্তরূপী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আর রামকেলির মেলায় সাংবাদিক লালবিহারী মজুমদার।

গ্রন্থঋণ:

১. Vaishnavism in Bengal- Ramakanta Chakravarty, Firma KLM, Kolkata, 1996
২. গভীর নির্জন পথে- সুধীর চক্রবর্তী, আনন্দ, কলকাতা, ১৪০৭ বঙ্গাব্দ
৩. জাতবৈষ্ণব কথা- অজিত দাস, চর্চাপদ, কলকাতা, জানুয়ারি ২০১২
৪. মালদহের ইতিহাসের ধারা- তুষারকান্তি ঘোষ, অক্ষর প্রকাশনী, কলকাতা, ২০২০
৫. নির্বাচিত ‘গৌড়দূত’ সংকলন (মজুমদার পরিবারের সৌজন্যে)

চিত্র: গুগল

One Response

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × 5 =

Recent Posts

সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

ছোটগল্প: ফাউ

গরমকালে ছুটির দিনে ছাদে পায়চারি করতে বেশ লাগে। ঠান্ডা হাওয়ায় জুড়োয় শরীরটা। আকাশের একপাশে আবির। সন্ধে হবে হবে। অন্যদিকে কাঁচা হলুদ। চায়ের ট্রে নিয়ে জমিয়ে বসেছে রুমা। বিয়ের পর কি মানুষ প্রেম করতে ভুলে যায়? নিত্যদিন ভাত রুটি ডালের গল্পে প্রেম থাকে না কোথাও? অনেকদিন রুমার সঙ্গে শুধু শুধু ঘুরতে যায়নি ও।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার…

মনু-পরাশর-বৃহস্পতি-কৌটিল্যদের অনুশাসন এসে নারী প্রগতির রাশ টেনে ধরল। নারীর শিক্ষালাভের ইতি ঘটল, অন্তঃপুরে বাস নির্দিষ্ট হল তাঁর জন্য। তাঁকে বাঁধা হল একের পর এক অনুশাসনে। বলা হল, স্বাধীনতা বলে কোনও পদার্থ থাকবে না তাঁর, ‘ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি’! কুমারী অবস্থায় পিতা-মাতার অধীন থাকবে সে, বিয়ের পর স্বামীর, বার্ধক্যে সন্তানের। ধাপে ধাপে তাঁর ওপর চাপানো হতে লাগল কঠিন, কঠিনতর, কঠিনতম শাস্তি।

Read More »
স্বপনকুমার মণ্ডল

গরিব হওয়ার সহজ উপায়

এককালে পর্তুগিজ-মগরা আমাদের নিম্নবঙ্গ থেকে দাস সংগ্রহ করত মালয়-বার্মাতে শ্রমিকের কাজের জন্য, ইংরেজ সাহেবরাও কিনত গোলাম। আজ আবার মানুষ সস্তা হয়েছে। ঔপনিবেশিক শাসকের দরকার নেই। খোলাবাজারে নিজেরাই নিজেদের কিনছে দেশের মানুষ। মানুষ বিক্রির মেলা বসে এখন গ্রামগঞ্জের হাটে হাটে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহাশ্বেতা দেবী: স্বনামে চিহ্নিত অনশ্বর প্রতিভা

গ্রামশি-বর্ণিত ও পরবর্তীতে বহুলচর্চিত ‘সাব অলটার্ন’-এর আগেই মহাশ্বেতার লেখায় ব্রাত্যজনসংহিতা মূর্ত; ‘অরণ্যের অধিকার’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৭-এ। আর সাব অলটার্ন-তত্ত্ব প্রথম দানা বাঁধছে ১৯৮২-তে জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে, রণজিৎ গুহ, গৌতম ভদ্র, শাহেদ আমিন, পার্থ চট্টোপাধ্যায়দের সঙ্কলন প্রকাশের মাধ্যমে। অবশ্য তার বহু আগেই ইতিহাস রচনায় সাব অলটার্ন চেতনায় স্থিতধী দেখা গেছে রবীন্দ্রনাথকে। স্বামী বিবেকানন্দ মূর্খ, চণ্ডাল ও দরিদ্র ভারতবাসীর মাহাত্ম্য বুঝিয়ে গেছেন, আর বিভূতিভূষণকেও আমরা সামগ্রিক বিচারে প্রান্তিক মানুষের কথাকার রূপেই পাই। কিন্তু মহাশ্বেতা আরও ব্যাপক, গভীর, তন্ময়, নিবিড়, ও নিঃসন্দেহে দলিত জনতার কথাকার।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

সারদাদেবী: এক অনন্যা মাতৃরূপা

ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়ে ও বধূ হয়ে তিনি কিনা মুসলমান ঘরামি আমজাদকে খেতে দিয়ে তার এঁটোকাটা নিজের হাতে পরিষ্কার করেন! বিধর্মী খ্রিস্টান নিবেদিতার সঙ্গে বসে আহার করেন! আর তাঁর চেয়েও বড় কথা, সে যুগের বিচারে বিপ্লবাত্মক ঘটনা, স্বামীর মৃত্যুর পর যে দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন তিনি, বিধবাবিবাহের প্রবর্তক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-ও যা কল্পনায় আনতে গেলে নির্ঘাত মূর্ছা যেতেন, লালপেড়ে শাড়ি আর সোনার বালায় ভূষিতা থাকতেন তিনি! আজকের উচ্চশিক্ষিত সমাজেও ক’জন পারবেন এ-কাজ করতে, বা নিদেন এ কাজকে সমর্থন করতে?

Read More »
মো. বাহাউদ্দিন গোলাপ

জীবনচক্রের মহাকাব্য নবান্ন: শ্রম, প্রকৃতি ও নবজন্মের দ্বান্দ্বিকতা

নবান্ন। এটি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক পার্বণ নয়; এটি সেই বৈদিক পূর্ব কাল থেকে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারায় (যা প্রাচীন পুথি ও পাল আমলের লোক-আচারে চিত্রিত) এই সুবিস্তীর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষের ‘অন্নময় ব্রহ্মের’ প্রতি নিবেদিত এক গভীর নান্দনিক অর্ঘ্য, যেখানে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে শস্যের অধিষ্ঠাত্রী লোকদেবতার আহ্বানও লুকিয়ে থাকে। নবান্ন হল জীবন ও প্রকৃতির এক বিশাল মহাকাব্য, যা মানুষ, তার ধৈর্য, শ্রম এবং প্রকৃতির উদারতাকে এক মঞ্চে তুলে ধরে মানব-অস্তিত্বের শ্রম-মহিমা ঘোষণা করে।

Read More »