Search
Generic filters
Search
Generic filters
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

ছোটগল্প: ভোজের হাট

সুশীল কর কলেজে রমেনের সঙ্গে পড়েছি; আমি বিকম, রমেন বিএসসি। বড় নিরীহ ছেলে। কিন্তু সেই রমেনই কিনা থার্ড ইয়ারের আগে তার পাড়ার কোন কাকার পাল্লায় পড়ে ছোটা হাতি চালানো শিখে নিল। কলেজে থাকতেই ঘোষপুরের সবজি সেই গাড়িতে সে কোলে মার্কেটে পৌঁছে দিয়ে বেশ দু’পয়সা করেছিল। আমাদের কাছে রীতিমতো হিরো। আর কলেজ ছাড়ার মাস কয়েক পরে দেখি এক লজ্‌ঝরে হলুদ অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সির ড্রাইভার বনে গেছে সে। বেশ কনফি রেখেই বলেছিল, দ্যাখ না, বছর দুয়েকের মধ্যেই নিজের ট্যাক্সি যদি না করেছি! সে তাও করেছিল; ভোজের হাটের ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে তার সেই সেকেন্ড হ্যান্ড ট্যাক্সির গায়ে হেলান দিয়ে মোবাইলে গেম খেলছিল। আমার ডাকে তাকিয়ে দেখে। কিছু বলে না, শুধু তার বাঁ হাত দিয়ে বনেটে আলতো চাপড় মেরে বুঝিয়ে দিয়েছিল তার সেই স্বপ্নটি এখন সত্যি। আমি, চলি রে রমেন, বলে নিজের কাজে চলে গেলাম। তবে বেশ ভাল লেগেছিল; নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য বন্ধুর এমন একমুখী চেষ্টা, যাকে বলে সেল্ফ মেড।

মাঝেমধ্যেই রমেনের সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। বেশিরভাগ সময়েই খানিক রাতের দিকে। তাকে ওই ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে আরেকদিন ধরলাম।

কীরে, কী ব্যাপার, তোকে তো দিনের বেলা দেখি না!

আরে, রাতের দিকে সওয়ারির ভাড়া ডবল, সে বলল। আর, আমি তো সেই কবে থেকে রাতে সবজি নিয়ে গিয়ে রাত্তিরের কলকাতাকেই চিনি ভাল; ডান্ডাবাবুগুলোও আমায় চেনে। আসলে দিনের বেলা তিনটে শিফটে ট্যুইশনি, অঙ্ক আর কেমিস্ট্রি; সকালে দু’ব্যাচ, তারপর দুপুরে খাবার পর জম্পেশ দিবানিদ্রা, আবার বিকেলে একটা ব্যাচ। স্ট্যান্ডে আসতে আসতে রাত সাড়ে আটটা-ন’টা।

আমি বললাম, এবারে বিয়ে কর।‌ রমেন বাঁকা হাসি হেসে যা টুকিটাকি বলল তাতে বুঝলাম সে তার পক্ষীরাজ নিয়ে বেশ আছে।

এরপর বেশ অনেকদিন তার দেখা মেলেনি। আমিও হয়তো রমেনের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। সবাই নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে যা হয় আর কী।‌ ইদানীং আমাদের এদিকটায় আবার বাজারের আবহাওয়া বেশ তেতে উঠছে। সামনের বছরে ভোট, এখনই কেমন ফিসফাস; চাপা কানাকানি। কোথাও বিরোধীর টিকির দেখা নেই, তাও সব ঠেকেই নানান কে, কেন, কোথায় ইত্যাদির জোর তুফান। আরও যেন বেশ কয়েক মাস পরে রমেনকে দেখলাম; কেমন ফ্যাকাসে মুখ আর ঠান্ডা চাউনি। আমাকে দেখেও দেখল না, গাড়ি নিয়ে পাশ দিয়ে চলে গেল ঘটকপুকুরের দিকে।

মাস কয়েক হয়তো আরও চলে গেছে; আমি কাজ সেরে ফিরছি। ভোজের হাট বাস স্টপে নামতেই রমেন আমার পাশে গাড়ি থামিয়ে বলল, উঠে আয়। আলো-আঁধারে মুখ তো ভাল দেখছি না, তবে গলাটা কেমন ঠান্ডা আর কঠিন। আমি সেই আদেশের মতো ডাক উপেক্ষা করতে পারলাম না। পেছনের সিটেই উঠলাম।

কেমন আছিস রমেন? অনেকদিন তোকে দেখতে পাচ্ছিলাম না, ভাবলাম কোথাও গেছিস‌ হয়তো!

খুঁক করে ছোট্ট হাসির মতো একটা শব্দ করেই সে সেই ঠান্ডা গলায় বলল, ঠিকই ধরেছিস। আবার চুপচাপ। গাড়ির পেছন দিকটা দেখার লম্বাটে আয়নায় ওর মুখটা দেখার চেষ্টা করছি; রমেন বলল, সে অনেক কথা রে। নিজের চেষ্টায় নিজের পায়ে দাঁড়ানো যতটা না কঠিন, তার চেয়ে ঢের কঠিন কাজ দাঁড়িয়ে থাকাটা। কথাটা আমার নয়, এ আমাকে বলেছিল ওবেদুল্লা।

ওবেদুল্লা! সে তো তোদের সদস্য।

হ্যাঁ, পঞ্চায়েতে দুবারের।

তা সে হঠাৎ তোকে জ্ঞান দিচ্ছে কেন!

সেই কথা বলব বলেই তোকে ডাকলাম।

আমি কেমন রহস্যের গন্ধ পেলাম। দেখছি গাড়ি কখন আমার বাড়ি কোথায় পেছনে ফেলে ঘটকপুকুরের দিকে চলেছে; খুব জোরেও না, তবে ধীরেও নয়। আমি ভাবছি এর পর কী বলবে সে!

বুঝলি, সেদিনও এমন রাত দশটা নাগাদ হবে; ওবেদুল্লা, নবী, ছেনো আর পুলিনদা আমার ট্যাক্সিতে ওই পেছনের সিটেই গাদাগাদি করে চেপে বসল। সকলেই তো চেনা, তবে ওবেদুল্লা একেবারে আমার পাড়ার ছেলে। আমায় দেখে একটু হাসল। ভারিক্কি চালে ওবে বলল, রমেনদা, এই যে তুমি নিজের চেষ্টায় দু’পায়ে দাঁড়িয়েছ এটা শেখার, তবে জানবে সোজা দাঁড়িয়ে থাকাটা এখন বেশ চাপ। পুলিনদারা ঠেসেগুঁজে বসেই বলল, চল।

কোথায় যাব? তোমরা চললে কোথায় এই রাতবিরেতে!

কাজ আছে, একটু কুল্টিগঙের দিকে নিয়ে চল তো। পুলিনদাই বলল। ঘটকপুকুরের কাছাকাছি এসে হঠাৎ বলল, পোলের হাট চল।

সে কী, তাহলে তোমরা এদিকে এলে কেন?

আরে বাঁ হাতে ব্রিজ পেরিয়ে ভাঙড়ের রাস্তা ধর। আমাদের কথা আছে।

সে তো ধরতেই হবে; পেছনের সিটে নবী আর পুলিনদা দুজনে ওবেদুল্লাকে নিচু গলায় কিছু বোঝাচ্ছে, এবারে লড়াই জোর, তারই স্ট্র্যাটেজি নিয়ে কীসব বলছে, আমার কানে ঢুকলেও মাথায় ঢুকছে না। আমি ভাবছি তেলের দামটা কি দেবে! ভাঙড় কাটা খালের কাছেই একটা চাপা গোঙানির আওয়াজে পেছনে তাকিয়ে আমি হতবাক; ছেনো মুখটা গামছা দিয়ে ঠেসে ধরেছে, আর পুলিনদা তার সর্বশক্তি দিয়ে ওবেকে সিটে চেপে ধরেছে। নবীর একটা বীভৎস ছোরা ওবেদুল্লার গোটা পেটটাকে কুপিয়ে চলেছে। আমার হাত কাঁপছে, চোখে কেমন ঝাপসা দেখছি। পুলিনদা, ওবে তো তোমারই দলের, তোমার চ্যালা! বলতে চাইলাম, না বললাম নিজেই বুঝে উঠতে পারলাম না। খালের পাশে গাড়িটা থামিয়ে দিয়েছি। পেছন থেকে হিসহিসিয়ে উঠল পুলিনদা; তখনই সে আবার মনে করিয়ে দেবার মতো করে বলল, দাঁড়ানো সহজ, দাঁড়িয়ে থাকাটা সহজ নয়। এগিয়ে চল, চাপা গলায় বলল; খালের ধারে ফাঁকা জায়গায় গাড়ি রাখ। আমি তার কথামতো এঁকেবেঁকে তার পছন্দের জায়গায় পৌঁছলাম। পেছনের সিট রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ওবে কি এখনও বেঁচে আছে? এই গাড়িতে কত মরণাপন্ন মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছি, আর এই গাড়িতেই একটা প্রাণ চলে গেল! স্টিয়ারিংয়ে মাথা রেখে কতক্ষণ শুয়ে ছিলাম, খেয়াল নেই।

পুলিনদা বলল, ওঠ; তোর এসব দেখার অভ্যেস নেই, তোর হাত কাঁপবে, চালাতে পারবি না। ছেনো চালাবে, তুই পেছনে আয়।

আমি মন্ত্রপূতের মতো পেছনে গেলাম। আমাকে মাঝখানে রেখে দুপাশে দুজন, নবী আর পুলিনদা। সিটটা বোধহয় ধুয়েছে, ভেজা, ঠান্ডা; কেমন আঁশটে গন্ধ। পুলিনদা বলছে, অনেক কিছু জেনে ফেলেছিস রমেন! আমার হাত পা অসাড়, গলা দিয়ে কোনও শব্দ বেরোচ্ছে না। দেখছি নবী আমার মুখ বাঁধছে, হাত-পাও; আমি বুঝতে পারছি কী ঘটতে চলেছে, কিন্তু আমি শান্ত, প্রতিরোধহীন। ওরা ঠিক ওবের মতোই আমার দশা করল; তারপর ঠান্ডা মাথায় জলার ঠান্ডাজলের নীচে এমন ভাবে রাখল যাতে লাশটা ভেসে না ওঠে। রমেন থামল।

আমি গর্জে উঠি, কী যা তা বলে যাচ্ছিস!

রমেন কাতর গলায় বলল, না রে, আমি নেই। সত্যিই। জীবনে হয়তো দাঁড়িয়েছিলাম, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকাটা কি অত সহজ!

আমি কি জ্ঞানে ছিলাম, নাকি অজ্ঞান! যখন ঘোর কাটল তখন প্রথম আলোয় জলার ওপরের কুয়াশা যেন আমার চোখের ওপরেও জমে আছে। গাড়ি থেকে বেরোলাম। কিন্তু এ তো নীল-সাদা গতিধারা, হলুদ অ্যাম্বাসাডর তো নয়! ড্রাইভার কোথায়? রমেনের ফোন নম্বরে কোনও সাড়াশব্দ নেই। হাঁটতে শুরু করলাম; আমি ভোজের হাটে ফিরে যাব।

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়
5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
JYOTIRINDRANARAYAN LAHIRI
JYOTIRINDRANARAYAN LAHIRI
11 months ago

ভাল লাগল গল্পটি৷ ভূতের গল্প কিন্তু এটাই আমাদের ভবিষ্যতের গল্প৷

Recent Posts

সাবিনা ইয়াসমিন

শিলং ঘোরা

নদীর মাঝখানে একটা মস্ত পাথরের চাঁই। তারপরে সিলেট, বাংলাদেশের শুরু। কোনও বেড়া নেই। প্রকৃতি নিজে দাঁড়িয়ে দুই পারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

আষাঢ়স্য প্রথম দিবস

পয়লা আষাঢ় বলতে অবধারিতভাবে যে কবিকে মনে না এসে পারে না, তিনি হলেন মহাকবি কালিদাস। তিনি তাঁর ‘মেঘদূত’ কাব্যে পয়লা আষাঢ়কে অমরত্ব দিয়ে গেছেন।

Read More »
উত্তম মাহাত

কল্পোত্তমের দুটি কবিতা

দশাধিক বছরের সূর্যোদয় মনে রেখে/ শিখেছি সংযম, শিখেছি হিসেব,/ কতটা দূরত্ব বজায় রাখলে শোনা যায়/ তোমার গুনগুন। দেখা যায়/
বাতাসের দোলায় সরে যাওয়া পাতার ফাঁকে/ জেগে ওঠা তোমার কৎবেল।// দৃষ্টি ফেরাও, পলাশের ফুলের মতো/ ফুটিয়ে রেখে অগুনতি কুঁড়ি/ দৃষ্টি ফেরাও সুগভীর খাতে/ বুঝিয়ে দাও/ তোমার স্পর্শ ছাড়া অসম্পূর্ণ আমার হাঁটাহাঁটি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: অনন্যতাসমূহ

বিভূতিভূষণ, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ডায়েরি লিখতেন। এ ডায়েরি অন্য এক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে এনে দাঁড় করায়। মদ্যাসক্ত মানিক হাসপাতালে লুকিয়ে রাখছেন মদের বোতল। ডাক্তার-নার্সকে লুকিয়ে মদ খাচ্ছেন। আর বাঁচার আকুলতায় মার্ক্সবাদী মানিক কালীর নাম জপ করছেন! তবু যদি শেষরক্ষা হত! মধুসূদন ও ঋত্বিক যেমন, ঠিক তেমন করেই অতিরিক্ত মদ্যপান তাঁর অকালমৃত্যু ডেকে আনল!

Read More »
মধুপর্ণা বসু

মধুপর্ণা বসুর দুটি কবিতা

ভয় পেলে ভয়ংকর সত্যি ধারালো ছুরির মতো/ খুব সন্তর্পণে এফোঁড়ওফোঁড় তবুও অদৃশ্য ক্ষত,/ ছিঁড়ে ফেলে মধ্যদিনের ভাতকাপড়ে এলাহি ঘুম/ দিন মাস বছরের বেহিসেবি অতিক্রান্ত নিঃঝুম।/ গণনা থাক, শুধু বয়ে চলে যাওয়া স্রোতের মুখে/ কোনদিন এর উত্তর প্রকাশ্যে গাঁথা হবে জনসম্মুখে।/ ততক্ষণে তারাদের সাথে বুড়ি চাঁদ ডুবেছে এখন,/ খুঁজে নিতে পারঙ্গম দুদণ্ড লজ্জাহীন সহবাস মন।

Read More »
নন্দদুলাল চট্টোপাধ্যায়

ছোটগল্প: জমির বিষ

বিষয় মানেই বিষ। তালুকেরও হুল ছিল। বছরে দু’বার খাজনা দিতে হতো। আশ্বিন মাসে দুশ’ টাকা আর চত্তির মাসে শেষ কিস্তি আরো দুশ’ টাকা। এই চারশ’ টাকা খাজনার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। সে বছর বাবার ভীষণ অসুখ। বাতে একদম পঙ্গু, শয্যাশায়ী। অসুস্থ হয়ে জমিদারের ছুটি মিলল। কিন্তু খাজনা জমা দেবার ছুটি ছিল না। চত্তির মাসের শেষ তারিখে টাকা জমা না পড়লেই সম্পত্তি নিলাম হয়ে যেত।

Read More »