Search
Generic filters
Search
Generic filters

আমি শুধু ‘ভাইরাল’ হব, এটাই আমার অ্যাম্বিশন

—কী হে ভাগ্নে, সকাল থেকে বার্ড ফ্লু হওয়া মুর্গির মতো অমন গোল গোল করে সারা বাড়িময় ঘুরছ কেন হে?

—এটা ফাজলামি করার সময় নয় মামা, সরে দাঁড়াও!

—ওহ বাবা, এ তো পুরো মিলিটারি মেজাজ! বলি ব্যাপারটা কী হে? অফিসের ম্যানেজার আবার ছুটির দিনেও বাঁশ দিল নাকি হে?

—আরে না না, সেসব কিছু না! খুঁজছি…

—অ্যাঁ! এ কী অলুক্ষুনে কথা! তা কী খোঁজা হচ্ছে? দুর্গাপুজোর ছুটিতে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার জায়গা নাকি?

—আরে না না, সেসব খুঁজছি না!

—তাহলে পুজোর চারদিন ম্যাডক্স স্কোয়ারে বা হেঁদুয়ায় একসাথে হাত ধরে ঘোরা আর এগরোল খাওয়ার জন্য নতুন বান্ধবী খুঁজছ নাকি হে?

—উফফ! তোমাকে নিয়ে আর পারা গেলো না মামা! দুর্গাপুজো এখন ঢের দেরি! আর কত্তবার বলেছি দেশটা এই ক’বছরে হুহু করে এগিয়ে গেছে!

—হুহহ! তাতে কী হল?

—এটাই যে ‘প্রেম করাটা মধ্যবিত্ত বাঙালির সেরা অ্যাডভেঞ্চার, আর বিয়ে করাটা সেরা অ্যাচিভমেন্ট’— এই  তত্ত্ব থেকে এবার একটু বিরতি নাও!

—অহহ, তাহলে কি বুদ্ধিজীবী খুঁজছ নাকি হে?

—খামোকা বুদ্ধিজীবী খুঁজতে যাব কী দুঃখে!

—না, ওই ক’দিন ধরে খবরের কাগজে আর পাড়ার চায়ের দোকানে দোকানে মেলা শোরগোল চলছে না— ‘বুদ্ধিজীবীরা এখন কোথায়?’, ‘বুদ্ধিজীবীরা কি এখন নাকে সরষের তেল দিয়ে ঘুমুচ্ছে?’ তাই ভাবলাম তুমিও বুঝি তাদেরই খুঁজছ!

—তোমার বাজে বকাটা এবার থামাও! আর বুদ্ধিজীবী দিয়ে হবে কী! সব শালারা মাকাল ফল!

—ওহ বাবা! তুমি তো দেখছি হে বুদ্ধিজীবীদের ওপর বিশাল খাপ্পা!

—না হওয়াটাই অস্বাভাবিক! সব শালারা অপারচুনিস্ট খচ্চর!

—সে তো ভাগ্নে সব বাঙালিই কোনও না কোনও স্তরে রবীন্দ্রনাথ, সব পলিটিক্যাল নেতাই কোনও না কোনও স্তরে গোরুচোর, আর সব ক্রিমিনালই কোনও না কোনও স্তরে সমাজসেবী! তা নিয়ে অত গোঁসা করার কী আছে!

—ছাড়ো! ও তুমি বুঝবে না!

—ঠিক করে বোঝালেই বুঝব! যাক ছাড়ো, কী খুঁজছ সেটা তো বলো হে…

—চটজলদি বিখ্যাত হবার তারিকা…

—অ্যাঁ! চটজলদি বিখ্যাত হওয়া! অহহ, মানে ‘ভাইরাল’ হওয়া?

—হ্যাঁ, ওই একই হল!

—এই তো ভাগ্নে, বেসিক জিনিসে ভুল! পুরি আর ডালপুরি যেমন এক জিনিস নয়, বা কাম আর কামরাঙা, বা রসগোল্লা আর রাজভোগ, তেমনি বিখ্যাত হওয়া আর ভাইরাল হওয়া— দুটো আলাদা জিনিস! এগুলো সম্পর্কে একটু ওয়াকিবহাল থাকতে হবে বইকী! নাহলে তো সবই ওই ‘উটের পাকস্থলী’ হয়ে যাবে!

—ব্যস! ওই শুরু হয়ে গেল জ্ঞানভৈরবী!

—না না ভাগ্নে, সেই প্রাচীন আপ্তবাক্যটা শোনোনি? A problem can not be solved that starts from an absurd hypothesis…

—উফফ, এ তো দেখছি পুরো পাগল করে ছাড়বে!

—আর না না, তা হটাৎ অমন ভাইরাল হবার সাধ জাগল কেন? খাটের তলা থেকে কোটি কোটি টাকা বেরোচ্ছে বলে মাথায় ব্যামো চাপল নাকি?

—জাগবে নাই বা কেন! কোনও সুরতালের বালাই নেই, কিন্তু তার গানে আসমুদ্রহিমাচল পাব্লিক যেখানে-সেখানে কোমর-পশ্চাদ্দেশ দুলিয়ে নাচছে! বছর ষাট-এর বুড়ো ভাম নেতা, আড়াল থেকে স্বচ্ছন্দে টিটকারি দেওয়া যায় ‘চলমান মাংসের দোকান’ বলে, সে কিনা বছর ২০-২৫-এর মামণিদের সাথে নেচেকুঁদে বাজার মাত করছে! আবার কেউ হাফবয়সি ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর বাড়িতে কোটি কোটি টাকা রেখে খবরকাগজের হেডলাইন বাগিয়ে নিচ্ছে! এগুলো মেনে নেওয়া যায়?!

—ভাগ্নে, একটু জেলাস মনে হচ্ছে? তা তুমিও ওই ঘুরে ঘুরে নেচে ভিডিও বানাও না, ওই ৩০-৪০ সেকেন্ডের? কী যেন বলে বেশ ওগুলোকে?

—রিল?

—হ্যাঁ হ্যাঁ, রিল! তা তুমিও ওরকম কিছু বানাও না?

—হুহ্, ছেলেদের আবার রিল করে ভাইরাল হওয়া! যেন কাঁঠালের আমসত্ত্ব!

—ওহ বাবা, সেগুলো কি আর তেমন এফেক্টিভ নয় নাকি?

—নাহ, রিল-খ্যাত মামণিরা এখন হালে পানি না পেয়ে তাদের পোষা কুকুর-বেড়াল থেকে শুরু মায় তাদের খুদে খুদে বাচ্চাগুলোকে দিয়ে নাচিয়ে-কুঁদিয়ে বাজার ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে!

—হুহু বাবা! অধিক প্রয়োগে ব্রহ্মাস্ত্রও ভোঁতা হয়ে যায়! তাহলে আর কী, বেখাপ্পা গলায় তারস্বরে গান গাও আর কী!

—নাহ, সেটাও ঠিক জুতসই হবে না!

—অহহ, তাহলে কবিতা লিখে বই আকারে ছাপাও না, বেশ সুনীল-শক্তি ধাঁচের!

—মামা তুমি এখনও সেকেলেই রয়ে গেলে! গীতাঞ্জলীকে ‘বাপি বাড়ি যা’ স্টাইলে বাজার থেকে হঠিয়ে কথাঞ্জলির রমরমা এখন! ওসব আর চলে না!

—তাহলে কোনও গরমাগরম স্লোগান আমদানি করো না হে!

—উহু, ‘খেলা হবে’-র পর আর কোনও স্লোগানই ধোপে টিকবে না!

—এ তো মহা মুশকিল! তাহলে একটা রান্নার ভিডিও! আমি তো আছিই পাকা রাঁধুনি! ভাগ্নেকে নাহয় একটু সঙ্গত দিয়ে দেব। তাতে যদি তুমি একটু ভাইরাল হও!

—সে মোলাসেসেও বালি! বাজারে ঝাঁট দিলেই এমন রান্নার ভিডিও ঝুড়ি ঝুড়ি মিলবে!

—বলো কী! তাদের সব্বার রেসিপি ভাল?

—কোনওটার রেসিপি ভাল, আবার কোনওটার উপস্থাপিকা!

—গোলমেলে ব্যাপার হে! একটু খোলসা করে বলো দেখি! উপস্থাপিকার জোরে রান্নার ভিডিও হিট!

—মানে, ধরো, রাঁধছে টমেটোর চাটনি…

—আরে দাঁড়াও দাঁড়াও! এ তো পাতি রান্না…

—আমাকে সবটা বলে শেষ করতে দাও আগে!

—বেশ বলো!

—রাঁধছে টমেটোর চাটনি, কিন্তু উনুনে আগুন নেই! আর ভিডিওর শুরু থেকে শেষ অব্দি তেনার শাড়ির আঁচলের স্থিরতা বজায় থাকছে না! শেষে এমন হাল যে, শাড়ির আঁচল থাকার প্রধান উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ! আর তাতেই ভিডিও ভাইরাল!

—এ তো ঘোর কলি হে ভাগ্নে! তা বলি কী ভাগ্নে, ভাইরাল হওয়াটা কি নিতান্তই জরুরি?

—সব্বাই তো হচ্ছে, ধিনচ্যাক পূজা থেকে ভুবন বাদামওয়ালা! আমারও কি সাধ জাগে না!

—সে তো বুঝলাম, তবে একটা কথা না বলে পারছি না! সেদিন আমার ঘরে চুপিচুপি সিগারেট আনতে গিয়ে আমার ঘরের কম্পিউটারে একটা কবিতা চলছিল, সেটা শুনে তো মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে ছিলে!

—হ্যাঁ তা ছিলাম বইকী! কবিতাটা ঠিক মনে পড়ছে না!

—হুম, শম্ভু মিত্রের গলায় ‘মধুবংশির গলি…’।

—কারেক্ট! এবার মনে পড়েছে!

—হ্যাঁ, তা কেমন লাগল?

—আনরিয়্যাল!

—হুহু বাবা, পিওর সাধনা! টানা ১২ বচ্ছর ঘর বন্ধ করে কবিতাপাঠের সাধনা! লোকে ভেবেছিল লোকটা নির্ঘাত পাগল হয়ে গেছে!

—তাহলে বলছ, অমন চটজলদি দু’দিনের ভাইরাল হয়ে তারপর পুকুরের ঢেউয়ের মতো মিলিয়ে গিয়ে কোনও লাভ নেই?

—এতক্ষণে মাথায় ঢুকল তাহলে!

—গ্যারান্টি দিচ্ছ যে সবুরে মেওয়া ফলে?

—একদমই! গোলবাড়ির মাটন কষা-র দিব্যি! কথাতে আছে না, দু’মিনিটে কেবল ওই ম্যাগিই হয়, বিরিয়ানি রাঁধতে একটু সময় লাগে যে ভাগ্নে! সবুরে মেওয়া আর সাধনায় অমৃত… মিলিবেই মিলিবে…

চিত্রণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

2 Responses

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen + fifteen =

Recent Posts

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপুজো

বাংলাদেশের নানা জেলার‌ রামকৃষ্ণ মিশনে ঘোরার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সব জায়গাতেই আচারপরায়ণ মহারাজ ও ব্রহ্মচারীদের সুমধুর ব্যবহার। এখানে এসেই যখন এখানকার অধ্যক্ষ মহারাজ স্বামী একনাথানন্দজির সঙ্গে আলাপ হল, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলেন। আমাকে পূজামণ্ডপে নিয়ে তাঁর কাছে বসালেন। ষষ্ঠীর রাতে নববস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান‌ ছিল। আমাকে দিয়েও বস্ত্রদান করালেন। এই যে আচরণ, এতে করে আমি যে কী পরিমাণ সম্মানিত বোধ করলাম, তা বলার‌ নয়। কেবল‌ তাই নয়, সমবেত দর্শক-শ্রোতার সামনে আমাকে কিছু বলার আমন্ত্রণ-ও জানালেন। আমাকে আপ্লুত করল তাঁর এই আহ্বান।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

দুর্গাপূজা ও প্রসঙ্গত

এতদিন ধরে অন্য কোনও দেবদেবীর পুজো কোথাও হয় না। দুর্গাপুজোর এটি একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বৈশিষ্ট্য, এই পুজো উপলক্ষে কত যে পত্রপত্রিকা বেরোয়, তার কোনও সীমা নেই। কলকাতা যেহেতু এ-পুজোর প্রাণকেন্দ্র, স্বভাবতই এখান থেকে সবচেয়ে বেশি পুজোসংখ্যা পত্রিকা বেরোয়। প্রতিটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট আকারে পুজোর অর্ঘ্য সাজায়। প্রসঙ্গত, সত্যজিৎ রায় তাঁর যে দু’টি ভিন্নধারার লেখার মাধ্যমে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের ওপর জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তা কিন্তু এই পুজোর ‘দেশ’ আর’ আনন্দমেলা’-র সূত্রেই।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

মহালয়া

এই চণ্ডীপাঠকে অভাবিত মাত্রা দিয়েছে কলকাতার আকাশবাণী কেন্দ্র। ১৯২৭ সালে স্থাপিত হওয়া এই বেতার প্রচারকেন্দ্র থেকে (তখন নাম ছিল ‘Indian State Broadcasting Service’) ১৯৩১-এর ১১-ই অক্টোবর সর্বপ্রথম মহালয়ার অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। পরিকল্পনা বাণীকুমার, প্রকৃত নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য। সঙ্গীত পরিচালনায় রাইচাঁদ বড়াল ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। অচিরেই এটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। অদ্যাপি, প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিল্পীর পরিবর্তন হয়েছে, মহালয়ার প্রাক্-সূর্যোদয়ে এখনও কী কলকাতা, কী কানপুর-ঢাকা-ম্যাসাচুসেটস-আগরতলা-আন্দামান-মেহেরপুর-টোকিওর বাঙালি এটা শুনতে ভোলেন না।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

চিরজীবী বিদ্যাসাগর

বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার মাধ্যমে শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৮৫৫-র ১৪-ই এপ্রিল, অর্থাৎ ১২৬২-র পয়লা বৈশাখ এর প্রথম খণ্ড, ও সে বছরের-ই পয়লা আষাঢ় বইটির দ্বিতীয় খণ্ড বেরোয়। এর আগেও শিশুদের অক্ষর পরিচয় ও বাক্যগঠনের বেশ কিছু বই থাকলেও বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ উপযোগিতার দিক দিয়ে সেগুলিকে, ও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের ‘সহজপাঠ’-কে বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাঁর জীবিতকালেই বইটির ১৫০-এর ওপর সংস্করণ হয়, আর ছাপা হয়েছিল তিরিশ লাখের-ও বেশি। এখন-ও ও বইটির উপযোগিতা শেষ হয়ে যায়নি।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

অজানা বিভূতিভূষণ

নিতান্ত দারিদ্র্যের মধ্য থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন বলে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব এক দর্শন ছিল। তাই দেখি, ডায়েরির এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘দুঃখ জীবনের বড় সম্পদ, দারিদ্র্য, ব্যর্থতা বড় সম্পদ— Sadness ভিন্ন profundity আসে না।’ অতীত দারিদ্র্যময় জীবনের কথা মনে করে নিজে সপ্তাহে একদিন শুধু নুন আর ভাত খেতেন।

Read More »
মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

উত্তম উত্তম

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কম মহা-অভিনেতা জন্মাননি। তাঁদের মধ্যে খুব সামান্য কয়েকজন আল পাচিনো, মার্লোন ব্র্যান্ডো, রবার্ট ডি নিরো, লরেন্স অলিভিয়ার, গ্রেগরি পেক, জিন-পল বেলমন্ডো, ব্রুস লি, ইনোকেন্তি স্মোকতুনভস্কি, জিন গ্যাবিন, মাইকেল কেইন প্রমুখ। কিন্তু কতজন মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েই চলেছেন? সম্ভবত চার্লি চ্যাপলিনের পর একমাত্র উত্তম। এলিজাবেথ টেলর ‘নায়ক’ দেখে আপ্লুত হয়ে যে উত্তমের সঙ্গে ছবি করতে চেয়েছিলেন, উত্তমের অভিনয়ের এ-ও তো এক অনিবার্য স্বীকৃতি!

Read More »